রাগিব রব্বানি :
দ্বীপ জেলা ভোলার বুরহানুদ্দিন উপজেলায় ‘হিন্দু যুবকের ফেসবুক আইডি’ থেকে ইসলাম ও নবিজিকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে গত ২০ অক্টোবর স্থানীয় তৌহিদি জনতার সমাবেশে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে শাহাদত বরণ করেছিলেন কিশোর মাদরাসাছাত্রসহ চারজন মুসল্লি। আহত হয়েছিলেন আরও শতাধিক। যাঁদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ এখনও সুস্থ জীবনে ফিরতে পারেননি। ১১ জন আছেন এখনও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিন্তু নৃশংস এ ঘটনার এক মাস পূর্ণ হলেও কোনো বিচার বা তদন্তের বিশ্বাসযোগ্য আশ্বাসও এ পর্যন্ত মেলেনি সরকারের তরফ থেকে। স্থানীয় প্রশাসন ৫ হাজার লোকের বিরুদ্ধে বেনামি মামলা দিয়ে উল্টো আরও সাধারণ জনগণকে হয়রানি করছে। এমনটাই বলছেন ভোলা জেলা মুসলিম ঐক্য পরিষদের মিডিয়া সমন্বয়ক মাওলানা মিজানুর রহমান।
আরও পড়ুন : ভোলা হত্যাকাণ্ড : প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন
মাওলানা মিজান ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, বেনামি মামলার কারণে বুরহানুদ্দিনের অসংখ্য মানুষ এখনও আতঙ্কে আছেন। পুলিশ যেকোনো সময় যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে বলে শঙ্কিত তাঁরা। এমনকি আহতদের অনেকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতেও ভয় পাচ্ছেন, চিকিৎসাহীনভাবে তাঁরা দিন গুজরান করছেন ধরপাকড় থেকে বাঁচার জন্য।
গ্রেপ্তারের ভয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন না আহতদের অনেকে
মাওলানা মিজানের ভাষ্যমতে, ভোলা জেলা মুসলিম ঐক্যপরিষদ সাধ্যমতো আহতদের খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করছে। সংগঠনটি ইতিমধ্যে ৭২ জন আহতের তালিকা করে তাঁদেরকে অল্প পরিমাণ আর্থিক অনুদানও দিয়েছে। এর বাইরে আরও ৪২ জন আহতের তালিকা সংগঠনটির হাতে আছে, যাঁদের কেউই অনুদান গ্রহণ করতে রাজি হননি। কারণ, তাঁদের ভয়, অনুদান গ্রহণ করতে গেলে তাঁরা প্রশাসনের নজরে পড়বেন এবং সেই সূত্র ধরে গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হতে পারেন। তাই, তাঁদের নামের তালিকা যাতে প্রকাশ না করা হয় এজন্য মুসলিম ঐক্য পরিষদকে তাঁরা অনুরোধও করেছেন।
মাওলানা মিজান জানান, আহতদের ৭২ জন এবং ৪২ জনের যে তালিকা এর বাইরেও আরও আহত হয়েছেন। সমাবেশের দিন বুরহানুদ্দিনের নয়টি ইউনিয়ন থেকে বিপুল পরিমাণের লোক এসেছিলেন, নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সবকয়টি ইউনিয়নে তাঁরা খোঁজ-খবর নিতে পারেননি। যার ফলে আহতদের অনেকেই বাদ পড়েছেন তালিকা থেকে। মাওলানা মিজান বলেন, সেদিন কমপক্ষে হলেও আড়াইশো মুসল্লি নানাভাবে আহত হয়েছেন।
এখনও হাসপাতালের বেডে ১১ মুসল্লি
এদিকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে এখনও চিকিৎসাধীন আছেন ১১ জন মুসল্লি। বরিশাল ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে তাঁরা চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান মাওলানা মিজান। তিনি বলেন, ঢাকায় যাঁরা চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদেরকে হাফেজ্জী হুজুর রহ. সেবা সংস্থা এবং ঢাকার বেশ কয়েকজন আলেম দেখভাল করছেন। বরিশালে চিকিৎসারতদের দেখভালেও ওলামায়ে কেরাম রয়েছেন। কিন্তু এর বাইরে অনেক আহত এমন আছেন, যারা গ্রেপ্তারের ভয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যেতে পারছেন না। পুলিশ যে কোনো অজুহাতেই গ্রেপ্তার করে বসছে যাকে তাকে।
বেনামি মামলায় এ পর্যন্ত কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানতে চাইলে মাওলানা মিজান বলেন, পুলিশের ভাষ্য সাত জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের কাছে যে তথ্য এসেছে, এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ছয় দফা দাবি মানতে তালবাহানা
এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর মুসলিম ঐক্য পরিষদ প্রদত্ত ছয় দফা দাবির ব্যাপারে এখনও কোনো সুরাহা হয়নি। দাবিগুলোর অন্যতম ছিল ৫ হাজার মুসল্লির বিরুদ্ধে বেনামি মামলা প্রত্যাহার করা, গ্রেপ্তারকৃতদের নিঃশর্ত মুক্তি প্রদান এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচার বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা।
মাওলানা মিজান বলেন, পুলিশ যেখানে নির্বিচার গুলি চালিয়ে চারজন মুসল্লিকে হত্যা করেছে, অসংখ্য মানুষকে আহত করেছে, সেখানে উল্টো পুলিশের মামলায় হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ জনতাকে। আমাদের ছয় দফা দাবির অন্যতম ছিল এ হয়রানি বন্ধ করা এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা। কিন্তু আমাদের কোনো দাবিই এখন পর্যন্ত মানা হয়নি।
মাওলানা মিজান জানান, গত ৭ নভেম্বর ছয় দফা দাবির বিষয়ে ভোলা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক হয় মুসলিম ঐক্য পরিষদের। সেখানে জেলা প্রশাসক বলেছেন, দাবিগুলো তিনি ঊর্ধ্বতন মহলে পৌঁছিয়েছেন, দাবি পর্যালোচনা করে নির্দেশনা আসতে সময় লাগবে। তবে ভালো একটি ‘ফলাফল’ আসবে বলে তিনি আশ্বাস দেন মুসলিম ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেবে মুসলিম ঐক্যপরিষদ
জেলা প্রশাসকের এমন আশ্বাস ইতিপূর্বেও কয়েকবার দিয়েছেন, কিন্তু এ আশ্বাস এখন মুসলিম ঐক্যপরিষদকে হতাশ করেছে। মাওলানা মিজান বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর এখন তাঁরা একটা স্মারকলিপি প্রদান করে ছয় দফা দাবির বাস্তবায়ন চাইবেন। সেদিন বুরহানুদ্দিনে কী ঘটেছিল, আলেমদের সাথে আগের দিন রাতে প্রশাসনের কী কথা হয়েছিল সবকিছু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে স্মারকলিপিতে।
তিনি বলেন, ২০ নভেম্বর পর্যন্ত ভোলায় সবধরনের সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই ২৩ নভেম্বর আমরা শহিদদের স্মরণে দোআ মাহফিলের আয়োজন করেছি। দোআ মাহফিলের আগে যদি আমাদের দাবি না মানা হয়, অন্তত বেনামি মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি না দেওয়া হয় তাহলে আমরা নতুন কর্মসূচিতে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
