ভোলা হত্যাকাণ্ড : প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন

রাগিব রব্বানি : 

হিন্দু যুবকের ফেসবুক আইডি থেকে ইসলাম ও মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে অশালীন ভাষায় কটূক্তির প্রতিবাদে গতকাল রোববার ভোলার বুরহানুদ্দিনে স্থানীয় ঈদগাহ মসজিদ মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে পুলিশের গুলি, আক্রমণ ও বেশ কয়েকজন মুসল্লির শাহাদাতের ঘটনার বিস্তারিত জানতে চেয়ে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর থেকে কথা হয়েছে স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে।

ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে তাঁরা বলছেন, ইসলাম ও মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে হিন্দু যুবকের কটূক্তির প্রতিবাদ জানাতে বুরহানুদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্ধ লক্ষেরও বেশি মানুষ গতকাল জমায়েত হয়েছিলেন বুরহানুদ্দিন ঈদগাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে। তাঁরা মূলত শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদের জন্যই এসেছিলেন। কিন্তু পুলিশ সমাবেশ পূর্ণভাবে শেষ করতে বাধা দিলে সমবেত তৌহিদি জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ অ্যাকশনে যায়।

সমাবেশের আয়োজন হয়েছিল যেভাবে

বুরহানুদ্দিনের সাচড়া মাহমুদিয়া মাদরাসা দরুন বাজারের প্রধান শিক্ষক মাওলানা রিয়াজ মাহমুদ, যিনি গতকালের সমাবেশ আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামক হিন্দু ছেলেটির ফেসবুকে ইসলাম ও মহানবিকে নিয়ে কটূক্তির বিষয়টি শনিবার সারা উপজেলায় জানাজানি হলে এবং একটা প্রতিবাদমুখরতা ছড়িয়ে পড়লে উপজেলার শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ ছেলেটিকে গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে রোববার বেলা ১১টায় ঈদগাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ আহ্বান করেন। শনিবার সন্ধ্যায় সেই সমাবেশের অনুমতি নিতে থানায় গেলে পুলিশ তাঁদেরকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কথা বলে অনুমতি দিতে চায়নি। একই সঙ্গে হিন্দু ছেলেটির আইডি হ্যাক হয়েছে এবং তদন্তের জন্য তাকে পুলিশের কাস্টোডিতে রাখা হয়েছে বলেও তাদেরকে নিশ্চিত করে পুলিশ।

‘কিন্তু সমাবেশের আহ্বায়ক আলেমরা পুলিশকে অনুরোধ করে বলেন, সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়ে গেছে, ইতিমধ্যে সারা উপজেলায় এ সংবাদ পৌঁছে গেছে, এখন এটা স্থগিত করলেও মানুষজনকে থামানো যাবে না। তাই আগামীকাল লোকজন সমবেত হলে ছেলেটির আইডি হ্যাক ও তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সবাইকে অবগত করে সমাবেশ সমাপ্ত করে দেওয়া হবে। পুলিশ আলেমদের এ কথায় সম্মতি জানায়।’ বলছিলেন মাদরাসা-শিক্ষক রিয়াজ মাহমুদ।

লোকসমাগম ছিল আয়োজকদের কল্পনার বাইরে

রোববার সকাল থেকেই যথামাফিক ঈদগাহ মসজিদ মাঠে দলে দলে মানুষজনের সমাগম ঘটে। রিয়াজ মাহমুদ বলেন, আমরা কল্পনাও করতে পারি নাই এত লোকের সমাগম ঘটবে। সমাবেশের সময় ছিল দুপুর ১১টা, কিন্তু ১০টার দিকেই ঈদগাহ মাঠ লোকারণ্যে পরিণত হয়। প্রায় অর্ধ লক্ষেরও বেশি মানুষের উপস্থিতি ছিল।

তিনি বলেন, ঈদগাহ মাঠ মানুষজনে ভরে গেলেও যেহেতু সমাবেশের সময় নির্ধারিত ছিল ১১টায় তাই মানুষজন তখনও দলে দলে আসছিল। এদিকে পুলিশ অফিসাররা মানুষজনের উপস্থিতি দেখে সমাবেশের নেতৃস্থানীয়দেরকে বলেন এখনই সমাবেশ সমাপ্ত করে দিতে। পুলিশের বড় একজন অফিসার এ সময় বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যের পর মোনাজাতের মাধ্যমে সাড়ে দশটার দিকে সমাবেশ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু পূর্বঘোষণা অনুযায়ী যেহেতু সমাবেশের সময় এখনও শুরু হয় নাই, মানুষজন তখনও দলে দলে আসছিল, তাই মোনাজাতের পর যারা সমাবেশে ঢুকছিল, তারা সময়ের আগেই সমাবেশ সমাপ্তি মেনে নিতে পারছিল না বলে জানান রিয়াজ মাহমুদ।

প্রথম হামলা কারা করেছে, জনতা নাকি পুলিশ?

রিয়াজ মাহমুদ জানান, ঈদগাহ মসজিদের যে মাঠটি, তার একপাশে মসজিদ আর ওপর পাশে একটি হাই স্কুল। সমাবেশ সমাপ্ত ঘোষিত হবার পর ওলামায়ে কেরাম ও মাদরাসাছাত্ররা মাঠ ছেড়ে মসজিদে চলে আসেন। পুলিশ উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে তখন মাঠে অবস্থান করছিল। এমন সময় স্কুলের দিকে থাকা একদল তরুণ বয়েসি ছেলে হঠাৎ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়তে শুরু করে।

রিয়াজ মাহমুদ বলেন, সংঘর্ষের সূত্রপাত এখান থেকেই। কে বা কারা পুলিশের ওপর এরকম আক্রমণ করছে আমরা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সমাবেশের নেতৃত্বে যে আলেমরা ছিলেন তারা মসজিদের মাইক থেকে পুলিশের ওপর আক্রমণ না করার জন্য অনুরোধ করে আসছিলেন বারবার। কিন্তু ততক্ষণে পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করেছে।

পুলিশ প্রথমে টিয়ারসেল নিক্ষেপ করেছে নাকি গুলি করেছে, জানতে চাইলে রিয়াজ বলেন, তখন তাদের কাছে টিয়ারসেল ছিলই না। গুলি করেছে প্রথমে। টিয়ারসেল এসেছে অনেক পরে।

আক্রমণের এই সময়টায় মাঠে ছিলেন আলামিন মাওলানা নামে এক মাদরাসা-শিক্ষক। তিনি পশ্চিম দরুন মাদরাসার শিক্ষক। গতকালের সংঘর্ষে এই মাওলানাও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তিনি সমাবেশ সমাপ্ত হবার পর মাঠে ঢুকেছিলেন। সংঘর্ষের সূত্রপাত বিষয়ে তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, হিন্দু ছেলেটির কুশপুত্তলিকা নিয়ে এসেছিল একদল লোক। তারাও সমাবেশ সমাপ্ত হবার পর মাঠে ঢুকেছে। মাঠে ঢুকে সমাবেশ সমাপ্ত শুনে তারা শ্লোগান দিতে থাকে এবং কুশপুত্তলিকাটাকে জুতা দিয়ে পিটিয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। এ সময় পুলিশ এসে তাদের ওপর লাঠি চার্জ করতে শুরু করে। তখনই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশকে হাতের জুতা দিয়ে পেটাতে শুরু করে। পুলিশ তৎক্ষণাত খানিকটা দূরে চলে যায় এবং তাদেরকে লক্ষ্য করে শুরু করে গুলি বর্ষণ।

পুলিশের রুদ্ররূপ : আশ্রয়দাতাদেরকেই আক্রমণ

এদিকে মাওলানা রিয়াজ মাহমুদ জানান, পুলিশ প্রথম দফা গুলি চালানোর পর তাদের গুলি শেষ হয়ে যায়। তখন তারা উত্তেজিত জনতার রোষানল থেকে বাঁচতে মসজিদের দুতলায় আশ্রয় নেয়। দুতলায় থাকা আলেম ও ছাত্ররা তখন তাদেরকে নিরাপত্তা দেন এবং একটি কক্ষে নিয়ে যান। কিছুক্ষণের মধ্যে সাদা পোষাকে নতুন একদল পুলিশ থানা থেকে গুলি ও টিয়ারসেল নিয়ে তাদের কাছে আসেন। আর তখনই তাদের রূপ পাল্টে যায়। এতক্ষণ যারা উত্তেজিত জনতার হাত থেকে তাদেরকে নিরাপত্তা দিচ্ছিল, তাদেরকে হুমকি দিয়ে এখনই মসজিদ ত্যাগ করার নির্দেশ দেয় এবং বাইরে থাকা উত্তেজিত জনতার দিকে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে। মসজিদে থাকা আলেম ও ছাত্রদের ওপরও তারা আক্রমণ করে। এ সময় স্থানীয় ওয়ায়েজ আলেম হাবিবুর রহমান আল জাবেরি গুলিবিদ্ধ হন।

রিয়াজ বলেন, পুলিশের এই রুদ্ররূপ দেখে আমরা সঙ্গে সঙ্গেই মসজিদ ত্যাগ করি। তারপরও অনেকে পুলিশের আক্রমণের শিকার হয়েছি।

স্থানীয় গ্রাম-পুলিশের ভাষ্য

মসজিদের দুতলা থেকে পুলিশ যখন গুলি করছিল, মাঠের একপাশে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাচড়া ৯ নং ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ আলামিন। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, পুলিশ নির্বিচারে গুলি করছিল, মাঠ থেকে কোনদিকে বেরোবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম ভয়ার্তভাবে। আমার পাশে ১৪-১৫ বছরের একটা মাদরাসাছাত্রও দাঁড়িয়ে ছিল। সেও বোধহয় আমার মতো কিংকর্তব্য বিমূঢ় ছিল। কোনদিকে মাঠ থেকে বেরোবে খুঁজে পাচ্ছিল না। এমন সময় হঠাৎ দেখি পরপর দুটো গুলি এসে তার মাথায় বিদ্ধ হয়েছে। ছেলেটি তৎক্ষনাৎ দাঁড়ানো থেকে পড়ে গেছে। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে তার মাথা থেকে। আমি তখন আরও ভয় পেয়ে যাই এবং নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য পেছনের দেয়াল টপকে দৌড়ে পালিয়ে আসি। তিনি বলেন, ছেলেটি তৎক্ষণাতই মারা গেছে।

মাদরাসা-শিক্ষক রিয়াজ মাহমুদ জানান, পুলিশ নির্বিচার গুলি চালালে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে মাঠ খালি হয়ে যায়। মানুষজন জীবন বাঁচাতে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিল, পুলিশ ছুটন্ত মানুষের ওপরও হামলা করেছে। আহত হয়ে মানুষ হাসপাতালের দিকে ছুটে যাচ্ছিল, পুলিশ হাসপাতালের সামনে গিয়েও মানুষজনকে পেটাচ্ছিল।

তিনি বলেন, অনেক সংবাদমাধ্যম প্রচার করেছে থানায় হামলা করেছে জনতা, অথচ থানায় কোনো হামলা হয়নি। পুলিশের রুদ্ররূপ দেখে মানুষজন নিজেদের জীবন বাঁচানোতেই ব্যস্ত ছিল, থানায় হামলা করবে কীভাবে।

স্থানীয়দের দাবি নিহতের সংখ্যা আরও বেশি

বুরহানুদ্দিনের স্থানীয় সাংবাদিক কালাম খানের সঙ্গেও কথা হয় ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের। তিনি বলেন, গতকালের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক এবং প্রশ্নবিদ্ধ। তৌহিদি জনতা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাতে এসেছিল। তাদের হাতে কোনো লাঠিসোঁটা বা অস্ত্র ছিল না। পুলিশি বাধার কারণে তারা উত্তেজিত হয়েছে। তাদের উত্তেজনা প্রশমনে গুলি চালানোর কোনো দরকার ছিল না। এই যে এতগুলো প্রাণ ঝরে গেল, এর দায় কে নেবে? মানুষের জীবন কি এতই সস্তা?

কালাম খান বলেন, পুলিশ ৪ জন নিহত হবার কথা বলছে, অথচ আমরা জানতে পারছি নিহতের সংখ্যা আরও বেশি। সকাল থেকে বেশ কয়েক মারফতে ১৩ জন নিহত হবার খবর আমাদের কাছে এসেছে। গতকালের ঘটনায় জনতাকে দোষারোপ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে, এখানকার বাস্তবতা কেউই তুলে আনার চেষ্টা করছেন না। নিরস্ত্র জনতাকে এভাবে নির্বিচারে গুলি করে প্রতিহত করা কতটা ন্যায়সঙ্গত?

তিনি বলেন, বিজিবি মোতায়েনের কারণে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত আছে এখন। কিন্তু এখানকার প্রতিটা মানুষের মধ্যেই পুলিশের গতকালের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে তুমুল ক্ষোভ কাজ করছে।

এদিকে গতকালের এ ঘটনায় রাতে পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৫ হাজার মুসল্লির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। ইতিমধ্যেই ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্থানীয় আলেম ও তৌহিদি জনতার অনেকেই গ্রেপ্তারের ভয়ে এখন আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান মাদরাসা শিক্ষক রিয়াজ মাহমুদ। রিয়াজ মাহমুদ বলেন, গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি নিজেও এখন আত্মগোপনে আছেন। কারণ, মামলা হয়েছে অজ্ঞাতনামা পাঁচ হাজারের বিরুদ্ধে, যেকোনো অজুহাতে যেকোনো সময় যে-কেউ গ্রেপ্তারের আশংকা রয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য

এদিকে গতকাল রোববার রাতে পুলিশের সদর দপ্তর থেকে গতকালের ঘটনা নিয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে বিজ্ঞপ্তিটিতে গতকালের পুরো ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাখ্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার বেশ কিছু অমিল রয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা ঈদগাহ মাঠে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশসহ সাধারণ মানুষের হতাহতের ঘটনায় পুলিশ সমবেদনা জ্ঞাপন করছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিষয়ে যেকোনো প্রকার বিভ্রান্তি এড়াতে পুলিশ সদর দফতর প্রকৃত ঘটনাটি জনসমক্ষে তুলে ধরার প্রয়োজন মনে করছে।’

এর পর সেখানে বলা হয়, ‘গত ১৮ অক্টোবর নিজ ফেসবুক আইডি হ্যাক হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য (২৫) ওরফে শুভ নামে এক যুবক রাত ৮টা ৫ মিনিটে ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন থানায় জিডি করেন, যার জিডি নং-৪৪০। জিডি করার সময় থানায় অবস্থানের সময়েই বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের নম্বরে একটি কল আসে এবং তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়।

‘বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ওসিকে জানান। ওসি বিষয়টি ভোলা জেলার পুলিশ সুপারকে জানান। প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে সেদিন রাতের মধ্যেই বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাককারী ও তার মোবাইলে কলকারী শরিফ এবং ইমন নামে দুই মুসলিম যুবককে পটুয়াখালী এবং বোরহানউদ্দিন থেকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের বোরহানউদ্দিন থানায় নেয়া হয়।

‘ইতোমধ্যে শুভর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া কথিত ‘কমেন্টের’ জেরে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা উত্তেজিত হতে থাকেন। ফেসবুকে ধর্মীয় মন্তব্যের অভিযোগে মন্তব্যকারীর ফাঁসি দাবি করেন স্থানীয় আলেম সমাজ।

‘বোরহানউদ্দিন উপজেলা সদরের ঈদগাহ মাঠে রোববার বেলা ১১টায় তারা প্রতিবাদসভার ঘোষণা দেয়। এ ঘোষণার কথা শুনলে শনিবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বোরহানউদ্দিন থানায় জেলা প্রশাসক, ইউএনও, থানার অফিসার ইনচার্জ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ আলেম সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে দীর্ঘ সময় বিষয়টি আলোচনা করে পুলিশ।

‘আলেম সমাজের অভিযোগের ভিত্তিতে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যকে আটক দেখানো হয়। এ বিষয়ে উপযুক্ত আইনিব্যবস্থা গ্রহণের নিশ্চয়তা পেয়ে প্রতিনিধিত্বকারী আলেম সমাজ তাদের পূর্বঘোষিত প্রতিবাদ কর্মসূচি বাতিলের ঘোষণা দেন।’

পুলিশ সদর দফতরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘সমাবেশ বাতিলের ঘোষণা সত্ত্বেও পুলিশ সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকে। পর দিন সকাল থেকেই কিছু লোক ঈদগাহ ময়দানে সমবেত হতে থাকেন। ময়দানের বিভিন্ন পয়েন্টে বসানোর জন্য ১৭টি মাইক নিয়ে আসা হয়।

‘যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সমবেত লোকজনকে সরিয়ে নিতে বললে উপস্থিত আলেমরা নিশ্চিত করেন, লোকজন কোনো রকম বিশৃঙ্খলা করবে না।

‘এরই মধ্যে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে স্থানীয় পুলিশকে সহায়তা দিতে সকালেই বরিশাল থেকে রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি ভোলায় যান।

‘অতিরিক্ত ডিআইজি ও ইউএনওকে নিয়ে পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা করে প্রয়োজনীয় সব আইনিব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়ে তাদের শ্বস্ত করেন। তাদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে সমবেত লোকজন ঈদগাহ ময়দান ত্যাগ করেন।

‘উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য শেষে পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত ডিআইজিসহ অন্য কর্মকর্তারা মাদ্রাসার একটি কক্ষে অবস্থান নেন। এরই ধ্যে অন্য একটি গ্রুপ ঈদগাহ ময়দানে প্রবেশ করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে উত্তেজিত করতে থাকেন। এর পর একদল লোক বিনা উসকানিতে মাদ্রাসার অফিসকক্ষে অবস্থানরত কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণ করেন।

‘আক্রমণকারীদের একদল আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুলিশ ও অন্যান্য কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ চালান। আক্রমণকারীদের গুলিতে ও হামলায় বরিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজিসহ পুলিশের তিন সদস্য মারাত্মক আহত হন। এমন পরিস্থিতিতে ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে আত্মরক্ষার্থে ও সরকারি জানমাল রক্ষার্থে ও উত্তেজিত লোকজনকে নিবৃত্ত করার জন্য প্রথমে টিয়ারশেল ও পরে শটগান চালায় পুলিশ।

‘পরিস্থিতির ভয়াবহতা বেড়ে গেলে একপর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়। আক্রমণকারীদের গুলিতে মারাত্মক আহত পুলিশ সদস্যকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার সিএমএইচে স্থানাস্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত চারজনের মধ্যে অন্তত দুজনের মাথা ভোঁতা অস্ত্র দ্বারা থেঁতলানো বলে নিশ্চিত করেছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।’

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে ডিআইজি বরিশাল রেঞ্জকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, এসবি, পিবিআই এবং জেলা পুলিশ থেকে একজন করে মোট চারজন কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিকে সাত কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।’

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘সার্বিক ঘটনা পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, পুলিশ ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে শুরু থেকে তৎপর থাকা সত্ত্বেও এবং আলেম সমাজ পুলিশের গৃহীত ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রেখে কর্মসূচি স্থগিত করলেও কোনো একটি স্বার্থান্বেষী মহল ধর্মকে পুঁজি করে একটি সামাজিক অস্থিরতা তৈরির অপপ্রয়াস চালিয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনাস্থলসহ সারা দেশে পুলিশকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।’

আগের সংবাদভোলার ঘটনায় দেশব্যাপী হেফাজতের ৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা
পরবর্তি সংবাদরেস্টুরেন্টে খাসি বলে শেয়ালের মাংস বিক্রি : আটক ২