রাগিব রব্বানি :
দেশে পরিবেশ বিপর্যয়ের মাত্রা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। খারাপ হচ্ছে বায়ুমান। বাতাসে অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণার ব্যাপক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে মৃত্যুঝুঁকি। শিল্প বর্জ্য, মেডিক্যাল বর্জ্য, প্রাণিজ এবং অন্যান্য বর্জ্য-সহ বিভিন্ন রাসায়নিক বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণ বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্যের ওপর। তাঁরা বলছেন, জলবায়ুর প্রতিকূল প্রভাবও পরিবেশের উপর পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে বিভিন্ন প্রাণীর জটিল ও কঠিন রোগ দেখা দিচ্ছে। পরিবেশের উপর জলবায়ুর প্রভাবের জন্য ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত, খাদ্যাভাবজনিত রোগ-সহ নানা জটিল ও অপরিচিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এর পাশাপাশি বেড়ে গেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগও।
বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম। আর বায়ুদূষণে ১৭৮টি দেশের মধ্যে দূষণের বিবেচনায় প্রথম দিকে। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে মৃত্যুর তৃতীয় সর্বোচ্চ কারণ বায়ুদূষণ। এ দূষণের কারণে গড় আয়ুও সবচেয়ে বেশি কমছে বাংলাদেশে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট (এইচইআই) ও দ্য ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন (আইএইচএমই) প্রতি বছর বৈশ্বিক বায়ুমান প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১৭ সালের তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরের প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে বায়ুদূষণে মারা গেছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ, মোট মৃত্যুর যা ১৪ শতাংশ। এছাড়া বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশীদের আয়ু কমছে গড়ে ১ বছর ১০ মাস। গড় আয়ু কমার এ হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।
পরিবেশ দূষিত হবার পেছনে অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা, বৃক্ষ কর্তন, যেখানে সেখানে বর্জ্য ফেলা, শহরের পাশের নদীগুলোকে দূষিত করে তোলাকে প্রধানত দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি এবং জনসচেতনতার অভাবও সমানভাবে দায়ী, বলছেন তাঁরা।
পরিবেশের এই বিপর্যয়ে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ—প্রয়োজনের তুলনায় যদিও তা খুব সামান্য—আছে, সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনও পরিবেশ সচেতনতায় মোটামুটি কাজ করছে, কিন্তু ধর্মীয় পরিসরে এই বিপর্যয় নিয়ে খুব একটা সচেতনতা পরিলক্ষিত হয় না।
চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলছেন, পরিবেশ বিপর্যয় বর্তমানে আন্তর্জাতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, বর্জ্য শোধনাগারের অভাব, নদীদূষণ ইত্যাদি কারণে আমাদের বাংলাদেশও এ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। এ বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি উদ্যোগের যেমন অতিপ্রয়োজন, তেম্নি জনসচেতনতাও খুবই দরকারি। আর বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের সঙ্গে যেহেতু ওলামায়ে কেরামের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে, তাই পরিবেশ বিপর্যয় সম্পর্কে সচেতন করতে তাঁদের ভূমিকা অধিক কার্যকর হবে বলে মনে করি।
তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষার জন্য সর্বপ্রথম জোরালো ও অ্যাকাডেমিক নির্দেশনা ইসলামই দিয়েছে। আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অনেক হাদিস বিদ্যমান এ ব্যাপারে। তিন জায়গায় বর্জ্য ত্যাগে নিষেধাজ্ঞার হাদিসটি তো প্রসিদ্ধই। গাছের নিচে, রাস্তায়, নদীর ধারে বর্জ্য ফেলতে নিষেধ করেছেন নবিজি। কারণ, এ তিন জায়গায় বর্জ্য ফেললে একদিকে যেমন মানুষের কষ্ট হয়, অপরদিকে পরিবেশও দূষিত হয়। এ ছাড়া বৃক্ষ রোপণের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে উৎসাহ এসেছে হাদিস শরিফে, অযথা বৃক্ষকর্তনের ব্যাপারেও বাধা দেওয়া হয়েছে। এসব হাদিস কিন্তু পরিবেশ সংক্রান্তই। ওলামায়ে কেরাম যাঁরা মাহফিলে আলোচনা করেন, মসজিদের মিম্বরে জুমাবারে খুতবা দেন, বিভিন্ন মাধ্যমে লেখালেখি করেন, তাঁরা তাঁদের ওয়াজে, খুতবায়, লেখালেখিতে পরিবেশ নিয়ে কথা বললে জনসমাজে আলাদা একটা সচেতনতা তৈরি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ইসলাম কেবল একটা ধর্মই নয় বরং পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার নাম। পরিবেশ দূষণ রোধে সচেতনতা তৈরিও ইসলামের দাওয়াতি মিশনের অংশ। তাই ওলামায়ে কেরামকে এই সচেতনতা তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখা দরকারি।
ড. আ ফ ম খালিদ আরও বলেন, জনসমাজে সচেতনতার পাশাপাশি পরিবেশের বিপর্যয় রোধে সরকারেরও বেশ অনেকগুলো করণীয় আছে। শহরগুলোতে প্রধানত অপরিকল্পিত বর্জনিক্ষেপের কারণেই পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বেশি। বর্জ্যনিক্ষেপকে পরিকল্পনার আওতায় এনে রিসাইকেল ইউনিট স্থাপনের আহ্বান করতে চাই আমি সরকারকে। ইউরোপে বর্জ্যনিক্ষেপের চার হাজার রিসাইকেল ইউনিট রয়েছে। এসব বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বর্জ্যকে তারা সম্পদে রূপান্তরিত করছে। ফলে ইউরোপে একদিকে পরিবেশ দূষণ থেকেও বাঁচতে পারছে মানুষ, অপরদিকে আহরিত হচ্ছে মূল্যবান বিদ্যুৎ।
তিনি বলেন, আমাদের দেশেও এটা সম্ভব, কেবল আমাদের সরকারের একটু সদিচ্ছার দরকার।
