উপমহাদেশের দুই কিংবদন্তির প্রয়াণ দিবস

মুজিব হাসান :

আজ ৬ অক্টোবর। উপমহাদেশের দুই কিংবদন্তির প্রয়াণ দিবস। একজন মাওলানা আতহার আলি রহ.। আরেকজন মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.। যুগশ্রেষ্ঠ দুই মহাপুরুষ। দুজনই যুগশ্রেষ্ঠ। তাঁদের সময়ের সেরা মনীষা। একজন মুজাহিদে মিল্লাত, আরেকজন মুফতিয়ে আজম। তাঁরা নিজেদের মধ্যে সময়কে ধারণ করতে পেরেছিলেন। কর্ম ও কীর্তির গুণে উজ্বল করেছেন নিজ নিজ শতাব্দী। দুজনই ছিলেন হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলি থানভি রহ. এর হাতেগড়া শিষ্য। তাঁর আজাল্লে খলিফা। ছিলেন ইমামুল আসর আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহ. এর সরাসরি ছাত্র। তাঁর সোহবতে ধন্য। এ হিসেবে তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। দারুণ প্রীতির। তাছাড়া দুজনই ছিলেন আপাদমস্তক দেওবন্দি। দারুল উলুমের সূর্যসন্তান। আকাবিরে দেওবন্দের আদর্শে আদর্শবান। তাঁদের সুযোগ্য উত্তরসূরি।

তাঁদের উৎসস্থল ছিল এক, বিচরণক্ষেত্র অভিন্ন। মননে বিশ্বাসে ছিলেন একমুখি চেতনার অধিকারী। হজরত থানভির রাজনৈতিক চিন্তাধারার উত্তরসূরি। নিজ মুরশিদের নির্দেশে দুজনই শরিক হয়েছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানি রহ., মাওলানা জাফর আহমদ উসমানি রহ. প্রমুখের সাথে। উলামায়ে কেরামের অসীম ত্যাগ-তিতিক্ষায় প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান। একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র। তখন মুরশিদের নির্দেশমতো একজন হলেন রাজনৈতিক নেতা ও আধ্যাত্মিক গুরু। আরেকজন জাতীয় বিচারক ও ধর্মীয় উপদেষ্টা। দুজনই ছিলেন দেশ ও জাতির একনিষ্ঠ সেবক। একজন পূর্ব পাকিস্তান, আরেকজন পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থান নিয়ে করে যেতে লাগলেন রাষ্ট্র পরিচালনা, সমাজসেবা এবং দীনের খেদমত। কিন্তু পাকিস্তানের নেতারা যখন তাদের নীতি থেকে সরে দাঁড়াল, আদর্শের বিপরীতে অবস্থান নিল, তখন দুজনই সোচ্চার হয়ে উঠেলন। তাদের এ অনৈতিকতার বিরুদ্ধে শুরু করলেন প্রতিবাদ। একজন রাজনীতির ময়দানে, আরেকজন দরসের মসনদে। বক্তৃতায়, লিখনিতে দিতে লাগলেন সঠিক নির্দেশনা।

মুহাম্মাদ শফী উসমানীর চিত্র.jpg
মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.

মাঠে-ময়দানে দুজনে ছিলেন অভিন্ন, ব্যক্তিজীবনেও অনন্য। দুজনের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। শ্রদ্ধা ও প্রীতি ভরা। বয়সের দিক দিয়ে মুফতি শফি রহ. ছিলেন ছোট। মাওলানা আতহার আলি রহ. তাঁর থেকে সাত বছরের বড়। কিন্তু দুজনের মধ্যে মান্যতা ছিল প্রচুর। অতি সাধারণ কাজেও মাওলানা আতহার আলি রহ. মুফতি শফি রহ. এর নিকট চিঠির মাধ্যমে পরামর্শ চেয়ে নিতেন। তাঁর সিদ্ধান্তকে খুব মূল্যায়ন করতেন। শরিয়তের কোনো জটিল বিষয়ে মুফতি শফি রহ. এর নিকট ফতোয়া তলব করতেন। সঠিক বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর খুব দৃঢ়ভাবে সেটা কার্যকর করতেন।

Related image
মাওলানা আতহার আলি রহ.

মাওলানা আতহার আলি রহ. বিভিন্ন উপলক্ষে মুফতি শফি রহ. কে দাওয়াত করতেন। তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে মুফতি শফি রহ. পাকিস্তান আমলে প্রতিবছরই কিশোরগঞ্জ আসতেন। তখন মাওলানা আতহার আলি রহ. তাঁর থাকার ব্যবস্থা করতেন শহিদি মসজিদের দোতলায় নিজের একান্ত ইবাদতগাহটিকে। তাঁর ব্যক্তিগত খাদেমকে নিয়োজিত করতেন মুফতি সাহেবের খেদমতে। রাজনৈতিক কারণে মাওলানা আতহার আলি রহ. কে প্রায়ই পশ্চিম পাকিস্তান যেতে হত। তখন মাঝেমধ্যে মুফতি সাহেব রহ. প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম করাচিতে অবস্থান নিতেন। বিশেষ উপলক্ষে তিনিও মাওলানা সাহেবকে দাওয়াত করতেন। কোনো সভা-সমাবেশ বা ওয়াজ মাহফিলে দুজন একসঙ্গে উপস্থিত হলে, মাওলানা আতহার আলি রহ. থাকতেন প্রধান অতিথি আর মুফতি শফি রহ. সভাপতি। কখনো এর বিপরীতও হত। শোনা যায়, হজরত থানভি রহ. এর ইন্তেকালের পর মুফতি শফি রহ. মাওলানা আতহার আলি রহ. এর নিকট বায়আত হয়েছিলেন।

এমনই দুই মহাপুরুষের প্রয়াণ দিবস আজ। থানভি-গগণের দুই প্রদীপ্ত সূর্য। উপমহাদেশের আকাশে যাঁদের আবির্ভাব হয়েছিল একই সময়ে। একই কক্ষপথে যাঁরা ছিলেন সমান জাজ্বল্যমান। ১৯৭৬ সালের ৬ অক্টোবর আজকের এই দিনে একই সময়ে হয়েছিল তাঁদের মহাপ্রয়াণ।

রাহিমাহুমাল্লা ! ওয়ারাফাআ দারাজাতাহুমা ! আল্লাহ তাঁদের উপর রহম করুন ! তাঁদের মর্যাদা উঁচু করুন !

আগের সংবাদসিলেট দরগাহ মাদরাসার শতাধিক ছাত্র অসুস্থ, আইসিউতে ২
পরবর্তি সংবাদআরব দেশগুলোর সঙ্গে আগ্রাসনবিরোধী চুক্তি করতে চায় ইসরাইল