
ফাতেহ ডেস্ক
৩০ আগস্ট গুম দিবস। প্রতি বছর ৩০ আগস্ট গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসটি পালন করা হয়। দিবসটি জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত।
বাংলাদেশের অধিকার সংগঠনগুলোর বরাত দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গুমের শিকার হয়েছেন ৫০৭ জন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ সময়ে কমপক্ষে ৮০ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালে শুধুমাত্র জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যেই ১২ জন ব্যক্তি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দ্বারা গুমের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যাদের মধ্যে দুইজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, একজন ফিরে এসেছেন, পাঁচজন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে রয়েছেন এবং বাকি চারজনের আজ পর্যন্ত কোনো খোঁজ নেই। এরপরে গত চার মাসেও অনেক স্থানে বেশ কিছু গুমের তথ্যও পাওয়া গেছে।
সূত্র আরো জানায়, ২০১৮ সালের গুমের চিত্রও ছিল ভয়াবহ। দেখা গেছে, গত বছর মোট ৯২ জন ব্যক্তি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারা গুমের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের মাঝে আটজনের লাশ পাওয়া গেছে, ১০ জন ফিরে এসেছেন, ৪৭ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে এবং ২৭ জনের ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
গুম করা রোধে আইনানুগ বিধিবিধানের প্রয়োজনীয়তা থেকে ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (গুম হওয়া থেকে সমস্ত ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য ঘোষণাপত্র) গ্রহণ করে। এ ঘোষণার সূত্র ধরেই পরে গুম হওয়া থেকে সমস্ত ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা ২০১০ সাল থেকে কার্যকর হয়। এ সনদে অনুস্বাক্ষর করার পরে প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজ নিজ দেশে আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।
মানবাধিকার ও জনহিতকরণ আইন বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক দলিলগুলোকে বিবেচনায় রেখে এ সনদটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আন্তর্জাতিক সনদের ২নং অনুচ্ছেদে গুম বা এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সনদ অনুযায়ী গুম করা বলতে বুঝায় ‘রাষ্ট্রীয় অনুমোদন, সাহায্য অথবা মৌন সম্মতির মাধ্যমে কার্যত কর্মরত রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি বা এক বা একাধিক ব্যক্তিবিশেষ বা গোষ্ঠী কর্তৃক সংগঠিত হয়ে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার, বিনা বিচারে আটক, অপহরণ অথবা অন্য যেকোনো উপায়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণকে বুঝায়।
জাতিসঙ্ঘ সব সদস্য রাষ্ট্রকে গুম হওয়া থেকে সমস্ত ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ (ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অভ অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস) ২০০৬ অনুসমর্থন করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। এ পর্যন্ত ৯৮টি রাষ্ট্র কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে, যার মধ্যে ৫৯টি সদস্য রাষ্ট্র ইতিমধ্যে অনুসমর্থন করেছে। এশিয়ার ৯টি সদস্য রাষ্ট্র কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে এবং যার মধ্যে মাত্র ৩টি রাষ্ট্র অনুসমর্থন করেছে। বাংলাদেশ এখনো এটা স্বাক্ষর বা অনুসমর্থন কোনোটিই করেনি।
গুম থেকে সুরক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধানে সুনির্দিষ্ট কিছু মৌলিক অধিকারের কথা উল্লেখ আছে। এগুলোর মধ্যে আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভের অধিকার (৩১ নম্বর অনুচ্ছেদ), জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার (৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ) উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও গ্রেফতারের কারণ দর্শানোর বিধান, আইনি সাহায্য লাভের অধিকার, আদালতের অনুমতি ব্যতীত কাউকে হেফাজতে না রাখার নির্দেশসহ গ্রেফতার ও আটক থেকে রক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট রক্ষাকবচ (৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদ) এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের (৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদ) বিষয়টি এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়।
পূর্বোক্ত আইনগত সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে গুম সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে চলছে। কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা উল্লেখযোগ্য অনুসন্ধানমূলক তৎপরতার অনুপস্থিতিতে, গুমের শিকার ব্যক্তির স্বজনেরা (আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তায়) হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায় করেছেন। হাইকোর্ট বিভাগ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছিলেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবেদন কোনো প্রকার আলোর মুখ দেখেনি।
