হিন্দুত্ববাদের সমালোচনায় শশী থারুর : বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

তুহিন খান :

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতে গত এক দশক যাবত চলছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির রাজত্ব। এই এক যুগে ভারত বদলে গেছে অনেকটাই। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র মুখোশ ভারতের খসে পড়েছিল সেই বাবরি মসজিদ কাণ্ডের সময়েই, এই এক যুগে ভারত হয়ে উঠেছে ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় মৌলবাদের বৈশ্বিক উদাহরণগুলোর একটি। এমনকি বিশেষজ্ঞরা ভারতে বিজেপির শাসনকে, বৈশিষ্ট্য, লক্ষণ ও গন্তব্যে, ইসরাইলের লিকুদ পার্টির শাসনের সমান্তরাল বলেও মনে করছেন।

গত একযুগে ভারতীয় সমাজে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে, এসেছে বিচিত্রসব পরিবর্তন। গরুর গোশত খাওয়া বা ঘরে রাখার অপরাধে হিন্দু জনতার হাতে মুসলমানদের মৃত্যু, কাশ্মীরে ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ আনার লক্ষ্যে ৩৭০ ধারা বাতিল, মুসলমানদের ধর্মীয় বিধান ‘তিন তালাক’র জন্য শাস্তির বিল তৈরি, আসামে এনআরসির জন্য তোড়জোড়, সবচে বড় ব্যাপার হল: পুরো দেশজুড়ে বিজেপি তৈরি করেছে একটা উন্মত্ত ধর্মীয় উন্মাদনা, যে উন্মাদনায় যোগ দিচ্ছেন বলিউড তারকারা, ক্রিকেটাররা, যে উন্মাদনার কারণে মুসলমান ও অভিবাসীরা আজ ভারতে হয়ে পড়েছে দ্বিতীয়শ্রেণীর নাগরিক।

বিজেপির এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে আছে তাদের পলিটিকাল ইডিওলজি ‘হিন্দুত্ববাদ’, যাকে ইংরাজিতে বলে ‘Hindutva’. এই হিন্দুত্ববাদের ধারণা দেন বিজেপির রাজনৈতিক চিন্তার গুরু বিনায়ক দামোদর সাভারকর। সাভারকর মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির বিপরীতে তৈরি করেন ভারতীয় জাতিবাদের ধর্মীয় প্রকল্প—হিন্দুত্ববাদ। সমস্ত ভারতীয়ই ইনহেরেন্টলি, কালচারালি হিন্দু—এই হল হিন্দুত্ববাদের মূলকথা। তার অখণ্ড ভারত হল আর্যাবর্তের ভারত, মোসলমান শাসন তার কাছে লুটেরাদের শাসন। সাভারকর নাৎসিদের প্রশংসা করেছেন। ভারতীয় তথা হিন্দু জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও ভারতে এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা ছিল তার রাজনৈতিক চিন্তার প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

বিজেপির বিপরীতে ভারতে আছে ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। সেই কংগ্রেস যারা সর্বপ্রথম ভারতীয় জাতিবাদী আন্দোলন শুরু করেছিল বৃটিশদের বিরুদ্ধে এবং যারা ভারতকে সেক্যুলার রাষ্ট্র হিশাবে বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ধর্ম, জাত বা শ্রেণীনিরপেক্ষ সেক্যুলার জাতিবাদের আওয়াজ তুলেছিল ভারতে। কিন্তু সাতচল্লিশের পরে ভারতের উপর লেখা ইতিহাসে দেখা গেলো, ১৯৩০-৪০ এর সময়কালে, কংগ্রেস নেতাদের হিন্দুত্ববাদের চর্চা, বিশেষত উত্তর প্রদেশ ও কোলকাতায়, রাজনৈতিক কর্মসূচী ও চিন্তায় বিজেপির সাথে সেসবের তেমন ফারাক ছিল না বললেই চলে।

ভারতের জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ, ডিপ্লোমেট, লেখক, পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল এবং কংগ্রেসপন্থী শশী থারুর, একজন স্বঘোষিত ভেজিটারিয়ান ও নীতিনিষ্ঠ হিন্দু। ২০১৮ সালে বের হয় তার আলোচিত বই—’হোয়াই আই অ্যাম আ হিন্দু’। থারুরের ভাষায়, বিজেপির ‘হিন্দুত্ববাদ’র ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতেই তিনি এই বই লিখেছেন। আনিশকা ঘিওয়ালা লোহিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কথা বলেন শশী।

ভারতের একজন রাজনীতিবিদের কেন এরকম ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজের ধর্মবিশ্বাসের জানান দিতে হলো, বা দেওয়া জরুরি কিনা—এই প্রশ্নের জবাবে শশি বলেন, এটা আসলে জরুরি না। কিন্তু গত কয়েক বছরে বিজেপি দেশে একটা ফলস ডিবেট খাঁড়া করেছে। তারা বলছে, এটা সত্যিকারের ধার্মিক আর নাস্তিকদের ডিবেট৷ কিন্তু ঘটনা তো তা নয়। খোদ হিন্দু ধর্মের মধ্যেই হাজারো ডাইভার্সিটি আছে। হিন্দু হলে বিজেপিকে ভোট দাও—এই আহ্বানের কোনই অর্থ নাই। এই কথাটা বলতেই বইটা লেখা।

বইটিতে স্বামী বিবেকানন্দকে শশী নিজের মেন্টর হিশেবে স্বীকার করেছেন। তার মতে, হিন্দুইজম হিন্দুত্ববাদ থেকে আলাদা। হিন্দুত্ববাদ হল এক ধরণের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা। আর সাভারকার যেসব লিখেছেন তার সাথে বিশ ও ত্রিশের দশকের একনায়ক হিটলার, মুসোলিনি ও পরবর্তীতে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর অনুসারীদের লেখারই প্রতিধ্বনি। সাভারকার মূলত বিশাল ও উদার এক হিন্দুইজমকে একটা সংকীর্ণ রাজনৈতিক ডকট্রিনে নামিয়ে এনেছেন। ধর্মবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক প্রেরণা হিশেবে, হিন্দুত্ববাদের বিশেষ কোন মূল্য নাই।

কালচারালি ভারত হিন্দু—এই ধারণার সাথে শশী থারুরও দ্বিমত করেন না। থারুর মনে করেন, ভারত কালচারালি হিন্দু, এবং এজন্যেই মহাকাশে রকেট পাঠানোর আগে নারিকেল ভেঙে যাত্রা উদযাপনে তিনি কোন সমস্যা দেখেন না। কিন্তু এই হিন্দুইজম অন্যের বিশ্বাসকেও সম্মান করে, মর্যাদা দেয়। কংগ্রেস আর বিজেপির এই ফারাক।

শশী থারুর মূলত বিজেপির ধর্ম নিয়ে রাজনীতির সাফল্যে প্রাণিত হয়েই, কংগ্রেসের জন্যও একটা আলাদা হিন্দুইজম নির্মাণ করতে চান, যা ভাবে সেক্যুলার, আবার হিন্দুও বটে। তবে থারুরের এই বক্তব্য বা কনসেপ্ট নতুন কিছু নয়।

আসলে ভারতীয় জাতিবাদের আইডিয়াটা গোড়াতেই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ইণ্ডিয়ান ন্যাশনালিজমর প্রাথমিক সমস্যা ছিল এর আঞ্চলিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা। উনিশ শতকে ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজমের গুরুরা ম্যাক্সিমামই ছিলেন মহারাষ্ট্র বা বাঙলার, তায় আবার মূলত হিন্দু। ধরা যাক, বাঙলায় যিনি বাঙালি জাতির ইতিহাস লেখার ডাক দেন সর্বপ্রথম, তিনি আর কেউ নন, প্রাতঃস্মরণীয় বাবু বঙ্কিমচন্দ্র। কলোনিয়াল ভারতে ‘ইণ্ডিয়ান ন্যাশনালিজম’ আর্টিকুলেট করা ছিলো বেশ শক্ত কাজ। কারণ, ‘ইণ্ডিয়া’ বা ‘ভারত’ কী জিনিশ, তা নিয়া কোন একরৈখিক ধারণা ছিলো না। মুসলমানদের প্রাথমিক পর্যায়ের বৃটিশবিরোধী আন্দোলন ছিল ‘জেহাদ’ বা ‘খেলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন’, অন্যদিকে হিন্দুরা তখন ছিলেন রাজ কর্মচারী। উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের গোড়ার দিকে যে নয়া রেনেসাঁর জন্ম হয় ভারতে, তার নেতৃত্ব দেন হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা, কারণ তারাই কলোনিয়াল ভারতে ইংরাজকে স্বাগত জানিয়ে চাকরি-বাকরি, শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে যান। তাদের হাতে গঠিত এই জাতিবাদের উপরে সেক্যুলার প্রলেপ থাকলেও, ভাবে তা বহুলাংশেই ছিল কম্যুনাল, ধরা যাক, বাঙলা প্রদেশের বঙ্কিমচন্দ্রের কথাই। কিংবা রবিবাবু ও মহাত্মা গান্ধীর ভারতবর্ষ ও হিন্দুত্বের বোঝাপড়া। ফলে, ভারতবর্ষে জাতিবাদের উত্থানের লগে কম্যুনাল চিন্তাধারার অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক ছিল বিদ্যমান বাস্তবতা। উনিশ শতকের শেষভাগে যে লিবারাল ন্যাশনালিজমের উত্থান ঘটে ভারতবর্ষে, গোপালচন্দ্র গোখলে, এম জি রণদে বা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জিদের হাতে, সেইখানেও কম্যুনাল চিন্তার প্রভাব ছিলো। এম জি রণদের ‘প্রার্থনা সমাজ’ ওয়েস্টার্ন সেক্যুলার চিন্তা লালন করলেও, তাদের বৃটিশবিরোধী ‘জাতিবাদ’ গঠনের গোড়া ছিল ভারতের পুরানা কালচারের ভিতরেই গাঁথা, আর সেই কালচার বহুলাংশেই ছিলো হিন্দু কালচার। পরবর্তীতে এই দর্শনের উপরেই প্রতিষ্ঠিত হয় কংগ্রেস, যা আবার ভারতের সকল প্রদেশে সমান সেক্যুলার ছিলো না। ধরা যাক, বাঙলা অঞ্চলে কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার চিন্তাধারায় বিশেষ কোন ফারাক ছিল না, যার বিস্তারিত বিবরণ আছে বিমলানন্দ শাসমলের ‘ভারত কী করে ভাগ হলো’ বইতে। শাসমল দেখাইছেন, কীভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন মূলত ‘হিন্দুদের আন্দোলন’ হইয়া উঠলো, কীভাবে অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা বাঙলায় ‘হিন্দু-ভারতীয় জাতিবাদ’ প্রচার করছিলেন এবং কীভাবে এই নেতারাই বাঙলায় কংগ্রেসের প্রধান সারির নেতা হইলেন। ১৯৪৭-এ বাঙলা ভাগের পেছনে বাঙলায় তিলে তিলে গইড়া ওঠা এই ‘হিন্দু-ভারতীয় জাতিবাদ’র দায় কম নয়।

এই হিশেবে দেখা যায়, কংগ্রেস আর বিজেপির ফারাক, অন্তত আমাদের চোখে, খুব বেশি না। ঐতিহাসিক সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয় কংগ্রেসের শাসনামলেই। আজকের কাশ্মীর সমস্যা, বাবরি মসজিদ সমস্যা এগুলোও কংগ্রেস আমলে তৈরি সমস্যাই। হিন্দুইজম বনাম হিন্দুত্ববাদ—কংগ্রেস আর বিজেপির ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির এই যে সংজ্ঞা দিয়েছেন থারুর, তাকে ইতিহাসের নিরিখে বিশ্লেষণ করলে যা পাওয়া যায় তা হলো, কংগ্রেসের উদর থেকেই মূলত বিজেপির জন্ম। এক অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন গান্ধীও দেখতেন, দেখতেন রবীন্দ্রনাথ; তাদের সেই ভারতেরও আন্তরাত্মা বা জাতীয় আত্মার প্রধান ধারণা ছিল হিন্দুইজম, এক উদার হিন্দুইজম, যেখানে এসে পৃথিবীর সকল ধর্ম ও কালচার লীন হয়ে যায়। কিন্তু যারা লীন হয় না? তাদের জোর করে লীন করা হয়, যেমন হায়দ্রাবাদ, সিকিম, কাশ্মীর। বিজেপি চায় এমন অখণ্ড ভারত যেখানে হিন্দুত্ববাদ সবাইকে গ্রাস করবে, কংগ্রেস চায় এমন ভারত যেখানে হিন্দুত্ববাদ সবাইকে বশ করবে—শশী থারুরের হিন্দুইজমের আইডিয়া মূলত এমনই একটি ব্যাপার। মূলত, কংগ্রেসী সেক্যুলারিজমের এই আভ্যন্তরীণ ডিলেমা ও দ্বিচারিতারই ফলাফল আজ বিজেপির এই উত্থান।

আগের সংবাদমাদানি, যোগেন মণ্ডল ও জিন্নাহ : উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের নানা মত
পরবর্তি সংবাদপ্রতারণা ও গাদ্দারি : কাশ্মীর যেভাবে হাতছাড়া হয়েছে