
হামমাদ রাগিব :
জাগ্রত কবি মুহিব খান। সম্প্রতি ভক্তদের কেউ কেউ ভালোবেসে ‘আল্লামা’ও ব্যবহার করেন তাঁর নামের শুরুতে। যেন-বা হালের আল্লামা ইকবাল। হ্যাঁ, আল্লামা ইকবালেরই অনেকটা প্রতিচ্ছায়া ভেসে ওঠে তাঁর গান ও কবিতায়। সেই সঙ্গে পাওয়া যায় আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্রোহ ও জাগরণীর ঝংকার। দুই ভাষার এ দুই মুসলিম কিংবদন্তি কবির ছাপ যে তাঁর কবিতা ও গানে পরিস্ফুটিত, তা জাগ্রত কবি নিজেও স্বীকার করেন। কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে কবি স্বমহিমায় ভাস্বর। তাঁর কবিতা ও গানের স্বতন্ত্র একটি চেতনা ও ধারা তিনি তৈরি করে নিয়েছেন নিজের মতো করে। এবং এই ধারাটি কবির একান্ত নিজস্ব ও আনকোরা।
তাঁর প্রতিটা কবিতা ও গানে ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা থাকে। গানে গানে তিনি ছড়িয়ে দেন বিশেষ এক চেতনা। যে চেতনা বিশুদ্ধ ও শাশ্বত বিধানের ঐশিজলে বিধৌত। বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ এখান থেকে প্রেরণা ও আলো গ্রহণ করেন। অনেকের চেতনার প্রথম পাঠ শুরু হয় জাগ্রত কবির কবিতা ও গানের ঝংকারে। এবং মুহিব খানকে তাঁরা নিজেদের আইডল হিসেবে গ্রহণ করে নেন নিজের অজান্তেই।
একজন কবি ও সঙ্গীতশিল্পী হিসেবেই মুহিব খানের মূল খ্যাতি। এ দেশের তরুণরা তাঁকে এ পরিচয়েই চেনে। কিন্তু অ্যাকাডেমিকভাবে মুহিব খান কওমি ঘরানা থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত একজন মেধাবী ও চিন্তক আলেম। তারপরের পরিচয় তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে বিশেষ পড়াশোনা করেছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হবার কারণেই কি-না জানি না, তিনি সম্প্রতি রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছেন। বছর দুয়েক আগে ন্যাশনাল মুভমেন্ট নামে স্বতন্ত্র একটি দলও গড়েছেন। দলের গঠনতন্ত্র, কাঠামো এবং বক্তব্যের প্রতি খেয়াল করলে মুহিব খানের মেধা ও চিন্তার উচ্চমার্গীয়তা সম্পর্কে খানিকটা ধারণা পাওয়া যায়। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি যে যথার্থ ও পারফেক্ট তাঁর দলের এই দিকগুলো লক্ষ করলেই বোঝা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি কতটা সফল হবেন, সেটা হলো ভাবনার বিষয়।
মুহিব খান প্রায়ই বলেন, তাঁর প্রতিটা গান ও কবিতায় একেকটা দর্শন পুঁতে দেন তিনি। প্রতিটা গানেই তাই আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে, থাকে স্বতন্ত্র বার্তা। তাঁর গান যাঁরা এতদিন শুনে এসেছেন, গানে গানে ছড়ানো তাঁর দর্শন, বিশিষ্টতা ও বার্তাগুলো তাঁরা জেনে হোক কিংবা আপনার অজান্তে, নিশ্চয় হৃদয়ঙ্গম করে ফেলেছেন। তিনি দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে ‘দিন বদলের গান’ শুনিয়েছেন বাংলার তরুণ-যুবাদেরকে, শুনিয়েছেন ‘নতুন দিনের ইশতেহার’। ইশতেহার অনুযায়ী তাই এখন ‘দিন বদলের’ কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার সময় এসেছে। বছর দুয়েক আগে ন্যাশনাল মুভমেন্ট গঠনের প্রস্তুতি যখন প্রায় সম্পন্ন, ঘরোয়া এক আলাপচারিতায় এমনটাই শুনেছিলাম কবির মুখ থেকে।
কিন্তু তরুণ-যুবা-নবীন, যাঁরা তাঁকে শোনেন, পাঠ করেন ও ভালোবাসেন, তাঁরা কতটুকু সাড়া দিয়েছেন তাঁর এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়? বছর দুয়েক পার হয়ে গেছে, আমরা কিন্তু সেভাবে কোনো সাড়া লক্ষ করিনি এঁদের তরফ থেকে। এটা ঠিক কী কারণে, কবির কর্মপ্রক্রিয়ার ধীর গতি, না অন্য কোনো হেতু আছে এর পেছনে, বলতে পারছি না। তবে দেশের নানা প্রান্তের বেশ কিছু তরুণ ও নবীনের সঙ্গে আলাপ করে বুঝেছি, তাঁদের সিংহ ভাগই মুহিব খানকে একজন কবি ও সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে দেখতে বেশি আগ্রহী। রাজনৈতিক মাঠে যদিও দক্ষ ও সৎ নেতৃত্বের তুমুল সংকট এবং মুহিব খান যদিও নেতৃত্বের সব গুণাগুণে সমৃদ্ধ, কিন্তু বিদ্যমান সংকট এতোটাই সংকটপূর্ণ যে, তা মুকাবেলা করা বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় মুহিব খানের মতো নতুন রাজনীতিবিদের জন্য অনেকটা অসম্ভব। তাই মুহিব খানকে রাজনীতির মারপ্যাঁচে ছেড়ে দিয়ে নতুন ও অভিনব পদ্ধতির জাগরণী চেতনাসমৃদ্ধ গান ও কবিতা থেকে বঞ্চিত থাকতে চান না মুহিব খানের অধিকাংশ তরুণ ভক্তশ্রেণি।
মুহিব খানের ৪০তম জন্মদিন আজ। জন্মদিনে কবি’র জন্য অনিঃশেষ শুভ কামনা।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, ফাতেহ
