এই সময়ে কতটা প্রাসঙ্গিক মওলানা ভাসানী?

এই সময়ে কতটা প্রাসঙ্গিক মওলানা ভাসানী?

রাগিব রব্বানি :

বাংলাদেশের কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আজ তাঁর তেতাল্লিশতম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটিয়ে পরপারে পাড়ি জমান তিনি।

মওলানা ভাসানী আজীবন খেটে খাওয়া মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। কেবল ক্ষমতাপ্রাপ্তির রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। গোটা জীবনই তিনি ব্যয় করেছেন কৃষক ও দিনমজুর মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, দীর্ঘ পরিশ্রম, আপামর জনতার অকুণ্ঠ সমর্থন, কিন্তু তিনি ক্ষমতায় যেতে পারেননি ওভাবে। কারণ, ক্ষমতায় যেতে যে কূটচাল এবং ধূর্ততার দরকার হয় সাধারণত, মওলানা ভাসানী সেই কূটচাল ও ধূর্ততা থেকে অনেক দূরে ছিলেন। এমনটাই বলছেন আলেম কবি ও বুদ্ধিজীবী মাওলানা মুসা আল হাফিজ।

ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের সঙ্গে ভাসানী প্রসঙ্গে বিশেষ এক আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ভাসানীর রাজনীতির যে স্পিরিট, যে স্বাতন্ত্র্য, বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থবিরতার এই সময়ে এর প্রাসঙ্গিকতা এবং গুরুত্ব অনেক বেশি।

মুসা আল হাফিজ বলেন, ব্রিটিশ আমলে আসামে বাঙালি, বিশেষত মুসলমানদের বিতাড়নের যে পায়তারা শুরু হয়েছিল, মওলানা ভাসানী রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এই বিতাড়নের বিরুদ্ধে। ৪৭-এর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের দিকে যদি নজর দিই, দেখা যাবে মওলানা ভাসানী একজন সাধারণকর্মীর মতো মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পাকিস্তানের জন্য। একইভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাক-শাসকগোষ্ঠী যখন বাংলাদেশের মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করছিল নানাভাবে, তখন মওলানা ভাসানী ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে পাকিস্তানকে বিদায় জানিয়ে বলেছিলেন ‘আসসালামু আলায়কুম’। এ দেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে প্রথম উচ্চারণ ছিল মওলানা ভাসানীর জবান থেকেই, এবং সেটা ছিল এই ‘আসসালামু আলায়কুম’।

মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শন বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে মাওলানা মুসা আল হাফিজ বলেন, ভাসানী দেওবন্দে পড়েছেন একটা সময়, এই সূত্রে হজরত হুসাইন আহমদ মাদানি রহমতুল্লাহ আলায়হির রাজনৈতিক চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক মূল দর্শন ছিল মাওলানা আজাদ সোবহানির রব্বানি আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত। একই সঙ্গে কমিউনিজমের সঙ্গেও তাঁর একটা যোগাযোগ ছিল। চীন সফর করেছেন, মাওসেতুংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। তার মানে এই না যে, তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন। প্রতিটা মতবাদেরই ভালো কিছু দিক থাকে। তিনি মূলত কমিউনিজমের ভালো দিকগুলো এ দেশের সমাজ বাস্তবতায় প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

মুসা আল হাফিজ বলেন, মওলানা ভাসানী ইসলামের জায়গাটাকে সবার উপরে রেখে এর আলোকে আধুনিক পৃথিবীর ভালো ভালো থিউরিগুলো বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় প্রতিফলিত করার জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি জাতপাত শ্রেণিবৈষম্যের ঊর্ধ্বে ওঠে এ দেশের গণমানুষের উন্নয়ন চাইতেন। চাইতেন সাম্য ও সম্প্রীতির একটি রাষ্ট্র। রব্বানি আন্দোলন বা হুকুমাতে রব্বানিয়ার মূল কথা এটাই ছিল।

Image result for মুসা আল হাফিজ
মুসা আল হাফিজ

মাওলানা মুসা আল হাফিজ আরও বলেন, মওলানা ভাসানী জীবনভর রাজনীতি করেছেন, নিজের জন্য কিছুই করেননি। কেবল সাধারণ মানুষের অধিকার ও জীবনমানের উন্নতির জন্য কাজ করে গেছেন। শুধুই যে রাজনীতি করেছেন এমন না, শিক্ষা ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ব্যাপক ছিল। এ দেশে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়েছে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। হক কথা নামে একটা পত্রিকাও প্রকাশিত হতো তাঁর তত্ত্বাবধানে। একই সঙ্গে নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায়ও সচেতন ছিলেন। ৭৬ সালে, তাঁর মৃত্যুর বছর, অসুস্থতা ও বার্ধক্যপীড়িত শরীর নিয়েও ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ঐতিহাসিক লংমার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

মওলানা ভাসানীর জীবন ও চিন্তার চর্চা এই সময়ের জন্য জরুরি উল্লেখ করে মুসা আল হাফিজ বলেন, কেবল যে একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন মওলানা ভাসানী, এমন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন এ দেশের গণমানুষের কণ্ঠস্বর। রাজনীতির একজন তুখোড় চিন্তক ও দার্শনিকও বলা যায় তাঁকে। তাই খণ্ডিতভাবে নয়, বৃহৎ পরিসরে তাঁর জীবন ও চিন্তার চর্চা করা এই সময়ের অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য জরুরি। বিশেষত বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থবিরতার এই সময়ে মওলানা ভাসানীর চর্চা অপরিহার্য। ক্ষমতার বাইরে থেকেও কীভাবে ক্ষমতাবান হওয়া যায়, কীভাবে গণমানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা আদায় করে নেওয়া যায়, মওলানা ভাসানীর জীবন দর্শনে রয়েছে এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

আগের সংবাদইরাক-আফগানে যুদ্ধাপরাধ ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ ব্রিটিশ সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে
পরবর্তি সংবাদইমরান খানের বুদ্ধিমত্তায় জেইউআই-এফ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মাঝে সংঘর্ষ হয়নি : পিএমএল-কিউ