আসামে এনআরসি তালিকা প্রকাশের বিরুদ্ধে বিজেপি! নেপথ্যে কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি)-’র তালিকা প্রকাশ নিয়ে এবার দ্বিচারিতার আশ্রয় নিয়েছে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। একদিকে কেন্দ্র থেকে বিশেষ তাগিদে তালিকা তৈরি ও খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে গত দুই বছরে, অপরদিকে এখন এই তালিকার বিরোধিতায় বিক্ষোভে নেমেছে আসামের গেরুয়া শিবির। আসাম জুড়ে শুরু হয়েছে বিজেপি ও তাদের শাখা সংগঠনগুলির সক্রিয় বিরোধিতা। তবে এটা বাঙালি ও মুসলিমদের কল্যাণে নয়, বরং এনআরসি তালিকায় তাদের অনেকের নাম-অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে–এই অভিযোগ এনে তালিকা পুনর্মূল্যায়ন করে বাঙালি ও মুসলমানদের বাদ দেওয়ার দুর্ভিসন্ধিতেই এ বিরোধিতায় নেমেছে গেরুয়া শিবির।

এদিকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল শুক্রবার গুয়াহাটিতে জেলাশাসক ও পুলিশ অফিসারদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি বলেন, এনআরসি-তে নাম না থাকলেই তাঁকে বিদেশি বলা যাবে না। বিদেশি বলার অধিকার শুধু ফরেনার্স ট্রাইবুনালের। আর তাঁর দলেরই বিধায়ক শিলাদিত্য দেব দিন দিন সুর চড়িয়ে এনআরসি নিয়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উসকানি দিয়ে চলেছেন। থানায় অভিযোগ করেও সুরাহা মিলছে না। বিজেপি নেতারাও সযত্নে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন শিলাদিত্যকে। বিজেপি–‌র বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস। আসামের ভাষীক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আশঙ্কা, এই দ্বিচারিতার পিছনে বিজেপি–‌র বড় কোনও অভিসন্ধি রয়েছে।

৩১ আগস্ট প্রকাশিত হবে এনআরসি–‌র চূড়ান্ত তালিকা। এর আগেই ৪২ লাখ মানুষের নাম বাদ দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে খসড়া তালিকা। খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্তদের ২৯ শতাংশের তথ্য ফের যাচাই হয়েছে। উগ্র বাঙালি বিদ্বেষী বলে পরিচিত সারা অসম ছাত্র সংস্থা বা আসু অন্তত ৫ লাখ বাসিন্দার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। সবদিক বিচার করেই কয়েক লাখ মানুষকে বাদ দিয়ে প্রকাশ হতে চলেছে চূড়ান্ত তালিকা। আপত্তি জানানোর সময়ে বিজেপি বা তাঁদের সমর্থকরা একজনের বিরুদ্ধেও আপত্তি জানায়নি। এখন তারা দাবি তুলেছে, ফের তথ্য যাচাই করতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন খারিজ করলেও রাজনৈতিক ফায়দা নিতে মরিয়া বিজেপি ও তাদের শাখা সংগঠনগুলি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

বিজেপি–‌র এই দাবির সবচেয়ে বড় সমালোচক এখন আসু। অসমে ‘বঙাল খেদা’ আন্দোলনের হোতা এই ছাত্র সংগঠনটি চাইছে এনআরসি প্রকাশ হোক। বিজেপি এটা চাইছে না। তারা বিদেশি সমস্যা জিইয়ে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লুঠতে চাইছে বলে মনে করেন আসুর উপদেষ্টা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্য। কংগ্রেসও এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগে। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়ার দাবি, বৈধ নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়া চলবে না। ভারতীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হয়রানিরও বিরোধিতা করেন তিনি। বিজেপি–‌র বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ করে সঠিক এনআরসি চালুরও দাবি তোলেন এই কংগ্রেস নেতা।

এদিকে, বহু বিদেশি মুসলিমের নাম এনআরসি–‌তে থাকবে–এই অভিযোগ তুলে পথে নেমেছে বিজেপি ও তাদের লেজুড় সংগঠনগুলি। বিভিন্ন জায়গায় এনআরসি কেন্দ্রের সামনে ধর্না দিতে শুরু করেছে বিভিন্ন গেরুয়া সংগঠন। বিক্ষোভকারীদের নেতা শিলাদিত্য দেব বলে চলেছেন, ‘বাংলাদেশি মুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দিতে মরিয়া এনআরসি। তাই এর বিরোধিতা চলবে।’ মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, এনআরসি পছন্দ না হলে বিধানসভায় বিল এনে তাঁরা বাতিল করে দেবেন গোটা প্রক্রিয়া। এদিন আরও একধাপ এগিয়ে তিনি রাজ্যবাসীকে এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর শান্ত থাকার আর্জি জানান। সেইসঙ্গে জানান বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবে তাঁদের সরকার।

এতেই উদ্বিগ্ন আসামের সাধারণ মানুষ। আসাম রাজ্য নাগরিক অধিকার সুরক্ষা সমন্বয় সমিতি (সিআরপিসিসি)–‌র চেয়ারম্যান তপোধীর ভট্টাচার্য বিজেপি–‌র আচরণ প্রসঙ্গে বলেন, ‘চোরকে চুরি করতে বলছে। আর গৃহস্থকে সাবধান করছে। ওদের গেমপ্ল্যান অন্য। বাঙালি জাতিকেই ধ্বংস করতে চাইছে।’ সেইসঙ্গে তিনি এনআরসি–‌র পাশাপাশি অসমের বাঙালিদের ভিটেমাটির অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে বলেও মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, আসাম চুক্তির ৬ নম্বর ধারা রূপায়ণে গঠিত শর্মা কমিটি আসলে কেড়ে নিচ্ছে আসামে বাঙালিদের বেঁচে থাকার অধিকার।

তপোধীরবাবুর অভিযোগ, ‘অমিত শাহের বুদ্ধিতে সর্বানন্দ এখন আধা–‌সেনাকে সঙ্গে নিয়ে তেড়ে মেরে ডান্ডা, করে দেব ঠান্ডা নীতি নিয়ে মানুষের অধিকার হরণ করতে চাইছেন। এর প্রতিবাদ করা জরুরি।’‌

সূত্র : আজকাল

আগের সংবাদআসামে এনআরসি বিড়ম্বনা : নিজ দেশেই বিদেশি ঘোষিত হলেন বিএসএফের সাব-ইন্সপেক্টর মিজান
পরবর্তি সংবাদকাশ্মীরে ঢুকতে পারলেন না রাহুল গান্ধী, বিমান বন্দর থেকেই ফেরত পাঠিয়েছে সেখানকার ভারতীয় প্রশাসন