বিশৃঙ্খলা ও এনজিওদের তৎপরতা : যে কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে

মুনশী নাঈম

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে এনজিওদের কর্মতৎপরতা নিয়ে বড়সড় একটা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মিডিয়ার ঢেলে দেয়া ঘিয়ে এই বিতর্ক এখন আলোচনার তুঙ্গে। সরকার এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে জারি করেছে রেড এলার্ট। নিষিদ্ধ করেছে চল্লিশের অধিক এনজিও। এ সবই করা হচ্ছে নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায়। রোহিঙ্গাদের সেবায় এনজিওগুলোর তৎপরতাকে বাংলাদেশের মিডিয়ায় এখন অভিহিত করা হচ্ছে ‘অপতৎপরতা’ বলে। এনজিওগুলোর তৎপরতা, চলমান গতিপ্রকৃতি আসলেই কি আমাদের দেশকে নিরাপত্তা-ঝুঁকিতে ফেলছে? এই প্রতিবেদনে তা-ই একটু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করবো।

শরণার্থী শিবিরে কতগুলো এনজিও তৎপর?

ট্রিপল আরসির (সরকারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন) সর্বশেষ তথ্যানুসারে, দেশে মোট নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন। এর মধ্যে আশ্রয়প্রার্থী ৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৪১ জন। এদের মধ্যে ৩৪ হাজার ৩৩৮ জন গর্ভবতী। রোহিঙ্গাদের জন্য ৬ হাজার ৫০০ একর জমিতে মোট ৩২টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এখানে ঘরের সংখ্যা ২ লাখ ১২ হাজার ৬০৭টি। দুই প্রক্রিয়ায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার ১৯ জনকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

এনজিওবিষয়ক ব্যুরো সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে বৈদেশিক অনুদান নিয়ে কাজ করে এমন দেশি-বিদেশি দুই হাজার ৬২৫টি এনজিও রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি এনজিও ২৫৯ এবং দেশি দুই হাজার ৩৬৬। রোহিঙ্গাদের নিয়ে মোট ১৮৯টি এনজিও কাজ করছে। এসব এনজিও বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ২১টি প্রকল্পে ২ হাজার ৭৪৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা বিদেশি সহায়তা নিয়েছে। এর মধ্যে দেশের ১৩৪টি এনজিওর বিপরীতে ছাড় হয়েছে ১ হাজার ৩২৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং বিদেশি ৫৫টি এনজিওর প্রকল্পে ছাড় হয়েছে ১ হাজার ৪৬৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় স্বাস্থ্য খাতে। এ খাতে এ পর্যন্ত ব্যয় ২৩৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া খাদ্য খাতে ১৭৮ কোটি এবং বস্ত্র খাতে ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এনজিওগুলোর মাধ্যমে ১৬ হাজার টয়লেট এবং ২২ হাজার টিউবওয়েলসহ স্যানিটেশনের বেশকিছু উপকরণ দেয়া হয়েছে।

দাতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই জাতিসংঘ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকেন্দ্রিক। এ ছাড়া আরব দেশগুলো থেকেও এনজিওদের কিছু সহায়তা দেয়া হচ্ছে। তবে বিদেশি সহায়তার বড় অংশই সরকারিভাবে আসে। এনজিওদের মাধ্যমে যে সহায়তা আসে, সেটিও সরকারের নজরদারি মধ্যে ব্যয় হয়।

রোহিঙ্গাদের এখনও শরণার্থী স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশ সরকার। কারণ শরণার্থী স্বীকৃতি পেলেই সেটি জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) আওতায় চলে যাবে। আর তখন তাদের থাকা-খাওয়াসহ সব দায়িত্ব জাতিসংঘ বহন করবে। তবে ইউএনএইচসিআরের অনুমতি ছাড়া তাদেরকে কোথাও পাঠানো যাবে না। ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো তহবিল ছাড় করা হচ্ছে না। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের যে প্রকল্পে সহায়তা দেয়া হচ্ছে তাকে বলে এফডি (ফরেন ডোনেশন)।

এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে কেন অভিযোগ উঠছে?

আগে থেকে টুকটাক অভিযোগ উঠলেও আগস্টের শেষদিকে এসে কয়েকটি ঘটনায় এই অভিযোগ আরও প্রকট হয়ে দেখা দেয় সবার সামনে। ঘটনাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা এমনভাবে জড়িত, আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় জাল, ষড়যন্ত্র। সবার মনে তুমুলভাবে এই বিশ্বাস দানা বাঁধতে শুরু করে—এনজিওগুলো রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে না যেতে প্ররোচনা দিচ্ছে, বুদ্ধি দিচ্ছে।

দফায় দফায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলাপ হচ্ছে। প্রত্যাবাসনের আগে যাচাইয়ের জন্য ২৯ জুলাই ছয় হাজার পরিবারের ২৫ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশ। এ নিয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা পেয়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তারা প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য মাত্র ৩৪৫০ রোহিঙ্গাকে ছাড়পত্র দেয়। ২২ আগস্ট ছিলো প্রত্যাবাসনের দিন।

নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগে ক্ষুব্ধ হয় এনজিওগুলো। এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে ২১ আগস্ট আ্যাকশন এইডের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি ৬১টি এনজিও যৌথ বিবৃতি দেয়। এরপরদিন নির্বাচিত সব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজি নয় বলে জানিয়ে দেয়।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে রাজি না হওয়ার প্রেক্ষিতেই অভিযোগ উঠে—নিজ দেশে ফেরত না যেতে ইন্ধন যুগিয়েছে এনজিওগুলো। কারণ এনজিওগুলো এই শরণার্থীদের নাম করে বিদেশি দাতা সংস্থা থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এই টাকায় তারা আয়েশ করে বেড়াচ্ছে। সুতরাং তারা চাইছে রোহিঙ্গারা আরও থাকুক। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা যাতে দেশে ফিরে না যায়, এ ব্যাপারে দেশি-বিদেশি কিছু এনজিও ইন্ধন যোগাচ্ছে।’

প্রত্যাবাসন নাকচ করার পর রোহিঙ্গাদের সমাবেশ আরও তোলপাড় সৃষ্টি করে। সমাবেশে ইংরেজিতে লেখা প্লেকার্ড, বিশেষ রঙের টি-শার্ট, সুবিন্যস্ত দাবি-দাওয়া দেখে সন্দেহ আরও ঘনিভূত হলো কালো মেঘের মতো। যারা লিখতে পড়তে জানে না, তারা এত বিন্যস্ত দাবি পেশ করে কীভাবে, এতবড় সমাবেশ করে কীভাবে? এনজিওগুলো তাদের এসব করে দিয়েছে। পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে সেবার নামে ঢুকে পড়া এনজিওগুলো।

এ ছাড়াও অভিযোগ উঠে এসব এনজিও রোহিঙ্গাদের মধ্যে উগ্র চিন্তার প্রচার, সরকারবিরোধী প্রচারণা, এমনকি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার মতো অপতৎপরতা চালাচ্ছে। কয়েকটি এনজিও রোহিঙ্গাদের বাংলা ভাষা শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি অবৈধভাবে এ দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র পাইয়ে দেওয়ার মতো অপরাধমূলক তৎপরতার সঙ্গে জড়িত–এমন তথ্যও উঠে আসে। দেখা যায়, এসব এনজিও শরণার্থীদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য নির্দেশিত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও তা আদৌ দিচ্ছে না।

ক্যাম্পগুলোতে বিদেশিরা ঠিক কী করছে, তাদের ভূমিকা কেমন সেখানে? এই প্রশ্নের জবাবে ইসলামি ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী ইয়াকুব বলেন, সেবার জন্য বিদেশি যেসব সংস্থা সেখানে কাজ করছে তারা একটা লক্ষ্য নিয়ে গেছে সেখানে। সাধারণত এসব চ্যারিটি সংস্থার ডোনার যারা থাকে, তারাই ঠিক করে দেয় লক্ষ্যটা ঠিক কী৷ শরণার্থী ক্যাম্পে এনজিওদের যারা বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করছে, তাদের ম্যাক্সিমামদের লক্ষ্য–কৌশলে মিশনারি কার্যক্রম পরিচালনা করা।

এ ক্ষেত্রে তারা যেটা করেছে, শিক্ষামাধ্যমটাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। তাদের নিজস্ব সিলেবাসে পাঠদান করা হয়। ধর্মকে যেটা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। নারীদেরকেও বিভিন্নভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয় তারা। পাশাপাশি দৈনন্দিন যোগাযোগ ও আলাপচারিতার মাধ্যমে তাদের সঙ্গর একটা অন্তরঙ্গতা গড়ে নেয়। ফলে নারী ও শিশুর মানসিকতায় তাদের চিন্তার বীজ বপণ হয়ে যায়।

অভিযোগের তদন্তে সরকার

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে শুরু হয় তদন্ত। সরকারি সূত্রে জানা যায়, তিনটি অভিযোগের তদন্ত করা হবে দেশি বিদেশি কিছু এনজিওর বিরুদ্ধে। এক. রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মিয়ানমারে ফেরত যেতে না চাওয়ার পিছনে কোনো ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে কিনা। দুই. সম্প্রতি শরণার্থী শিবিরের ভেতরে রোহিঙ্গাদের বড় একটি সমাবেশ করার ক্ষেত্রে অর্থ যোগান বা অন্যান্য সহযোগিতা করা হয়েছে কিনা। তিন. শরণার্থী শিবিরের ভেতর রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে কিনা।

এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক কে এম আবদুস সালাম জানান, বারবার সতর্ক করার পরও কিছু এনজিও বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছে। গত বছর আমরা বলেছি যে, এনজিওরা মানবিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এর বাইরে তারা যেন কোনো কিছুতে না জড়ায়। এখন জানা যাচ্ছে, কিছু এনজিও তাদের ‘ডিসকারেজ’ করেছে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে। আমরা খতিয়ে দেখছি কারা এটা করেছে? এ ছাড়াও এনজিওগুলোর কার্যক্রমের ওপর ট্রিপল আরসি এবং জেলা প্রশাসনকে রিপোর্ট পাঠাতে বলেছি। খুব দ্রুতই তারা রিপোর্ট দেবে। রিপোর্ট পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কক্সবাজারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম এনডিসি বলেছেন, এনজিওদের ব্যাপারে ঢালাওভাবে বেশ কিছু অভিযোগ এসেছে। সুনির্দিষ্টভাবে কেউ তথ্য দেয়নি। তবে আমরা এসব খতিয়ে দেখছি। নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনো এনজিওর এ ধরনের তৎপরতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডিফেন্সে কী বলছে এনজিওগুলো?

শরণার্থী শিবিরে কর্মরত এনজিওগুলো আশঙ্কায় আছে—কখন কার ওপর কোন অভিযোগ এসে পড়ে। শরণার্থী ক্যাম্পের পরিস্থিতি যেভাবে দিনকে দিন জটিল হয়ে উঠছে, ভেতরে কাজ করা তাদের জন্য মুশকিল হয়ে যেতে পারে। তাই শরণার্থী শিবিরে কর্মরত এনজিও কর্মকর্তা শিউলি শর্মা বলেন, ‘ঢালাওভাবে অভিযোগ না করে সুনির্দিষ্টভাবে করা উচিত। একজন বললো নিয়ম ভঙ্গ করছে, এতেই সবাই লাফাচ্ছে। এমন করা যাবে না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সুনির্দিষ্টভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

অ্যাকশন এইডের নেতৃত্বে ৬১টি এনজিও রোহিঙ্গাদের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিল। বিবৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গাদের পাঠানোর বিরোধিতা করছি না। তবে রোহিঙ্গারা গরু -ছাগল নয়, মানুষ। তাই বলেছি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই যেন তাদের পাঠানো হয়।’

বিবৃতি দেয়া এনজিওগুলোর কাজের শর্তের মধ্যে পড়ে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিবৃতিতে খারাপ কিছু বলিনি।

এনজিওগুলো বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, অস্থায়ী বাসস্থান ও বিনোদন সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বিবৃতি দেয়া কি সেবার মধ্যে পড়ে, এই প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ সম্পাদক ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ সহায়তায় তৎপর মাওলানা শরিফ হোসাইন ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ‘বিবৃতি দেয়া সেবার মধ্যে পড়ে না। তবে বিবৃতির দাবিগুলো কিন্তু সঠিক।’ রোহিঙ্গাদের সমাবেশ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের সমাবেশ নৈতিক না অনৈতিক তা সরকার ভাববে। আমি কিছু বলছি না। কিন্তু এনজিওগুলোর এভাবে দাবি নিয়ে সামনে আসা ঠিক হয়নি। বিশেষ টি-শার্ট, যৌথ বিবৃতি—এগুলো করে হাইলাইটে চলে এসেছে। এটা বড় একটা মিস্টেক হয়ে গেছে তাদের। ভেতরে ভেতরে রোহিঙ্গাদের বুঝিয়েছে ভালো কথা, এটা আমরাও মানি, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে তাদের ফিরিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। কিন্তু বিবৃতি দিয়ে সমস্যা করে ফেলেছে। এর একটা নেতিবাচক প্রভাব কিন্তু পড়ছে।’

নিষিদ্ধের তালিকায় টার্গেট ইসলামি এনজিও

২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসেই বিতর্কিত এবং এনজিও ব্যুরোর শর্ত লঙ্ঘন করা সাতটি এনজিওর কার্যক্রম বন্ধের সুপারিশ করে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। এসব এনজিওর মধ্যে ছিল—এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সার্ভিস (ইডিএএস), সেভ দ্য চিলড্রেন, মোয়াস এমডিএস, কোডাক, এসআরপিবি এবং শেড। পরে এনজিও ব্যুরো থেকে মোট ৪১টি এনজিওর একটি তালিকা তৈরি করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে ব্যুরোর যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ ওঠে। তবে রহস্যজনকভাবে ৪১ এনজিওর সুনির্দিষ্ট নামসহ তালিকাটি কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। অনানুষ্ঠানিকভাবে বেশ কিছু এনজিওর নাম কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গত ৩০ আগস্ট ৪১টি এনজিওর কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত জানালেও এর তালিকা সাংবাদিকদের দিতে পারেনি কক্সবাজারের স্থানীয় প্রশাসন।

সহকারী আরআরসি শামসুদ্দোজা বলেন, বিতর্কিত এনজিও মুক্তির ৬টি প্রকল্প বন্ধ করার নির্দেশনা ছাড়া তার অফিসে আর কোনো এনজিও নিষিদ্ধ বা প্রত্যাহার করার নির্দেশনা নেই।

সম্প্রতি গত ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গাদের মহাসমাবেশে আর্থিক সহযোগিতা এবং প্রত্যাবাসন-বিরোধী প্রচারণার অভিযোগে আন্তর্জাতিক দুই এনজিও সংস্থার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো। পাশাপাশি এ দুই এনজিওর ব্যাংক লেনদেনও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) মো. আশরাফুল আফছার।

তিনি জানান, এ সংক্রান্তে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পাঠানো একটি চিঠি বুধবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসনে পৌঁছেছে। গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের মহাসমাবেশে আর্থিক সহযোগিতা ও প্রত্যাবাসন-বিরোধী প্রচারণার অভিযোগে আল আদ্রা ও আল মারকাজুল ইসলামী নামে দুটি এনজিওর কার্যক্রম বন্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠিতে নির্দেশনা রয়েছে। দ্রুত তা বাস্তবায়ন করা হবে।

তবে রোহিঙ্গা এলাকায় এ পর্যন্ত ৬টি এনজিওর তহবিল ছাড় বন্ধ রেখেছে এনজিও ব্যুরো। এগুলো হলো–মুসলিম এইড ইউকে, ইসলামিক রিলিফ, ইসলামিক এইড, স্মল কাইন্ডনেস বিডি, নমিজন আফতাবি ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ চাষী কল্যাণ সমিতি।

যে এনজিওগুলোর তহবিল ছাড় পাচ্ছে না, সম্প্রতি বন্ধ করা হলো যে দুটো এনজিও—নাম দেখলেই বুঝা যায় ইসলামি এনজিও এগুলো। এনজিও বন্ধ করার নামে সরকার কি ইসলামি এনজিওগুলো টার্গেট করছে? ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে শরীফুল হক বলেন, ‘ইসলামি এনজিওগুলোই টার্গেট কিনা বিষয়টা স্পষ্ট না।’ তবে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে কাজ করা আলেম গাজী ইয়াকুব বললেন, ‘শরণার্থী শিবিরে ইসলামি এনজিও এবং অন্য এনজিওগুলোর মাঝে একটা প্রচ্ছন্ন বৈরী মনোভাব আছে। অনেক রোহিঙ্গা মনে করে জাতিসংঘ তাদের খাওয়াচ্ছে, পরাচ্ছে। আমাদের থোড়াই কেয়ার করে। জাতিসংঘ তাদের সবকিছু করছে, বাংলাদেশ এখানে কিছুই না।’

যে কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে

মিয়ানমার থেকে ইতিহাসের নৃশংসতম নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি অংশ ক্রমশ বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ছে। জড়াচ্ছে মাদক, চোরাচালান ও ডাকাতির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে হরহামেশাই লিপ্ত হচ্ছে বিবাদে। এটা কি আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে? ব্যাপারটি কিভাবে দেখছেন জানতে চাইলে গাজী ইয়াকুব বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের একটি অংশ নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাপনে বড় ধরনের বিঘ্নতার সৃষ্টি হচ্ছে, ব্যাপারগুলো সত্য। তবে তাদের এই অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার পেছনে কিছু এনজিও সংস্থা ও দেশীয় দুষ্ট চক্রের পৃষ্ঠপোষণ ও ইন্ধন রয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নাম ভাঙিয়ে বহির্বিশ্ব থেকে শত শত কোটি টাকার ত্রাণ সহায়তা নিয়ে আসছে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান। এসব টাকার কত পার্সেন্ট খরচ করা হয় রোহিঙ্গাদের পেছনে? অল্পকিছু খরচ করে বাকি বিশাল অংকের এমাউন্ট পকেটে ঢুকে ওই সব এনজিও’র হর্তাকর্তাদের। তাই তারা চায় রোহিঙ্গা সংকট জিইয়ে রাখতে। আর এজন্য এদেরকে অশান্ত করে তুললে মিয়ানমার সরকার এদেরকে ফেরত নেবে না, সংকট দীর্ঘায়িত হবে। তাদেরও পকেটে ঢুকতে থাকবে বিদেশি ডলার।’

গাজী ইয়াকুব বলেন, নির্দিষ্ট কিছু সংস্থা রোহিঙ্গাদের উস্কানি দেবার মূলে রয়েছে। এরাই নানা প্রকারের অস্ত্র ও ট্রেনিং দিয়ে তাদেরকে নানা ধরনের অরাজকতায় লিপ্ত করে। এদের মধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে লিয়াজো আছে অনেকের। রোহিঙ্গাদের কিছু সদস্যকে অস্ত্র দিয়ে মারমুখো করতে পারলে, মিয়ানমার সরকার তাদের ওপর নিপীড়নের একটা অজুহাত দাঁড় করাতে পারবে যে, এরা উচ্ছৃঙ্খল ছিল, তাই আমরা তাড়িয়ে দিয়েছি।

আগের সংবাদরোহিঙ্গা ও জাতিবাদী ঘৃণা : কেন বিরোধিতা করবেন?
পরবর্তি সংবাদকেমন আছেন এখন রোহিঙ্গারা? প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে