
রাকিবুল হাসান :
গত ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল একেপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ দাউদ উগলু। এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর একেপির কার্যনির্বাহী কমিটির সভা থেকে দাউদ উগলুকে বহিষ্কারের সুপারিশ তদন্ত কমিটিতে পাঠানো হয়। সাধারণত তদন্ত কমিটি সুপারিশ পর্যবেক্ষণ করে বাদী এবং বিবাদী দু’পক্ষকেই ডাকে। বিবাদী এখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়। বিবাদীর স্পষ্ট মতামত জানার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ কথা সুস্পষ্ট—প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের ইঙ্গিত কিংবা মতামত ছাড়া এই সিদ্ধান্ত কখনোই নেয়া যেত না। কারণ, দাউদ উগলু একেপির শুধুই সাধারণ একজন সদস্য নন, বরং তিনি একজন মুসলিম রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। এরদোগানকে আধুনিক তুরস্কের স্থপতি বলা হলে, দাউদ উগলুকে তাঁর পররাষ্ট্রনীতির স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার বলতে হয়। আধুনিক তুরস্কের বর্তমান বহুমুখী ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি তাঁর দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এদিকে গুঞ্জন উঠেছে—বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও একেপির সহ-প্রতিষ্ঠাতা আলী বাবাজান একটি নতুন দল প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন। ঠিক এই সময়ে দাউদ উগলু’র পদত্যাগ গুঞ্জনটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাহলে দাউদ উগলু কি আলী বাবাজানের নতুন দলে যোগ দেবেন নাকি নিজেই নতুন আরেকটি দলের জন্ম দেবেন?
এতটুকু স্পষ্ট—তুরস্কের রাজনৈতিক মানচিত্রটি নতুন করে আঁকা হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নও উঠে, একেপির দলছুট নেতারা নতুন দল গঠন করে কতটুকু সফল হতে পারবেন? লড়াইয়ের ময়দানে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব এড়িয়ে কতদিন টিকে থাকতে পারবেন?
বিভক্তি কেন বাড়ছে?
গত দু’বছর ধরে একেপির সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। ২০১৭ সালে দেশটির পরিচালনা-পদ্ধতি সংসদীয় সিস্টেম থেকে রাষ্ট্রপতি সিস্টেমে পরিবর্তন করার লক্ষ্যে আমূল সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে গণভোটে যাওয়ার পর থেকেই মূলত একেপির অভ্যন্তরীণ বিভেদগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। একেপির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন, সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল্লাহ গুল (২০০৭-২০১৪) এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী দাউদ উগলু (২০১৪-১০১৬) রাষ্ট্রপতি সিস্টেমের বিরোধিতা করেননি। বরং তাঁরা প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। তাতে রাষ্ট্রপতি সিস্টেমের কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তাঁদের প্রস্তাবিত ধারাগুলো সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো থেকে একটু আলাদা ছিল। কিন্তু এরদোগান এই প্রস্তাবনা মানেননি। পরিবর্তে সংবিধানের সংশোধিত খসড়াই অনুসরণ করেন।
২০১৮-এর জুলাইয়ে তুরস্ক পরিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রপতি শাসিত দেশ হয়ে ওঠে। এরদোগান নতুন করে ঘোষণা করেন সরকার। যদিও এই সরকার দলের কোনো কোনো সদস্যের সমর্থন পায়নি। বিশেষ করে আব্দুল্লাহ গুল এবং দাউদ উগলু’র। নতুন সরকার ঘোষণা করার কয়েক মাস পরই যখন অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দিলো, তখন আব্দুল্লাহ গুল, আলী বাবাজান এবং দাউদ উগলু শুধু অর্থনীতি নয় বরং সরকার এবং দলের বিপক্ষেই অবস্থান নেন। এতে করে বিভক্তি আরও প্রকট হয়। ২০১৯-এর ৩১ মার্চে পৌরসভা নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দলের সাথে জোট বাঁধার পরও হ্রাস পায় একেপির ভোট।
এরপর এপ্রিলের শেষে দাউদ উগলু নির্বাচনে একেপির পতন সম্পর্কে মন্তব্য করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে একেপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে একে একে মূল্যবোধ ব্যবস্থার অবনতি, দলীয় সংগঠনগুলোর চারপাশে সঙ্কুচিত সামাজিক বৃত্ত, দল ও তৃণমূলের মধ্যে আস্থার ক্রমবর্ধমান সঙ্কট, নতুন রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থার কাঠামোসহ আরো কয়েকটি বিষয়ে সমালোচনা করেন। বিবৃতিটি আসলে এরদোগান এবং দাউদ উগলু’র মানসিক বৈপরীত্যকেই প্রতিফলিত করে।
নতুন দলগুলোর সামর্থ্য কতটুকু?
শুরুতে মনে হয়েছিল আলী বাবাজান, আব্দুল্লাহ গুল এবং দাউদ উগলু একসাথে কাজ করছেন। কিন্তু পরে স্পষ্ট হয়েছে তাঁদের একেকজনের দৃষ্টিভঙ্গি একেকরকম। তাঁদের প্রত্যেকের পথ ও মত আলাদা। দুটি দল সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা এখানে।
প্রথম দলে আছেন আলী বাবাজান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বশির আটলাই, সাবেক আইনমন্ত্রী সা’দুদ্দীন ইরজিন, সাবেক শিল্পমন্ত্রী নিহাদ ইরজিন এবং সাংবিধানিক আদালতের সাবেক প্রধান হাশিম ক্লিটস। এই দলটি সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল্লাহ গুল-সমর্থিত। ২০১৯-এর জুলাইয়ে আলী বাবাকান একেপি ছেড়ে আসার পর অন্যরাও একের পর এক ছেড়ে দেয়।
দলটির ঘনিষ্ঠসূত্রে জানা গেছে, এঁদের অধিকাংশ সদস্য যদিও ইসলামি ধারার জন্য পরিচিত ছিলেন, কিন্তু তাঁরা ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ না করে নতুন রক্ষণশীল দল গঠন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। পেছন থেকে আব্দুল্লাহ গুল কলকাঠি নাড়লেও এর নেতৃত্ব দেবার কথা রয়েছে আলী বাবাজানের। দলের নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশল গঠনের লক্ষ্যে জুলাই মাস থেকেই ছোট ছোট সভা করে আসছে দলটি।
তবে দলটি বিরোধী রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন পরিসরে ভাবতে চেষ্টা করবে। কিন্তু দলটি দেশের জন্য বিকল্প সংস্কার প্রকল্প গ্রহণ করবে না। বরং কেবল আব্দুল্লাহ গুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাহন হিসেবে কাজ করবে। এরা প্রাণপণে চাইবে এরদোগানের যুগ এবং তাঁর আধিপত্যের অবসান ঘটাতে।
আর দ্বিতীয় দলের নেতৃত্বে আছেন দাউদ উগলু। তিনি দলটিকে কেবল ক্ষমতায় আরোহণের বাহন হিসেবে দেখছেন না, বরং দেশটির বিকল্প সংস্কার পরিকল্পনা করছেন। ২০১৯-এর এপ্রিলের শেষে এক বিবৃতিতে বিষয়টি তিনি স্পষ্ট করেছিলেন।
প্রথম দলে যাঁরা আছেন, তাঁরা সকলেই একেপির প্রবীণ নেতা। তাঁরা নতুন দলকে রাজনৈতিক বৈধতা সরবরাহ করতে পারবেন। তবে তাঁরা কিন্তু দলীয় ক্যাডার এবং কর্মী নন, যাঁদের ওপর ভিত্তি করে টেকসই দলীয় সংগঠন তৈরি করা যেতে পারে। অপরদিকে দ্বিতীয় দলের প্রধান দাউদ উগলু’র সাথে একেপির কোনো নেতা বা প্রতিষ্ঠাতা আছেন, এমন কোনো তথ্য এখন অবধি পাওয়া যায়নি। তবে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী আছেন, যাঁদের ওপর ভিত্তি করে দলীয় সংগঠন তৈরি করা যেতে পারে। কিন্তু তাঁরা রাজনৈতিক ফিগার ও ওজনদার ব্যক্তিত্বের অভাবে জনসাধারণের যথেষ্ট সমর্থন না-ও পেতে পারেন।
দু’দলেরই কমতি আছে। এই কমতি সত্ত্বেও তাঁরা টিকে থাকতে পারবেন কিনা—এই প্রশ্নের জবাবে এখনই বলা মুশকিল। কারণ এই মুহূর্তটি ২০০১ সালে একেপির নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তখনও তুরস্কের ইসলামপন্থী ধারার নেতা নাজমুদ্দীন আরবাকানের দল থেকে কিছু নেতা বেরিয়ে গিয়েছিলেন, যাঁরা পরবর্তীতে একেপি গঠন করেছেন। তাঁদের সঙ্গে আরও অনেক নেতা এবং কর্মীও দল থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ফলত আরবাকান ডুবে গিয়েছিলেন। এরপর একেপি একটু একটু করে ক্ষমতায় আরোহণ করে প্রায় দু’দশক কাটিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং বিভক্ত হয়ে যাওয়া নেতাদের একেবারেই উপেক্ষা করা যায় না।
শেষকথা
২০০১ সালে একেপির জন্ম। ২০০২ সালে সংসদ নির্বাচনে তার বিজয়। একেপি সংসদীয়, স্থানীয়, পৌরসভা সব রাউন্ডে জিতেছিল। সেই থেকে একের পর এক সরকারগুলোতে একেপি কেবল বিস্তৃত পুনরুজ্জীবন প্রকল্প হাতে নেয়নি, বরং রাজনৈতিক মানচিত্রকে স্থিতিশীল করে তুলেছিল। যা দীর্ঘদিন ধরে অস্থির, অস্থিতিশীল ছিল। দলটি এখনও জনগণের ব্যাপক সমর্থন, শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ দলের সংগঠন এবং ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বসহ টিকে আছে ক্ষমতায়। সুতরাং খণ্ডিত দুটি দল কতটা জনসমর্থন আদায় করতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
একটি কথা অস্বীকার করা যায় না, সর্বশেষ নির্বাচনে ব্যর্থতা ও নেতাদের বিভক্তি আরও একটি রাজনৈতিক পালাবদলের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলতে শুরু করেছে তুরস্কে। তবে পরবর্তী সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২৩ সালের আগে আর হচ্ছে না। এই চার বছরে একেপির নিজেদের সমস্যাগুলো সমাধান করার পর্যাপ্ত সময় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক বিভক্তির ফলে যে অস্থিতিশীলতা ঘটতে পারে, তার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারে কেবল রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন ব্যবস্থা। কিন্তু এই রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই জনপ্রিয় কোনো আন্দোলন গড়ে উঠবে কিনা, তা বলা যায় না।
যা-ই হোক না কেন, এই বিভক্তি ও বিতর্ক তুর্কি রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা ক্রান্তিকাল হিসেবেই হাজির হয়েছে। সম্ভাবনা এখন অনেক কিছুর। কী ঘটবে তা সময়ই বলে দেবে।
আল জাজিরা অবলম্বনে
