
তুহিন খান
রোহিঙ্গা সমস্যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত সমস্যা। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর মায়ানমার আর্মির নৃশংস গণহত্যা এবং এরই প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা নাফ নদী পেরিয়ে বাঙলাদেশে আসেন। কক্সবাজারের উখিয়া অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি করা হয় রিফিউজি ক্যাম্প। বর্তমানে এই রিফিউজি ক্যাম্পেই কাটছে ১১ লাখ রোহিঙ্গার জীবন।
রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাঙলাদেশ। এরই মধ্যে, দুই দুই বার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে গত ২২ আগস্ট দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসনের তারিখ থাকলেও, রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহে প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা সফল হয় নাই। এর তিনদিন পর, ২৫ আগস্ট কুতুপালংয়ে প্রায় বিশ হাজার রোহিঙ্গার অংশগ্রহণে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা, বার্মিজ আর্মিকর্তৃক পরিচালিত গণহত্যার বিচারসহ ছয়টি দাবি পেশ করেন। নেতারা এও বলেন, এইসব দাবি পূরণ হলে তবেই রোহিঙ্গারা দেশে যাবে৷ এ ছাড়া জোর করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাধ্য করলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
রোহিঙ্গা সমস্যা : রোহিঙ্গাদের দৃষ্টিতে
রোহিঙ্গা সমস্যা কী? রোহিঙ্গারা তাদের নিজেদের সমস্যাটিকে কীভাবে দেখেন? রোহিঙ্গারা মনে করেন, তারা বাঙালি নন, তারা ‘রোহিঙ্গা’, এবং মায়ানমারের রাখাইন স্টেটে তারা বহু বছর ধরেই বসবাস করছেন। মায়ানমার সরকার তাদের ‘বাঙলাদেশি অভিবাসী’ হিশেবে চিহ্নিত করে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে এবং তাদেরকে জাতিগতভাবে নির্মূল করার চেষ্টা করছে।
প্রথমে বাঙলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ও পরে সেখান থেকে কানাডায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্ট আহমেদ হাশিম উল্লাহ কানাডায় একদল তরুণ রোহিঙ্গা যুবককে নিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটা নাটক নির্মাণে কাজ করছেন। এ ছাড়াও রোহিঙ্গা যুবকদের একটি সক্রিয় সার্কেল গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি। হাশিমের ভাষায়, ‘বার্মায় বৌদ্ধরাই সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী, কিন্তু বার্মার রাখাইন স্টেটে রোহিঙ্গারা দেশের অন্যতম বৃহৎ মাইনরিটি গ্রুপ।… ১৯৮২ সালে সরকার আইন করে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়…বার্মায় এই রোহিঙ্গাদের উপরই বেশিরভাগ নির্যাতন হয়। আমি এমন অনেককেই চিনি, যারা তাদের মা-বোনের ধর্ষণ দেখেছে, বাপ-ভাইয়ের হত্যা প্রত্যক্ষ করেছে। মানুশ মনে করে, বৌদ্ধ ধর্মের সকলেই শান্তিপ্রিয়, কিন্তু সত্য কথা হলো, তারা এসব ধর্মের নামেই করছে…।’
রোহিঙ্গা কম্যুনিটি লিডার জোজো আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা বাঙালি না। বাঙালিদের ভাষা আর আমাদের ভাষা এক না। আমরা রোহিঙ্গা, আমাদের বাপ-দাদারা বহুকাল ধরে এইখানে আছেন…।’ সরকারের শঠতার কথা উল্লেখ করে জো জো বলেন, ‘২০০৮ সালে আমাদের সাময়িক হোয়াইট কার্ড দেওয়া হয়েছিল, যার মাধ্যমে আমরা সিটিজেনশিপের আবেদন করতে পারব, ভোট দিতে পারব। কিন্তু ২০১২-র পরে সরকার আমাদের অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা দিল।’
রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন
রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন চলছে বহুকাল ধরেই। মূলত বৃটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভেরও আগ থেকে এই অত্যাচারের ধারাবাহিকতা শুরু হয়। ১৯৪২ থেকে অদ্যাবধি, ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অত্যাচার ও নির্যাতন চালু থাকে। ১৯৪২-১৯৭২ পর্যন্ত আরাকানে প্রায় ১৪ টি রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে (রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ, মাহফুজুর রহমান আকন্দ, পৃঃ ৭৯)। ১৯৭৪ সালে সরকার বার্মাকে ‘বৌদ্ধ রাষ্ট্র’ ঘোষণা করলে মগদের নেতৃত্বে দাঙ্গা বেড়ে যায়। ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত, সেনা অভিযানের পাশাপাশি অনেকগুলো দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। মাহফুজুর রহমান আকন্দের দেওয়া তথ্যমতে, শুধু ১৯৪২ সালেই মারা যায় প্রায় এক লক্ষ মানুশ!
সর্বশেষ ২০১৬ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের উপর চলে জঘন্য ভয়াবহ জাতিগত নিধন। দলে দলে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসে বাঙলাদেশে। রাখাইন রাজ্যে অত্যাচারের সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারেন না তারা।
বাঙলাদেশের রিফিউজি ক্যাম্পে থাকা হামিদা নামের এক রোহিঙ্গা নারী আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘স্বামী নাই, কিসের আশা করব। এইখানে আছি, লোকে অল্প অল্প যা দ্যায়, তাই খাই।…বার্মিজ সেনারা গুলি করতে থাকে, আমাদের বাড়িঘরে আগুন দেয়। প্রাণ বাঁচাতে আমরা এইখানে পালিয়ে এসেছি।…আমার স্বামীকে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে। অনেক মানুশকেই নিয়ে গেছে। আমি জানিও না উনি এখন কই আছেন।…সবাইরে একসাথে বসিয়ে তারা সুন্দরী মেয়েদের তুলে নিয়ে যেত, কেউ কিছু বলতে পারত না। মা-বাবারা জানত তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে। তারা তাদের ফিরিয়ে আনতে যাইত।’
নুর নামের আরেক নারী বলেন মর্মন্তুদ সেই অভিজ্ঞতার কথা। ‘সৈন্যরা এসে সবকিছু ভেঙে ফেলতে শুরু করল। বাড়িঘর তছনছ করে তারা বলতে লাগলো, বাড়িতে কোনো সন্ত্রাসী আছে কিনা৷…১৪ তারিখ তিনজন সেনা আমার ঘরে আসে। তারা আমারে ধরে নিয়ে যায়, এবং একের পর এক ধর্ষণ করতে থাকে। আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। কয়জন কতবার রেপ করছে, আমার মনে নাই। তিন বছরের মেয়েরে নিয়া আমি তিনদিন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকি। পরেরদিন বর্ডার পার হয়ে বাঙলাদেশে আসি।’
জাওহারা নামের আরেক নারী আল জাজিরাকে বলেন, ‘গোলাগুলি যখন চলছিল, এক মৌলভি সাহেব দৌড়ায়ে পালাচ্ছিলেন। তারা তারে ধরে জবাই করে ফেলল।…জবাইয়ের পরে তারা চলে যায়। আমার স্বামীও একজন মৌলভি। সেইদিন থেকেই তার কোনো খোঁজ নাই। ১৫ দিন অপেক্ষা করছি খবর পাওয়ার জন্য।…দুইজন আমারে গুলির মুখে ধরে রাখে, একজন রেপ করে।’
মুমতায নামের আরেক নারী বলেন, ‘আমার ছোট একটা মেয়ে আর দুই ছেলেরে মাইরা ফেলছে। আমার চোখের সামনেই।’
গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গা নারী মাবিয়া খাতুন বলেন, ‘মায়ানমারে শান্তি নাই। লোকজনকে ধরে ধরে আগুনের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। বোমা ফেলা হচ্ছে গ্রামে গ্রামে।…আমরা শুধু রক্ত দেখছি, লাশগুলা দেখতেও পারি নাই। লাশগুলা সব বস্তা ভইরা নিয়া গেছে।…এইগুলা মনে পড়লেই পাও কাঁপে, মাথা ঘুরায়।…আমরা কীভাবে দেশে যাব? ছোট ছোট পোলাপানও মিলিটারির ভয়ে দৌড়ায়ে ঘরে আসে।’
রহিমা খাতুন বলেন, ‘বাঙলাদেশে আমরা জুলুমের বিচার চাইতে আসছি। আমরা আর পারতেছি না। এরা বলে, এইটা তোমাদের দেশ না, তোমরা বাঙালি, বাঙলাদেশে যাও।…২০০’র বেশি মানুশ মারছে, ১০০-১৫০ বাচ্চা মারছে। মেয়েদের উপর জুলুম করছে, রেপ করছে। আমার ছয় বছরের ছেলে আর তার বাপরে মাইরা ফেলছে গুলি কইরা (কান্না)।…বাচ্চাদের আগুনে ফেলা হইতেছিল। স্কুলঘরে অনেক মেয়ে আশ্রয় নিছিল। তাদের সবাইরে রেপ করছে, তাদের স্তন কাইটা ফেলছে।’
তাইয়েবা খাতুনের কাহিনী আরো মর্মন্তুদ। তার ভাষায়, ‘পাঁচজন মিলিটারি আসলো। দুইজন আমারে রেপ করলো আর বাকি তিনজন দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে পাহারা দিল।…আমার স্বামী আমারে বাঁচানোর জন্য আসলে তারা তারে গুলি কইরা মাইরা ফেললো।…এখন আর কি, পোলাপানের পাশে বইসা খালি কান্দি।’
এর সমাধান কী হতে পারে?
রোহিঙ্গা-প্রশ্নে মায়ানমার তার নীতিতে অটল। তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে, কিন্তু নাগরিকত্ব দেবে না। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আছে চীন-ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ, তাই তারাও এ ব্যাপারে মায়ানমারের পাশেই আছে। দুই দুইবার প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করেও লাভ হয় নাই৷ কারণ, মায়ানমার সরকার মুখে প্রত্যাবাসনের কথা বললেও, এমন কোন আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারে নাই বা করে নাই যে রোহিঙ্গারা নির্ভয়ে ফিরে যাবে।
মাইয়ু আলি একজন রোহিঙ্গা কবি, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট। তিনি বাঙলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘ইয়ুথ এম্পাওয়ারমেন্ট সেন্টার’ নামে একটা প্রতিষ্ঠান চালান। আল জাজিরা, সিএনএন ও ঢাকা ট্রিবিউনে তার অনেক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে।
জেমস বায়ার্নকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মাইয়ু কথা বলেন রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশা, বর্তমানের হতাশা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চিতি নিয়ে। গত বছর অক্টোবরে প্রত্যাবাসনে রোহিঙ্গাদের রাজি না হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে, আসলে রোহিঙ্গাদের এই ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার সহজ ওয়েটা কি, তারা কী চায়, কোথায় থাকতে চায়—এসব প্রশ্নে মাইয়ু আলি বলেন, ‘আমরা তো দেশে ফিরতে চাই। মায়ানমার আমাদের দেশ, আমরা প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে সেখানে বসবাস করছি। মায়ানমার সরকার আমাদের জন্য নিরাপদ প্রত্যাবাসন ও যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিক। ঐতিহাসিকভাবে, ভৌগোলিকভাবে এবং বংশগতভাবেও আমরা ওখানকারই নাগরিক।
গত এক দশকে, আমরা বহুবার পালাইছি, বহুবার ফিরে গেছি। প্রত্যেক রোহিঙ্গাই শান্তিতে, নিরাপদে, সসম্মানে, স্বেচ্ছায় নিজের দেশে ফিরতে চায়৷ কিন্তু প্রথমে আমরা শান্তি ও বিচার চাই। এই অত্যাচারের কুশীলবদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিকত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রোহিঙ্গাদের সাথে থাকা, যতক্ষণ না রোহিঙ্গারা তাদের দেশের অন্যান্য মানুশের মতই সমান অধিকার ভোগ করতে পারে।’
