শিক্ষক হিসেবে যেমন ছিলেন মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল

(মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রাজনীতি ও লেখালেখির পাশাপাশি একজন আদর্শ উসতাদ হিসেবে বরিত ছিলেন তাঁর ছাত্রদের কাছে। লালবাগে দীর্ঘ সময় তিনি শিক্ষকতা করেছেন। বরং নিজেকে একজন শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দানে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, কেমন ছিল তাঁর দরসপ্রদান এবং ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক, ফাতেহ সাপ্তাহিকীর ‘আহলুল্লাহ ওয়াসেল : স্মৃতি ও সিলসিলা’ সংখ্যায় স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে সেসবই জানাচ্ছেন তাঁর উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের কয়েকজন।)

মাওলানা আবু বকর
শিক্ষক, জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ, ঢাকা

হজরত আল্লামা আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেব রহমতুল্লাহ আলায়হি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, একজন প্রাজ্ঞ লেখক। এসবের বাইরে তাঁর যে পরিচয়টা আমাদের কাছে দেদীপ্যমান এবং সবচেয়ে বড়, সেটা হচ্ছে তিনি একজন আদর্শ উসতাদ ছিলেন। ছাত্রদেরকে কীভাবে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করা যায়, এর সব কলাকৌশল হুজুরের জানা ছিল। লালবাগে দীর্ঘ দিন হুজুরের কাছে আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছি। দরসি পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদেরকে বাংলা ও আরবি সাহিত্যে দক্ষতা অর্জনের তাগিদ দিতেন। জোরজবরদস্তি নয়, অনুপ্রেরণার ভঙ্গিতে তিনি আমাদেরকে উৎসাহিত করতেন এসব ব্যাপারে। ছাত্রদের সাথে তাঁর আচরণ ছিল নিতান্ত স্নেহপূর্ণ। প্রতিটা ছাত্রই তাঁর আচরণ ও ব্যবহার থেকে বিমুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হতো। আল্লাহ তাআলা হুজুরকে জান্নাতের আলা মাকাম দান করুন।

মাহবুবুল হাসান
শিক্ষক, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া রাওজাতুল উলূম উত্তরা, ঢাকা

১.
হুজুরের কাছে পড়া আমার প্রথম কিতাব হলো, মুখতাসারুল মাআনি। সে থেকে হুজুরের কাছাকাছি হওয়া। আস্তে আস্তে সম্পর্কের মধ্যে গভীরতা আসা। মুখতাসারুল মাআনি সম্পর্কে উপরের জামাতের সবারই জানা যে কেমন কিতাব এটা, এবারত থেকে মাসআলা উদ্ধার কেমন দুঃসাধ্যের ব্যাপার। এ কিতাব বোঝা যেমন কঠিন, তেমন বুঝানোটাও। একটা মাসআলা সাধারণত একাধিকবার আলোচনা করতে হয়, নয়তো ছাত্রদের বুঝে আসে না। কিন্তু উস্তাদে মুহতারাম স্বভাবজাত স্বল্পভাষী ছিলেন, স্বল্প কথায় কোনো জিনিস বুঝিয়ে দিতে ছিলেন পারদর্শী। মুখতাসারের মাসআলাও অল্প সময়ে স্বল্প কথায় চমৎকারভাবে আমাদের সামনে পরিস্কার করে দিতেন।

২.
তিনি ছিলেন প্রখর মেধার অধিকারী। দরসে কোনো এক প্রসঙ্গে আলোচনার সুত্রে উস্তাযে মুহতারাম শৈশবের স্মৃতি চারণ করেন এভাবে–‘তখন আমি কামরাঙ্গীরচর নুরিয়ায় পড়ি। নাহবেমির জামাত। সামনে বেফাক পরীক্ষা। কিন্তু শরীরে প্রচণ্ড অসুস্থতা ভর করেছে। নিজে চলার মতো সাধ্যটুকু নেই। আমি ধরে নিয়েছি, বেফাকের পরীক্ষা আমার দেয়া হচ্ছে না। পরীক্ষা যেদিন শুরু হলো, আমাদের উস্তাদ হলরুমে প্রবেশ করে দেখলেন, আমি হলে নেই। হুজুর ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলেন, “ওয়াসেল কোথায়?” ছাত্ররা জানাল, “অসুস্থ। চলার মতো অবস্থাও নাই। শোয়ে আছে।” হুজুর বললেন, “যাও, তাকে ধরে এনে হলে বসিয়ে দাও।”

‘তাই করা হলো। আমি এ অবস্থায় পরীক্ষা দিতে থাকলাম। প্রতিদিন আমাকে ধরে নিয়ে হলরুমে বসিয়ে দেয়া হয়। আমি পরীক্ষা দিই। এভাবে সকল পরীক্ষা শেষ হয়। পরে যখন রেজাল্ট প্রকাশ হলো, দেখা গেল বোর্ডে আমার সিরিয়াল এসেছে তিন নম্বর।’

৩.
হুজুর ভদ্রতায়ও ছিলেন অনন্য। কোনো প্রয়োজনে যখনই ডাকতেন, সরাসরি আদেশ করতেন না, বরং বলতেন, ‘এ কাজটি করা দরকার। তুই কি করে দিতে পারবি?’ যেকোনো ছাত্রকে এমন আবেদনের সুরে বলতেন।

একবার হুজুরের সাথে গেলাম মাদানীনগর মাদরাসায়। তাঁর ছোটছেলেকে দেখতে। ফেরার পথে যাত্রাবাড়ি স্ট্যান্ডে নামলাম। সূত্রাপুর রোডে একটু হাঁটার পর সামনে হোটেল পড়লে হুজুর বললেন, ‘কিছু খাবি?’ আমি বললাম, ‘জি না, বরং মাদরাসায় চলে যাই।’ আমি আসলে বুঝতে পারিনি যে হুজুর আমার রুচির ব্যাপারটা ভাবছেন।

কিছুদুর অগ্রসর হলে আরেকটা হোটেল সামনে পড়লে বললেন, ‘ডায়াবেটিসে আমার শরীর কাঁপছে, এক্ষুণি কিছু খেতে হবে, চল খেয়ে নিই।’

আমি বললাম, ‘অবশ্যই., আমি তো আগে বুঝতে পারিনি।’

খেতে খেতে ভাবলাম, উস্তাদ হয়েও ছাত্রের রুচির অপেক্ষায় এতক্ষণ কষ্ট করা! আখলাকের কত উন্নত স্তর এটা! হায়, প্রথমেই কেন রাজি হলাম না! বড় বোকামি হয়ে গেল!

ইফতেখার জামিল
সম্পাদক, ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর ডটকম

আমরা তাঁর কাছে শরহে বেকায়াহ ও মুখতাছারুল মাআনি পড়েছি। শিক্ষক হিসেবে তিনি বেশ দক্ষ ছিলেন। মুখতাছারুল মাআনির মতো জটিল কিতাব অত্যন্ত সহজভাবেই তিনি আমাদেরকে বুঝিয়েছেন। মনে হয়েছে যেন সাধারণ কোনো আরবি কিতাব পড়ছি। দরসে এসে প্রথমে সহজভাষায় আলোচ্যঅংশের খোলাসা বুঝিয়ে দিতেন, খুব অল্পশব্দে মূলমর্ম বুঝানোর ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল, তারপর আরবি ইবারত ও ইবারতের ব্যাখ্যা, একটু পরপর আবার খোলাসার সাথে ইবারতের মর্ম মিলাতেন, এভাবে সবশেষে আবার খোলাসা বলতেন। মুখতাসারুল মাআনির মতো জটিল কিতাবের চার-পাঁচ পৃষ্ঠা তিনি পঁচিশ-ত্রিশ মিনিটের মধ্যে গুছিয়ে পড়িয়ে ফেলতেন।

আবু তাহের মিসবাহ সাহেবের ছাত্র হিসেবে তাঁর বাংলা ও আরবি ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ দক্ষতা ছিল। তবে রাজনীতি, সাংগঠনিকতা ও শিক্ষকতায় কেটে গেছে সময়। সাহিত্যে মনযোগী হতে পারেননি। মনোযোগী না হতে পারলেও তাঁর ভাষা, বক্তব্য ও চিন্তার স্বাতন্ত্র্য বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। তিনি বলতেন গুছিয়ে, লিখতেন মার্জিত ভাষায়িএবং ছাত্রদের দরসের লেখা সম্পাদনা করে দিতেন। চলাফেরাতেও একটা আভিজাত্য ছিল। একজন শিক্ষক গৌণভাবেই অনেক প্রভাব তৈরি করেন, এর মধ্যে কথা, লেখা, সম্পাদনা ও চলাফেরার প্রণোদনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।

মরহুম আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। আরবি সাহিত্য বিষয়ক এক পরীক্ষায় আমার রচনার প্রশংসা করে অন্য এক উস্তাজকে লেখাটা দেখান এবং আমাকে ডেকে নিয়ে সাহিত্যে মনযোগী হতে বলেন। একজন তরুণ উস্তাজকে আমাকে সাহায্যও করতে বলেন। এই ঘটনা আরবি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে আমাকে অনেক আলোড়িত করেছে। পরবর্তীতে ঐ তরুণ উস্তাজ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আরবি পাঠে সাহায্য করেন। ‘মাজা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন’ ও ‘মানফালুতির’ উপন্যাসিকার নির্বাচিত সমগ্র পড়ান।

সর্বশেষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তাঁর বিশেষ সাহায্য ছিল। ফাতেহের শুরুর দিকে শরীফ মুহাম্মদ সাহেব উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। এতে আহলুল্লাহ ওয়াসেলের বিশেষ ভূমিকা ছিল। একদিন বিকেলে হুজুর ফোন করে বলেন, তুমি কোথায়, লালবাগে শরীফ এসেছে, তুমি উনার সাথে দেখা করো। পরবর্তী কয়েক মাস শরীফ মুহাম্মদ সাহেব প্রতি সপ্তাহে ফাতেহের কাজে লালবাগ আসতেন এবং আমাকে সাংবাদিকতার নানা খুঁটিনাটি বিষয় বুঝাতেন, অভিজ্ঞতা ও কৌশলের কথা বলতেন। আমি অনুমান করি, আমার প্রতি শরীফ সাহেবের স্নেহের পেছনে আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেবেরও একটা ভূমিকা আছে। ওয়াসেল সাহেব শরীফ মুহাম্মদ সাহেবের আত্মীয়; আরও স্পষ্ট করে বললে আত্মীয়ের চাইতেও বেশি, ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেবের লেখাজোখা খুব বেশি নেই, তাতে তাঁর চিন্তার সংরক্ষণ কঠিন হয়ে গেছে, কোনো সন্দেহ নেই। তবে আমরা যারা তাঁর ছাত্র, তারা তাঁর অভিজ্ঞতার সিলসিলা, চিন্তা ও তৎপরতার ধারাবাহিকতা। শিক্ষকের মৃত্যু নেই, সাদাকায়ে জারিয়ার মতো তাঁর চিন্তার সিলসিলাও জারি থাকে কেয়ামত পর্যন্ত।

মাহমুদুল হাসান আরাবি
খণ্ডকালীন শিক্ষক, মাদরাসা-দারুল কোরআন ও ইমাম, বায়তুল মামুর জামে মসজিদ কমপ্লেক্স, ১২/ধ, পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬

১.
মক্তব থেকে হেফজখানা, তারপর কিতাবখানা…১৬/১৭ বছরের ছাত্রজীবনে মাদরাসার সংখ্যা গোটা পাঁচেক। প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ মিলিয়ে মুহতারাম শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় শ’য়ের কাছাকাছি। এর মধ্যে কিছু ছিলেন, যাঁদের মন-মেজাজ আচার-আচরণ জালালি বা গরম প্রকৃতির। আর কিছু ছিলেন জামালি বা অতিশয় নরম প্রকৃতির। বাকি অধিকাংশই ছিলেন নরম-গরম মিলিয়ে।

আমাকে যদি বলা হয়, তোমার নরম-কোমল প্রকৃতির শিক্ষকদের একটা তালিকা করো, তবে আমি সেই তালিকায় সর্বাগ্রে যাঁর নাম লিপিবদ্ধ করবো, তিনি হলেন, আমার দেখা ছোট্ট দুনিয়ায় সবচেয়ে কোমলপ্রাণ শান্তি প্রিয় নির্বিবাদী নিরীহ মানুষ মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেব রাহিমাহুল্লাহ। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন। মানুষ এতোটা কোমল হতে পারে, মরহুম রাহিমাহুল্লাহকে না দেখলে, সত্যিই পৃথিবী আর তার বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যময় মানুষকুল দেখার অভিজ্ঞতায় বিশাল ফারাক থেকে যেতো।

২.
২০০৬ সালের কথা। তখন লালবাগ মাদরাসায় আরবি তৃতীয় বর্ষে (নাহবেমির) পড়ি। আন্তঃ স্কুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটি বিতর্ক প্রতিযোগিতা প্রয়োজনীয় পরিমাণে হলেও, সেই অর্থে কওমি মাদরাসাগুলোর মধ্যে আন্তঃমাদরাসা বিষয় ভিত্তিক বিতর্ক অনুষ্ঠান না হলেও প্রতিযোগিতার কথা মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। তবে আভ্যন্তরীণভাবে কমবেশি অনেক মাদরাসায়ই বার্ষিক বিষয় ভিত্তিক বিতর্ক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

অবশ্য আন্তঃমাদরাসা বিষয় ভিত্তিক বিতর্ক অনুষ্ঠান না হওয়ার এই অধঃযাত্রা আমাদের সময়ে। শুনেছি আমাদের কয়েক প্রজন্ম আগেও ঢাকাসহ বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে আন্তঃমাদরাসা বিতর্ক অনুষ্ঠান হতো। যাকে আমাদের কওমি অঙ্গনের পরিভাষায় বলা হয় বাহাস-মুবাহাসা। মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রাহিমা হুল্লাহ এমনটাই বলেছেন।

তো বলছিলাম, ২০০৬ সালের কথা। সেবার আমরা তৃতীয় বর্ষের ছেলেরা এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। এই বর্ষে আমাদের মূল পাঠ্যসূচি ছিল ইলমুন নাহু বা আরবি বাক্যবিন্যাস শাস্ত্র। যা আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্রের দুটো অংশের সবচেয়ে জটিল-কঠিন অংশ। শিক্ষিত মানুষ মাত্রই জানেন, ব্যাকরণ মানেই হলো কাঠখোট্টা রসকষহীন নির্জলা একটি বিষয়। তা যেই ভাষারই হোক না কেন। আরবি ভাষাও তার ব্যতিক্রম নয়।

আমরা তৃতীয় বর্ষের ছেলেরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এই কাঠখোট্টা জটিল-কঠিন বিষয় নিয়েই অন্য কোনো মাদরাসার তৃতীয় বর্ষের ছেলেদের সাথে বিতর্ক করব। বিষয় যেহেতু ব্যাকরণ, তাই এখানে প্রচুর চিপা-চাপা কানাগলি আছে। বিভিন্ন ব্যাকরণিক নিয়ম-কানুন নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন করা যায়। সম্ভাব্য উত্তর জানা থাকা এবং তাৎক্ষণিক বলতে পারাটাই এখানে বিশেষ যোগ্যতা মনে করা হয়। আমি দাবি করব না আমাদের শিক্ষক দেশসেরা শিক্ষক ছিলেন, তবে তাঁর পাঠদান এতো চমৎকার ছিলো যে, আমাদের সাহসী করে তুলেছিল অন্যদের তুলনায় নিজেদের সেরা প্রমাণে। যেই ভাবা সেই কাজ! আমরা মোহাম্মদপুরের এক নামকরা মাদরাসার ছেলেদের সাথে বিতর্ক করেছিলাম, এবং আলহামদুলিল্লাহ বিজয়ী হয়েই ফিরে এসেছিলাম।

পাঠকের কাছে মাফ চাইছি, এই লম্বা ফিরিস্তি দেয়ার জন্যে। আসলে লেখার এই শেষ অংশে জড়িয়ে আছে মুহতারাম রাহিমাহুল্লাহের নাম। যিনি বিজয়ী ‘আমাদের’ দিয়েছিলেন সবচেয়ে বড় পুরষ্কার।

বিতর্ক করে আসার পর তিনি কিভাবে যেন জেনে ফেললেন, আমরা তৃতীয় বর্ষের ছেলেরা অমুক মাদরাসায় বিতর্কের জন্য গিয়েছিলাম। সেদিন সন্ধ্যায় নেতা গোছের কয়েকজনকে ডাকলেন। অধমও সেই দলে ছিল। প্রথমে একটু ভয় পেলেও সহসাই তা কেটে গেল যখন দেখলাম তাঁর চোখ-মুখ জুড়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস খেলা করছে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে আমাদের স্বাগত জানালেন। বিস্তারিত শুনতে চাইলেন। তারপর খুলে দিলেন নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতির জানালা…

বললেন, ‘দেখ, এখন তো ইলম বা জ্ঞানচর্চার অধঃপতন চলছে। এখনকার ছেলেরা অন্য মাদরাসায় বিষয় ভিত্তিক বিতর্ক-বাহাস-মুবাহাসা করার জন্য যায় না। অথচ আমাদের সময়ে আমরা অন্য মাদরাসায় চলে যেতাম বিষয় ভিত্তিক বাহাস করার জন্য। এর দ্বারা লাভ হলো, বিতর্কিত বিষয়ের সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম অংশও জানা যায়। বিষয়ে পরিপক্বতা অর্জন হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এভাবে মাদরাসা এবং শিক্ষকেরও সুনাম ছড়াতো।’

আমরা এই অধঃগতির সময়েও এমন সাহস করেছি এবং বিজয়ী হয়ে মাদরাসা ও শিক্ষকের সম্মান বৃদ্ধি করেছি বলে দিল খুলে আমাদের জন্য দোয়া করলেন। জীবনে ওভাবে দ্বিতীয় বার আর কোথাও বিতর্ক করার জন্য যাইনি। তবে প্রথম বিতর্কের পর পাওয়া মরহুমের দোয়াকে আজীবনের পুরষ্কার মনে হয়।

আরও একটা তথ্য উল্লেখ করেই মরহুমকে নিয়ে আমিও স্মৃতির জানালা বন্ধ করে দেবো। লালবাগ মাদরাসায় যাঁরা ইফতা (ইসলামি আইন অনুষদ) বিভাগে পড়েন, তাঁদের সেখান থেকে নিয়মতান্ত্রিক সনদপত্র দেয়া হয় না। দেয়া হয় ‘সত্যায়ন পত্র’। মরহুমের ইন্তেকালের মাত্র কয়েক মাস আগে, কর্মস্থলে ইফতার সত্যায়নপত্রের প্রয়োজন হয়। এটা যেহেতু হস্তলিখিতভাবে দেয়া হয়, ফলে মুক্তার দানার মতো হস্তাক্ষরের কারণে জীবদ্দশায় এই লেখার কাজটা তিনিই করেছেন। মাদরাসা প্যাডের কাগজটা নিয়ে গেলে পরম মমতায় লিখে দিয়েছিলেন। জীবিত আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেবকে ওটাই শেষ দেখা ছিল। দুর্ভাগা আমি, তাঁর শেষ যাত্রা জানাযায় শরিক হতে পারিনি। মিরপুরের জ্যাম ঠেলে লালবাগ যাওয়ার আগেই খবর পেয়েছি, তড়িঘড়ি জানাযা শেষ করে লাশ গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আজও যখন সেই প্রত্যায়নপত্রে হাত বুলাই, মরহুমের স্নেহমাখা স্পর্শ অনুভব করি। আল্লাহ মরহুমকে জান্নাতবাসী করুন।

আগের সংবাদওয়াসেল! তোমাকে ভুলতে পারছি না
পরবর্তি সংবাদসিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি শিহাব, সাধারণ সম্পাদক সিরাজ