মিডিয়ায় রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে ঘৃণার চর্চা : যেভাবে ফ্যাক্ট চিহ্নিত করবেন

রাগিব রব্বানি

মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি দুবছর আগে বাংলাদেশের মানুষের যে সহমর্মিতা এবং ভালোবাসা ছিল, সময়ের ব্যবধানে তা এখন অনেকখানিই ঘৃণা ও ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়েছে। আর এর পেছনে মূল দায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বাংলাদেশের একশ্রেণির মিডিয়ার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিক্ষা ও সভ্যতার আলো থেকে দূরে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে রঙচঙ মাখিয়ে নিয়মিত পরিবেশন করা হচ্ছে মানুষের সামনে। আর এ প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং একশ্রেণির ওই মিডিয়া।

তুচ্ছ ঘটনাকে বড় করে দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের অপরাধপ্রবণতার যেসব খবর পরিবেশিত হয় আমাদের কাছে, তার সত্যমিথ্যা যাচাই করবেন কীভাবে, এ নিয়েই আমাদের আজকের আলাপ। ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন ফ্যাক্টচেক ডটকমের সম্পাদক ও সাংবাদিক কদরুদ্দীন শিশির।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণার চর্চা

কদরুদ্দীন শিশির গণমাধ্যমের বাইরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যে বিভ্রান্তিগুলো ছড়ানো হয় সে বিষয়েই প্রথমে আলাপ টেনেছেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকহারে এই প্রবণতা আছে। উদাহরণত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির এলাকার পরিবেশ ধ্বংসের ব্যাপারটাই ধরুন। অনেককে দেখা যায় ওই এলাকার বর্তমান ও অতীতের, অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের আগমনের আগেকার ছবি পাশাপাশি রেখে বলবার চেষ্টা করেন যে, রোহিঙ্গাদের কারণে সেখানকার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা বনজঙ্গল সাফ করে সেই এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলছে। এটা বলবার দ্বারা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে রোহিঙ্গাদের নেগেটিভিটি উপস্থাপন করে একধরনের ঘৃণা ছড়ানো হয়।

পরিবেশ ধ্বংসের পেছনে রোহিঙ্গাদের দায় কতটুকু, সেটা জানা থাকলে এই নেগেটিভ চিন্তা ধারণ করা থেকে বাঁচা যাবে। দেখুন, রোহিঙ্গারা শরণার্থী হিসেবে সেখানে বসবাস করছে। আমাদের সরকার তাদেরকে বসবাসের জন্য এলাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এলাকাটা পাহাড়ি এবং বন-জঙ্গলে ঘেরা। এখন সেখানে তাদেরকে বসবাস করতে হলে এলাকাটাকে প্রথমে তো তাদের বসবাসের উপযোগী করতে হবে। প্রয়োজনমাফিক বনজঙ্গল পরিস্কার না করলে তারা থাকবে কীভাবে? আর বনজঙ্গল পরিস্কার যে কেবল রোহিঙ্গারাই করছে এমন না, আমাদের সরকারের পক্ষ থেকেও বরং অঞ্চলটাকে মোটামুটি বসবাসের উপযোগী করতে সবধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু রোহিঙ্গা কেন, সরকার যদি অন্য কোনো এলাকার মানুষকে যেকোনো বিপর্যয়ের কারণে এখানে বসবাস করতে দিত, তাহলে তাদেরকেও একই কাজ করতে হতো। এ জন্য এ ধরনের ছবি বা কথাবার্তা কোথাও পেলে, যে, রোহিঙ্গারা পরিবেশ নষ্ট করে ফলছে, তা এড়িয়ে যেতে হবে। বুঝতে হবে এটা জাতিগত ঘৃণাচর্চার অংশ।

আরেকটা বিষয় ঘুরে-ফিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রচার হতে দেখা যায়—রোহিঙ্গারা অবৈধভাবে এখানে থাকছে। আমরা করুণা করে তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছি। এটাও সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অমূলক একটা প্রচারণা। রোহিঙ্গারা কোনোভাবেই অবৈধভাবে আমাদের দেশে থাকছে না। নিজদেশে তারা নিপীড়ন ও চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। আর জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক আইনে আছে, কেউ যদি নিজ দেশে কোনো বিপর্যয় বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় চায়, তবে প্রতিবেশী দেশ তাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য। বাংলাদেশ সরকার সেটাই করেছে এবং রোহিঙ্গারা সে আইন অনুযায়ী বৈধভাবে আমাদের দেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছে। হ্যাঁ, আমাদের দেশে আশ্রয়গ্রহণের সময় আমরা তাদের প্রতি মানবিক দায়বোধ থেকে অনেক সহযোগিতা করেছি, তাই বলে তাদেরকে তো এটা বলে আমরা খোঁটা দিতে পারি না! আমরা এই অনুকম্পা না করলেও জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদেরকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হতাম। এবং সে আইন অনুযায়ী জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তারা বর্তমানে বৈধভাবেই আমাদের দেশে বসবাস করছে। এটা মোটেও সত্যও নয় যে, তারা অবৈধভাবে এখানে বসবাস করছে।

এম্নিভাবে বলা হয় রোহিঙ্গারা অপরাধপ্রবণ জাতি। বাংলাদেশে এসে তারা নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে কক্সবাজার অঞ্চলকে অশান্ত করে তুলেছে। এটাও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর অংশ। একটা এলাকায় কয়েক লক্ষ মানুষ একসঙ্গে থাকছে। তাদের মধ্য থেকে কিছু লোক তো অপরাধ করতেই পারে। বিদেশি এবং শরণার্থী হিসেবে তার অপরাধকে যে আলাদাভাবে দেখতে হবে এবং কয়েকজনের অপরাধকে পুরো গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দিতে হবে, এমনটা উচিত এবং ন্যায়সঙ্গত না। একজন আমেরিকান এসে যদি আপনার দেশে অপরাধ করে, তাহলে এর দায় তো পুরো আমেরিকানদের ওপর চাপিয়ে দেবেন না, তাহলে রোহিঙ্গাদের বেলায় এই বৈষম্য কেন? বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুসারে অবশ্যই তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু একটা সম্প্রদায়ের মুষ্ঠিমেয় কিছু লোকের অপরাধের দায়ে পুরো সম্প্রদায়কে অপরাধপ্রবণ হিসেবে উপস্থাপন করা অন্যায় এবং ভুল। এটাও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো ও ঘৃণাচর্চার অংশ। এ ধরনের আলাপ যেখানে পাওয়া যাবে, আমাদের এড়িয়ে যেতে হবে এবং বুঝতে হবে এ আলাপ আসলে সত্য নয়।

গণমাধ্যমে ঘৃণার চর্চা

দেশীয় গণমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যে বিদ্বেষমূলক খবর প্রচারিত হয়, এটা ওই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চর্চিত ঘৃণারই রিফ্লেকশন। কারণ মিডিয়ায় যাঁরা কাজ করেন, সাংবাদিক হোন কিংবা মালিকপক্ষ, তাঁরা এই সমাজেরই অংশ। ফলে তাঁদের অনেকের মধ্যে রোহিঙ্গা ঘৃণাচর্চার প্রবণতাটা সংক্রমিত হয়েছে। তাই রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কোনো সংবাদ বা প্রতিবেদন করতে গেলে তাঁরা রোহিঙ্গাদের নেগেটিভভাবে উপস্থাপন করেন। যেমন ধরুন, রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে কেউ অপরাধ করল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মেরে ফেলল, পত্রপত্রিকায় তখন এই খবরের শিরোনাম করা হয় মোটামুটি এই রকম— ‘বন্দুকযুদ্ধে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিহত’। কেন, তাকে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত করা হবে কেন? বাংলাদেশের বাসিন্দা কোনো সন্ত্রাসীকে এভাবে মারলে তখন তো আলাদাভাবে বাংলাদেশি কিংবা বাঙালি সন্ত্রাসী বলা হয় না! রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর খুব সিম্পল একটা উদাহরণ এটা। এ ছাড়া রোহিঙ্গা বিষয়ে যেকোনো সংবাদ প্রচারের সময় অধিকাংশ মিডিয়াই এখন তাদেরকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে। এটা সাংবাদিকতা-নীতির পরিপন্থী এবং অন্যায়।

ফ্যাক্ট চিহ্নিত করবেন কীভাবে

রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে প্রচারিত যেকোনো সংবাদের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের জন্য উপরের আলোচনা মাথায় রাখাই যথেষ্ট। এর বাইরে মিডিয়ায় প্রচারিত সংবাদগুলোতে যদি রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়, কিংবা শিরোনামে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কোনো বিদ্বেষমূলক কথা থাকে, তবে এমন সংবাদ গ্রহণে পাঠককে অবশ্যই সন্দেহের অবকাশ রাখতে হবে। এম্নিভাবে যদি রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে কাউকে প্রশাসন গ্রেপ্তার করে অথবা ক্রসফায়ারে দেয়, কিংবা রোহিঙ্গাদের কারো অপরাধমূলক তৎপরতা বিষয়ে প্রতিবেদন করা হয়, আর সেখানে কেবল প্রশাসনের বক্তব্য কিংবা অভিযোগকারীর বক্তব্য থাকে, অভিযুক্তের বা অভিযুক্তের পক্ষের লোকজনের কোনো বক্তব্য না থাকে তাহলেও এমন প্রতিবেদন পুরোপুরি বিশ্বাস করা থেকে পাঠক বা দর্শক-শ্রোতাকে বিরত থাকতে হবে। কারণ, ভিক্টিমের বক্তব্য না এনে তার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন করার মধ্যে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।

আরেকটা বিষয়, প্রতিবেদনে পরিসংখ্যান থাকা। রোহিঙ্গারা অপরাধ করছে, কিংবা পরিবেশ নষ্ট করে ফেলছে, গাছবৃক্ষ কেটে ধ্বংস করে ফেলছে ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিবেদন হয়। এসব প্রতিবেদনে দেখতে হবে, প্রতিবেদক অপরাধপ্রবণতার কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারছেন কি না। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের ঠিক কতজন লোক অপরাধ করছে, কী পরিমাণ অপরাধ করছে, গাছবৃক্ষ কাটলে কতটা কেটেছে, কী পরিমাণ বনভূমি ধ্বংস করছে, কেন করছে—এসব বিষয়ে যদি নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান দিতে না পারেন তিনি অথবা পরিসংখ্যান উল্লেখ করলেও দেখা যায় কোনো সংস্থার জরিপ থেকে না নিয়ে নিজের মনমতো বা অগ্রহণযোগ্য সূত্রে উল্লেখ করেছেন, তাহলে এমন প্রতিবেদন বা নিউজেও পাঠক বা দর্শকশ্রোতাকে ডাউটফুল থাকতে হবে। এমন নিউজ পুরোপুরিভাবে বিশ্বাস না করে, অন্য যেকোনো সোর্স থেকে জানার চেষ্টা করতে হবে আসল ঘটনা।

আগের সংবাদঘৃণায় সম্মতি উৎপাদন : মিডিয়া সম্পর্কে কেন সতর্ক থাকতে হবে?
পরবর্তি সংবাদরোহিঙ্গাদের সম্পর্কে মিডিয়া-প্রচারিত কয়েকটি ভুল তথ্য