রাকিবুল হাসান :
ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ইস্পাতকঠোর রাজনীতিবিদের নাম নরেন্দ্র মোদি। কট্টর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা এবং তাদের সহযোগীদের নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি এখন দেশের শীর্ষ আসনে আসীন। গত শতকের আশির দশকে ভারতীয় জনতা পার্টিসহ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা এবং তাদের সহযোগীরা যা যা পরিকল্পনা করেছিল, ক্ষমতার দ্বিতীয় ইনিংসে মোদি একে একে সেগুলো বাস্তবায়ন করছেন। মুসলিম-অধ্যুষিত কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল করেছেন। এর মাস কয়েকের মধ্যেই স্পর্শকাতর বাবরি মসজিদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে রায় ঘোষণা করালেন। রায়ে বাবরি মসজিদের বিতর্কিত ভূমি হিন্দুদের দিয়ে দেওয়ার রায় দিয়েছে ভারতের হাইকোর্ট। পাশাপাশি বিকল্প স্থানে মসজিদ নির্মাণের জন্য মুসলিমদের ৫ একর জমি দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এই রায় ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি থেকে সরিয়ে হিন্দুত্বের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে একটি জয় হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। মার্কিন দৈনিক ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ লিখেছে, ‘কয়েক শতাব্দীর বিতর্কিত জমি নিয়ে শনিবার (৯ ডিসেম্বর) ভারতের সুপ্রিমকোর্ট হিন্দুদের পক্ষে রায় দিয়েছে। মোদি এবং তার অনুগামীরা যে নতুন করে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি থেকে সরিয়ে হিন্দুত্বের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে, তার পক্ষে এটা বড় জয়।’
কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সম্বলিত ৩৭০ ধারা বাতিলের পর ভারতজুড়ে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের রায়ে অত জোর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ভারতীয় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে বড্ড শান্তভাবে। কারণ রায়ের আগের দিন মোদি ঘোষণা দিয়েছিলেন, রায় নিয়ে কেউ যেন বেফাঁস মন্তব্য না করে। এই ভয়ে সবাই স্বাগত জানিয়েই চুপ থেকেছে।
রায় ঘোষণার পরপরই রায়কে এক টুইটে সাধুবাদ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট সময় দেয়া হয়েছে। এবং এই রায়ের ফলে বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের ‘আস্থা’ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
বাবরি মসজিদ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে ভারতের কংগ্রেস। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেস জানিয়েছে, ‘আমরা অযোধ্যা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়কে সম্মান করি। আমরা আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ ও ভ্রাতৃত্বের চেতনা মেনে চলতে এবং শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ ও সব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই। যুগে যুগে পারস্পারিক শ্রদ্ধা ও ঐক্য আমাদের সমাজকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে, তা পুনরায় নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।’
অযোধ্যা মামলার অন্যতম পক্ষ নির্মোহী আখড়ার মুখপাত্র কার্তিক চোপড়া বলেন, ‘শেষ ১৫০ বছর ধরে আমরা যে লড়াই চালাচ্ছি তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তাতে নির্মোহী আখড়া কৃতজ্ঞ। কেন্দ্র সরকার শ্রী রাম জন্মস্থান মন্দির নির্মাণের জন্য যে ট্রাস্ট গঠন করবে তাতে নির্মোহী আখড়ার প্রতিনিধি থাকবে।’
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভগবত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘অযোধ্যা ইস্যুতে আমরা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে সাধুবাদ জানাই। এই রায়কে কারো জয় বা কারো পরাজয় হিসেবে দেখাটা ভুল হবে। অতীতের বিভেদ ভুলে রাম মন্দির নির্মাণে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
শিবসেনার প্রধান উদ্ধভ ঠাকরে বলেছেন, ‘আজকের দিন ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’ আদালতের রায় মেনে দ্রুত রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নিতে এক বিবৃতিতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ।
যাদের হাতে শহিদ হয়েছে বাবরি মসজিদ, যাদের শাবলের আঘাতে খসে পড়েছে মসজিদের একেকটি ইট, সেই তারা এমন মিষ্টি ভাষায় তাদের পক্ষে কথা বলা আদালতকে সমর্থন জানাবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে তাদের সবার মুখেই স্বাগত জানানোর সঙ্গে সঙ্গে একটি দাবি উচ্চারিত হয়েছে। তা হলো—দ্রুত মন্দির নির্মাণের দাবি। কারণ তাদের ভেতরে এখনো একটা চাপা ভয়—আবার না যেন কোনোভাবে মন্দির নির্মাণ ভেস্তে যায়।
এই রায় নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন এর প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। তিনি বলেছেন, মামলার রায়ে মুসলমানেরা সন্তুষ্ট নন। সুপ্রিম কোর্টকে সর্বোচ্চ আদালত বলে মানলেও তিনি মনে করেন সুপ্রিম কোর্টও সবসময় ‘নির্ভুল’ নয়।
অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের আইন বিষয়ক কমিটির প্রধান মাওলানা গুলজার আহমদ আজমি। তিনি বলেন, মসজিদের পক্ষের দলিল-প্রমাণাদির আলোকে সর্বোচ্চ আদালতের নিকট মুসলমানরা ইতিবাচক রায়ের আশা করছিলো। কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট ন্যায়বিচার করতে পারেনি; বরং এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে হাইকোর্ট।
অযোধ্যা মামলায় রায়ের পর নানা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরা মন্তব্য করলেও নীরব ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বা তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো নেতা এ নিয়ে মুখ খোলেননি। বরং তাৎপর্যপূর্ণভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের কবিতা পোস্ট করেছেন তৃণমূল নেত্রী। মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘অনেক সময় কথা না বলেও অনেক কথা বলা হয়ে যায়৷ কিছু বলার থেকে না বলাটা আরো শক্তিশালী বলা।’
এই কবিতায় অযোধ্যা বা রাম মন্দিরের উল্লেখ না থাকলেও, এখানে যে সেই ইস্যুতেই বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে অনেকেই নিশ্চিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিবাজীপ্রতিম বসু বলেন, ‘নীরবতার মধ্যেই একটা প্রচ্ছন্ন বার্তা আছে যে তিনি রায়কে স্বাগত জানাচ্ছেন না। আবার সমালোচনা থেকেও বিরত থাকছেন। ভোটের অংক তো তাকে মাথায় রাখতেই হয়। তবে এই কবিতার প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক অতীতে জয় শ্রীরাম স্লোগানের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর যে তীব্র প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি, তা থেকে তাঁর অবস্থান আঁচ করা যায়। একইসঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থে তিনি সরাসরি মন্তব্য এড়িয়েছেন।’
পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু ভোট এক-চতুর্থাংশের বেশি। তাদের ভোট মূলত তৃণমূলের পক্ষেই যায়। অধ্যাপক নন্দের মতে, ‘মুখ্যমন্ত্রী অযোধ্যা রায়কে স্বাগত জানালে এই সংখ্যালঘুরা বিরক্ত হতই। আবার উষ্মা প্রকাশ করলে এই রায় ঘিরে হিন্দুদের মধ্যে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হত। তাই মুখ্যমন্ত্রী নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করেছেন।’
আমজনতা অযোধ্যার সৈয়দ বাদা এলাকার মোহাম্মদ শিবু খান মনে করেন, মসজিদের জন্য স্থানটি আদালত সুনির্দিষ্ট করে দিলে মুসলিমরা খুশি হতেন। তিনি কাতার–ভিত্তিক টিভি চ্যানেল আল জাজিরাকে বলেন, ‘তারপরেও আমি খুশি যে এটার একটা শেষ হলো। বছর জুড়ে এভাবে বন্ধ থাকতে থাকতে অযোধ্যার মানুষ ক্লান্ত।’
উত্তর প্রদেশের অন্য দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি সমাজবাদী পার্টি বা বহুজন সমাজ পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের তরফ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। বামেরা সব দিক বাঁচিয়ে বয়ান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কোনো মন্তব্য না করা কিংবা সব দিক বাঁচিয়ে বয়ান দেওয়ার চেষ্টা আসলে মুসলিমদের বিপক্ষে দেওয়া এই রায়ে সন্তুষ্টিই প্রকাশ করে।
কিন্তু এই রায় নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন ভারতের সাবেক বিচারপতি অশোক কুমার গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন, ‘এই রায়টা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হলো, সবটা ঠিক বুঝতে পারছি না। সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সেই আদালত একটা রায় দিলে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাচ্ছি না। চারশ’-পাঁচশ’ বছর ধরে একটা মসজিদ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেই মসজিদকে আজ থেকে ২৭ বছর আগে ভেঙে দেওয়া হলো বর্বরদের মতো আক্রমণ চালিয়ে। আর আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালত বললেন- ওখানে এবার মন্দির হবে। সাংবিধানিক নৈতিকতা বলে তো একটা বিষয় রয়েছে! এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যাতে দেশের সংবিধানের ওপর থেকে কারও ভরসা উঠে যায়। আজ অযোধ্যার ক্ষেত্রে যে রায় হলো, সেই রায়কে হাতিয়ার করে ভবিষ্যতে এই রকম কাণ্ড আরও ঘটানো হবে না- সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন?’
