ফাতেহ ডেস্ক :
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের অভাবে ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ময়নাতদন্ত করেন মেডিক্যাল অফিসাররা। কোর্টে হাজিরা, রিপোর্ট তৈরিতে বাড়তি চাপসহ নানা সংকটের কারণে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে ডাক্তারদের আগ্রহ কম। তাই তৈরি হচ্ছে না প্রয়োজনীয় ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ।
দেশে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের অভাব এতোটাই বেশি যে অবসরে যাওয়ার পরেও নিয়মিত কর্মস্থলে হাজিরা দিতে হচ্ছে বর্তমানদের।
এমনই একজন খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ খ ম শফিউজ্জামান। একবছর হলো আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে গিয়েছেন, তবুও নিয়মিত অফিস করতে হচ্ছে।হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে আটটি পদের পাঁচটিই দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। ফরেনসিক বিভাগের দায়িত্ব নেয়ার মত কেউ না থাকায় বাধ্য হয়েই শফিউজ্জামানের দারস্থ হতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা হাসপাতালগুলোর ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে ১৩৫টি চিকিৎসকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে আছেন মাত্র ৬৩ জন। আর অধ্যাপক চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র পাঁচজন।
নড়াইলের সিভিল সার্জন ডা. নুপুর কান্তি দাস বলেন, ‘আমাদের এখানে আকজন প্রতিষ্ঠিত কনসাল্টেন্ট দরকার, যেহেতু আমাদের সদর হাসপাতাল এবং উপজেলা পর্যায়ে ফরেনসিক বিভাগ বলতে কোন বিভাগ নেই। এগুলো শুধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতেই রয়েছে।’
চাঁদপুর জেলারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. সুজাউদৌলা রুবেল বলেন, ‘আমাদের এখানের মর্গটা হাসপাতাল থেকে অনেক দূরে। সেখানে যেতেও আমাদের অনেক সময় লাগে। এছাড়া ফরেনসিক বিষয়ে আমাদের ট্রেনিং খুবই কম দেয়া হয়।’
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আব্দুস সোবহান বলেন, ‘আমাদের রোগীদের সেবার পাশাপাশি ময়নাতদন্তের কাজও করতে হয়। এটা আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ন কাজ।’
এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ না হওয়ায় রিপোর্টে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বলে মনে করেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. সেলিম রেজা।
চিকিৎসকরা বলছেন, ময়নাতদন্ত প্রভাবিত করতে নানামুখী চাপ, প্রণোদনা ভাতা না থাকা, আদালতে হাজিরা দেয়াসহ নানা কারণে এই বিভাগে ডাক্তাররা আসতে চান না।
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, “পোস্টমর্টেম করতে ডাক্তাররা সাধারণতঃ অনীহা প্রকাশ করে, কারণ পোস্টমর্টেম করার পরে ডাক্তাররা খুব টেনশানে থাকে। বাদী-বিবাদী পক্ষের চাপ, মিডিয়ার চাপ থাকে। আরেকটা বিষয় হলো যে এর জন্য আমাদের ডাক্তাররা কোনো ইনসেনটিভ পান না।”
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, “ফরেনসিক মেডিসিনে কেউ চাকরি করলে সে বিকালবেলায় প্র্যাকটিসটা করতে পারে না, সে ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হতে পারছে না। আমি ঈদের দিনও মিরপুর থেকে পোস্টমর্টেম করি,এতে আমার আসা যাওয়ার যে খরচ হয় তা আমার নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। সরকার আমাকে এক পয়সাও দেয় না। আমাকে প্রায়ই ঢাকা কোর্ট ও জজ কোর্টে গিয়ে সাক্ষী দিতে হয়,এতে আমার যে সময় এবং টাকা পয়সা খরচ হচ্ছে এগুলোও সরকার দিচ্ছে না নিজেকেই দিতে হচ্ছে।এছাড়া মাঝে মাঝে ঢাকার বাইরে গেলে আমার তিন-চারদিন সময় নষ্ট হয়।”
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. রত্নদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, “পোস্টমর্টেম যারা করেন, তাদের অনেক সময় আমৃত্যু আদালতে হাজিরা দিতে হয়।”
নির্ভুল ময়নাতদন্তের স্বার্থে ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের সুদৃষ্টি চেয়েছেন তারা।
সূত্র : ডিবিসি নিউজ
