উপমহাদেশে আহলে হাদিস মতবাদের উৎপত্তি ও বিকাশ

তুহিন খান : 

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতবর্ষে, মূলত উত্তর ভারতে ‘আহলে হাদীস’ মতবাদের সূচনা হয়। ভূপালের সিদ্দীক আহমদ খান এবং দিল্লীর সৈয়দ নাযীর হুসাইনের চিন্তাধারা ও লেখালেখির উপর ভিত্তি করেই এই মতবাদ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। উনিশ শতকের প্রায় পুরোটা জুড়েই এই মতবাদ ক্রমশ বিস্তার লাভ করতে থাকে। একদিকে সেযুগে মুসলমানদের ঈমান-আমলের অবক্ষয়, অপরদিকে বৃটিশ শাসনের অনুগত থেকে তাদের আনুকূল্য লাভ–এই দুই কারণই আহলে হাদীস মতবাদের বিকাশের নেপথ্যে কাজ করে।

সৈয়দ নাযীর হুসাইন ও সিদ্দীক আহমদ খানের পরে আব্দুল্লাহ গযনবি, সানাউল্লাহ অমৃতসরি, হুসাইন বাটালভি প্রমুখের মাধ্যমে এই মতবাদ বিস্তৃতি লাভ করে। এদের মধ্যে হুসাইন বাটালভি বিভিন্ন আকিদা ও ফেকাহ বিষয়ক তর্কে হানাফিদের তৎকালীন প্রধান প্রতিনিধি দেওবন্দের ওলামাদের সাথে বিভিন্ন তর্কে অবতীর্ণ হয়ে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। আগেই বলা হয়েছে, মতাদর্শিকভাবে সালাফি ও ওয়াহাবি আন্দোলনের উত্তরসূরী হলেও, আহলে হাদীসগণ নিজেদের কখনোই সালাফি বা ওয়াহাবি বলতেন না, এবং রাজনৈতিকভাবে তারা বৃটিশ ভারতকে ‘দারুল ইসলাম’ মনে করতেন এবং বৃটিশ শাসনকে সমর্থনও করতেন। ফলে, শুরুর দিকে বৃটিশরা তাদের ‘ওহাবী’ হিশেবে চিহ্নিত করলেও, ধীরে ধীরে তারা বৃটিশ সরকারের আনুকূল্য লাভ করতে থাকেন। এক্ষেত্রেও মৌলভি হুসাইন বিশেষ অবদান রাখেন। ১৮৭৮ সালে পাঞ্জাবে আহলে হাদীস আন্দোলনের মুখপাত্র হিশেবে ‘এশায়াতুস সুন্নাহ’ নামক একটি পত্রিকা চালু করেন তিনি। পত্রিকাটি ব্যাপক প্রসিদ্ধি ও সরকারী আনুকূল্য পায়। মৌলভি হুসাইন বৃটিশ সরকারের প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। এরই প্রেক্ষিতে, মৌলভি হুসাইন এক চিঠির মাধ্যমে বৃটিশ ভাইসরয় রবার্ট বৌলওয়ার লিটনের কাছে লেখেন যে, ‘ওহাবী’ মতবাদের সাথে আহলে হাদীসদের কোন সম্পর্ক নাই এবং আহলে হাদীসদের যেন ওহাবী না ডেকে ‘আহলে হাদীস’ নামে ডাকা হয়। ১৮৮৭ সালের জানুয়ারিতে সরকারিভাবেই এই আবেদন গৃহীত হয়।

ঊনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন মূলত একটি রিফর্মিস্ট সামাজিক আন্দোলন হিশেবেই বিস্তৃত হতে থাকে। বিংশ শতকের শুরুতেই এটি ধীরে ধীরে সাংগঠনিক রূপ লাভ করতে থাকে, এবং এর মধ্যে বিভিন্নরকম মতভেদও দেখা দেয়।

নিম্নে ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সাংগঠনিকভাবে আহলে হাদীস আন্দোলনের বিকাশের উপর আলোকপাত করা হল।

ভারতপর্ব : জামায়াতে গোরাবা আহলে হাদীস

১৮৯৫ সালে মাওলানা নাযীর হুসাইন ও আব্দুল্লাহ গযনভির ছাত্র ও মুরিদ আব্দুল ওয়াহহাব মুহাদ্দেসে দেহলবি (১৮৬৬-১৯৩৩) কর্তৃক ‘জামায়াতে গোরাবা আহলে হাদীস’ নামে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। আব্দুল ওয়াহহাব সাহেবকে ‘ইমাম’ ঘোষণা করে, তার অধীনে ১২ জন আহলে হাদীস আলেম ও নেতা বায়াত গ্রহণ করেন। এদেরকে ‘ইমামতপন্থী’ বা ‘ইমারতপন্থী’ আহলে হাদীসও বলা হয়। এই দলের মতে, ইসলামি হুকুমত থাকুক বা না থাকুক, মুসলিম উম্মাহকে সর্বদা একজন ‘ইমাম’ বা ‘আমির’-এর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। উক্ত ইমাম শর‍য়ী হুকুম-আহকাম, এমনকি হুদুদ ও কিসাসও জারি করতে পারবেন। ইমামহীন অবস্থায় কোন মুসলিম মৃত্যুবরণ করলে সেটা ‘জাহেলি হালত’-এ মৃত্যুবরণ বলে গণ্য হবে।

আহলে হাদীসদের একটি বড় অংশ এই ইমামতপন্থীদের বিরোধিতা করেন। শেষমেশ এই জামায়াতে গোরাবা আহলে হাদীস একটি আলাদা দলে পরিণত হয়। ১৯২০ সালে এই দলের মুখপাত্র হিশেবে মাসিক ‘সহীফায়ে আহলে হাদীস’ নামে একটি পত্রিকা দিল্লী থেকে বের হয়। দেশভাগের পর এই দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় দিল্লী থেকে করাচীতে স্থানান্তরিত হয়। এবং এর পাশে ‘মাদরাসা দারুস সালাম’ নামে একটি কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়। বর্তমানে আব্দুর রহমান সালাফি এই দলের পাকিস্তান অংশের আমীর। রংপুরের মাওলানা আব্দুল হামীদ এই জামাতের বাংলাদেশ অঞ্চলের আমীর হিশেবে পরিচিত। বর্তমানে পাকিস্তানে এই জামাতের অধীনে প্রায় ৩০টি মাদ্রাসা পরিচালিত হয়। করাচীর গুলশান ব্লকে অবস্থিত ‘জামেয়া সাত্তারিয়া’ এর কেন্দ্রীয় শিক্ষালয়। এছাড়াও নিউইয়র্কের টেক্সাসেও এর একটি শাখা রয়েছে। করাচী থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ‘সহীফায়ে আহলে হাদীস’ এই জামাতের প্রধান মুখপাত্র।

অল ইণ্ডিয়া আহলে হাদীস কনফারেন্স

১৯০৫ সালে মিয়াঁ নাযীর হুসাইনের একদল ছাত্র এবং আহলে হাদীস আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই সংগঠনের সূচনা করেন। এই সংগঠনের প্রথম সভাপতি, সেক্রেটারি ও কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন যথাক্রমে হাফেয আব্দুল্লাহ গাযীপুরী, ছানাউল্লাহ অমৃতসরী ও শামসুল হক আযীমাবাদী। এটিই ছিল প্রথম সর্বভারতীয় আহলে হাদীস সংগঠন। ১৯২৪ সালে সৌদি সরকারকর্তৃক সাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন মাজার ইত্যাদি ভাঙা হলে এই সংগঠন বেশ জোরালোভাবে তা সমর্থন করে এবং সৌদি সরকারের এই পদক্ষেপের প্রশংসা করে।

১৯৭০-এর পর এই সংগঠনের নাম বদলে ‘জমঈয়াতে আহলে হাদীস হিন্দ’ রাখা হয়। বর্তমানে দিল্লীতে এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবস্থিত। উর্দু পাক্ষিক ‘তারজুমান’ এর প্রধান মুখপাত্র। এর নেতাকে বর্তমানে ‘সদর’ বা ‘সভাপতি’র বদলে ‘আমীর’ বলা হয়।

জমঈয়াতুল ইত্তিহাদিল ইসলামী (কেরালা)

ভারতের কেরালা রাজ্যে শুরু থেকেই আহলে হাদীস আন্দোলন বেশ জোরদার। ১৯২২ সালেই সেখানকার আহলে হাদীস আলেমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘জমঈয়াতুল ইত্তিহাদিল ইসলামী’। প্রাথমিকভাবে এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিল, মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যায় সরকারের দ্বারস্থ না হয়ে নিজেরাই মীমাংসা করা।

পরবর্তীতে এই সংগঠন আরো বড় আকার লাভ করে, এবং ‘জমঈয়াতুল উলামা’ নামে ১৯৩২ সালে আরো বড় পরিসরে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৫০ সালে এটি ‘নাদওয়াতুল মুজাহেদীন’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে এর যুব, ছাত্র ও নারী শাখা রয়েছে। এর প্রধান কার্যালয় ভারতের কেরালায় কালিকট-২ এ অবস্থিত।

পাকিস্তানপর্ব : মারকাযে জমিয়তে আহলে হাদীস পাকিস্তান

দেশভাগের পর ‘অল ইণ্ডিয়া আহলে হাদীস কনফারেন্স’-এর পাকিস্তানপন্থী আলেমরাই, ১৯৪৮ সালের ২৪ জুলাই ‘মারকাযী জমিয়তে আহলে হাদীস’-এর গোড়াপত্তন করেন। লাহোর সরকারী কলেজের আরবী বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আব্দুল কাইয়ূমের নেতৃত্বে এই সংগঠনের গোড়াপত্তন হয়। মাওলানা দাউদ গযনবি প্রথম সভাপতি ও আব্দুল কাইয়ূম প্রথম সেক্রেটারি হন। বর্তমানে মিয়াঁ ফযলে হক এই জামাতের আমীর। লাহোরে এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবস্থিত। সাপ্তাহিক ‘আহলে হাদীস লাহোর’ এর প্রধান মুখপাত্র।

জমঈয়াতে আহলে হাদীস

রাজনৈতিক বিষয়াদিতে সবসময়ই আহলে হাদীস আন্দোলনের অবস্থান ছিল রহস্যপূর্ণ ও দ্বিধান্বিত। সূচনাকালে বৃটিশবিরোধী সর্বাত্মক আন্দোলনে তারা শামিল হন নাই। দেশভাগের পরেও, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কার্যকলাপে আহলে হাদীস আন্দোলনের নেতাদের অবস্থান ছিল রহস্যপূর্ণ। রাষ্ট্রের সাথে কোনরকম সংঘাতে না যাওয়া এবং সরকারের আনুকূল্য লাভ করে সেফ সাইডে থেকে এক ধরণের এলিট ইসলাম প্রচার সবসময়ই এই জামাতের মূল চরিত্র ছিল। পাকিস্তানের মারকাযী জমিয়তও এর ব্যতিক্রম ছিল না। রাজনৈতিক বিষয়ে তাদের নীরবতা তরুণদের ক্ষুব্ধ করে। ফলে, ১৯৮১ সালে ইহসান ইলাহী যাহীর (১৯৪০-১৯৮৭)-এর নেতৃত্বে মারকাযী জমিয়ত ভেঙে নতুন ‘জমঈয়াতে আহলে হাদীস’-এর গোড়াপত্তন হয়। ১৯৮৬ সালে এটি একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।

এই দলটি তরুণদের মধ্যে এর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৮৭ সালে এক বোমা হামলায় ইহসান যাহীর শহীদ হন। এরপরে অধ্যাপক সাজিদ মীর এর সম্পাদকের পদ গ্রহণ করেন। এই দলটিই আহলে হাদীসদের একমাত্র দল, যেটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে পার্লামেন্টারি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। পাকিস্তানে ২০০২ সালের নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর জোট ‘মুত্তাহিদা মজলিসে আমাল’-এ জোটভুক্ত ছিল এই দল।

গবেষক বিজা যাইনাব আলির মতে, এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় সৌদি অর্থায়নে, বিশ্বব্যাপী সালাফি ইসলাম প্রচারের সৌদি প্রজেক্টের অংশ ছিল এই দল-গঠন। সম্ভবত এর মাধ্যমেই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে আহলে হাদিসরা সৌদি সালাফি ইসলামের প্রজেক্টের অংশ হয়ে পড়ে। শিয়া, কাদিয়ানি ও বেরলভিদের প্রতি অত্যধিক কঠোর এই গ্রুপ দেওবন্দীদেরও ‘মুশরিক’ মনে করে, তাদের অত্যধিক নবীভক্তির কারণে (আলী, বীযা যাইনাব : ২০১০)।

জামাআতে আহলে হাদীস পাকিস্তান

১৯৩১ সালে মাওলানা আব্দুল্লাহ রৌপড়ি এই সংগঠনের গোড়াপত্তন করেন। বর্তমানে লাহোরের মসজিদে কুদসে এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবস্থিত। ‘তানযীমে আহলে হাদীস’ এর প্রধান মুখপাত্র।

অবিভক্ত বাংলাপর্ব : আঞ্জুমানে আহলে হাদীস বাঙ্গালা ও আসাম

মাওলানা নাযীর হুসাইনের বাঙালি ও আসামি ছাত্ররা ১৯১৪ সালে কোলকাতার আহলে হাদীস মসজিদে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। মাওলানা নেয়ামতুল্লাহ সভাপতি এবং মাওলানা আব্দুল লতিফ সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। প্রথমে মাসিক ও পরে সাপ্তাহিক ‘আহলে হাদীস’ ছিল এই সংগঠনের মুখপাত্র। ১৯১৬ সালে কোলকাতায় ‘অল ইণ্ডিয়া আহলে হাদীস কনফারেন্স’র অধিবেশনে এই সংগঠনটিকে ‘অল ইণ্ডিয়া কনফারেন্স’র শাখা ঘোষণা করা হয়।

নিখিল বঙ্গ ও আসাম জমঈয়াতে আহলে হাদীস

১৯৪৬ সালে রংপুরের হারাগাছ বন্দরের অদূরে বিখ্যাত আহলে হাদীস আলেম মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফি আল কোরাইশি (১৯০০-১৯৬০)-এর নেতৃত্বে তিনদিনব্যাপী এক আহলে হাদীস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলার বাইরে থেকেও ওলামায়ে কেরাম যোগদান করেন। এই সম্মেলনে কাফী সাহেবকে সভাপতি করে উক্ত সংগঠনের গোড়াপত্তন হয়।

আঞ্জুমানে আহলে হাদীস পশ্চিমবঙ্গ

১৯৪৭-এ দেশভাগের পর জমঈয়াতের পূর্ব পাকিস্তান শাখা পাবনায় স্থানান্তরিত হয়। ফলে, পশ্চিমবঙ্গের আলেমরা প্রয়োজনের তাগিদে ১৯৫১ সালে কোলকাতার মিছরীগঞ্জ মসজিদে ‘আঞ্জুমানে আহলে হাদীস পশ্চিমবঙ্গ’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর মাসিক ‘তবলীগ’ ও ‘তওহীদ’ নামের দুইটি পত্রিকা যথাক্রমে এই সংগঠনের মুখপাত্র হিশাবে প্রকাশিত হয়। ১৯৭১ সালে আব্দুল কাইয়ূম খানের সভাপতিত্বে এটি আবার পুনর্গঠিত হয়। ১৯৭৫-এ এর নতুন নামকরণ করা হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ জমঈয়াতে আহলে হাদীস’। বর্তমানে এটি কেন্দ্রীয় জমিয়তে আহলে হাদীস হিন্দের প্রাদেশিক শাখা হিশেবে বর্তমান।

বাংলাদেশপর্ব : বাংলাদেশ জমঈয়াতে আহলে হাদীস

৪৭-এ দেশভাগের পর ‘নিখিল বঙ্গ ও আসাম জমঈয়াতে আহলে হাদীস’-এর সদর দফতর পাবনায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৩ সালের সাধারণ সভায় এর নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব-পাক জমঈয়াতে আহলে হাদীস’ রাখা হয়। ১৯৫৬ সালে এর সদর দপ্তর ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এর নতুন নাম হয় ‘বাংলাদেশ জমঈয়াতে আহলে হাদীস’। বর্তমানে এর সভাপতি ডক্টর মুহাম্মদ আব্দুল বারি।

জমঈয়াতে আহলে হাদীস বাংলাদেশ বাংলাদেশে আহলে হাদীস আন্দোলনের ভিত রচনা করে। মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফি কোরাইশি ছিলেন উদারমনস্ক মানুশ। তিনি নিজে আহলে হাদিস হলেও অপরের মতকে সম্মান করতেন এবং দলমত নির্বিশেষে সকলের ঐক্য চাইতেন। তার নেতৃত্বে এই জমঈয়ত একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি লাভ করে। বর্তমানে সাপ্তাহিক ‘আরাফাত’ এই দলটির মুখপাত্র।

জামাআতে মুজাহেদীন বাংলাদেশ

এটি আহলে হাদীসদের একটি প্রাচীন সংগঠন। এরা সাইয়েদ আহমদ বেরলভি ও ইসমাঈল শহীদের জিহাদি সিলসিলার উত্তরাধিকার দাবি করেন। দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের নান্দেড়াই দারুল হুদা আলিয়া মাদ্রাসা এই দলের কার্যালয় হিশেবে পরিচিত। মাসিক ‘আল মুজাহিদ’ এই দলের মুখপাত্র, যা বর্তমানে বন্ধ। এই দলটির কোন সাংগঠনিক কার্যক্রম অবশিষ্ট নেই।

জামাআতে গোরাবায়ে আহলে হাদীস বাংলাদেশ

আব্দুল ওয়াহহাব কর্তৃক ১৮৯৫ এ গঠিত এই ইমামতপন্থী আহলে হাদীস দলের সমর্থনে সাক্ষর করা ৮৩ জন আলেমের ৪২ জনই ছিলেন বাঙ্গালি। এদের মাধ্যমেই পরে বাংলাদেশে এর শাখা গঠিত হয়। বর্তমানে রংপুরের হারাগাছের মাওলানা আব্দুল হামীদ বাংলাদেশের ইমামাতপন্থী আহলে হাদীসদের আমীর।

আহলে হাদীস তাবলীগে ইসলাম

কেন্দ্রীয় জমঈয়াতে আহলে হাদীসের সাথে মতানৈক্যের জের ধরে ১৯৮৩ সালের ১৫ জানুয়ারি জেনারেল কমিটির কিছু সদস্য বিখ্যাত আলেম মুন্তাছির আহমাদ রাহমানি (১৯২৩-১৯৮৯)-কে প্রধান করে এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে অনেক আলেম এই দলে যোগ দেন। বর্তমানে হাবীবুল্লাহ খান রাহমানী এই দলের আমীর। ঢাকার বংশালে মালিবাগ মহল্লায়, হাবীব মার্কেটের দোতলায় এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবস্থিত। প্রধানত ঢাকার আহলে হাদীস মহল্লাগুলোতেই এর প্রভাব সীমিত। এই সংগঠনটির ‘তাবলীগে ইসলাম প্রেস’ নামে একটি নিজস্ব ছাপাখানা ও ‘দাওয়াতে ইসলাম’ নামে একটি অনিয়মিত মুখপাত্র রয়েছে।

বাংলাদেশ আহলে হাদীস যুব সংঘ ও মহিলা সংস্থা

সত্তরের দশকে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পরে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। এসময় ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে, জমঈয়াতে আহলে হাদীস বাংলাদেশ-এর তৎকালীন সদস্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবির অধ্যাপক ডক্টর আসাদুল্লাহ আল গালিব, ১৯৭৮ সালে ‘বাংলাদেশ আহলে হাদীস যুব সংঘ’ ও ১৯৮১ সালে ‘বাংলাদেশ আহলে হাদীস মহিলা সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত, আহলে হাদীস আন্দোলনকে রাজনৈতিক পর্যায়ে শক্তিশালী করা এবং সামাজিকভাবে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন হিশেবে একে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এই সংগঠনগুলির লক্ষ্য।

আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ

উপরোক্ত সংগঠন দুটির কার্যক্রম কিছুটা ব্যাপক হওয়ার পরে, ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ তারিখে এই সংগঠনগুলোর মাদার সংগঠন হিশেবে ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। আত্মপ্রকাশের পরপরই এই সংগঠনটি মসজিদ, মাদ্রাসা ও এনজিওভিত্তিক একটি নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলে। এছাড়া এর নারী, যুব, ছাত্র ও শিশু শাখাও প্রতিষ্ঠা করে। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকার মিলিট্যান্টদের সাথে যোগসাজশের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে কুয়েত এবং মিডল ইস্ট থেকে ফাণ্ডিং পাওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা তিনি অস্বীকার করেন। পরে ২০০৮ সালে তিনি মুক্তি পান।

‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’ একটি সোশাল মুভমেন্ট হলেও, এর পলিটিকাল লক্ষ্যও রয়েছে। ২০০৬ সালে জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এই দলটি ‘ইনসাফ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন এবং আসন্ন নির্বাচনে ন্যূনতম ৬০টি সিটে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ১/১১-এর কারণে সেই নির্বাচন হয় ২০০৮-এ, যদিও তখন তারা আর নির্বাচনে অংশ নেয় নাই। বর্তমানে দেশের তরুণ আহলে হাদীসপন্থীদের ভেতরে এই দলের জনপ্রিয়তা রয়েছে।

আহলে হাদীস আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব

শুরু থেকেই আহলে হাদীস আলেমগণ সরকারের সাথে সুসম্পর্ক, সরকারের বিরোধিতা না করা এবং ‘গণতন্ত্র হারাম’ বলে রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষার নীতি গ্রহণ করেন। এর ফলে, মুসলিমপ্রধান দুই দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান, যেখানে রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব অনস্বীকার্য এবং বিশেষত সেক্যুলার গভমেন্টের শাসনে ধর্ম প্রায়ই গণপ্রতিরোধের ভূমিকা গ্রহণ করে, সেখানে আহলে হাদীস আন্দোলনের নেতাদের এই নীতি সমালোচনার মুখে পড়ে এবং এরই ফলে পাকিস্তানে ইহসান ইলাহি যাহীর এবং বাংলাদেশে আসাদুল্লাহ আল গালিব কর্তৃক আহলে হাদীস আন্দোলনকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুটি দল গঠিত হয়।

যদিও, ভোটের রাজনীতিতে আহলে হাদীস সংগঠনগুলো বরাবরই ব্যর্থ। পাকিস্তানে জমঈয়াতে আহলে হাদীস ২০০২-এর আগে কোন আসনেই জিততে পারে নাই। ২০০২ সালে মুত্তাহিদা মজলিসে আমালের সাথে জোট বেঁধে তারা কিছুটা সাফল্য পেলেও, তার কারণ ছিল ভিন্ন। মূলত নওয়াজ শরিফের পিএমএলের সাপোর্ট ও মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সহায়তায়ই রাজনীতিতে এই দলটিকে টিকিয়ে রেখেছে। ফলে, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে বিপ্লবী কোন ভূমিকায় এই দলটি কখনও অবতীর্ণ হতে পারে নাই।

বাংলাদেশে আহলে হাদীসদের কোন সংগঠন কখনও নির্বাচনে অংশ নেয় নাই। ফলে রাজনৈতিকভাবে তাদের প্রভাব তেমন একটা নাই। সরকারের সাথে সুসম্পর্ক রাখাই তাদের একমাত্র পলিটিকাল পাওয়ার। তবে, আসাদুল্লাহ আল গালিবের প্রতিষ্ঠিত ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন’ একমাত্র ব্যতিক্রম যারা ২০০৬-এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও পরে তারা আর অংশগ্রহণ করেন নাই।

আহলে হাদীস আন্দোলন ও মিলিট্যান্সি

বৃটিশ আমল থেকেই আহলে হাদীস আন্দোলনের নেতারা নিজেদের ‘ওহাবি’ বা ‘সালাফি’ হওয়ার ব্যাপারটিকে নাকচ করে আসছেন। কিন্তু, নব্বইয়ের দশকের পর থেকে সৌদি সরকারের অনুদান গ্রহণ এবং মিডোল ইস্টের বিভিন্ন এনজিওর সাথে যোগাযোগ তাদের ও সালফিদের মাঝে ভেদরেখা মুছে দিয়েছে। মূলত সালাফি ইসলামের আইডিওলজি থেকেই আহলে হাদীস ধারণাটির জন্ম–এ ব্যাপারে এখন সকলেই প্রায় একমত।

আহলে হাদীসগণ গণতন্ত্রকে কুফরি বলে নির্বাচন থেকে দূরে থাকলেও, কুফরি মতবাদের শাসনে থাকতে আপত্তি করেন নাই। বরং, যেকোন শাসক, যদি সে মুসলিম হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অন্যায়–এই নীতির উপরে অটল থেকে সরকারের আনুকূল্য লাভের চেষ্টা করে এসেছেন। তবে, আশি-নব্বইয়ের দশক থেকে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। রাজনীতিতে তো বটেই, এমনকি উপমহাদেশে মিলিট্যান্সির পেছনেও আহলে হাদীস আন্দোলনকে বর্তমানে দায়ী করা হচ্ছে।

পাকিস্তানে ‘তেহরিক-ই-মুজাহিদীন’ নামে জমঈয়তে আহলে হাদীসের মিলিট্যান্ট শাখা রয়েছে। এছাড়াও পাকিস্তানের বিখ্যাত মিলিট্যান্ট গ্রুপ লশকর-ই-তৈয়েবার মজলিসে জমঈয়াতে আহলে হাদীসের আমীর সাজিদ মীরকে বহুবার বক্তৃতা দিতে দেখা গেছে। এমনকি, লশকর-প্রতিষ্ঠাতা হাফিয সাইদও আহলে হাদীস মতাদর্শের অনুসারী।

বাংলাদেশে জেএমবির অনেক সদস্যই গালিব প্রতিষ্ঠিত আহলে হাদীস যুব সংঘের সাবেক সদস্য ছিলেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

শেষকথা

আহলে হাদীস আন্দোলনের ভিত যদিও পূর্বের সালাফি ও ওহাবি আন্দোলনের আদর্শের মাঝেই প্রোথিত, তথাপি সূচনালগ্নে যেকোন কারণেই হোক, এই আন্দোলনের নেতারা নিজেদের ‘সালাফি’ বা ‘ওহাবি’দের চেয়ে আলাদা ভাবতেন। মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক রফর্মেই তাদের কাজ সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে, রাজনৈতিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় এই দলটি কোন আবেদন তৈরি করতে পারে নাই। যদিও আশি ও নব্বইয়ের দশকে বিশ্বের প্রেক্ষাপটে আহলে হাদীস আন্দোলনের তরুণেরা রাজনীতি ও মিলিট্যান্সিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

আহলে হাদীস আন্দোলন মূলত ছিল সালাফিজমের উপমহাদেশীয় ভার্শন। কিন্তু বর্তমানে মেইনস্ট্রিম সালাফি মুভমেন্ট উপমহাদেশে বিভিন্নভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠায়, তরুণরা সরাসরি সালাফি মুভমেন্টের প্রতিই আগ্রহী হচ্ছে। ফলে, সালাফিজমের উপমহাদেশীয় এই ভার্শনটিকে টিকে থাকার স্বার্থে হয় সালাফিজমের সাথে মার্জ করতে হচ্ছে অথবা নতুন রাজনৈতিক প্রস্তাবনা হাজির করতে হচ্ছে। ফলে, আহলে হাদীস আন্দোলন মূলত তার সূচনালগ্নের নিছক ধর্মীয় ও সামাজিক রিফর্মের চরিত্র এবং রাজনৈতিক ব্যাপারে চুপ থাকার নীতি থেকে সরে গিয়ে গ্লোবাল সালাফিজমের সাথে একাত্ম হয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন : আহলে হাদিস আন্দোলন : সূচনা ও বিস্তার

আগের সংবাদক্যাসিনো ব্যবসা : আ. লীগের দুই নেতার বাসায় মিলল কোটি টাকাসহ ৭৩০ ভরি স্বর্ণ
পরবর্তি সংবাদজমিয়তে আবার ভাঙন : সিলেটে নতুন দলের উদ্যোগ