জাতিসংঘে ইমরান খানের ভাষণ (কাশ্মীর ইস্যু)

গ্রন্থনা ও তরজমা : সাদিকুর রাহমান

(আর যাইহোক পাকিস্তান নামসর্বস্ব হলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র। প্রত্যেক নামের একটা প্রভাব থাকে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমরান খানের জাতিসংঘে প্রদত্ত এবারের ভাষণটি সে কথাই বলে। জাতিসংঘে প্রদত্ত তাঁর এ ভাষণ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একসময়ের মাঠের খেলোয়ার বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে যে দুর্দান্ত সাহসিকতা দেখালেন, তা মাঠের ছক্কা-চারের চেয়ে মোটেই কম না। সঙ্গত কারণে আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। ইমরান খান বক্তব্য করেছেন মোট ৫০ মিনিট। চারটি পয়েন্টে গোছানো বক্তব্যের পুরোটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ধারাবাহিক পয়েন্টগুলো হচ্ছে–গ্লোবাল ওয়ার্মিং, মানি লন্ডারিং, ইসলামফোবিয়া ও কাশ্মীর। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে, তৃতীয় ও চতুর্থ। ইতোমধ্যে অনেকেই বক্তব্যটি মূল ইংরেজি যুবানে শুনে নিয়েছেন। যারা শুনতে ভালোবাসেন না কিংবা ইংরেজিতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তাদের জন্যে এই অনুবাদ। তৃতীয় পয়েন্ট অর্থাৎ ইসলামফোবিয়া অংশের অনুবাদ ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে (পড়ুন : জাতিসংঘে ইমরান খানের ভাষণ (ইসলামফোবিয়া অংশ)। আজ চতুর্থ [কাশ্মীর] পয়েন্টের অনুবাদটুকু তুলে ধরা হলো। -সাদিকুর রাহমান)

এখন আমি কাশ্মীর প্রসঙ্গে যেতে চাই। আমরা ক্ষমতায় আসার পর সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছি শান্তি প্রতিষ্ঠাকে। আমরা চেয়েছি, পাকিস্তান হোক বিশ্বের বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণকারী শান্তিপ্রিয় দেশ। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যোগ দিয়ে পাকিস্তান একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময়টা পাকিস্তানের জন্যে মোটেই ভালো ছিল না, সেটা ছিল সবচেয়ে খারাপ সময়। সে যুদ্ধে আমরা আমাদের ৭০ হাজার তরতাজা প্রাণ হারিয়েছি। তাঁর সঙ্গে হারিয়েছে আমাদের ১৫০ বিলিয়ন ডলার অর্থও।

আমরা ১৯৮০ সনে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হই। আমেরিকার নির্দেশে পাকিস্তান আফগান মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এই মুজাহিদদেরকে তখন সোভিয়েত বলতো সন্ত্রাসী আর আমেরিকা বলতো মুক্তিযোদ্ধা। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলো, বিজয় হলো আমেরিকার। কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার যুদ্ধ। আবার ধ্বংস, আবার হত্যা। বিশ্ব দেখল নাইন ইলেভেনের আবির্ভাব। আমরাও আবার সেই বলির পাটা হলাম। যোগ দিতে হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। আমাদের বলা হলো, আফগান তালেবান ও আল-কায়দাকে আর মুক্তিযোদ্ধা বলা যাবে না, ওরা সন্ত্রাসী। কিছুদন আগে যারা মুক্তযোদ্ধা ছিল, সময়ের ব্যবধানে তারাই হয়ে গেল সন্ত্রাসী!

আফগান মুজাহিদরা ভেবেছিলেন আমারা তাদের সহযোগী, কিন্তু হঠাৎ আমরা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলাম। তারাও আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলেন। অথচ, মাত্র কিছুদিন আগে আমরা তাদের সহযোগী বন্ধু ছিলাম।

যুদ্ধের ফলে ৭০ হাজার পাকিস্তানি প্রাণ হারালেন। অথচ, এ যুদ্ধে পাকিস্তানের কোনও সম্পর্ক বা স্বার্থ ছিল না। এমনকি নাইন ইলেভেনের ঘটনার সঙ্গেও কোনও পাকিস্তানি জড়িত ছিল না। এসব কারণে আমরা ক্ষমতায় আসার পর সন্ত্রাস প্রতিরোধের সিদ্ধন্ত গ্রহণ করি। এবং এ সিদ্ধান্তে সকল রাজনৈতিক দল একমত।

আমি শুনেছি, ইন্ডিয়া বলছে আমার নাকি জঙ্গি সংগঠন আছে। আমি জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক টিমকে পাকিস্তানে স্বাগত জানাই, আপনারা এসে নিজেরাই সেটা যাচাই করুন। দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের সীমান্ত-সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছি। কেননা, ভৌগোলিকভাবে আমরা আফগান, ইরান ও ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আজকে আমি এখানে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা বলব। ভারত উপমহাদেশে ক্রিকেটের প্রতি মানুষের প্রচন্ডরকমের আবেগ রয়েছে। এই ক্রিকেটের কারণে ভারতে আমার অনেক বন্ধু আছেন। আমিও সবসময় ভারতে যেতে পছন্দ করি।

সরকার গঠনের পর আমার প্রথম পদক্ষেপ ছিল প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে একটি আন্তরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। এজন্যে আমি নরেন্দ্র মোদিকে এই বলে বার্তা পাঠাই যে, আসুন, আমরা অতীতকে পেছনে ফেলে পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে আনি। সবার আগে আমরা আমাদের জনগণের অধিকারকে প্রাধান্য দিই। ভারত ও পাকিস্তানের সমস্যাও এক–দারিদ্র ও জলবায়ু পরিবর্তন। কেননা, এ উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক লোকের বসবাস। কিন্তু ভারত থেকে কোনও সাড়া পেলাম না। মনে মনে ভাবলাম, বিজেপি তো একটি জাতীয়তাবাদী দল। সুতরাং সামনের নির্বাচনের আগপর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা দরকার।

অপেক্ষার প্রহর আর নির্বাচন পর্যন্ত প্রলম্বিত হলো না, সাড়া আসলো। তখন সাড়া আসলো, যখন কাশ্মীরের এক উগ্রপন্থী ছোকড়া ভারতীয় বাহিনির উপর বোমা হামলা করে বসলো। এ হামলার জন্যে পাকিস্তানকে দায়ী করতে ভারত এক মুহূর্তও দেরি করল না। আমি ভারতকে বললাম–আপনারা প্রমাণ দিন, আমি এর বিহিত ব্যবস্থা নেব। ভারত প্রমাণ দিতে পারল না। অথচ আমাদের বেলুচিস্তানে কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে ভারতের জড়িত থাকার প্রমাণ আমার কাছে আছে। এমনকি আমরা তাদের গুপ্তচর কুলভূষণ যাদবকেও ধরেছি, যে নিজের মুখে গুপ্তচরবৃত্তির কথা স্বীকার করেছে।

পুলওয়ামায় হামলার সঙ্গেও কোনও পাকিস্তানি জড়িত থাকার প্রমাণ ভারত দিতে পারেনি। উল্টো তারা আমাদেরকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার কোশেশ করে। আমরাও আচ্ছামত পাল্টা জবাব দিয়েছি। একেবারে বুঝিয়ে দিয়েছি, কত ধানে কত চাল। তাদের পাইলটকে বন্দী করেছি। চাইলে রাখতে পারতাম। কিন্তু রাখিনি। পরের দিনই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি। কেননা, পরিস্থিতি আরও খারাপ হোক সেটা আমরা চাইনি।

এই ঘটনার পর মোদির নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন সংযোজন ঘটল। মোদি তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় পাকিস্তানকে নিয়ে ট্রল করতে শুরু করলেন। পাকিস্তান সীমান্তে তাদের বিমান হামলার দিকে ইঙ্গিত করে বলতে লাগলেন, ‘এটা তো ট্রেইলর মাত্র। সিনেমা এখনও আসেনি।’ আমরা তখনও ভাবলাম নির্বাচনের পরে হয়তো আমাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্ত সেটা আর হলো না। যেই লাউ, সে কদু।

নির্বাচনের পরে দেখলাম, ইন্ডিয়া আমাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে কোনঠাসা করার জন্যে পাকিস্তানকে এফএটিএফ-এ কালো তালিকাভূক্ত করবার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠছে।

এরপরে ভারত ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে। কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর সংখ্যা বাড়ায় এবং ৮ মিলিয়ন লোককে কারফিউ জারির মাধ্যমে বন্দী করে।

মি. প্রেসিডেন্ট, আমি আপনাদের সামনে আরএসএসকে একটু পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। মি. মোদি যে আরএসএস-এর জীবনসদস্য, সে আরএসএস হিটলার ও মোসলনির দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন। নাৎসিরা যেভাবে আর্য জাতির আধিপত্যে বিশ্বাসী ছিল, আরএসএসও তেমনিভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী।

এটি মুসলমান ও খ্র্রিস্টানদের জন্য বিব্রতকর। আরএসএস মনে করে হিন্দু ধর্মের স্বর্ণযুগের অবসান হয়েছে মুসলিম শাসনের মাধ্যমে। তারা মুসলমান ও খ্রিস্টানদেরকে প্রকাশ্যে গালমন্দ করে। এসব কোনও গোপন তথ্য নয়, প্রকাশিত সত্য। আপনি চাইলে ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগলে সার্চ করে গোলওয়ালকারের মতো আরএসএসের প্রতিষ্ঠাকালীন গডফাদারকে যাচাই করে দেখতে পারেন। আরএসএসের এই ঘৃণার আদর্শ মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছিল। নরেন্দ্র মোদিকে বলা হয়, গোজরাটের কসাই। নরেন্দ্র মোদি গোজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর নেতৃত্বে ২০০২ সালে আরএসএস গুন্ডাবাহিনী ২ হাজার মুসলমানকে কসাইয়ের মতো জবাই করেছিল। এর কারণ একটাই–আরএসএস-এর ঘৃণার আদর্শ। মুসলিমবিরোধী সহিংসতার রাজনীতি। কংগ্রেস এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে বলেছিল, আরএসএস-এর ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রসীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এসব কারণে মোদির আমেরিকা সফরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল খুদ মার্কিন প্রশাসন।

কোন ধরণের মানসিকতা থাকলে পরে ৮ মিলিয়ন সাধারণ মানুষকে বন্দী করে রাখা যায়? যেখানে অসহায় নারী থেকে শুরু করে নীরিহ শিশু ও অসুস্থ মানুষও রয়েছে। পশ্চিমাদের মানবিকতা সম্পর্কে আমি জানি। তারা ৮ মিলিয়ন মানুষ কেন, ৮ মিলিয়ন প্রাণীকেও এভাবে বন্দী করে রাখবে না। ওরা মানুষ। আমার মনে হয়, অহংকার প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তাঁর বিজেপিকে অন্ধ করে দিয়েছে। কাশ্মীর থেকে কারফিউ উঠিয়ে দেওয়ার পর এই জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তার কী হবে মনে হয়?

আপনারা ভাবছেন, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর কাশ্মীরিরা নতুন একটি স্থীতিশীল পরিস্থিতিকে স্বাগত জানাবে। ১ লাখ কাশ্মীরি নিহত হয়েছে। হাজার হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ বিষয়ে জাতিসংঘ একটি প্রতিবেদনও তৈরি করেছে। তারপরেও বিশ্বমোড়লেরা নীরব। মোড়লরা কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাতে রাজি নন। উল্টো ভারতে তারা তাদের বাজার তৈরিতে ব্যস্ত। বস্তুবাদ ও পুঁজিবাদের কাছে ভোগ আর মুনাফাই মুখ্য। মানবতা কেবলই তুচ্ছ, নেহায়েত গৌণ।

একবারও কি ভাবছেন, কাশ্মীর থেকে কারফিউ উঠিয়ে নেওয়ার পর কী হবে? মোদি জানিয়েছেন, কাশ্মীরের ভালোর জন্যে ৩৭০ অনুচ্ছেদকে বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু ৮ মিলিয়ন মানুষ যখন অবরোধ থেকে বেরিয়ে এসে ৯ লক্ষ সৈন্যের মুখোমুখি হবে, তথন পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? আমি আশঙ্কাবোধ করছি, কাশ্মীরে তখন রক্তের বন্যা বইবে। কাশ্মীরারা খাঁচার ভেতরের পশুর মতো আজ তাদের ঘরে বন্দী। তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রেফতার। এমনকি ইন্ডিয়ার সমর্থকদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৩ হাজার যুবককে তুলে নেওয়া হয়েছে। তাদেরকে বন্দী করে রাখা হয়েছে অজ্ঞাত স্থানে। শত শত তরুণী ভারতীয় সেনাদের গুলিতে অন্ধত্ববরণ করেছে। এসব নির্যাতন কাশ্মীরকে কেবল উগ্রতার দিকেই নিয়ে যাবে।

আমরা পুলওয়ামায় নতুন আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা করছি। যার দায়ভার ভারত আবারও পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পাকিস্তান সীমান্তে ৫০০ সন্ত্রাসী হামলার জন্যে প্রহর গুণছে। আমি জানতে চাই, মাত্র ৫০০ সন্ত্রাসী ০ দশমিক ৯ মিলিয়ন সৈন্যের বিরুদ্ধে কী করবে? ভারত আসলে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের প্রপাগান্ডা তৈরির জন্যে কেবল একটি অজুহাত দাঁড় করাতে চায়। কথিত ইসলামি সন্ত্রাসবাদের অনেক সুবিধা আছে। এই ইসলামি সন্ত্রাসবাদের সনদ ভারতকে মানবাধিকার লঙ্গন ও কাশ্মীরিদের উপর নিষ্ঠুরতার বৈধতা প্রধান করে!

আমরা খামোখা কেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অশান্ত করতে যাব? কিন্তু প্রতিবেশী ভারত আমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। এমন কোনও ঘটনা নাই, যা ভারত ঘটায়নি। কাশ্মীরে তাদের নিষ্ঠুরতার কারণে খুব শিগগির আরও একটি পুলওয়ামার ঘটনা ঘটবে। আর তারা আমাদেরকে আবারও দোষ দেবে এবং আবারও বোমা ফেলার চেষ্টা করবে।

আপনি কি একবারও এটা ভাবেন না যে, ৮০ মিলিয়ন কাশ্মীরিকে অবরুদ্ধ দেখতে দেখতে একদিন ভারতের ১৮০ মিলিয়ন মুসলমান ভ্রাতৃত্বের টানে মারমুখো হয়ে উঠতে পারে? আর প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মুসলমান এইসব ঘটনা দেখছেন। এবং তারা এটা ভালো করেই জানেন যে, কেবল কাশ্মীরি মুসলমানদের সঙ্গেই এমন নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে।

বিশ্বের কোথাও যদি মাত্র ৮ হাজার ইহুদি এভাবে অবরুদ্ধ হয়, ইহুদিদের প্রতিক্রিয়া তখন কেমন হবে? ইউরোপীয়রা তখন এর প্রতিবাদ কোন ভাষায় জানাবে? এ ছাড়া অন্যান্য মানবগোষ্ঠী কীভাবে এর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে? শুধু মুসলমানদের বেলায় কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। কেন, আমরা কি কোনও কম জাতের সন্তান? আপনারা কি বুঝেন না এসব বৈষম্য যে আমাদেরকে আহত করে, বেদনা জাগায়?

আমরা ফিল্ম দেখে দেখে বড় হয়েছি। ফিল্ম-এ দেখেছি, ভালো মানুষ কখনও ন্যায়বিচার পায় না। ফলে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে ভালো মানুষগুলো বাধ্য হয়ে অস্ত্র হাতে নেয়। আর এভাবে সিনেমাগুলো ভালো মানুষগুলোকে অস্ত্র হাতে নিতে শেখায়। মুসলিমবিশ্বে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনাগুলোর ব্যাপারে বিশ্বনেতারা কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন? আমি নিজেকে কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতিতে কল্পনা করছি। যেখানে আমাকে ৫০ দিন ধরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ভারতীয় সেনারা ঘরে মা-বোনদের ধর্ষণ করছে। এমন লাঞ্ছনা নিয়ে কি আমি বেঁচে থাকতে পারি?

আপনি মানুষকে উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। মানুষ যখন বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলে, তখনই অস্ত্র হাতে নেয়। ‘ডেথ উইশ’ (মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা) নামক একটি চলচিত্রে দেখানো হয়েছে, একটি ছেলে কীভাবে বন্দুক তুলে নিয়ে ছিনতাইকারীদের হত্যা করতে শুরু করে। আপনি জনগণের সঙ্গে জোরজবরদস্তি করছেন, আপনি জোর করে জনগণকে নির্ঘাত উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। আপনি যদি জনগণের সঙ্গে এভাবে অন্যায় জোরজবরদস্তি করতে থাকেন, তাহলে প্রকৃতপক্ষে আপনিই তাদেরকে উগ্রবাদী করে তুলছেন।

এটি একটি কঠিন সময়। কিছু একটা ঘটলেই পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া হবে। ফেব্রুয়ারিতে দুটি পারমানবিক শক্তিমান দেশ প্রায় যুদ্ধের মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। সঙ্গত কারণে জাতিসংঘের কিছু করণীয় আছে। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এ কারণেই।

আমার মনে হয়, আমরা আবারও ১৯৩৯-এ ফিরে গেছি। মিউনিখ ও চেকস্লোভাকিয়া গ্রহণ করেছে। বিশ্ব-সম্প্রদায়গুলো কী করতে যাচ্ছে? তারা ১ দশমিক ২ বিলিয়নের বাজার সম্পসারণে ব্যস্ত! তারা কি ন্যায়বিচার ও মানবতার পাশে দাঁড়াবে না? যদি দুটি পারমানবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে, তাহলে মারাত্মক কিছু ঘটে যেতে পারে। মনে করুন, কোনও একটি রাষ্ট্র তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে ৭ গুণ ছোট। তারপরেও তার শক্তি প্রদর্শনের এখতিয়ার আছে। আপনি হয় আত্মসমর্পণ করুন, না হয় আমরণ লড়ে যাওয়ার শপথ নিন।

আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, এমন পরিস্থিতিতে আমি কী করবো? আমি বিশ্বাস করি, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনও উপাস্য নেই। সুতরাং আমি নির্ভয়। আমি যুদ্ধ করবো। আমি এখানে পারমানবিক যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছি না, শুধু সতর্ক করছি। যদি দুটি পারমানবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে, তবে এটা সীমানা অতিক্রম করবে। আমি এখানে এ কথাগুলো বলার জন্যেই এসেছি। এটি জাতিসংঘেরে জন্যে একটি পরীক্ষা। কাশ্মীরি জনগণের অধিকারের নিশ্চয়তা প্রধানের দায়িত্ব এ জাতিসংঘের। এটি ১৯৩৯ সালের মিউনিখের মতো নীরবতার সময় নয়। এখন জাতিসংঘের উচিৎ, ভারতকে কাশ্মীর থেকে কারফিউ প্রত্যাহারে বাধ্য করা। অজ্ঞাত স্থানে বন্দী করে রাখা সেই ১৩ হাজার যুবককে মুক্ত করা এবং কাশ্মীরি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা।

সাদিকুর রাহমান : গবেষক ও ক্রিটিক, সিলেট

আগের সংবাদনিজের গায়ে আগুন দেয়া কলেজছাত্রী লিজা রহমানের মৃত্যু
পরবর্তি সংবাদইউরোপে কেন বাড়ছে ইসলামফোবিয়া