
রাগিব রব্বানি
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম মথুরাপুর। দারিদ্র্য-পীড়িত এলাকা। প্রতিবছর বর্ষার মৌসুমে বন্যার করাল গ্রাসকে মুকাবেলা করে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে হয় এ অঞ্চলের মানুষকে। শিক্ষাদীক্ষার খুব বেশি বন্দোবস্ত নেই। যাও আছে, তা সরকারি স্কুল কিংবা এনজিওদের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান। ধর্মীয় শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে ধর্মের জন্য আকুলতা থাকলেও এ অঞ্চলের মানুষ ধর্মের সঠিক শিক্ষা থেকে যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত।
৭০ বছর পূর্বে মথুরাপুর গ্রামে গড়ে উঠেছিল একটি ফুরকানিয়া মকতব। এই মকতবে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন দুই প্রজন্মের মানুষ। কিন্তু যা শিখেছেন, শিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে তাও ভুলে ভরা। আশপাশের এলাকার মসজিদগুলোর ইমাম-মুয়াজ্জিনের প্রাথমিক পড়াশোনাও এই ফুরকানিয়া মকতবে। তারপরে স্থানীয় আলিয়া মাদরাসায় আরও কিছুদূর পড়াশোনা করে ইমাম-মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষার যথাযথ পরিচর্যার অভাবে এসব ইমাম-মুয়াজ্জিনের তেলাওতও বিশুদ্ধ না। এমনকি জরুরি মাসআলা-মাসায়েল সম্বন্ধেও এঁরা নিতান্ত অজ্ঞ।

মথুরাপুরের ফুরকানিয়া মকতবটি বেশ কয়েক বছর ধরে পরিচালনার অভাবে বন্ধ। শিক্ষকের বেতনভাতা ও আনুষঙ্গিক খরচ যোগাতে না পারার কারণে আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার প্রত্যন্ত গ্রামের এই মাদরাসাটি পুনরায় চালু করার জন্য এবং চিরিরবন্দর অঞ্চলে ইসলামি শিক্ষার বিস্তারের লক্ষ্যে রাজধানী থেকে তরুণ আলেমদের একটি দল যান ওই এলাকায়। বেসরকারি এনজিও সংস্থা পিপলস ইমপ্রুভমেন্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মারকাযুল কুরআন আল ইসলামী বাংলাদেশের উদ্যোগে মথুরাপুরের বন্ধ হয়ে যাওয়া মকতবটিকে আবারও চালু করতে এবং এটাকে একটি মাদরাসায় রূপান্তর করে মথুরাপুরসহ আশপাশের গ্রামে দীনি শিক্ষার আলো জ্বালতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন তাঁরা।
মারকাযুল কুরআন আল ইসলামি’র চার সদস্যের এ কাফেলায় ছিলেন মারকাযের মজলিসে শুরার আমির মাওলানা ইমরান হোসাইন হাবিবী, নায়েবে আমির মাওলানা জহিরুল ইসলাম ফারুকী, সদস্য সচিব মাওলানা জাকারিয়া মাহমুদ এবং মাওলানা মাহদী হাসান।
মথুরাপুর-সহ আশপাশের চারটি মসজিদে এই চার আলেম জুমার সময় এলাকাবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। এলাকাবাসীকে বিস্তারিত জানান তাদের উদ্দেশ্যের কথা। বলেন, মথুরাপুরের ফুরকানিয়া মকতবকে একটি মাদরাসার রূপ দিয়ে মারকাযের অর্থায়নে এখান থেকেই দীনি শিক্ষার আলো জ্বালতে চান আশপাশের এলাকায়।
মাওলানা ইমরান হোসাইন হাবিবী ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, চার মসজিদে সমবেত মুসল্লিরা বিপুলভাবে সাড়া দেন তাদের এই প্রস্তাবে। এবং সীমাহীন আনন্দিত হন।
ইমরান হোসাইন হাবিবী বলেন, আমাদের এ উদ্যোগ ও উদ্দেশ্যের কথা শুনে এলাকার মানুষ আমাদের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে রাজি। এলাকার সম্পন্ন ঘরের কর্তারা আবেগপ্রবণ হয়ে বলছেন, ক’বিঘা জমি আপনাদের লাগবে, বলুন, সব আমরা দেবো। আমাদের বাচ্চাদের জন্য একটা দীনি প্রতিষ্ঠান এখানে খুবই জরুরি।
মাওলানা হাবিবী আরও বলেন, এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা শেষে আমরা যখন মকতবঘরটিতে ‘মারকাযুল কুরআন আল ইসলামী মথুরাপুর’ নামে নতুন ব্যানারটি টানানোর কথা বললাম, বিশ্বাস করবেন না, কী পরিমাণ আনন্দ বিরাজ করছিল তাদের চোখে-মুখে ! যে কথা আমাদের বলা উচিত ছিল সেটা তারাই বলেছে, বলেছে সবাই আমরা একসাথে ব্যানার ধরবো, সবাই বরকত নেবো। ব্যানার টানানোর মুহূর্ত যে এতটা আনন্দময় হবে আমি কল্পনাও করি নাই।

মাওলানা হাবিবী জানান, গ্রামবাসীর সঙ্গে সমন্বয়ের পর আপাতত শিশু থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত ক্লাস চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এবং এটা মারকাযুল কুরআন আল ইসলামি বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে ও অর্থায়নে পরিচালিত হবে। মারকাযের পক্ষ থেকেই দক্ষ কয়েকজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। আগামী রমজান থেকে হিফজ বিভাগ খোলা হবে। তারপর পর্যায়ক্রমে চাহিদার ভিত্তিতে ক্লাস বাড়ানো হবে।
এ ছাড়া এলাকার মসজিদগুলোর ইমাম-মুয়াজ্জিনের তেলাওত বিশুদ্ধকরণ এবং তাঁদেরকে সঠিক ও জরুরি মাসআলা-মাসায়েল শিক্ষাদানের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্সেরও ব্যবস্থা করা হবে মথুরাপুর মাদরাসায়।

মারকাজুল কুরআন ইতিমধ্যে এমন আরও কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এরকম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। সংস্থাটি এ দেশের ধর্মীয় সুবিধা বঞ্চিত প্রতিটা এলাকায় মাদরাসা ও ধর্মীয় শিক্ষার আলো বিস্তারে ধারাবাহিক কাজ করে যাবে বলে জানিয়েছেন মাওলানা ইমরান হোসাইন হাবিবী। এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সবার কাছে দোআও চেয়েছেন তিনি।
