কেন লোক টানতে পারছে না ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজন ও অনুষ্ঠান?

কেন লোক টানতে পারছে না ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজন ও অনুষ্ঠান?

রাগিব রব্বানি :

রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে ইসলাম ও ইসলাম বিষয়ক শিক্ষা-সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং ইসলাম বিষয়ক গবেষণার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। লক্ষ্য অর্জনে ইসলামকে উপজীব্য করে নানা মাত্রিক আয়োজন, অনুষ্ঠান ও কর্মশালা প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত কর্মসূচির অংশ। একসময় এসব আয়োজন-অনুষ্ঠানে ইসলামি ঘরানা ও ধর্মীয় সমাজের লোকজনের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি থাকলেও বর্তমানে খুব একটা লোকসমাগম পরিলক্ষিত হয় না। অনেকটা দায়সারা গোছে সম্পন্ন হয় প্রায় সবকয়টি অায়োজন।

ফাউন্ডেশনের মওসুমি আয়োজন-অনুষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম রবিউল আউয়াল মাসের পক্ষকালব্যাপী সিরাত মাহফিল এবং ইসলামি বইমেলা। এই আয়োজনও কয়েক বছর ধরে কেবল দায়সারা গোছে সম্পন্ন হয়। সিরাত মাহফিলে যেমন নেই শ্রোতাদের উপস্থিতি, বইমেলায়ও থাকে না উল্লেখযোগ্য হারে পাঠক সমাগম। অবশ্যি চলতি বছরের বইমেলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকজন অ্যাক্টিভিস্টের দৃষ্টি আকর্ষণের কারণে বেশ আশা জাগানিয়া উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু তার আগে রমজানে এবং আগের কয়েক বছরের বইমেলায় নতুন প্রজন্মের পাঠকদের অনেকে এ মেলা সম্পর্কে ওয়াকিবহালই ছিলেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্যে এমনটাই জানাচ্ছেন তাঁরা।

এদিকে পক্ষকালব্যাপী সিরাত মাহফিলেও (কয়েক বছর ধরে যেটাকে ঈদে মিলাদুন্নবী মাহফিল হিসেবে উদযাপন করা হয়) ছিল না কোনো লোক সমাগম। গত ৯ নভেম্বর মাহফিলের উদ্বোধনের দিন শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের আওতাভুক্ত ঢাকা জেলার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনকে শ্রোতা হিসেবে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ করিয়ে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছে। তার পরের দিনগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে মাহফিলে উল্লেখযোগ্য কোনো শ্রোতা নেই।

আরও পড়ুন : ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঈদে মিলাদুন্নবী মাহফিল : অংশগ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে ইমামদের

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এসব আয়োজন-অনুষ্ঠান দর্শক-শ্রোতাদের কেন টানতে পারছে না জানতে চেয়ে কথা হয়েছিল ইসলামি ঘরানার বহুল পঠিত ও অধুনা বিলুপ্ত পত্রিকা মাসিক রহমতের সম্পাদক মাওলানা মনযূর আহমাদের সঙ্গে।

মাওলানা মনযূর আহমাদ ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজন-অনুষ্ঠান একসময় ঝমকালো এবং জনপ্রিয় ছিল। নব্বইয়ের দশক বলি কিংবা শূন্যের দশকের সূচনার বছরগুলোর কথা বলি, সে সময় রবিউল আউয়ালের সিরাত মাহফিলে একদিকে যেমন শ্রোতাদের উপস্থিতি থাকত, অন্য দিকে দেশের বিজ্ঞ ও প্রথিতযশা আলেমগণও আমন্ত্রিত হতেন বয়ানের জন্য। বইমেলায়ও থাকত ইসলামি ঘরানার পাঠকদের উপচে পড়া ভিড়।

তিনি বলেন, তখনকার বড় বড় প্রকাশনীগুলো আগ্রহ নিয়ে মেলায় স্টল বরাদ্দ নিত। স্টল বরাদ্দের নীতিমালায়ও ছিল বেশ কড়াকড়ি। প্রকাশনীগুলোকে নিজেদের প্রকাশিত নির্দিষ্ট পরিমাণের বই দেখাতে হতো। এখন যেভাবে আতর-টুপির হকাররাও স্টল বরাদ্দ পায়, সেসময় এটা ছিল না। ফলে বইমেলা সত্যিকারার্থেই বইমেলা হয়ে উঠেছিল। ইসলামি ঘরানার লেখালেখি, সাহিত্যচর্চা বা বই প্রকাশনার সাথে সম্পৃক্ত, তারা বাংলা একাডেমির মেলার বিকল্প একটা কিছু দাঁড় করাবার স্বপ্ন দেখেছিলেন এই মেলাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু বিগত ১০-১৫ বছরে সবকিছুই উলট-পালট হয়ে গেছে।

মাওলানা মনযূর বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে এখন ধর্মীয় পরিসরে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মত প্রচারের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। সেই সঙ্গে ঢুকেছে নানা রকমের দুর্নীতি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আয়োজন-অনুষ্ঠান নানাভাবে সংকুচনের পাশাপাশি এগুলোকে কেবলই নিয়ম রক্ষা করার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ইসলামি ঘরানার নানা পথ ও মতের যে বৈচিত্র্যময়তা ছিল সেটাকেও নষ্ট করা হয়েছে। ফলে এখনকার আয়োজন-অনুষ্ঠানের প্রতি ধর্মপ্রাণ মানুষের ঝোঁক ও আগ্রহ কমে গেছে। এ ছাড়া এসব আয়োজন-অনুষ্ঠানের জন্য আগে যেভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো হতো, সেটাও এখন নেই। নেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয়। ফলত, কেবল আয়োজন-অনুষ্ঠান নয়, ফাউন্ডেশনের সবরকমের কাজকর্ম অনেকটাই খেই হারিয়েছে।

মাওলানা মনযূর আরও বলেন, ফাউন্ডেশনের এখনকার বইমেলাগুলোতে টুপি-তসবিহ বিক্রেতারাও স্টল পায়, স্টল বরাদ্দের নিয়মকানুনে যথেষ্ট শিথিলতা আনার কারণেই এমনটা হচ্ছে। ফলে বইমেলার যে রূপ এবং অবয়ব সেটা এখন আর নেই। আগে আগে প্রাচীন ইসলামি লাইব্রেরিগুলো আসত ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে, এখন তারাও আর আগ্রহ দেখায় না। আবার নতুন প্রকাশনীগুলোর মধ্যে অনেকে আসতে চাইলেও স্টল বরাদ্দ পায় না। এটা ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি এবং অবহেলার কারণে হচ্ছে। তাদের যদি সদিচ্ছা এবং সঠিক তদারকি থাকত তাহলে বাংলা একাডেমির বইমেলার বিকল্প হিসেবে এ মেলাকে দাঁড় করানো খুব কঠিন কিছু ছিল না।

একই কথা বলছেন ইসলামি ঘরানার প্রবীণ লেখক ও অনুবাদক মাওলানা আবদুর রশীদ তারাপাশী। গত শুক্রবার ফাউন্ডেশনের বইমেলায় এসে তিনি অবাক হয়েছেন। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, বাংলা একাডেমি যেমন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ইসলামিক ফাউন্ডেশনও তেমনি। কিন্তু বাংলা একাডেমির বইমেলায় যত আয়োজন, প্রস্তুতি, ঝাঁকঝমক এবং ব্যবস্থাপনা থাকে, তার ১০০ ভাগের এক ভাগও পরিলক্ষিত হয়নি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বইমেলায়। বরং আমার লজ্জা লেগেছে এমন ব্যবস্থাপনা এবং আয়োজনের অপ্রতুলতা দেখে।

তিনি বলেন, মানলাম, বাংলা একাডেমিরটা জাতীয় গ্রন্থমেলা তাই এতো ব্যাপক ব্যবস্থাপনা এবং বিশালতা, কিন্তু ফাউন্ডেশনের মেলায় তো অন্তত নূন্যতম ব্যবস্থাপনাটা রাখা দরকার ছিল। বইমেলার এমন দায়সারা ভাব এবং অব্যবস্থাপনা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গাফলতি এবং অবহেলাকেই প্রমাণিত করে বলে আমি মনে করি।

আগের সংবাদএনআরসি আতঙ্কে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকছেন শত শত মানুষ, অধিকাংশই মুসলিম
পরবর্তি সংবাদরোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে আল-জাজিরার নতুন ভিডিওচিত্র