ইসলামী সংগীতের অর্থনীতি : কতটা পেশাদার ইসলামী সংগীত অঙ্গন?

বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ইসলামি ভাবধারার সংগীতচর্চার বয়স খুব বেশি না হলেও বর্তমানে এসব গানের নতুন একটা জোয়ার তৈরি হয়েছে। সংগীতের গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ থাকলেও জনপরিসরে এ ধারার সংগীত সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাপক সমাদৃতি পাচ্ছে। ফলে ইসলামি অঙ্গনে গড়ে উঠেছে বেশকিছু সংগীত-দল। সংগীত-দলের বাইরে থেকে ব্যক্তি পর্যায়েও গানের চর্চা করছেন অনেকে।

ইসলামি ঘরানার সংগীতচর্চার এই ধারার অর্থনীতি, পেশাদারিত্ব এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে আলাপে বসেছিলাম বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী ও অনুষ্ঠান-উপস্থাপক মীম সুফিয়ানের সঙ্গে। মীম সুফিয়ান প্রায় এক দশক ধরে ইসলামি ভাবধারার সংগীতাঙ্গনের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। মাঠ পর্যায়ে ইসলামি সংগীতের যে প্রোগ্রামগুলো হয়, এর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ তাঁর উপস্থাপনায় হয়ে থাকে। সংগীতাঙ্গনের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি তিনি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন।

ইসলামি সংগীতের অর্থনীতি কতটা চাঙ্গা? জানতে চেয়েছিলাম মীম সুফিয়ানের কাছে। উত্তরে তিনি দীর্ঘ আলাপ টেনেছেন।

তিনি বলেন, ‘কোনো অঙ্গনের অর্থনীতি চাঙ্গা হবার পূর্বে দেখতে হবে সে অঙ্গনে কোনো অর্থনীতি আছে কি না। আসলে অর্থের সংশ্লিষ্টতা থাকলে পরে নীতির প্রশ্ন আসে। বাংলাদেশে ইসলামি ভাবধারার সংগীতকে প্রফেশনালি না ভাবার কারণে আর্থিক বিষয়টা একসময় ছিলই না। তাই ‘ইসলামি সংগীতে অর্থনীতি কতটা চাঙ্গা’–এই প্রশ্নের উত্তর কিছুটা প্যাঁচালো। ইসলামি ভাবধারার গান নিয়ে মাত্র দু-চার বছর হলো, প্রফেশনালি চিন্তা করতে শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সে হিসেবে বলা যায়, অর্থনৈতিক বিবেচনার মাত্র প্রবেশ ঘটেছে এই অঙ্গনে।’

মীম সুফিয়ান বলেন, ‘আমাদের এ দেশে ইসলামি গান চর্চার বিষয়টি চলে আসছে দু’ভাবে। গোষ্ঠীবদ্ধ ও ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবশালী ও প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন মাত্র দুয়েকজন। এ হিসেবে তারা স্ব স্ব কর্মের মাধ্যমে অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় মোটামুটি সফল। তারা সফল হলে ভাবা যায় তাদের ব্যক্তিগত ইসলামি সংগীত অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক চাঙ্গা। তবে সাধারণ সংগীতাঙ্গনের বিচারে সেটা নিতান্তই গৌণ। বড় কথা হলো, ইসলামি কোনো সংগীতকর্মী যে গানকে প্রফেশনালি চিন্তা করবে, সেটা কীভাবে করবে? যেখানে সে নিজেকে গঠন করতেই রাজি না। গানের শাস্ত্রীয় জ্ঞানার্জনকে যখন তারা গুরুত্ব দিচ্ছে না। মাইক্রোফোনের সামনে একদিন দাঁড়ালেই যখন তারা মনে করে ‘শিল্পী হয়ে গেছি’। গুরুমুখী এই বিদ্যাকে তারা তাচ্ছিল্য করে যখন স্বশিক্ষিত হতে চায়। আত্মগঠনের চিন্তা বাদ দিয়ে যখন তারা প্রচারমুখিতায় মগ্ন হয়ে পড়ে। তারা যেন জানেই না যে, গান একটি শ্রুতবিদ্যা। গুরুমুখী বিদ্যা।

‘গোষ্ঠীবদ্ধভাবে যে ইসলামি গানচর্চা হয়ে আসছে, তা আবার দুই দৃষ্টিতে বিবেচ্য। রাজনৈতিক সংগঠন-আশ্রিত এবং অরাজনৈতিক। অরাজনৈতিকভাবে যেসব সংগঠন কাজ করে আসছে, তারা কোনোসময়ই বেশিদূর এগুতে পারেনি। কারণ নিরেট ইসলামি গান ভালবাসেন এমন মানুষের সংখ্যা একেবারেই অল্প। শিশুকিশোর ও শিক্ষানবীশ তরুণ ছাড়া অরাজনৈতিক পেশাদার লোকদের মধ্যে ইসলামি গানপ্রেম নাই বললেই চলে। এতে সাধারণ মানুষের সুকুমারবৃত্তির অভাব অনুভূত হয় যেমন, তেমনি গীতিকার, সুরকার, গায়ক এবং সংগঠন-পরিচালকদের ব্যর্থতাকেও দায়ী করতে পারি আমরা। বিপরীতে রাজনৈতিক দলাশ্রিত শিল্পীসংগঠনগুলোর তৎপরতা একটু বেশিই পরিলক্ষিত হয়। কারণ বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক মহড়ার জন্য নেতৃস্থানীয় লোকেরা সংগীতপ্রোগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের এক্টিভিটি দেখানোর চেষ্টা করেন। কেননা মাঠ প্রোগ্রামই এ পর্যন্ত সংগীতশিল্পীদের সবচে বড় আয়ের মাধ্যম। সে জন্য যে সময় যে ইসলামি রাজনৈক দল চাঙ্গা থাকে, সে সময় সে দলের আশ্রিতরাও চাঙ্গা থাকে। এ ছাড়া দলের পক্ষে, দলের লিডারের স্তুতিতে গান রচনা করে ও গেয়ে দলের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমেও তারা নিজেদের প্রতি সহযোগিতা বাড়াতে প্রয়াস চালায়। দলাশ্রিত বা নির্দলীয় হোক, কোনো সংগীতপ্রতিষ্ঠানই সাংগঠনিকভাবে অর্থনীতিতে উন্নতি সাধন করতে পারেনি। বরাবরই হর্তাকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক উন্নতি লাভ করেছেন। হয়েছেন একান্তই লাভবান। কিছুদিন আগ পর্যন্ত সাংগঠনিকভাবে যে অর্থনৈতিক একটা বিষয় আছে, সেটা কেউ মনেও করত না। শিল্পীদল ছিল পরিচালকের ‘পকেটসংগঠন’। ছিল না কোনো হিসাবনিকাশ। অনেক সময় ক্ষতির হিসাব উঠে আসলেও লাভের হিসাব থাকত আড়ালেই। লাভ তো সেখানেই আলোচ্য, যেখানে বিনিয়োগ আছে।’

মীম সুফিয়ান আরও বলেন, ‘সীমিত পরিসরে কিছু স্পন্সরশিপ ছাড়া স্বুদ্যোগেই গান তৈরি করে থাকেন সংগঠন বা ব্যক্তি। খরচের ভার বহন করতে হয় অনেকাংশে নিজেকেই। গানের পেছনের সব বিনিয়োগ করতে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনকে। লাভজনক বিনিয়োগ হয়ে থাকে খুব কমই। যদিও এ হিসেবে এখন কিছু পরিবর্তন আসছে। সংগীত অঙ্গনের অর্থনৈতিক লাভের পথ মুখ্যত মাঠপ্রোগ্রাম ও ইউটিউব-প্রচারণা। বাহ্যতই যাদের সাপোর্টার বেশি, তারাই মাঠপ্রোগ্রামে আমন্ত্রণ পান বেশি। নামডাক বেশি থাকার কারণে তাদের ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার এবং ভিউয়ারও বেশি। তাই লাভের পরিসংখ্যানে তারাই এগিয়ে বেশি। তাই বলা যায়, বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলাশ্রিত দুয়েকটি সংগঠনই আর্থিকভাবে কিছুটা চাঙ্গা। এরাই সংগীতকে পেশাদরিত্বের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকার কারণে এরাই তৈরি করার চেষ্টা করছে যুগোপযোগী, কালোত্তীর্ণ ও মানসম্মত সংগীত। বস্তুত এ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রকৃত অর্থে ‘চাঙ্গা’ মনে করা যায় না।’

ইসলামি ভাবধারার সংগীতশিল্পীদের পেশাদারিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রেখেছিলাম মীম সুফিয়ানের কাছে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই ভাবধারার শিল্পী বা শিল্পীগোষ্ঠী নিজেদের কাজের ক্ষেত্রে কতটা পেশাদার?

উত্তরে তিনি বলেন, ‘প্রথমত সংগীতশিল্পী আছেনই-বা কয়জন? যারা আছেন, তারা এখন পর্যন্ত সঠিকমাত্রায় খুব একটা পেশাদার হয়ে উঠতে পারেননি। সাইমুম কাজ করছে দীর্ঘদিন থেকে। তারা প্রচুর পেশাদার লোক তৈরি করেছে। যদিও তারা রাজনৈতিক আন্দোলনের সহকারিতার গণ্ডি পেরোতে পারেনি। গোছালো, গঠনশীল ও উদ্দেশমুখী হওয়ায় তাদের এ ময়দানে লোক তৈরি হয়েছে প্রচুর। তারা অনেকেই পেশাদার হিসেবে কাজ করেও যাচ্ছেন। দাবানল রাজনীতি-আশ্রিত ছিল। তাদের পৃষ্ঠপোষক সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ায় তারাও যেন থমকে গেছে। শুরুতে বেশ কয়েকজন পেশাদার মানুষের দেখা সেখানে মিললেও বর্তমানে তার গতি শম্ভুকমতো।’

মীম সুফিয়ান বলেন, ‘আইনুদ্দীন কলরবকে সম্ভবত পেশাদার সংগঠন বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান কলরব তার পেশাদারিত্বে এতটাই মজেছে, দেখে মনে হয় পেশাদার না হওয়াই ভালো। আইনুদ্দীনের মৃত্যুর পর থেকেই প্রচুর সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে কলরব। বর্তমানে মুহিব খান, সাইফুল্লাহ মানসুর, মশিউর রহমান, ইকবাল হুসাইন জীবন, আমিরুল মোমেনিন মানিক, মুজাহিদুল ইসলাম বুলবুলের পর পেশাদার বলা যায় একমাত্র কলরবকেই। কলরবের দু টুকরোই তাদের পেশাদারিত্ব জাহিরে প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আসলে আমাদের ইসলামি অঙ্গনে নিরেট ইসলামি ভাবধারার গানের শিল্পী যারা, তাদেরকে সম্মানের চোখে দেখা হয় খুব অল্পই। এতে সাধারণ মানুষ ও উলামায়ে কেরামের চিন্তার দীনতা ও মানসিক সঙ্কীর্ণতাকেই কেবল দায়ী করা যাবে না। আমাদের শিল্পীদের শিক্ষার পরিধি, চারিত্রিক গুণাবলি, আমলি জিন্দেগি, আচরণগত সৌন্দর্য কতটুকু আছে, সেটা মানুষের বিচারের চোখে ধরা পড়ে যাওয়াও একটা বড় কারণ। সে কারণে ভালো যোগ্যতা সম্পন্ন ভদ্র আমলদার মেধাবী শিক্ষিত অনেকেই এ অঙ্গনে পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করতে আগ্রহ বোধ করেন না। সে-জন্য ভাঙ্গাচোড়া মানুষের বিচরণই এখানে বেশি দেখা যায়। আশার কথা হলো, এসময়ে কয়েকজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণকে যোগ্যতা ও দায়বদ্ধতার সাথে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। যাঁরা আমাদের ত্রুটি ঘোচাতে সচেষ্ট ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাই বলা যায়, ইসলামি গানের শিল্পীরা পেশাদার হতে চলেছেন।’

বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গনে ধর্ম বা ইসলাম-সংশ্লিষ্ট কাজকে পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে মূল্যায়ন করা হয় না। খেদমত হিসেবে দেখা হয়। সংগীতের ব্যাপারটাও এর বাইরে নয়। ফলে সংগীতে পেশাদারিত্বের বিষয়টা অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। এ বিষয়ে কী বলবেন?

উত্তরে মীম সুফিয়ান বলেন, ‘আসলে বুঝতে হবে, পেশাদারিত্ব ও খেদমত পরস্পর বিপরীতমুখী কি না। পেশাদারিত্বের অর্থ আমরা বুঝি বৈষয়িক মুনাফা অর্জনের মাধ্যম। আর খেদমত বলতে বুঝি পরকালীন মুনাফা অর্জনের মাধ্যম। পেশাদারিত্বের পাশাপাশি সেবা দেওয়ার নিয়ম চিরন্তন। যারা জিহাদের ময়দানে লড়েন, তারা পরকালীন পুণ্য হাসিলের পাশাপাশি ভাতা ও গনিমতও যে পান, সেটা জানি সবাই। স্বতসিদ্ধ ফতওয়া–মাদরাসা-মসজিদের খাদেমরা পেশাদার হওয়ার পাশাপাশি পুণ্যের ভাগিদার হবেন নিঃসন্দেহে। অতএব সংগীতশিল্পের পেশা খেদমত হতে বাধা কোথায়? তবে সমস্যাটা নিয়তে। নিয়ত যদি পরিশুদ্ধ থাকে, তবে খেদমত আঞ্জাম দেয়ার পাশাপাশি পেশাদারিত্ব গ্রহণ করাও সম্ভব। আমাদের দেশের দর্শক-শ্রোতারা সংগীতকর্মকে মূল্যায়ন করেন নিরেট খেদমত হিসেবে, আর সংগীতশিল্পীরা দেখেন নিরেট পেশাদারিত্বের চোখে। সমস্যাটা এখানেই।’

আগের সংবাদজাকির নায়েককে এখনই ভারতে ফেরত পাঠানো হবে না
পরবর্তি সংবাদ‘ইসলামী সংগীত’ : পরিভাষাটা কতটা সঠিক?