অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান :
শিক্ষা, সাহিত্য, ভাষা ও জ্ঞান-গবেষণার ক্ষেত্রে যেসব মনীষী বাংলাদেশে অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, প্রফেসর ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তি। অর্ধ শতাব্দীর অধিক কাল ধরে তিনি এসব ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখেছেন।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার অন্তর্গত রূপসী গ্রামে ১৯২৭ সনের ১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কাজী আলিমুদ্দীন আহমদ, মাতা মোসাম্মৎ কাওসার বেগম। পিতা কাজী আলিমুদ্দীন সেকালে রেংগুনে এক বিদেশী কোম্পানীতে চাকরি করতেন। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে কাজী দীন মুহম্মদ হলেন মেঝো। তার নানা মাওলানা শরাফতুল্লাহ চিশতী তৎকালে একজন পীর হিসেবে বিশেষ সম্মান ও খ্যাতি অর্জন করেন। কাজী দীন মুহম্মদের দাদা কাজী গোলাম হোসেন সোনারগাঁওয়ের ইতিহাসখ্যাত কাজী সিরাজউদ্দীনের সপ্তম পুরুষ। উক্ত কাজীর ন্যায়বিচারের কাহিনী ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। পিতৃ ও মাতৃকুলের এ সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদের বংশধারায় প্রবহমান।
শিক্ষা জীবন
কাজী দীন মুহম্মদ একজন ক্ষুরধার মেধা ও ধী-শক্তির অধিকারী ছিলেন। ছাত্রজীবনে শিক্ষার সর্বস্তরে তিনি বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। সেকালে সম্ভ্রান্ত বংশের রীতি অনুযায়ী কাজী দীন মুহম্মদের শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তার বিদুষী মাতা মোসাম্মৎ কাওসার বেগমের হাতে। মায়ের কাছে তিনি আরবি ভাষা শেখেন, এরপর তিনি রূপসী বোর্ড প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হন। চতুর্থ শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়ে তিনি ডাবল প্রমোশন লাভ করেন। কিন্তু ডাবল প্রমোশনের সুযোগ না নিয়ে উক্ত বিদ্যালয় ত্যাগ করে মাছিমপুর জুনিয়র মাদরাসায় পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। মাদরাসায় দু’বছর অধ্যয়নের পর তিনি ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমান কবি নজরুল কলেজ) সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৪৩ সালে তিনি মানবিক শাখায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর হুগলী ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অধ্যয়ন করে ১৯৪৫ সালে কলকাতা বোর্ড থেকে প্রথম বিভাগে তৃতীয় স্থান অধিকার করে আই.এ পাস করেন। অতঃপর ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বাংলায় বিএ (অনার্স) ও ১৯৪৯ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এমএ পাস করেন। ছাত্রজীবনে তিনি সর্বদা বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করে সরকারি বৃত্তি লাভ করেছেন।
১৯৫৭ সালে কাজী দীন মুহম্মদ সরকারি বৃত্তি নিয়ে বিলাত গমন করেন। সেখানে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের School of Oriental and African Studies বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৬১ সালে ভাষাতত্ত্বে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন।
কর্মজীবন
এমএ পরীক্ষা শেষ করে রেজাল্ট পাওয়ার আগেই কাজী দীন মুহম্মদ রংপুর কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। প্রথম জীবনে তিনি যে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন, সেটাই ছিল তার আজীবনের পেশা ও সাধনা। এরপর ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫১-৬১ পর্যন্ত লেকচারার, ১৯৬২-৭৬ পর্যন্ত রীডার এবং ১৯৭৬-৮৬ পর্যন্ত প্রফেসর হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ইতোমধ্যে ১৯৮১-৮৪ পর্যন্ত চার বছর বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় ডেপুটেশনে ১৯৬৪-৬৫ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের উন্নয়ন কর্মকর্তা এবং ১৯৭৬-৮০ পর্যন্ত বাংলা একাডেমীর পরিচালক (তখনো মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি হয়নি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অবসর গ্রহণের পর কাজী দীন মুহম্মদ কিছুকাল ঢাকাস্থ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও ভারপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নিজ উদ্যোগে গঠিত ‘ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ আদর্শ শিক্ষাভবন’ এর রেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া, ‘কলেজ অব এডুকেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ (সেডস) এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি ও বিভিন্ন শিক্ষা-কার্যক্রমের সাথে জড়িত থেকে তিনি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন।
ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ বাংলা একাডেমী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, লাহোরস্থ ল্যাংগুয়েজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের জীবন সদস্য। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ আর্ট ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণা পরিষদ, বাংলাদেশ স্কুল টেক্সটবুক বোর্ডের পাঠক্রম কমিটিসহ বিভিন্ন শিক্ষা-সাহিত্য ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থেকে এসব ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রাখেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল এবং বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ‘ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন’, ‘ইসলাম প্রচার সমিতি’ ও ‘বাংলাদেশ মসজিদ মিশন’ এর অন্যতম উপদেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
ব্যক্তি জীবনে কাজী দীন মুহম্মদ উপমহাদেশের প্রখ্যাত মনীষী ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একান্ত অনুরাগী ও প্রীতিধন্য ছাত্র ছিলেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মত তিনিও একজন জ্ঞান-সাধক, ভাষা-বিজ্ঞানী, সাহিত্য-সমালোচক ও কৃতী শিক্ষাবিদ। ব্যক্তিগত জীবনে একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম। শিক্ষা-সাহিত্য ছাড়াও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতই একজন প্রসিদ্ধ চারণ-বক্তা হিসেবে খ্যাত। বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আয়োজিত সভা-সেমিনারে শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইসলামী বিষয়ের ওপর বক্তৃতা দিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে তার জনপ্রিয়তা ও অবদান কম নয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম। সাহিত্যিক, ভাষাতাত্ত্বিক, লেখক, কবি, শিক্ষাবিদ ইত্যাদি নানা পরিচিতির মধ্যে একজন সুফী-সাধক হিসেবেও তার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। এতগুলো বিরল গুণের অধিকারী এবং পান্ডিত্য ও মননশীলতায় একজন অসাধারণ ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও নিরহংকারী ছিলেন।
সাহিত্য সাধনা
বাল্যকালে ছাত্রাবস্থায় লেখালেখি শুরু করেন। সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে প্রথম তার লেখা একটি প্রবন্ধ স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। এরপর প্রতিবছরই স্কুল ম্যাগাজিনে তার লেখা প্রবন্ধ ছাপা হত। অতঃপর সাপ্তাহিক ও মাসিক ‘মোহাম্মদী’, ‘দৈনিক আজাদ’ ও অন্যান্য পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হয়। প্রথমদিকে তিনি গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ ইত্যাদি সবকিছুই লিখেছেন। তার লেখা ‘জঞ্জাল’ শিরোনামে একটি গল্প তৎকালে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখা কয়েকটি কাব্য ও গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে তিনি গল্প, কবিতা লেখায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন এবং গবেষণামূলক রচনায় বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা মোট ৩৮টি। এগুলোর একটি ধারাবাহিক তালিকা নিচে প্রদত্ত হলো :
১. মানব মর্যাদা (১৯৬০, ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনস)।
২. পাকিস্তান সংস্কৃতি (১৯৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
৩. সাহিত্য শিল্প (১৯৬৪, আহমদ পাবলিশিং হাউস)।
৪. সাহিত্য সম্ভার (১৯৬৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
৫. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (১-৪ খন্ড, ১৯৬৮, স্টুডেন্টস ওয়েজ)।
৬. লোকসাহিত্যে ধাধা ও প্রবাদ (১৯৬৮, বাংলা একাডেমী)।
৭. সুফিবাদ ও আমাদের সমাজ (১৯৬৯, নওরোজ কিতাবিস্তান)।
৮. সেকালের সাহিত্য (১৯৬৯, পুঁথিপুস্তক)।
৯. সংস্কৃতি ও আদর্শ (১৯৬৯, পুঁথিপুস্তক)।
১০. এ কালের সাহিত্য (১৯৭০, পুঁথিপুস্তক)।
১১. ভাষাতত্ত্ব (১৯৭১, বইবিতান)।
১২. জীবন সৌন্দর্য (১৯৭৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
১৩. বর্ণমালা (১৯৭৪, স্বকীয়তা)।
১৪. প্রভাত (১৯৭৫, কাব্যগ্রন্থ; স্বকীয়তা প্রকাশনী)।
১৫. একুশের আগাছারা (১৯৭৬, কাব্যগ্রন্থ)।
১৬. সুফিবাদের গোড়ার কথা (১৯৮০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
১৭. মানব জীবন (১৯৮১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
১৮. প্রতিবর্ণায়ন নির্দেশিকা (১৯৮২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
১৯. The Phonology of the Verbal Structure in Colloquial Bengali (১৯৮৫, বাংলা একাডেমী)।
২০. ঘুষ (১৯৮৫, গল্পগ্রন্থ)।
২১. সুখের লাগিয়া (১৯৮৯, পুথিপুস্তক)।
২২. শিক্ষা (১৯৮৯ পুথিপুস্তক)।
২৩. ইসলামী সংস্কৃতি (১৯৮৯, পুথিপুস্তক)।
২৪. সমাজ সংস্কৃতি ও সাহিত্য (১৯৯০, পুথিপুস্তক)।
২৫. বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাব (১৯৯০, স্বকীয়তা প্রকাশনী)।
২৬. বিচিত্র প্রবন্ধ (১৯৯১, মারকাযুল কুরআন)।
২৭. অবিস্মরণীয় (১৯৯১, স্বকীয়তা)।
২৮. জুমুআর ঘরে (১৯৯১, মারকাযুল কুরআন)।
২৯. নস্তিকতা ও আস্তিকতা (১৯৯৩, মারকাযুল কুরআন)।
৩০. আমতো দিয়েছি তোমাকে কাওসার (১৯৯৩, মারকাযুল কুরআন)।
৩১. মহানবীর বাণী শতক (১৯৯৮, মারকাযুল কুরআন)।
৩২. বিধান তো আল্লাহরই (১৯৯৯, মারকাযুল কুরআন)।
৩৩. অবিশ্বাস্য (১৯৯৯, স্বকীয়তা)।
৩৪. বাণী চিরন্তন (১৯৯৯, পুথিপুস্তক)।
৩৫. ছোটদের হযরত মোহাম্মদ (সা.) (১৯৯৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
৩৬. Thus Spoke Prophet Muhammad (Sm) (২০০০, স্বকীয়তা প্রকাশনী)।
৩৭. হাসাহাসি (২০০০, পুথিপুস্তক)।
৩৮. বিসমিল্লাহর তাৎপর্য।
এছাড়া, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার লেখা দশটি মূল্যবান পান্ডুলিপি হারিয়ে যায়। এর মধ্যে ভাষাতত্ত্বের উপর লেখা তার একটি অতি মূল্যবান পান্ডুলিপিও ছিল। কাজী দীন মুহম্মদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত কোরআন শরীফ, বোখারী, তিরমিযী, মোয়াত্তা, আবু দাউদ প্রভৃতি প্রখ্যাত হাদীস গ্রন্থসমূহের অনুবাদ ও সম্পাদনার সাথেও জড়িত ছিলেন। ‘বাংলা একাডেমীর প্রান্তর থেকে’ শিরোনামে তার লেখা একটি ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী মাসিক ‘কলম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
ভাষাতাত্ত্বিক গবেষক
কাজী দীন মুহম্মদ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্বের উপর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এ ধরনের পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বাংলাদেশে তিনিই প্রথম। ভাষাতত্ত্বের উপর শিক্ষকতা ও গবেষণা করে তিনি বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন। ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় তিনি মূল্যবান অবদান রেখেছেন। বাংলা ভাষার ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে তার গবেষণাও পন্ডিতজনদের নিকট বিশেষরূপে সমাদৃত হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি তার পূর্বসূরি ও ওস্তাদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অনেকটা পদাঙ্কানুসারী। এ ক্ষেত্রে অবশ্য পরবর্তীরা আরো গবেষণা করছেন এবং স্বভাবতই নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কৃত হচ্ছে। তবু ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় ও বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যে চিন্তা-গবেষণা করে গেছেন, তার সুযোগ্য ছাত্র ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ সে পথ অনুসরণ করে আরো নতুন কিছু চিন্তার সংযোজন ও আলোকবিচ্ছুরণ ঘটিয়েছেন। ভাষাতাত্ত্বিক গবেষকগণ এ জন্য তাকে চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
বাংলা ভাষার ইতিহাস, বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বাংলা বর্ণমালার পরিচিতি সম্পর্কে কাজী দীন মুহম্মদের রচিত গ্রন্থসমূহ সর্বাধিক গুরুত্ব লাভের অধিকারী। তার রচিত ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (১-৪ খন্ড), ‘ভাষাতত্ত্ব’, ‘বর্ণমালা’, ‘The Phonology of the Verbal Structure in Colloquial Bengali’ উল্লিখিত বিষয়ে মূল্যবান গবেষণাগ্রস্থ হিসেবে বিশেষভাবে সমাদৃত। ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ চার খন্ডে বিভক্ত একটি বিশালাকার গ্রন্থ। এতে বাংলা সাহিত্যের আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইতিহাস বিস্তৃতিভাবে বর্ণিত হয়েছে। ‘ভাষাতত্ত্ব’ গ্রন্থটিও ভাষা-গবেষণার ক্ষেত্রে এক মূল্যবান মাইলফলকতুল্য গ্রন্থ। ‘বর্ণমালা’ গ্রন্থটি বাংলা বর্ণমালার স্বকীয়তা বিষয়ক একটি গবেষণামূলক মূল্যবান গ্রন্থ।
ইংরেজি ভাষায় লেখা তার ‘The Phonology of the Verbal Structure in Colloquial Bengali’ গ্রন্থটি তিন অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে গ্রামাটিক্যাল ক্যাটাগরিজ, সিনট্যাটিক স্ট্রাকাচার এবং সমাপিকা ও অপসমাপিকা ক্রিয়ার গঠন প্রণালী ইত্যাদি। দ্বিতীয় অংশে স্থান পেয়েছে বাংলা স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির আলোচনা। সর্বশেষে তৃতীয় অংশে বাংলা ক্রিয়াপদের নমুনা প্যালাটোগ্রাম ও কিলোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ধ্বনিতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে তিনি গ্রন্থটিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা গবেষকদের মতামত উদ্ধৃত করেছেন। এ গ্রন্থটি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক ডক্টর আবুল কালাম মনজুর মোর্শেদ বলেন, ‘‘অধ্যাপক দীন মুহম্মদের ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কিত একাধিক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও উপরিউক্ত গ্রন্থটি নানা কারণে বাংলা ভাষার ওপর একটি মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ। বিষয় উপস্থাপনা ও ব্যাখার ক্ষেত্রে তার অনুসন্ধিৎসু ও বিশ্লেষণধর্মী মনের উপস্থিতি বিশেষ লক্ষণীয়। অধ্যাপক কাজী দীন মুহম্মদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণার ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সাহিত্য ও ভাষা সম্পর্কিত নিজের আদর্শ ও মনোভাব উপস্থাপন করেছেন।’’
আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলনে অংশগ্রহণ
একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক হিসেবে কাজী দীন মুহম্মদ বিভিন্ন সময় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। সেসব সেমিনারগুলোর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো :
1. Third International Congress for Classical Studies, London, 1958.
2. Asian Writers Conference, New Delhi, 1950.
3. Pakistan Linguistic Association, Lahore, 1964, 65 & 68.
4. International Islamic Conference, Colombo, 1978.
5. International Seminar, Iran, 1984.
সফর
বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারে যোগদান করা ছাড়াও কাজী দীন মুহম্মদ হজ্ব উপলক্ষে এবং নিজের দেশ দেখার অভিজ্ঞতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেন। তিনি যেসব দেশ সফল করেছেন তার তালিকা নিম্নরূপ : পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান, শ্রীলংকা, সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, সাইপ্রাস, গ্রীস, সিরিয়া, বৃটেন, জার্মানী, ইতালী, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, আলজেরিয়া, মরক্কো, সুদান, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, মেক্সিকো, কিউবা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডা, আমেরিকা, মিসর।
পুরস্কার ও সম্মাননা
ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ ভাষা, বর্ণমালা, ব্যাকরণ, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি ও গবেষণা করেছেন। বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য ভাষাতাত্ত্বিক গবেষক, শিক্ষাবিদ ও মনীষী হিসেবে তিনি দেশ-বিদেশে সুপরিচিত ও খ্যাতিমান। তার মতো এতবড় একজন সাধক ও চিন্তাশীল গবেষককে জাতি এখনো উপযুক্ত মর্যাদা দিতে সক্ষম হয়নি, এটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য। তিনি এ পর্যন্ত যেসব পুরস্কর, সম্মাননা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন, তা নিচে উল্লেখ করা হলো :
১. বাংলাদেশ দায়েমী কমপ্লেক্স পুরস্কার (১৯৮৯)।
২. বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৯০)।
৩. Distinguished Leadership Award, American Biographical Institute Published in 7th Edition of Biographical Encyclopedia.
৪. Pandit Iswar Chandra Vidyasagar Gold Plaque (2002), The Asiatic Society, Calcutta, India.
৫. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রকল্প স্বর্ণপদক, (২০০৩)।
ব্যক্তি হিসেবে কাজী দীন মুহম্মদ একজন মহৎ, সহজ-সরল ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী সজ্জন ব্যক্তি। গবেষক হিসেবে তিনি অনন্যতুল্য। পন্ডিত ও শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয়। ধর্মবেত্তা ও সুফী-সাধক হিসেবে তিনি একজন অনুকরণীয় আদর্শ। সর্বোপরি একজন মানুষ হিসেবে তিনি উদার ও মহানুভব। তার মতো এমন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব বর্তমানে আমাদের সমাজে অতিশয় বিরল। তার উপযুক্ত মর্যাদা দেশ-জাতি যদিও এখনো দিতে সমর্থ হয়নি, তবু দেশ ও জাতিকে আমরণ তিনি দিয়েছেন অকৃপণ হাতে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। আমার মতো তার অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশ ও পৃথিবীর সর্বত্র। বিগত ৪ নভেম্বর ২০১১ তারিখে তিনি ৮৫ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। রাহমানুর রাহিমের কাছে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম
