
মুসান্না মেহবুব
২০ মার্চ। আমরা জানি ২০০৩ সালের এই দিনটাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুদের বানোয়াট অভিযোগ তুলে আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো জোট আগ্রাসী আক্রমণ চালিয়েছিল ইরাক ভূমিতে। এবং শান্তিপূর্ণ একটা দেশকে অল্প কিছুকালের ব্যবধানে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছিল। কিন্তু আমরা যেটা খুব জানি না, সেটা হলো ২০০৩-এর এই আক্রমণের অনেক আগ থেকেই ইরাক-ধ্বংসের পরিকল্পনা এঁটে আসছিল বিশ্বমোড়ল আমেরিকা। এমনকি নাইন/ইলেভেনেরও আগে। নাইন/ইলেভেন এই আগ্রাসনের একটা বাড়তি অজুহাত সৃষ্টি করে দিয়েছিল কেবল।
মার্কিন তেল-বাণিজ্য-উপদেষ্টা ফালাহ আল-জিবারির ভাষ্যমতে, ২০০১ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ক্ষমতা পাবার পরপরই ওয়াশিংটন, মধ্যপ্রাচ্য ও ক্যালিফোর্নিয়াতে ইরাকের সাদ্দাম হোসাইন সরকারকে উৎখাতের ব্যাপারে বেশ কয়েকবার গোপন মিটিং করেছিলেন। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-জিবারি আরও বলেছিলেন, সেসময় বুশ প্রশাসনের পক্ষে সাদ্দাম হোসাইনের প্রভাবশালী উত্তরসূরীদের সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন তিনি।
ইরাক আক্রমণ করার জন্য তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ ও কোয়ালিশন বাহিনী যে কারণ দেখিয়েছিল তা হলো, দেশটি নাকি ১৯৯১ সালের চুক্তি অমান্য করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ করছে এবং তাদের কাছে এ ধরনের অস্ত্রের মজুদও আছে। যা আমেরিকা, আমেরিকার জনগণ এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় ধরনের হুমকি।
কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে ‘ইরাক ইনকোয়ারি’র তদন্ত প্রতিবেদন, যেটা চিলকট রিপোর্ট নামে পরিচিত, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে সাদ্দাম হোসাইনের ইরাক আমেরিকার জন্য কোনোভাবেই হুমকি স্বরূপ ছিল না।
‘ইরাক ইনকোয়ারি’ ছিল ব্রিটিশ সরকারের একটি তদন্ত। এই তদন্তের উদ্দেশ্য ছিল ইরাক যুদ্ধের ব্যাপারে কী ঘটেছিল তা অনুসন্ধান করে ভবিষ্যতের ব্রিটিশদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় চিহ্নিত করা। এটি ‘চিলকট ইনকোয়ারি’ নামেও অভিহিত হয়। কারণ, পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এই তদন্ত কমিটির সভাপতি ছিলেন স্যার জন চিলকট। এই তদন্ত চলে প্রিভি কাউন্সিলরদের দিয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটির মাধ্যমে। কমিটির সদস্যদের বাছাই করেছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন নিজে। ২০০৯ সালে এ কমিটি গঠনের সাত বছরেরও বেশি সময় পর এই তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ্য বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় ২০১৬ সালের ৬ জুলাই। এই প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক মহলে ও গণমাধ্যমে চিলকট রিপোর্ট নামেই সমধিক অভিহিত।
প্রতিবেদনে বলা হয় : তখন সাদ্দাম হোসেন ব্রিটিশ স্বার্থের প্রতি কোনো আশু হুমকি ছিল না; সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপকবিধ্বংসী অস্ত্র (ডব্লিউএমডি–ওয়েপনস অব মাস ডেস্ট্রাকশন) রয়েছে বলে দেয়া যে গোয়েন্দা রিপোর্টের কথা বলে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সূচনা করা হয়, সে গোয়েন্দা রিপোর্ট নিশ্চিত তথ্যভিত্তিক ছিল না; যুদ্ধের বিকল্প শান্তিপূর্ণ প্রয়াসের উপায় শেষ না হওয়ার আগেই এই আগ্রাসী যুদ্ধ চালানো হয়; এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করেছে; যুদ্ধের বৈধ ভিত্তি চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া সন্তোষজনক হওয়া থেকে অনেক দূরে ছিল; যুদ্ধোত্তর ইরাক পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা ছিল পুরোপুরি অপর্যাপ্ত; এই যুদ্ধে সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়নি; ব্লেয়ার সরকারের বর্ণিত লক্ষ্য এই যুদ্ধে অর্জিত হয়নি; টনি ব্লেয়ার তার দাবির পক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেছিলেন, ইরাক জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৪৪১ নম্বর প্রস্তাব ভঙ্গ করেছে; যুদ্ধের কোনো বৈধতার সিদ্ধান্ত একমাত্র আন্তর্জাতিক আদালতই দিতে পারে; ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সামরিক অভিযান অনুমোদিত হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার জর্জ বুশকে ইরাক সম্পর্কিত ব্যাপারে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন ‘I will be with you whatever’ এবং ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন ছিল না।
চিলকট রিপোর্ট প্রকাশের পর আমেরিকা নিদারুণ বেকায়দায় পড়ে যায়। বিশ্বজুড়ে সমালোচনা শুরু হয় তাদের ইরাক আক্রমণ বিষয়ে। এই সমালোচনা থেকে বাঁচতে আমেরিকা নতুন করে আবার দাবি তুলে, সাদ্দাম হোসাইন আল-কায়েদাকে সহযোগিতা করছেন, কিন্তু এর পক্ষেও কোনো প্রমাণ তারা দাঁড় করাতে পারেনি।
তার পরও আগ্রাসনের কিছু কারণ দেখানো হয়েছে। যেমন : ফিলিস্তিনের আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করা, ইরাকি সরকার কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণতন্ত্রহীন ইরাককে গণতান্ত্রিক রূপে গড়ে তোলা। কিন্তু এর কোনোটিই একটি দেশকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট কোনো কারণ হিসেবে প্রতিভাত হয়নি খোদ মার্কিন জনগণের বৃহৎ একটি অংশের কাছেও।
তবে যে জিনিশটার জন্য এই আগ্রাসন, তা একটু সমঝদার যে কারো কাছেই স্পষ্ট ছিল। আর তা হলো, ইরাকের অবারিত তেল-সম্পদ কুক্ষিগত করা। সাদ্দাম হোসাইনের কারণে যেটা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। এ ছাড়াও আরও অনেক কারণের মধ্যে প্রধানতম আরেকটি কারণ হলো, স্বভাবজাত একরুখো শাসক সাদ্দাম হোসাইনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে নানাভাবে অসুবিধা হচ্ছিল।
আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের এই আগ্রাসন দেশটিকে অল্প কদিনের ভেতরেই ধ্বংসের জনপদে পরিণত করে। সাদ্দাম সরকারের পতনের পর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে সীমাহীন সহিংসতা। যা আজ অবধি চলমান। একদিকে যেমন বিদেশি সৈন্যের আক্রমণ, অপরদিকে দীর্ঘদিন ধরে একত্রে বসবাসকারী ইরাকি জনগণের মধ্যে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব এবং সহিংসতা।
আমেরিকার লক্ষ্যই ছিল এটা। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে চালানো এমন আগ্রাসনের নাম যদিও তারা ‘সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধ’ দিয়েছে, কিন্তু তারাই আবার দেশে দেশে সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে। মুসলিমদের মধ্যে পরস্পর অনৈক্য, ইসলামের বিরুদ্ধে জনমনে ঘৃণা তৈরি আর মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে পরস্পর বিবেদ তৈরি করে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। যাতে দুনিয়াজুড়ে নিঃশঙ্কভাবে তারা আধিপত্য চালিয়ে যেতে পারে।
এই ইরাকের কথাই ধরুন না! ২০০৩-এর আগে ইরাকে শিয়া-সুন্নির কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। সাদ্দাম হোসাইনের শাসনামলে ইরাকি জনগণের একটাই পরিচয় ছিল—ইরাকি। সেখানে শিয়া-সুন্নির আলাদা কোনো তফাত করা হতো না নিজেদের জাতীয় পরিচয়ে। এমনকি সাদ্দাম হোসাইনের সেনাবাহিনীতে প্রচুর শিয়া সদস্য ছিল, যারা ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। সম্প্রীতির একটা আবহ বিদ্যমান ছিল ইরাক জুড়ে। যদিও সাদ্দাম হোসাইনের বিরুদ্ধে শিয়া-নিপীড়নের অভিযোগ আছে, কিন্তু সেটা শিয়া বলে নয়, কুর্দি হবার কারণে এবং এই কুর্দিরা সাদ্দামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কারণে।
কিন্তু ২০০৩-এর পর থেকে নতুন এক ইরাকের জন্ম হলো। আমেরিকা এসে কৌশলে শিয়া-সুন্নির বিভাজন রেখা টেনে দিলো। সুন্নি মুসলিম যারা, তারা অবাক হয়ে দেখল, এতদিন যাদের তারা ভাই মনে করত, একসঙ্গে সম্প্রীতির বসবাস ছিল যাদের সঙ্গে, সেই শিয়ারাই তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। এবং সেটা আমেরিকার মদদে।
২০০৩-পূর্ব ইরাকে সুন্নি মুসলমানরা যদিও শিয়া-সুন্নির পার্থক্যটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিত না, কিন্তু শিয়াদের ভেতরে চাপাপড়া একটা আত্মচেতনা ধিকিধিকি জ্বলত। আমেরিকা এসে সেই ধিকিধিকি আগুনে ঘি ঢেলে দেয় আর দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে সাম্প্রদায়িক বিবাদ। ১৬ বছর পর আজ ইরাকে আমেরিকার সম্মুখ আগ্রাসন থামলেও নেভেনি সাম্প্রদায়িকতার এই দাবানল। এই দাবানলে আজও পুড়ছে ইরাক, ইরাকের মুসলমান।
