আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড, ইসলামপন্থীদের প্রতিক্রিয়া

মুজিব হাসান :

আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল বাংলাদেশ। এই প্রতিবাদ ছাত্র-শিক্ষক, আলেম-উলামা, রাজনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক মহলের কণ্ঠে কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়েছে আগুনের মতো। বুকের ভেতর জমে থাকা এতদিনের ক্ষোভ আবরার যেন দেশলাই হয়ে জ্বালিয়ে দিলো। মাঠে-ময়দানে, সড়কে-মহাসড়কে, কলেজে-ক্যাম্পাসে আবরার হত্যার বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ।

আবরার হত্যার এই প্রতিবাদ মিছিলে পিছিয়ে নেই আলেম-উলমাগণও। কেউ বক্তৃতায়, কেউ বিবৃতিতে, কেউ মিছিলে, কেউ মিম্বরে আবরার হত্যার প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন। এতে ইসলামি রাজনৈতিক দল যেমন প্রতিবাদ জানিয়েছে, তেমনি রাজনীতির বাইরের আলেমগণও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যদিও সংখ্যায় অল্প সেই প্রতিবাদের সংখ্যা। ৭ তারিখ সোমবার পুরো দেশ উত্তাল হয়ে উঠলেও এদিন আলেমদের থেকে তেমন প্রতিক্রিয়া আসেনি। ৮ তারিখ মঙ্গলবার সবাই মুখ খুলতে শুরু করেছে। কেউ বিবৃতিতে, কেউ মিছিলে।

আলেমদের প্রতিক্রিয়া

৭ অক্টোবর সোমবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন খেলাফত মজলিসের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের। বিবৃতিতে তারা বলেন, ভারতের সাথে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তির প্রতিবাদ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার পরেই আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থের পক্ষে কথা বলার কণ্ঠকে স্তদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের অপকর্ম থামছেই না। একের পর এক হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজির ঘটনা চালিয়ে যাচ্ছে। বুয়েটের মত প্রতিষ্ঠানের আবাসিক হল থেকে একজন ছাত্রকে ধরে নিয়ে হলের ভেতরেই নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দেশবাসী স্তম্ভিত। এ হত্যার সাথে জড়িত সকল খুনীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ারও আহ্বান জানান তারা।

৮ অক্টোবর, মঙ্গলবার বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস ঢাকা মহানগরের উদ্যোগে আবরার হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করে।

সোমবার বিকেলে ভোলা সরকারী স্কুল মাঠে ইসলামী আন্দোলনের জনসভায় আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে হত্যা করার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এবং ইসলামী আন্দোলনের এ যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। এছাড়াও ৯ অক্টোবর বুধবার বিকেলে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ মিছিল করে দলটির কর্মীরা।

৮ অক্টোবর সংবাদ মাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এ হত্যার ঘটনায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারকে যেভাবে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তা পশুত্বকেও হার মানিয়েছে। আবরার যদি বাস্তবেই দোষী হয়ে থাকে, তাহলে দেশীয় আইনে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হত। কিন্তু তা না করে জানোয়ারে মতো পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এটা চরম অমানবিক আচরণের শামিল।আমরা আবরার হত্যার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার জোর দাবি জানাই।

৮ অক্টোবর সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আবরার ফাহাদ হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছাত্রনামধারী সন্ত্রাসীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগর-এর সেক্রেটারী ও ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী। একই দিনে এক বিবৃতিতে আবরার হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা এবং অবিলম্বে হত্যাকারীদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী। তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে এই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেও আহ্বান জানান।

ইসলামি ঐক্যজোটের সাংগঠিনক সম্পাদক মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন তার ব্যক্তিগত এক মতামতে বলেছেন, দেশে যে কেবল আবরার একাই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার, বিষয়টি এমন নয়। বরং পিটিয়ে, কুপিয়ে, পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা দেশে অহরহ ঘটছে। আবরার হত্যাকাণ্ড ধারাবাহিক যুলুমের প্রকাশ হয়ে যাওয়া একটি ঘটনা। কিছুদিন পর পর কেবল নাম পরিবর্তন হয় এবং জাতি মানুষ মারার নিত্যনতুন কৌশল সম্পর্কে জানতে পারে। দেশে যে চলমান বিচারহীনতা তা যতদিন থাকবে ততদিন অভিনব হত্যার ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আন্দোলনে কেবল একবার নুসরাতের নাম আসবে, একবার রিফাত শরিফের নাম নেওয়া হবে আর একবার আবরার নাম আসবে। বিদ্যমান রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও শাসনযন্ত্র যে কতটা ভঙ্গুর-আবরার হত্যাকাণ্ড চোঁখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল।

৮ অক্টোবর মঙ্গলবার আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সেই সঙ্গে আবরারের খুনি ছাত্রলীগ নেতাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কারকে আইওয়াশ বলে দাবি করেছে দলটি। সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এ ঘটনার নিন্দা জানানোর কোনো ভাষা নেই। আবরার ফাহাদের মত নিরীহ নিরপরাধ মেধাবী ছাত্রকে হত্যার মাধ্যমে ছাত্রলীগ প্রমাণ করেছে যে, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জান-মালের কোনো নিরাপত্তা নেই।’

শেষকথা

বিবৃতিতে সবাই সরব হলেও বিক্ষোভ মিছিল করেছে খেলাফত ছাত্র মজলিশ এবং ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন। বিভিন্ন জেলায় এরাই মাঠে নেমেছে বিচারের দাবি নিয়ে। এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়—এমন একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানো শুধুই কি ইসলামি দলগুলোর কর্তব্য নাকি অন্যান্যদের ওপরও বর্তায়। একটা দাবি বেগবান হয় অনেকগুলো কণ্ঠস্বরের আওয়াজে। আবরার হত্যার প্রতিবাদে কতটুকু কণ্ঠ আলেমগণ দিয়েছেন, তা এই কয়েকটা বিবৃতির দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

আগের সংবাদআবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিক্রিয়া : ছবির ভাষায়
পরবর্তি সংবাদআবরার হত্যাকাণ্ড : মিডিয়া যেভাবে উপস্থাপন করেছে