জাতিসংঘে ইমরান খানের ভাষণ (ইসলামফোবিয়া অংশ)

তরজমা ও গ্রন্থনা : সাদিকুর রাহমান

(আর যাইহোক পাকিস্তান নামসর্বস্ব হলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র। প্রত্যেক নামের একটা প্রভাব থাকে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমরান খানের জাতিসংঘে প্রদত্ত এবারের ভাষণটি সে কথাই বলে। জাতিসংঘে প্রদত্ত তাঁর এ ভাষণ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একসময়ের মাঠের খেলোয়ার বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে যে দুর্দান্ত সাহসিকতা দেখালেন, তা মাঠের ছক্কা-চারের চেয়ে মোটেই কম না। সঙ্গত কারণে আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। ইমরান খান বক্তব্য করেছেন মোট ৫০ মিনিট। চারটি পয়েন্টে গোছানো বক্তব্যের পুরোটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ধারাবাহিক পয়েন্টগুলো হচ্ছে–গ্লোবাল ওয়ার্মিং, মানি লন্ডারিং, ইসলামফোবিয়া ও কাশ্মীর। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে, তৃতীয় ও চতুর্থ। ইতোমধ্যে অনেকেই বক্তব্যটি মূল ইংরেজি যুবানে শুনে নিয়েছেন। যারা শুনতে ভালোবাসেন না কিংবা ইংরেজিতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করনে, তাদের জন্যে তৃতীয় পয়েন্ট অর্থাৎ ইসলামফোবিয়া অংশের এ অনুবাদটুকু। বাকি চতুর্থ [কাশ্মীর] পয়েন্ট পরবর্তীতে ইনশাআল্লাহ। -সাদিকুর রাহমান)

আমার তৃতীয় পয়েন্টটি ইসলামফোবিয়া সম্পর্কে। বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন। পৃথবীর সবক’টি মহাদেশেই মুসলমানদের বসবাস। নাইন ইলেভেনের পর থেকে আশঙ্কাজনকভাবে ইসলামফোবিয়ার ক্রমবৃদ্ধি। এই বৃদ্ধিটা উদ্বেগজনকও বটে। শুধু উদ্বেগজনকই নয়, এটাই মূলত বিভাজন সৃষ্টি করেছে।

আশ্চর্যজনক ব্যাপার, মুসলিম মহিলাদের সাধারণ হিজাব পরাটাও আজ একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে! সাধারণ হিজাবকেও অস্ত্রের মতো দেখা হচ্ছে।

কোনও কোনও দেশের কিছু ভদ্র মহিলা তাদের গায়ের পোশাক খুলে ফেলতে পারেন, তাই বলে কি আর কেউ পোশাক পরতে পারেন না! আর কেনই-বা এমন হচ্ছে? কারণ, কিছু পশ্চিমা লিডার ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে নিয়েছেন।

উগ্রবাদী ইসলাম (Radical Islam) আবার কী? ইসলাম তো একটাই। আর সেটা হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসলাম। সেখানে আবার ইসলামফোবিয়া কেন? আমার জানতে ইচ্ছে করে, একজন আমেরিকান কীভাবে র‌্যাডিক্যাল মুসলিম ও মোডারেট মুসলিম বলে মুসলমানদেরকে ভাগ করতে পারে! আমাদের ধর্মে মোটেই এসবের কোনও সম্পর্ক নেই। বিদেশ ভ্রমণের সময় আমরা ইসলামফোবিয়ার মুখোমুখি হয়েছি। ইসলামফোবিয়া ইউরোপিয় দেশগুলোতে মুসলমানদেরকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। আর এ পরিস্থিতি উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আমার বক্তব্য হলো, আমাদেরকে অবশ্যই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। নাইন ইলেভেনের পর র‌্যাডিক্যাল ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। মুসলিম নেতৃবৃন্দ পশ্চিমা নেতাদের বার বার বুঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, র‌্যাডিক্যাল ইসলাম বলে আদৌ কিছু নেই।

সব সমাজেই কট্টরপন্থী রয়েছে। কিন্তু করুণা ও ন্যায়বিচার সব ধর্মের মূল কথা। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের মুসলিম নেতৃবৃন্দ এ ব্যাখ্যা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা মুসলিম বিশ্বকেও ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছি যে র‌্যাডিক্যাল ইসলাম বলে কিছু নেই। একসময় পাকিস্তানে আমরা ঝড়ের কবলে ছিলাম এবং আমাদের সরকার enlightened moderation নামে একটি স্লোগান তৈরি করেছিলেন।

যেহেতু নাইন ইলেভেনের হামলাকারীরা আত্মঘাতী ছিল, সঙ্গত কারণে আত্মঘাতী হামলা সম্পর্কেও একটু বলা দরকার। নাইন ইলেভেনের ব্যাপারটি ছিল অনেকটা স্বর্গীয় কুমারীর মতো। নাইন ইলেভেনের এই উদ্ভট ঘটনাটি ঘটেছিল আত্মঘাতী হামলার ইসলামিকরণের জন্যে। তামিল টাইগার আর জাপানের কামিকাজে বোমারু নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। তারা যখন আত্মঘাতী হামলা করে, তখন আর কেউ ধর্মকে দোষে না। হ্যাঁ, এটা সত্য যে, কোনও ধর্মই সহিংসতার শিক্ষা দেয় না।

পশ্চিমাদের ইসলামফোবিয়ার কারণ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধান আছে। আমি পশ্চিমের দেশগুলোতে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি ক্রিকেট খেলে। পশ্চিমাদের মন-মানস কীভাবে কাজ করে, তা আমি ভালো করে জানি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো, ইসলামফোবিয়ার অন্যতম কারণ ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত সেই বই। যেখানে জঘন্য ভাষায় নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়েছিল।

পশ্চিমারা আসল সমস্যা বুঝতে পারলেন না। কেননা, ইসলাম সম্পর্কে তাদের গভীর অনুধাবন নেই। ইসলামের শান্তি-সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল নয়। তাই ইসলাম তাদের কাছে একটি উগ্র, সাম্প্রদায়িক ও মারমুখো অসহিষ্ণু ধর্মের নাম।

দুই-তিন বছর পর পর কেউ একজন নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেন আর আমরা মুসলমানরা আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে শান্তিপূর্ণভাবে এর ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ করি। এ প্রতিবাদই আবার পশ্চিমাদের কাছে হয়ে ওঠে উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা! এটাই মুসলমানদের কপাল!

পশ্চিমের সবাই খারাপ অথবা সবাই ভালো এটা বলা যাবে না। খারাপের সংখ্যা নেহায়েত সামান্য। এই সামান্য সংখ্যক খারাপ লোকই মুসলমানদের উস্কে দেওয়ার জন্যে দায়ী। আমি তাদেরকেই দায়ী করবো।

আমাদের মহানবি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন আদর্শ মানব, মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের বাস্তব নমুনা। আমরা কেবল তাঁর আদর্শে বেঁচে থাকতে চাই। রাসুল মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যাকে বলে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র।

আমি ইসলাম সম্পর্কে এমন অদ্ভুত বিষয় শুনেছি, যা ইসলাম সম্পর্কে নির্ঘাত মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই না। ইসলাম নাকি নারীবিরোধী, সংখ্যালঘুবিরোধী। অথচ, মদিনা রাষ্ট্রই সর্বপ্রথম নারী, অসহায় ও বিধবার দায়িত্ব গ্রহণ করে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। মদিনা রাষ্ট্র ঘোষণা করে ছিল, কালো-ধলো সকল মানুষ একসমান। রাসুল ঘোষণা করেছিলেন, সবচেয়ে ভালো কাজ হচ্ছে দাসকে মুক্ত করা। কারও দাস-দাসী থাকলে তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের মতো আচরণ করুন। রাসুলের এ ঘোষণার ফলে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল। দাসরা রাজা হয়ে গেলেন। এমনকি দাসদের রাজবংশও তৈরি হয়ে গেল।

সংখ্যালঘুসহ সকল ধর্মের ধর্মীয় উপাসনাঘর রক্ষা করাও ইসলামি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলি রাযি. যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে একজন সাধারণ ইহুদি নাগরিকের কাছে মামলায় হেরে গেলন। নিরপেক্ষ আদালত মামলার রায় দেন ইহুদি নাগরিকের পক্ষে। এটাই ইসলাম। যেখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কোনও মুসলিম সম্প্রদায় যখন সংখ্যালঘুদের প্রতি অবিচার করেন, তখন সেটা আমাদের ধর্মের শিক্ষার বিরুদ্ধে যায়।

আমাদের মহানবি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের হৃদয়ে বাস করেন। যখন তাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়, তখন আমাদের হৃদয়ে আঘাত লাগে। ব্যথা অনুভব করি। যে ব্যথা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। একসময় মনের ব্যথা দেহে ভর করে। মুসলমানরা তখনই কেবল প্রতিবাদের ভাষায় প্রতিবাদ করেন।

আমি সবসময় এ বিষয় নিয়ে ভাবতাম যে, কখনও যদি আমার এমন পরিবেশে কথা বলার সুযোগ হয়, তখন আমি ইসলাম সম্পর্কে বিশ্বকে এ বার্তাটিই দেব।

পশ্চিমা সমাজে হলোকাস্টকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সরঙ্গ বিবেচনা করা হয়। কেননা, এর অবমাননা ইহুদি সম্প্রদায়কে আঘাত করে। আমরা আমাদের নবির ক্ষেত্রেও একই শ্রদ্ধার আবেদন করি। দয়াকরে আমাদের নবিকে কটাক্ষ করে আমাদের অনুভূতিতে আঘাত করবেন না। এটাই আমাদের অনুরোধ।

চতুর্থ পয়েন্ট পড়ুন : জাতিসংঘে ইমরান খানের ভাষণ (কাশ্মীর ইস্যু)

সাদিকুর রাহমান : গবেষক ও ক্রিটিক, সিলেট

আগের সংবাদঅক্টোবরে পাকিস্তান সফরে আসছেন এরদোগান
পরবর্তি সংবাদ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান দেয়া রাবি উপাচার্যের বহিষ্কার চাইলেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী