
কাজী মাহবুবুর রহমান
রাত পোহালেই দশই মুহাররম। পবিত্র আশুরা। ইসলামের ইতিহাসের অনেক উপাখ্যানই জড়িত আশুরার সঙ্গে। আশুরা উপলক্ষ্যে ইসলামে দুইটি নফল রোজা রাখারও বিধান রয়েছে। শুধু ইসলাম ধর্মেই নয়, অন্যান্য ধর্মেও রয়েছে আশুরার সম্মান ও গুরুত্ব। ইহুদী ধর্মাবলম্বীরাও এইদিনে রোজা রাখেন। তাদের সঙ্গে যেন এক না হয়ে যায়, তাই রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আশুরার সঙ্গে তার আগের অথবা পরেরদিনে আরো একটি রোজা রাখো।
সারাবিশ্বেই মুসলিম দেশগুলোতে এই দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। নানান ইবাদাত, সম্মিলিত দুয়া ও সরকারী ছুটির মধ্য দিয়ে এই দিনটির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বিশেষত শিয়া মতাবলম্বী দেশ ও কমিউনিটিগুলোতে এই দিনটির উদযাপন একটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। তারা হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৌহিত্র হযরত হাসান এবং হযরত হুসাইন রাযিআল্লাহু আনহুমার স্মরণে এইদিনে অত্যন্ত ধুমধামের সঙ্গে শোভাযাত্রা, তাজিয়া মিছিল ও নানান নজর-নেওয়াজ, সিন্নি ইত্যাদির আয়োজন করে থাকেন। আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সমূহের ভেতর ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান–এইদেশগুলোর শিয়া ঘরানার কালচার থেকে এসব আয়োজনগুলি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের শিয়া কমিউনিটির অন্যতম তীর্থস্থান পুরান ঢাকার হোসনে দালানেও প্রতি বছর আশুরার দিনটি ব্যাপক গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। হোসনে দালান নিয়ে শিয়া মতাবলম্বীদের ভক্তির অন্ত নেই। ভিন্নমতের মুসলিমদেরও রয়েছে হোসনে দালান নিয়ে অনেক কৌতূহল। অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরও এখানে জিয়ারতে আসতে দেখা যায়।
কী রয়েছে এই হোসনে দালানে
খোলাচোখে দেখতে গেলে বাংলাদেশের অন্য দশটি মাজারের চেয়ে বেশি কিছু নেই এখানে। বিশাল সুরম্য ভবন, শাহী তোরণ–এসবের কিছুই নেই। কিন্তু বিশ্বাসের বাঁকবদল করলেই দেখা যাবে এখানে রয়েছে আশ্চর্য মূল্যবান দর্শনীয় বিষয়াদি। মূলত হোসনে দালান বলতে যেই ভবনটিকে বুঝানো হয়, তা একটি প্রাচীন শান বাঁধানো পুকুরের পাড়ে খোলামেলা দ্বিতল ভবন। এই ভবনটির বিভিন্ন অংশে রয়েছে শিয়া মতাদর্শের বিভিন্ন রসুম ও রেওয়াজ। এতে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে, খুব ছোট ছোট দুটি মাজার। এগুলোকে প্রতীকের মতই মনে হয়।
কিন্তু হোসনে দালানের খাদেম-কর্মচারী, দালানের অর্গানাইজেশনে পরিচালিত মাদরাসায়ে আব্বাসিয়ার স্টাফ ও সাবেক ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বিশ্বাস করেন, এ কবর দুটি সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এ স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৌহিত্র হযরত হাসান এবং হযরত হোসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুমার কবর। বিষয়টি শুনতে বিস্ময়কর মনে হলেও এমনটিই বিশ্বাস করেন তারা।

কিন্তু হযরত হাসান এবং হযরত হোসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুমার কবর এমন দূরদেশে কী করে এলো, এমন বিস্ময় প্রকাশ করলে তারা বলেন, হযরত হোসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহু যেদিন কারবালার প্রান্তরে শহীদ হন, সেদিনই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যেখানে হযরত হাসান, হোসাইনকে ভালবাসার মানুষ রয়েছে সেখানেই মহান আল্লাহর ‘ইশারা’য় এই মাজারগুলি ‘গায়েব’ থেকে জেগে উঠেছে। তারা এই কবর দুটিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে জিয়ারত করেন এবং কবরের প্রতিটি অংশ স্পর্শ করে চুম্বন করেন। এ সময়ে পাঠ করতে থাকেন বিশেষ এক দুরুদ। যেখানে নবীজীর পাশাপাশি হযরত আলী, হযরত ফাতেমা, হযরত হাসান ও হোসাইন রা.-এর নাম উল্লেখ করা হয়ে থাকে।
কিন্তু এগুলো যে অতিভক্তি ও অন্ধবিশ্বাসের পরিণতি, ইসলামের মূল স্রোতের সঙ্গে এর যে কোনো সম্পর্ক নেই–ব্যাপারটি মানতে তারা নারাজ এবং নিজেদের অন্ধবিশ্বাসে অনড় থাকতে বদ্ধপরিকর।
মাজারটির সঙ্গে একটি কাঁচের বাক্সের ভেতর সংরক্ষিত রয়েছে শিয়াদের অষ্টম ইমাম হযরত আলী রেজার ব্যবহৃত কালিমা খচিত একটি চাদর। ইমামদ্বয়ের কবর এবং ইমাম আলী রেজার চাদরটি যেই বেদীর ওপর স্থাপিত, তার পুরোটাই কালিমা এবং দরুদ অঙ্কিত পর্দায় ঘেরা। ভেতরে ফুলের স্তুপ। এবং আগত জিয়ারতকারীগণ মাজারে ফুল স্থাপনের পাশাপাশি কেউ কেউ মান্নত পূরণের লক্ষ্যে বেদীর গ্রিলের সঙ্গে রঙ-বেরঙয়ের সুতা, আগরবাতির প্লাস্টিকের খোসা বেঁধে দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ ঝুলিয়ে দিচ্ছেন তালা। তারা বিশ্বাস করেন, এই প্রক্রিয়ায় অনেক দুর্লভ ইচ্ছাও পূরণ হতে পারে। তবে অন্যান্য বিতর্কিত মাজারসমূহের মতো এখানে সিজদা করার প্রচলন নেই।
মাজারের পরেই রয়েছে একটি খোলা হলরুম। অন্যান্য সময় এই জায়গাটির উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবহার হয় না। কিন্তু আশুরার সময় এই হলরুমের ভেতর দিয়েই মাজার জিয়ারতের জন্য আসতে হয়। পুরুষ এবং মহিলাদের জন্য করা হয়ে থাকে পৃথক লাইন। মাজারের পশ্চিম পাশে রয়েছে পুরুষের নামাজ আদায়ের জায়গা। এবং ছোট্ট অজুখানা ও পানি পানের ব্যবস্থাও রয়েছে। মহিলাদের নামাজ ও ইবাদতের ব্যবস্থা রয়েছে হলরুমের দক্ষিণে।
হোসনে দালানের মূলকাঠামোর বড় একটি অংশ নির্মিত হয়েছে পুকুরের ওপর। তারা দাবী করেন, এই পুকুরটির ভেতর থেকেই গায়েব থেকে এই ভবনটি জেগে ওঠে। যার বয়স বর্তমানে প্রায় ১৪০০ বছর অতিক্রম করতে চলেছে। তবে তার নির্মাণের আদল লক্ষ্য করলে মোঘল-পরবর্তী নবাবী স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সেই পুকুরটির সীমানার ভেতর প্রবেশাধিকার এখন সংরক্ষিত। চারপাশে লোহার গ্রীল দিয়ে ঘেরাও করা। তবে বিশেষ অনুমতির পর পুকুরঘাট পরিদর্শন করে অনুমান করা যায়, এর প্রাচীন সংস্কারের বয়সও একশ বছরের বেশী হবে না। পুকুরটিতে কর্তৃপক্ষ মাছের চাষ করেন। ভক্তদের দৃষ্টিতে এই পুকুর এবং মাছগুলিও অনেক ‘বরকতপূর্ণ’। তারা মূল ভবনের দোতলার করিডোর থেকে মাছের জন্য খাবার ছুড়ে দেন। এক ভক্তের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইচ্ছাপূরণের জন্য মাছেদের খাবার দিয়ে থাকেন।
হোসনে দালানে ওঠার পূর্বে সিঁড়ির নীচে একটি স্থান রয়েছে মোম ও আগরবাতি প্রজ্জ্বলনের জন্য। এবং দেয়ালের সঙ্গে চোখে পড়ে বিভিন্ন হাতের ছাপ। প্রথমে জায়গাটি কিছুটা ভুতুড়ে ও রহস্যময় মনে হয়। হাতের ছাপগুলি আগরবাতির ছাই দিয়ে দেয়া। এটি তাদের একটি পুরনো রেওয়াজ। তারা মনে করেন, এর মাধ্যমেও অনেক অসাধ্য সাধন করা সম্ভব।
হোসনে দালানের সম্পূর্ণ কমপ্লেক্সটির আরো চারটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো–লাইব্রেরী, হাসপাতাল, মাদরাসা ও কবরস্থান। মাদরাসাটি একটি প্রাথমিক মক্তব হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে বাচ্চাদের কুরআন শিক্ষাই মুখ্য। হাসপাতালটির দেয়ালে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নাম ও তাদের উপস্থিতির সময়সূচী উল্লেখ করা থাকলেও এর ব্যবহার এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। হাসপাতালের অপজিটে গেটের নিচে রয়েছে একটি বই বিক্রয় কেন্দ্র। সম্পূর্ণ বইয়ের দোকানটিই শিয়া বিশ্বাসের অনূকুল বিষয়ের বইপত্র দিয়ে ভর্তি করা। সেখানে উল্লেখযোগ্য ও বহুল বিক্রিত বই সমূহের ভেতর কয়েকটি বই হল–নাহজুল বালাগাহ, দিওয়ানে মুইনুদ্দীন, বারো ইমামের জীবনী, ইমাম হোসাইনের শাহাদাত, মাওলার অভিষেক, কারবালার ইতিহাস, মধ্যপ্রাচ্যে হাফেজ্জী হুজুর, মারেফত ইমামত, বিলায়েতের দ্যুতি, এলীয়া, ঔঁ এবং আলী, শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস, দ্বীনিয়াত, দোয়ায়ে জওশান কাবীর।
এ ছাড়াও লাইব্রেরীতে চোখে পড়বে বেশ কিছু হাতে আঁকা ছবি। ফুরাতের তীরে আহত ঘোড়া এবং চাদর পরিহিত তিনজন মানুষের ছায়া। সিংহের আকৃতিতে কালেমার ক্যালিগ্রাফি। আল্লাহর নিরানব্বই নাম ও শ্লোগানধর্মী কিছু পোস্টার। দেয়ালে লাগানো একটি পুরান পোস্টারে দেখা যায় চারলাইনের এক বিচিত্র কবিতা :
কাবে কে আনদার আলী আলী
হার শায়কে আনদার আলী আলী
তু কবর কে বাহার জো কারলে
তেরী কবর কে আনদার আলী আলী
