কেন আফজাল গুরু লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন?

কেন আফজাল গুরু লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন?

শোয়েব আবদুল্লাহ

২০১৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি । দিনের হিসেবে কাশ্মীরের বারামুল্লা জেলার বাসিন্দা আফজাল গুরুকে ফাঁসি দেয়ার সময়কাল আজ ছয় বছর অতিক্রম করেছে । কিন্তু এই ছয়টি বছরেও আফজাল গুরু কখনোই আলোচনার বাইরে থাকেননি। বিভিন্নভাবে তিনি মিশে ছিলেন ভারতের রাজনীতিতে। এই সুদীর্ঘ সময়ে আজাদির স্লোগান কিংবা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ঘুরে-ফিরে বারবার আফজাল গুরুর নামটি উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু কে এই আফজাল গুরু? আর কেনই-বা মৃত আফজাল ভারতের রাজনীতিতে বারবার ফিরে আসছে?

কাশ্মীরের আফজাল গুরু : বন্দি খাঁচায় আজাদ পারিন্দে

১৯৬৯ সালের ৩০ জুন জন্ম নেয়া আফজাল গুরুর নিবাস ছিলো কাশ্মীরেই। উচ্চমাধ্যমিকের পরে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করেননি। আর পাঁচজন স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরি তরুণের মতো বই আর লড়াইয়ের মাঝে লড়াইকেই বেছে নিয়েছিলেন। মেডিকেলের কলেজ ছেড়ে প্রথম কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রণী সংগঠন জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টে যোগ দিলেও বেশিদিন থাকেননি। এরপর ইসলামি ধারার সশস্ত্র সংগঠন জয়শ-ই মুহাম্মাদের সাথে থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেটা থেকেও নিজেকে আলাদা করেন। ব্যক্তিগত জীবনে এক সন্তানের জনক আফজাল ফার্মেসিটিক্যাল কোম্পানির অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে শ্রীনগরে থাকতেন।

আফজাল গুরুর বিচারিক প্রহসন : মবজাস্টিস যেমন হয়

২০০১ সালে ভারতের পার্লামেন্টে সশস্ত্র হামলা হলে ১৫ ডিসেম্বর দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ একটি ফোন কলের উপর ভিত্তি করে শ্রীনগর থেকে প্রিভেন্টিং অফ টেরোরিজিম এ্যাক্ট (Prevention of Terrorism Act ) সংক্ষেপে পোটার অধীনে তাকে গ্রেফতার করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে। তার বিচারকার্য চালানোর জন্য কোর্টের নিকট ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবনে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আফজালের বিরুদ্ধে একদিকে যেমন এই হামলায় জড়িত থাকার শক্ত কোনো প্রমাণ ছিল না, অপরদিকে বাদী পক্ষও তার বিরুদ্ধে এই হামলার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ সেভাবে হাজির করতে পারেনি।

তবুও সম্পূর্ণ অসচ্ছ একটি বিচার প্রক্রিয়ার মুখামুখি করা হয় তাকে। এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার বিচার কাজে বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ আফজাল গুরুর পার্লামেন্ট হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকারের দাবী করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আফজাল নিজেই বলেছিলেন রিমান্ড নিয়ে তার উপরে অত্যাচার করে এবং স্ত্রী তাব্বাসুম গুরুসহ তার পরিবারকে হুমকি দিয়ে এই স্বীকারোক্তিতে তাকে সাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

আফজাল গুরুর বিচারে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আরেকটি শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় বিখ্যাত সংবাদ মাধ্যম ‘দ্যা ক্যারাভানের’ সম্পাদক বিনোদ যোসেফের আফজাল গুরু বিচারের উপরে করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে। বিনোদ তার প্রতিবেদনে বলেছেন, বিচার চলাকালে আফজালের পক্ষে আইনজীবিদের বাধা প্রধান করা হতো এবং যারা তার মামলা নিতে আগ্রহী হত তাদের অনেকেই মূলত রাষ্ট্রপক্ষের এজেন্ট।

মূলত তড়িঘড়ি করে আফজালের গ্রেফতার আর বিচার কার্যের মাধ্যমে ভারতীয় পুলিশ ‘কাশ্মীরের সন্ত্রাসী’র বিরুদ্ধে তাদের বীরত্বের প্রমাণ দিতে সর্বাবস্থায় সচেষ্ট ছিল। এটা ছিল রাষ্ট্রের সাথে কাশ্মীরি জনগনের একটি লড়াই, যেখানে ভারতীয় রাষ্ট্রের জিততেই হতো।

আফজালের ফাঁসি : জাতির বিবেকের শান্তি

এরকম একটি বিচারের পরে ২০০৫ সালের ৪ আগস্ট সুপ্রিমকোর্টের রায়ে আফজাল গুরুকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ শোনানো হয়। সুপ্রিমকোর্টের রায়ে বলা হয়, ‘সামগ্রিক ঘটনাবলী থেকে মনে হয়েছে আফজাল গুরু এই ঘটনায় জড়িত’ তাই তাকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ শোনানো হলো। বিস্ময়কর আরেকটি ব্যাপার হলো কোর্ট আফজাল গুরুকে মৃত্যুদনণ্ড দেয়ার পিছনে অদ্ভুত এক উপাদানের কথা উল্লেখ করে, যাকে তারা বলে ‘Appease The National Conscience’ আরেকটু সহজভাবে বললে জাতির বিবেককে শান্ত রাখা। যার উপর ভিত্তি করেই মূলত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সালে আফজাল গুরুকে ফাঁসি দেয়া হয়।

যদিও উপমহাদেশে বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করার পেছনে ‘জাতির বিবেকের’ ভূমিকা সেবারই শেষ নয় । ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের সময়ে বাংলাদেশেও এরকম একটি প্রক্রিয়ার দ্বারস্থ হতে দেখা গেছে। তথাপিও ভারতের আফজাল গুরুর ঘটনাটি ছিলো আধুনিককালে বিচার বিভাগের ন্যায় বিচারকে ‘সভ্য’ জনগণের চেতনার কাছে হেরে যাবার ঐতিহাসিক এক উদাহরণ। উপমহাদেশের মানুষ সেই প্রথম সম্ভবত এরকম একটি ঘটনার সরাসরি প্রতক্ষ্যদর্শী হতে পেরেছিল। যেখানে সংঘবদ্ধ মানুষ ফাঁসি চেয়েছিলও বলেই ন্যায় বিচারের শপথের বিচারপতিকেও ফাঁসি দিতে হয়েছিলো। এবং আফজাল গুরুর লাশটিও তাঁর পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়নি।

আফজাল গুরু বনাম ভারতী সমাজ

আফজাল গুরুর বিচারপ্রক্রিয়া থেকে ফাঁসি কিংবা ফাঁসি-পরবর্তী প্রত্যেকটি ঘটনা ছিল একেকটি শিক্ষণীয় বিষয়। আফজাল গুরুর ফাঁসি-পরবর্তী সময় প্রথম বারের মত ভারতের সকল আলাদা আলাদা রাজনৈতিক দল এক বিন্দুতে উপস্থিত হয়েছিলো। মধ্যমপন্থী কংগ্রেস হালের বিজেপি কিংবা ‘সাম্যবাদী’ কমিউনিস্ট পার্টি সকলেই গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের দোহাই দিয়ে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আফজাল গুরুর এই বিচারিক হত্যাকাণ্ডকে সমর্থনই করে গেছে। এবং তার ক্ষমা-প্রার্থনার দাবি রাষ্ট্রপতি এখতিয়ারে থাকার সময়ও বিজেপির নেতারা প্রতিনিয়ত ফাঁসি দেয়ার দাবী জানানোর মাধ্যমে বিচারকে প্রভাবিত করেছে। অপরদিকে ফাঁসি-পরবর্তী সময়ে কংগ্রেস আর কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা মৃদু প্রতিবাদের মাধ্যমে এই প্রশ্নবিদ্ধ বিচারকে মেনে নেয়ার দাবি জানিয়েছিল।

যদিও অরুন্ধতী রায়ের মত কিছু বিবেকসম্পন্ন বুদ্ধিজীবি এর বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু মহাপ্রতাপশালী রাষ্ট্রের আগ্রসন ঠেকাতে তা যথেষ্টা ছিল না। এই অসারতা কেবল বিচার বিভাগের দুর্বলতার প্রামাণই ছিল না বরং গণতন্ত্রের অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একজন নাগরিককে দাঁড় করিয়ে দিয়ে এক ভয়াবহ পরিণতির সৃষ্টি করেছিল। সম্ভবত আজকের দিনেও বারবার আফজাল গুরুর স্মৃতি ফিরে আসা সেই প্রায়শ্চিত্তেরই ইশারা দেয়।

মৃত আফজাল গুরুর বারবার ফিরে আসা

আফজাল গুরুর ফাঁসির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিকটা হলো এই ফাঁসির মাধ্যমে ভারতীয় সমাজে একটা স্পষ্ট লড়াইয়ের সূচনা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে যেসকল মানুষ মজলুমিয়াতের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছে তারা কারণ ছাড়াই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে মুখোমুখিভাবে একদিকে রাষ্ট্র দাঁড়িয়েছে অন্যদিকে দাঁড়িয়েছে ন্যায় বিচার। এবং ন্যায় বিচারের ন্যায্য দাবীকে রাষ্ট্র দেখেছে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে। আর কাশ্মীরের যে কোনো দাবিকে ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র রাষ্ট্রদ্রোহী আর মৌলবাদী মুসলিম মানসিকতার প্রকাশ হিসেবে চিহ্নত করেছে। ফলাফল হিসেবে সব সময়ই ভারত কাশ্মীরের ন্যায্য দাবিকে দমন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

যেমন ২০১৬ সালে জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটিতে একদল ছাত্র আফজাল গুরুর স্বরণে কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করলে সরকার পক্ষ তার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। এই ঘটনায় প্রত্যক্ষ উপস্থিত না থাকার পরেও শুধুমাত্র নৈতিক সমর্থনের জন্য এন ইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট ফেডারেশনের ( AISF) নেতা কানহাইয়া কুমার এবং কবিতা অনুষ্ঠানের আয়োজক ভাগত সিং আম্বেদকার স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনের নেতা উমর খালিদকে গ্রেফতার করে। এর মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী এক আন্দোলনের সূচনা হয়।

শহীদ আফজাল গুরু আর কাশ্মীরের যে লড়াইটি রাষ্ট্র বোঝে না

আফজাল গুরুর বিচারিক হত্যার পরবর্তী ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহ আর মজলুমিয়াত কাশ্মীরের আজাদির প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং বিচারিক হত্যার আধা ধোঁয়াশা চিত্রটা পরিস্কারভাবে চোখের সামনে তুলে এসেছে। যেখানে ভারতীয় রাষ্ট্রের কর্তব্য ছিল ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা সেই রাষ্ট্রই যেন আজ হাজারো মজলুম আফজাল গুরুর ন্যায় বিচারের রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এর মধ্যে কাশ্মীরের স্বনিয়ন্ত্রণের কিংবা স্বাধীনতার দাবীটিই স্পষ্টত আইনত এবং নৈতিকভাবে সমর্থন লাভ করেছে। যার ফলে আফজাল গুরু হয়ে উঠেছেন সমাজের মধ্যে এক ‘লড়াইয়ের’ প্রতীক ।

সাথে একটা সীমানাও তৈরী হয়েছে, যার একপ্রান্তে আছে মজলুমের আজাদির আকাঙ্ক্ষা অন্য প্রান্তে আছে ‘গণতান্ত্রিক বিবেকের’ ভারে নুয়ে পড়া রাষ্ট্র। এবং রাষ্ট্রের নিপীড়ক হয়ে ওঠার পিছনে প্রত্যক্ষ সমর্থন দিচ্ছে একদল নাগরিক। ফলে শ্রেণীর লড়াই বিভাজিত হয়েছে জালিম এবং মজলুমের লড়াই হিসেবে। কিংবা এটাকে বলা যায় ফ্যাসিবাদের বিপরীতে ইনসানিয়াতের লড়াই।

আফজাল গুরুর মৃত্যুর পর থেকে এখনো তাঁর নামে অঘোষিত যে কার্ফিউ চলে তা আশাব্যাঞ্জক। আজও কাশ্মীরের তরুণরা তাঁর লাশ কাশ্মীরে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখে। যা নিঃসন্দেহে একটি দীর্ঘ লড়াইয়েরই ইঙ্গিত।

আক্ষরিক অর্থে জটিল হলেও কাশ্মীরের স্বাধীনতা সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তাই মৃত্যুদিনে আফজাল গুরু ঢুকে পড়ছেন সমাজের প্রত্যেকটি অংশে। পার্লামেন্ট থেকে কাগজে, গ্রাম থেকে আজাদির–সর্বত্রই কাশ্মীরের প্রতি রাষ্ট্রের অবস্থানের এক প্রতিবাদ তৈরী হয়েছে। এবং পরিস্থিতি বলছে একে থামানোর শক্তি আজ রাষ্ট্রযন্ত্র কিংবা শাসকের সামান্যই আছে।

সহায়িকা গ্রন্থ : ‘কাশ্মীর ও আজাদীর সংগ্রাম’; আলতাফ পারভেজ

আগের সংবাদনির্জন বেহেশতের মুসাফির
পরবর্তি সংবাদশে’রুল মুকাওমাহ : কাশ্মীরের প্রতিরোধ সাহিত্য