
মুসান্না মেহবুব
‘পৃথিবীর ফুসফুস’ খ্যাত আমাজন অরণ্য আগুনে পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে। শুরুতে এ আগুনকে দাবানল বলে চালিয়ে দিলেও অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্বার্থান্বেষী কিছু চক্রের যোগসাজশে আগুন লাগানো হয়েছে। ৭০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তন এবং দক্ষিণ আমেরিকার ৯টি দেশ জুড়ে বিস্তৃত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এ অরণ্যে ৪৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড়, ৪২৮ প্রজাতির উভচর, ৩৭৮ প্রজাতির সরিসৃপ এবং ৪২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী বসবাস, এ ছাড়া আছে হাজার প্রজাতির বৈচিত্র্যময় জীব-অনুজীব। বন্য মানুষের বিশাল একটি অংশেরও বসবাস বৃহৎ এ অরণ্যে। প্রায় তিনশোরও বেশি উপজাতিতে ভাগ হয়ে তারা এখানে বসবাস করে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যাদের কোনো যোগাযোগ নেই।
বৈচিত্র্যময় এই ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ এখন লোভের আগুনে জ্বলছে, আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ (ইনপে) জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আমাজনে রেকর্ডসংখ্যক দাবানল হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ৮৩ শতাংশ বেশি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে এবং তা ব্রাজিলিয়ান অংশেই ঘটেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা ব্রাজিলের ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারোর ইন্ধনে এ ঘটনা ঘটছে।
আগুনের কারণে বন্য মানুষরা চরম বিপদে পড়েছেন। সেই সঙ্গে বিপর্যস্ত হচ্ছে বন্য পশু-পাখি ও নানা জাতের জীব-জন্তুর জীবনও। একসময় যাদের অভয়ারণ্য ছিল আমাজন বন, সেই আমাজনই তাদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে প্রাণী-হত্যা বা প্রাণী অধিকার নিয়ে নানাবিধ কথাবার্তা ও সচেতনতা চালু থাকলেও সুবিধাভোগীদের নানামাত্রিক লালসার নিয়মিত শিকার হচ্ছে বন্য প্রাণীগুলো। একদিকে আমাজনের ভয়াবহ আগুনে যখন প্রাণীদের জীবন বিপর্যস্ত, অপরদিকে আমাদের পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের কাছেও নিরাপদে নেই সুন্দরবনের বাঘ। কেমব্রিজের TRAFFIC ইন্টারন্যাশনালের এক জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের ৩,৯৫১ বাঘের মধ্যে ৭৫%-এর বেশি বা ২,৯৬৭টি বাঘ রয়েছে ভারতে। তবে এদেশেই গত এক দশকের বেশি সময়ে ৬২৬টি চোরাশিকারের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে ৪৬৩ বার বাঘের দেহাবশেষ উদ্ধার হয়েছে। ভারতের পরই লজ্জার এই তালিকায় রয়েছে থাইল্যান্ড (৩৬৯) এবং তৃতীয় স্থানে ইন্দোনেশিয়া (২৬৬)।
পশুপাখিসহ পৃথিবীতে যত ধরনের প্রাণী আছে, ইসলাম এগুলোকে অকারণে হত্যা করতে নিষেধ করেছে। এসব প্রাণীকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইসলাম।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রাণিকূল সৃষ্টির (অন্যতম) কারণ হলো, এগুলোতে তোমরা আরোহণ করে থাকো আর এগুলো সৌন্দর্যের প্রতীক।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৮)
প্রাণিজগতকে পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণী আছে আর যত পাখি দুই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, তারা সবাই তোমাদের মতো একেক জাতি।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ৩৮)
প্রাণীজগত সতত মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত। আল্লাহ তাআলা কুদরতিভাবে এগুলোকে মানুষের করায়ত্ত করে রেখেছেন। প্রাণীরা অবশ্যই করুণা ও মমতা পাওয়ার যোগ্য। ইসলাম পশু-পাখির সঙ্গে যথাসম্ভব দয়াশীল আচরণ করার শিক্ষা দেয়। পশু-পাখির যথেচ্ছ ব্যবহারে নিষেধ করে। ইসলামে পশু-পাখির অঙ্গহানি করা নিষিদ্ধ।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে প্রাণীদের অঙ্গচ্ছেদ করে।’ (বুখারি, হাদিস নং : ৫১৯৫)
পশু-পাখিকে আল্লাহর জমিনে অবাধ বিচরণের সুযোগ দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অহেতুক কোনো চড়ুই পাখি মেরে ফেলল, কিয়ামতের দিন পাখিটি আল্লাহর কাছে এই বলে নালিশ করবে যে হে আল্লাহ, অমুক ব্যক্তি আমাকে অহেতুক হত্যা করেছে।’ (নাসায়ি, ইবনে হিব্বান)
প্রাণী প্রতিপালন করলে, সেগুলোর সুস্থতা ও খাবারদাবারের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা ওয়াজিব বা অত্যাবশকীয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘এসব বাক্শক্তিহীন প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ অবস্থায় এগুলোতে আরোহণ করো, সুস্থ অবস্থায় আহার করো।’ (আবু দাউদ, হাদিস নং : ২৫৪৮)
অগণিত প্রাণীর মধ্যে ইসলাম সীমিত কিছু পশু-পাখি খাদ্য হিসেবে গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো জবাই করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অনুকম্পা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন তোমরা জবাই করবে, সর্বোত্তম পন্থায় করবে। জবাইয়ের বস্তু ভালোভাবে ধার দিয়ে নেবে, আর পশুটির প্রাণ স্বাভাবিকভাবে বের হওয়ার সুযোগ দেবে।’ (মুসলিম, হাদিস নং : ১৯৫৫)
তাই ফিকাহবিদগণ লিখেছেন, জবাই করার জন্য পশুদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা যাবে না। পরিপূর্ণ নিস্তেজ হওয়ার আগে ছুরিকাঘাত কিংবা চামড়া সরানো যাবে না। এসব কাজ মাকরুহে তাহরিমি।
কোনো জীবন্ত পশু-পাখি আগুনে পোড়ানো ইসলামে নিষিদ্ধ। আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ (রা.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, এক সফরে আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গী ছিলাম। তিনি দেখতে পেলেন, আমরা একটা মৌমাছির বাসা জ্বালিয়ে দিয়েছি। মহানবী (সা.) বললেন, ‘কে এটি জ্বালিয়ে দিয়েছে?’ আমরা নিজেদের কথা বললাম। তিনি বলেন, ‘আগুনের স্রষ্টা ছাড়া কারো জন্য আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া শোভা পায় না।’ (আবু দাউদ, হাদিস নং : ২৬৭৫)
ফিকাহবিদরা বলেন, পিঁপড়া দংশন না করলে তাদের মেরে ফেলা মাকরুহ। আর এদের পানিতে নিক্ষেপ করা সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। বিচ্ছুকেও আগুনে পুড়ে ফেলা মাকরুহ।’ (ফতোয়ায়ে বাজ্জাজিয়া, ৬/৩৭০)
জীবিত থাকা অবস্থায় পশু-পাখির কোনো অঙ্গ কাটা যাবে না। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘জীবিত অবস্থায় যে প্রাণীর কোনো অংশ কাটা হয়, সেটা মৃত তথা হারাম হয়ে যাবে।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ১৪৮০)
পশু-পাখির চেহারায় প্রহার করা, অঙ্কিত করা ও চিহ্ন ব্যবহার করে চেহারা বিকৃত করা ইসলামে নিষিদ্ধ। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) চেহারায় প্রহার ও অঙ্কন করতে নিষেধ করেছেন।’ (মুসলিম, হাদিস নং : ২১১৬)
ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন, ‘যেকোনো প্রাণীর চেহারায় আঘাত করা নিষিদ্ধ।’
আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রকৃতির সৌন্দর্য হিসেবে পশু-পাখির প্রতি ভালোবাসা থাকা চাই। এগুলোকে কোনো কারণে অশুভ মনে করা অজ্ঞতা ও কুসংস্কার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই। এমনকি পেঁচা বা সফর মাসেও কোনো কুলক্ষণ নেই।’ (বুখারি)
অহেতুক পশু-পাখির পেছনে লেগে থাকা, অযথা এগুলোকে শিকার করা ইসলামে নিন্দনীয়। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু বানিও না।’ (মুসলিম, হাদিস নং : ১৯৫৭)
সাইদ ইবনে জুবাইর (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার হজরত ইবনে ওমর (রা.) কোরাইশ গোত্রের একদল বাচ্চাকে দেখতে পেলেন যে তারা পাখি শিকার করছে। এটা দেখে ইবনে ওমর (রা.) তাদের সরিয়ে দেন এবং বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে কোনো প্রাণবিশিষ্ট বস্তুকে লক্ষ্যবস্তু বানায়।’ (মুসলিম, হাদিস নং : ১৯৫৮)
প্রাণীজগত সম্পর্কে ইসলামের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা যদি বিশ্ব জুড়ে প্রতিপালিত হতো, তবে প্রাণীঅধিকার নিয়ে বিশ্বকে আজ এত হাহাকার করতে হতো না, বিপন্ন হতো না প্রাণীর অধিকারও।
