আশরাফ উদ্দীন খান
আগের পর্ব পড়ুন : কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড : একটি পর্যালোচনা (৪)
এই পর্যন্ত আমরা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে নিয়ে প্রায় ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬৬ বছরের বিবর্তন ও সংস্কারের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছি। এই সময়ে এসে ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনের পরিসমাপ্তির মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে। এরপর আসে পাকিস্তানি শাসনকাল। পাকিস্থানের সময়কার আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করার আগে, এবার আমরা একটু পিছনের দিকে ফিরে যাবে। এবার আমাদের উদ্দেশ্য হবে দুটি ধারণার অনুসন্ধান, যার একটি হচ্ছে আলিয়া মাদ্রাসার সময়কাল থেকে ব্রিটিশ শাসনামলে এই অঞ্চলের মানুষদের জন্যে আলিয়া মাদ্রাসা ছাড়া আর কি ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা তারা চালু করেছিল সেটা অনুসন্ধান করে দেখা, আর দ্বিতীয় আরেকটি ধারণা হচ্ছে এই সময়ের মধ্যে বাংলার মুসলমান সমাজে শিক্ষা নিয়ে কি ধরণের সচেতনতা বা শিক্ষা নিয়ে কি ধরণের চিন্তা শুরু হয়েছিল। প্রথমে আমরা এই অঞ্চলে আলিয়া মাদ্রাসার পাশাপাশি আর কি ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা ইংরেজরা চালু করেছিল সেই বিষয়ে অতি সংক্ষেপে ধারণা পেশ করার চেষ্টা করবো।
কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা-উত্তর বাংলার শিক্ষার অবস্থা
১৭৮০ সালে আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশের ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসিত বাংলা অঞ্চলে, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়। তবে এই অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ নিজেদের পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগে আরো অনেক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন–যা ছিল অতি স্বাভাবিক বিষয়। এই ধারাবাহিকতায় এই সময়ের দিকে অর্থাৎ কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পরে, ১৮১৭ সালে হুগলীতে, বিখ্যাত দানবীর হাজী মুহাম্মাদ মুহসীনের দানের অর্থ দিয়ে একটি বড় মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় মাদ্রাসাটি হাজী মুহসীন ট্রাস্টের অর্থায়নে পরিচালিত হলেও, মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের হাতেই ছিল। “১৮৬৮ সালে কলিকাতার ‘ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে কতগুলি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয় যে, কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও পড়াশুনা সন্তোষজনক নয়। এই জন্য সরকারের একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এই পরিপেক্ষিতে মাদ্রাসাটির তদন্তের জন্য সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির রিপোর্টে হুগলী মাদ্রাসা সম্পর্কে বলা হয়–‘যদিও এই মাদ্রাসা আমাদের তদন্তের আওতাধীন নয়, তবুও এই মাদ্রাসা সম্পর্কে আমরা কিছু বলতে চাই। এই মাদ্রাসার সিলেবাস ও শিক্ষা পদ্ধতি আলিয়া মাদ্রাসারই অনুরূপ। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এই মাদ্রাসার (কলিকাতা আলিয়া) সমুদয় খরচ সরকার বহন করে আর হুগলী মাদ্রাসা ওয়াকফ সম্পত্তির আয়ে পরিচালিত হয়। অতএব আলিয়া মাদ্রাসার যেটুকু সংস্কার বা সংশোধন করা হবে, হুগলী মাদ্রাসাতেও ততটুকু সংস্কার করতে হবে”। (আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, পৃঃ ৯৪)
অন্যদিকে মুহসীন ফান্ডের তাসাররুফের ব্যাপারে দীর্ঘ দিন যাবত অনিয়ম হয়ে আসছিল। তাই এই ফান্ডের ব্যাপারে মুসলমানদের দাবী ছিল, এই ফান্ডের টাকা হাজী মুহাম্মাদ মুহসীনের অসিয়তের বহির্ভূতভাবে খরচ করা হচ্ছে। যার একটি সুন্দর সমাধানের দাবী সরকারের কাছে পেশ করা হয়েছিল। এর ফলে বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে একটি নতুন পরিকল্পনায় বলা হয়–
*আগামীতে মুহসীন ফান্ডের অর্থ দ্বারা হুগলী কলেজের ব্যয়নির্বাহ করা হবে না
*যে অর্থ হুগলী কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসায় ব্যয় করা হতো, উক্ত সমুদয় অর্থ দ্বারা তিনটি বিশেষ ধরণের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হবে
এই সিদ্ধান্তের আলোকে ১৮৭৩ সালে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্রগ্রামে তিনটি নতুন মাদ্রাসা স্থাপন করে কলিকাতা আলিয়ার অনুরূপ পাঠ্যসুচি প্রবর্তন করা হয়। (বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা, পৃঃ ১৫২)
এই হিসাবে দেখা যায় যে, ১৭৮০ সালে আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে, ১৮৭৩ সালে সরকার কর্তৃক ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে মোটামুটি অবস্থা এখানে এসেই উপনীত হয়। কলিকাতা আলিয়া, হুগলী মাদ্রাসার পাশাপাশি, ঢাকা, চট্রগ্রাম ও রাজশাহীতে আরো তিনটি মাদ্রাসা স্থাপিত হয়।
এবার সামনে আমরা প্রসায় হবে, ইসলামী শিক্ষার বাইরে সাধারণ পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচার-প্রসারে সরকারী প্রচেষ্টা ও অবদান কি ছিল সেই সম্পর্কে। তাহলে উপনিবেশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপারে সামগ্রিক ভাবে কি ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল তার একটি মোটামুটি ধারণা ও চিত্র আমাদের সামনে প্রকাশ পাবে।
সেই সময়ের ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে দেখা যায় যে, ইংরেজরা প্রদেশের আরো বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরণের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে থাকে। সেই সকল প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও ধরণ-প্রকৃতির দিকে খেয়াল করলে বুঝা যায় যে, এই অঞ্চলের শাসনভাব গ্রহণ করার পরে ইংরেজদের চিন্তার একটি বিষয় ছিল কিভাবে এই অঞ্চলে তাদের শাসনকাল দীর্ঘস্থায়ী করা যায়। এই জন্যে তাদের মধ্যে এই অঞ্চলের মানুষ ও প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করার একটি গভীর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠার আগ থেকেই এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে খৃষ্টধর্ম প্রচার করার উদ্দেশ্যে অনেক খৃষ্টান মিশনারি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। নারীশিক্ষার প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে অনেক নারী বা বালিকা বিদ্যালয় তৈরি করা হয়। আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠার সরাসরি পরে প্রথম যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয় সেটি ছিল ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ যা ১৭৮৪ সালে ফোর্ট উইলিয়ামে স্থাপিত হয়েছিল। এখন আমরা এই ধরণের কিছু উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করবো
এশিয়াটিক সোসাইটি
‘এশিয়াটিক সোসাইটি হচ্ছে কলিকাতার একটি অগ্রণী গবেষণা সংস্থা। ১৭৮৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ভারততত্ত্ববিদ উইলিয়াম জোনস ব্রিটিশ ভারতের ‘বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী’র তদানীন্তন রাজধানী কলিকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে উইলিয়াম জোনস প্রাচ্য সম্বন্ধে গবেষণার উদ্দেশ্যে কলিকাতা শহরে একটি উচ্চশিক্ষা সংস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগী হন। ১৭৮৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার পাঠানো একটি আমন্ত্রণপত্রে সাড়া দিয়ে ৩০ জন ইউরোপীয় অভিজ্ঞ ব্যক্তি কলিকাতা শহরের পুরাতন সুপ্রিম কোর্ট ভবনের এক সভায় মিলিত হন এবং সেখানেই এশিয়াটিক সোসাইটি নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এশিয়ার ভৌগলিক সীমার মধ্যে মানুষ ও প্রকৃতি দ্বারা সৃষ্ট সমস্ত বিষয় সম্বন্ধে অনুসন্ধান ও অধ্যয়ন করা। ১৮০৮ সালে চিকিৎসাশাস্ত্র, ভৌতবিজ্ঞান প্রভৃতির উন্নতি সাধনের জন্য ফিজিক্যাল কমিটি ও সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, শিল্পকলা প্রভৃতি বিষয়ের উন্নতি সাধনের জন্য লাইব্রেরী কমিটি গঠিত হয়।
উইলিয়াম জোনস ‘এশিয়াটিক মিসচ্যালেনি’ নামে একটি বার্ষিক গবেষণা পত্রিকা চালু করেন। পরে পত্রিকাটির নাম পাল্টে রাখা হয় ‘এশিয়াটিক রিসার্চার্স’ এবং ১৭৮৮ সালে এর প্রথম সংস্করণ বের হয়। আবার ১৮২৯ সালে ডেপুটি সার্ভেয়ার জেনারেল ক্যাপ্টেন হার্বাট ‘গ্লিনিংস ইন সাইন্স’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা চালু করে, তবে পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে ‘দ্যা জার্নাল অব দ্যা এশিয়াটিক সোসাইটি’ রাখা হয় এবং ১৮৩২ সালে এই নামে পত্রিকা চালু হয়।’
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ
‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বা কলেজ অফ ফোর্ট উইলিয়াম ছিল ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচ্যবিদ্যা শিক্ষাকেন্দ্র। ১৮০০ সালের ১০ জুলাই কলিকাতার ফোর্ট উইলিয়াম চত্বরে এই কলেজ স্থাপিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহস্রাধিক সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, বাংলা, হিন্দি ও উর্দু বই ইংরেজিতে অনুদিত হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ আধিকারিদেরকে ভারতীয় ভাষায় শিক্ষিত করে তোলা। এই প্রক্রিয়ায় বাংলা ও হিন্দির মত ভারতীয় ভাষাগুলির বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানে যেসকল প্রধান এশীয় ভাষা শিক্ষা দেওয়া হত, সেগুলি হল আরবি, হিন্দি, ফার্সি, সংস্কৃত, বাংলা। পরবর্তীকালে মারাঠি ও চীনা ভাষাও শিক্ষা দেওয়া শুরু হয়।’
হিন্দু কলেজ
‘১৮১৭ সালের ২০ জানুয়ারি কলিকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কলেজের উদ্দেশ্য ছিল ভদ্র হিন্দু ঘরের সন্তানদেরকে ইংরেজি ও ভারতীয় ভাষাসমূহ সহ ইউরোপ ও এশিয়ার সাহিত্য ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষাদান করা। ইংরেজদের আগমনের পুর্বে বাংলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে বাংলা, সহজ পাটিগণিত ও সংস্কৃতের বাইরে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু শিক্ষা দেওয়া হত না। আর টোলসমূহে (সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের আদি শিক্ষা) উচ্চতর সংস্কৃত, ব্যাকরণ ও সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব, ন্যায়শাস্ত্র ও দর্শনশাস্ত্র বিষয়ে পড়ানো হতো। গভীর জ্ঞান পিপাসুদের জ্ঞান পিপাসা এই শিক্ষা পূরণ করতে পারনি। তাদের মতে এই শিক্ষা ব্যাকরণের সুক্ষতা আর অধিবিদ্যার চুলচেরা বিশ্লেষণ দিয়ে তরুণদের মনকে অহেতুক ভারাক্রান্ত করবে, কারণ বাস্তবে এই শিক্ষার কোন প্রতিফলন নেই।
সনাতনী শিক্ষার বাইরে, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।’
শ্রীরামপুর কলেজ
‘১৮১৮ সালে উইলিয়াম কেরি সহ আরো দুইজন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক দেশীয় পুরোহিত সম্প্রদায় সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ভারতীয় খ্রিস্টানদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। হিন্দু কলেজের শিক্ষা শুধুমাত্র উচ্চবিত্ত পরিবারের মুষ্টিমেয় ছাত্রের জন্যে উন্মুক্ত ছিল, তাই সর্বসাধারণের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার জন্যে এই ধরণের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুভব করে এই প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়।’
সংস্কৃত কলেজ
‘সংস্কৃত কলেজ স্থাপিত হয় ১৮২৪ সালে। ১৮২৩ সালের ১৭ জুলাই, গভর্নর জেনারেল কর্তৃক গৃহীত এক প্রস্তাবে ইতিপুর্বে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির জন্য জনশিক্ষা সংক্রান্ত একটি সাধারণ কমিটি গঠনের কাজ সক্রিয় বিবেচনাধীন ছিল। কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ প্রাচ্যদেশীয় বিদ্যা শিক্ষাদানের পক্ষপাতী ছিলেন। তাই কলিকাতায় সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু প্রস্তাবটি রামমোহন রায় এর প্রচণ্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। তিনি ১৮২৩ সালের ১১ ডিসেম্বরে গভর্নর জেনারেলের নিকট দাখিলকৃত এক স্মারকলিপিতে কমিটির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে প্রচণ্ড আপত্তি তোলেন। এর পরিবর্তে তিনি প্রস্তাব করেন যে, সরকারের উচিত ইউরোপে শিক্ষালাভকারী বিদ্বান ব্যক্তিদের নিয়োজিত করার মাধ্যমে অন্যান্য উপযোগী বিজ্ঞানের সাথে গণিত, প্রাকৃতিক দর্শন, রসায়ন শাস্ত্র, ও অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করে অধিক উদারবাদী ও জ্ঞানালোকপুর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্মুখপানে এগিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় বই-পুস্তক, সরঞ্জাম ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি দ্বারা সজ্জিত একটি কলেজ গড়ে তোলা।
লর্ড আমহার্স্ট অবশ্য এই স্মারকলিপিতে তেমন একটা কর্ণপাত করেননি, এবং ১৮২৪ সালের ১লা জানুয়ারি সংস্কৃত কলেজ যাত্রা শুরু করে। শুরুতে শুধু ব্রাহ্মণ ও বৈদ্যদের এই কলেজের ক্লাসে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৮২৭ সালের ১লা মে প্রথমবারের মতো ইংরেজি ক্লাস –যদিও ঐচ্ছিক ভিত্তিতে- প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে সংস্কৃত কলেজকে কলিকাতা মাদ্রাসার সমমর্যাদা দেওয়া হয় এবং বিদ্যাসাগরকে প্রথম অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হয়।’
কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজ
‘১৮৩৫ সালে ‘মেডিক্যাল কলেজ বেঙ্গল’ নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি এশিয়ার প্রথম ইউরোপীয় মেডিসিন কলেজ। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল জাতি ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশীয় যুবকদের আধুনিক পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী করে তোলা। ডাঃ মাউন্টফোর্ড জোসেফ ব্রামলি ছিলেন কলেজের প্রথম সুপারিনটেন্ডেণ্ট–তখন এটাই ছিল শীর্ষপদ। ডাঃ ব্রামলি ও ডাঃ গুডিভ, এই দুই জন ইংরেজ শিক্ষক ছাড়া আরও দুই জন এদেশীয় শিক্ষক ছিলেন, মধুসূদন গুপ্ত ও নবকৃষ্ণ।’
বেথুন স্কুল ও কলেজ
‘১৮২১ সালে ব্রিটিশ ফরেন সোসাইটির মিস মেরি অ্যান কুককে ভারতে নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য পাঠানো হয়। সোসাইটির মতানৈক্যের কারণে মেরি অ্যান কুককে তার কাজ নির্বাহ করা থেকে বিরত থাকার কারণে, তিনি চার্চ মিশন সোসাইটির সাথে কাজ করতে শুরু করেন। তার প্রচেষ্টায় ২৭৭ জন বালিকা ১০টি স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়। এরপর লর্ড আর্মহার্স্টের স্ত্রী লেডি আর্মহার্স্টের উদ্যোগে ‘বেঙ্গল লেডিস সোসাইটি’ গঠন করা হয়। ১৮৩৮ সালের এক সরকারী রিপোর্ট অনুসারে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ১৯টি স্কুলে প্রায় ৪৫০ জন বালিকাকে ভর্তি করা হয়েছিল।
কলিকাতার মির্জাপুরে হিন্দু মহিলা বিদ্যালয় গড়ে উঠে। প্রথমে নাম ছিল ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ ২১ জন ছাত্রী নিয়ে সূচনা হয়। ১৮৪৯ সালের ৭ই মে, এর নাম পরিবর্তন করা ‘বেথুন স্কুল’ রাখা হয়।
বেথুন কলেজ ছিল বাংলার ইতিহাসে প্রথম মহিলা কলেজ। ১৮৭৯ সালে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বেথুন স্কুলের প্রথম স্নাতক কাদম্বিনী বসু উচ্চশিক্ষার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তার স্বীকৃতিতে বেথুন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।’
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
‘১৮৫৭ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের প্রাচীনতম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮৫৪ সালে ইংল্যান্ডে ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অফ কন্ট্রোলারের সভাপতি চার্লস উড ভারতের প্রেসিডেন্সি শহরগুলিতে (কলিকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ) তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করেন। এই সুপারিশ অনুসারে ১৮৫৭ সালে কলিকাতা ও বোম্বাই শহরে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। ১৮৫৭ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতের গভর্নর লর্ড ক্যানিং ‘কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইন’-এ স্বাক্ষর করেন। এই কারণে এই দিনটিকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা দিবস গণ্য করা হয়। প্রতিষ্ঠাকালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চাদভূমি লাহোর থেকে রেঙ্গুন পর্যন্ত প্রসারিত ছিল–যা যেকোনো ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সর্ববৃহৎ পশ্চাদভূমি।’ (বাংলা উইকিপিডিয়া, বাংলার নবজাগরণ)
উপরে যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সকল প্রতিষ্ঠানসমূহের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, প্রথম দিকে এই অঞ্চলে মূলত খৃস্টান ধর্মের প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা শুরু হয়। এটা ছিল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন এই অঞ্চলে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে সেই সময়ের শুরুর দিকের অবস্থা। এরপরে যখন এই অঞ্চলে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের উপনিবেশিক শাসন চালু করে তখন তাদের প্রথম প্রতিষ্ঠান ছিল এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করা। এবং এই সোসাইটির উদ্দেশ্য ছিল এশিয়ার ভৌগলিক সীমার মধ্যে মানুষ ও প্রকৃতি দ্বারা সৃষ্ট সমস্ত বিষয় সম্বন্ধে অনুসন্ধান ও অধ্যায়ন করা। যাতে তারা এখানে তাদের শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারে এবং তাদের নিজেদের স্বার্থ পুরাপুরি ভাবে অর্জন করতে সক্ষম হতে পারে।
প্রায় একই উদ্দেশ্য পাওয়া যায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পিছনে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীতিমালার মধ্যে একটি নীতিমালা ছিল এই যে, কোম্পানি যেখানেই তাদের ব্যবসা শুরু করবে কোম্পানির প্রশাসনের লোকদেরকে সেই অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা শিখতে হবে। তাই এই অঞ্চলের ভাষা-সাহিত্য সম্পর্কে শিক্ষা ও ধারণা লাভের উদ্দেশ্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহস্রাধিক সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, বাংলা, হিন্দি ও উর্দু বই ইংরেজিতে অনুদিত হয়। বাংলা ব্যাকরণসহ আরো বিভিন্ন বিষয়ের গ্রন্থ রচনা করা হয়।
মুসলমানদের যেহেতু স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থা ছিল এবং সেই শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ ও অনুরাগ ছিল অনেক বেশী ও গভীর, তাই মুসলমানগণ তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি অধিক যত্নবান ছিলেন। মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা প্রকাশ করার জন্যে প্রথম দিকেই তারা কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে, এরপর হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচার-প্রসারের জন্যে বিভিন্ন ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা শুরু করে।
এই ধারার শুরুতেই হিন্দুদের মাঝে শিক্ষার জন্যে ১৮১৭ সালে কলিকাতায় হিন্দু কলেজ প্রতিষ্টিত হয়। এখানে ভারতীয় ভাষা-সাহিত্য সহ ইংরেজি ও এশিয়ার সাহিত্য ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষা দান করা হয়। ফলে যেখানে হিন্দু সমাজে সনাতনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেখানে উচ্চতর সংস্কৃত, ব্যাকরণ, সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ইত্যাদি চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে আধুনিক ভাষা, সাহিত্য ও বিজ্ঞানের চর্চা শুরু হতে লাগল। প্রথম দিকে এই ধরণের শিক্ষা শুধুমাত্র সম্ভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্যে বিশেষভাবে সীমাবদ্ধ থাকলেও, পরে এটা সকল স্তরের হিন্দুদের জন্যে উন্মুক্ত করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
১৮৩৫ সালে কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা ছিল এই অঞ্চলের আধুনিক শিক্ষার ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কারণ এটাই ছিল এই অঞ্চলের প্রথম আধুনিক চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়।
মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেখা যায় যে, ইংরেজরা এই অঞ্চলের নারীদেরকে বিশেষকরে হিন্দু নারীদের শিক্ষার জন্যে হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু করে। এবং যুগের পরিপেক্ষিতে বেশ অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।
সর্বশেষ ১৮৫৭ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বলা যায় যে, আধুনিক শিক্ষার প্রায় সকল স্তরের অবকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তবে সেই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায়ের সামনে বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধার দ্বার অবারিত করে দেওয়া হয়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় সেই সময়ে সিপাহী বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার কারণে মুসলমানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়ার ব্যাপারে ইংরেজি প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোর দাবী ও চেষ্টা চালানো হতে থাকে। অনেক তর্ক-বিতর্ক, চিন্তা-পর্যালোচনার পরে শেষ পর্যন্ত মাদ্রাসা চালু রাখা হলেও, সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি জোরদার করা হয়। এইভাবে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিভিন্নমুখী শিক্ষাধারার প্রবর্তন হয়ে যায়।
