রাকিবুল হাসান :
‘আমি আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করছি—আন্দোলন-সংগ্রামের যাবতীয় দুর্যোগ এবং অভিজ্ঞতা আমি অবলোকন করেছি। এখনো আমার মেরুদণ্ড সটান, দিব্যি হেঁটে চলছি। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি প্রজন্ম একটির বেশি পরাজয় নিতে পারে না। অথচ আমি নিজেকে ছয় কিংবা সাতটি জয় অথবা পরাজয়ের জন্য প্রস্তুত করছি। একবার পরাজয়ে ভেঙে পড়ার সূত্রটা ব্যবসায়ী, ক্রীড়াবিদ এবং রাজনীতিবিদের জন্য, আমাদের জন্য নয়। কারণ আমাদের কাছে জয়-পরাজয় বড় কথা নয়; বড় কথা হলো আল্লাহর রিসালাত যথাযথভাবে সম্পাদন করা। নিজেদের দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে আদায় করা। এজন্য যেকোনো পরিস্থিতিতে, সামান্য একটু সম্ভাবনায় আমাদের কাজ করে যেতে হয়। জয় পেলে আমাদের প্রার্থনা—যেন আমরা আত্মপ্রবঞ্চনার স্বীকার না হই, কাউকে যেন যুলুম না করি। হেরে গেলে গেলে আমাদের প্রার্থনা—যেন আমরা লাঞ্ছিত এবং নিপীড়িত না হই।’
মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে নিজের ছেলে ইহসানকে লেখা আলি শরিয়তীর সর্বশেষ চিঠি। ছোট্ট এই চিঠিতে তিনি বুনে দিয়ে গেছেন বিশাল বিপ্লবের বীজ। যদিও এই চিঠি লেখার কিছুদিন পর তাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার এই চিন্তা লেলিহান শিখার মতো ছড়িয়ে পড়ে ইরান বিপ্লবীদের মনে মনে। তার বুনে দেওয়া বীজ তার মৃত্যুর দু বছর পর মহীরূহ হয়েছে। বিজয় পেয়েছে তার গড়ে তোলা বিপ্লব।
আলী শরিয়তীর বিকাশ
ষাটের দশকে আলি শরিয়তীর যখন বিকাশ, ইরানে ক্ষমতায় তখন রেজা শাহ। তার রাজনৈতিক উদার দৃষ্টিভঙ্গি লেজুড়বৃত্তির জন্ম দেয়। তিনি অর্থনীতিকে পশ্চিমা আদলে ঢেলে সাজান। বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রসার করেন। সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করেন। ইরানের সামাজিক জীবনে, মানুষের আয়-রুজিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। জনগণ হাসফাঁস শুরু করে।
‘সংস্কার চাই, অত্যাচার নয়’ স্লোগানে শাহের বিপরীতে একমাত্র দল জাতীয় ফ্রন্ট। একসময় জাতীয় ফ্রন্ট নিবু নিবু হয়ে আসে। বেড়ে যায় শাহের দৌরাত্ম। ইরানকে পশ্চিমাকরণের পথ পরিষ্কার করতে শুরু করে ইসলামকে দুর্বল করার প্রয়াস। ইসলামি নিয়ম-কানুন বিকৃত এবং পরিবর্তন করার তোড়জোড়।
ইরানে তখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দুটি ধারায় বিভক্ত। এক. এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান আয়াতুল্লাহ খামেনেই। তার দৃষ্টিভঙ্গি হলো—প্রতিষ্ঠান থেকেই বিপ্লব করা এবং সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। দুই. এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ফকিহগণ। এদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো—ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিপ্লব নয়, বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষা করতে রাজনৈতিক কিংবা অন্যান্য কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়া।
ইসলামবিরোধী আন্দোলনের সর্বশেষ পর্যায়ে ১৯৬৩ সালে ৫ জুন শাহ ভয়ংকর এক গণহত্যা চালায়। তখন আয়াতুল্লাহ খামেনেইকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৪ সালে দেশান্তরে নির্বাসন দেয়া হয়।
আয়াতুল্লাহ খামেনেইর গ্রেফতার ও দেশান্তরের পর শূন্যতা ভর করে প্রথম ধরনের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে। বিপ্লবই যেখানে মূল। হয়ত দিক হারাত প্রতিষ্ঠানটি। ঠিক এই সময় এর হাল ধরেন আলি শরিয়তী। যিনি ইরান জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলনের সদস্য এবং প্যারিসে ইরান মুক্তি আন্দোলনের শাখার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রাজনৈতিক পদচারণা শুরু করেছিলেন। তিনি আবার নতুন করে রূহ ফুঁকে দিলেন খামেনেইর আন্দোলনে।
আলি শরিয়তীর বাবা একজন লেখক। তিনি শিয়া মতবাদে ঢুকে যাওয়া কুসংস্কারকে বিশুদ্ধ করতে আগ্রহী ছিলেন। আলি শরিয়তী তার বাবার সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘হুসাইনি গাইডেন্স’। এই প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলো আলি শরিয়তীর চিন্তা বিনিময়ের সবচে বড় মঞ্চ। শত শত যুবক এখানে আসত লেকচার শুনতে। তিনি বিপ্লবের বাণী, জাগরণের চেতনা লেকচারের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেন যুবকদের রক্তের ফোঁটায় ফোঁটায়। এতটাই প্রসিদ্ধ এবং জনসম্পৃক্ত হয়ে পড়ে তার বক্তৃতা এবং প্রতিষ্ঠান, সরকার ভীত হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। আলি শরিয়তীকে আটক করে।
কিন্তু আলি শরিয়তি ছিলেন একটু এগিয়ে। তিনি সম্মুখ সমরে না গিয়ে এবার অন্যপথে এগুলেন। দর্শন, ইতিহাস, সমাজকর্ম এবং ধর্মতত্ত্ব পড়লেন ফ্রান্সে গিয়ে। সম্পর্ক করলেন বিশ্বজুড়ে মুক্তি আন্দোলনগুলোর সাথে। বিশেষ করে আলজেরিয়ার সাথে। তিনি তার তত্ত্ব এবং পড়াশুনার অভিজ্ঞতা দিয়ে নতুন করে গড়তে চাইলেন সমাজ। ইসলামকে তত্ত্ব থেকে বের করে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন মানুষের আচারে, আচরণে।
জামিল কাসিম বলেন, আলি শরিয়তী মার্কসবাদ এবং বুর্জোয়া মতাদর্শের বাইরে তৃতীয় মতাদর্শ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন।
আলী শরিয়তীর চিন্তাধারা
রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিদেশি আধিপত্যের মূলোৎপাটন চাইতেন আলি শরিয়তী। তিনি ভাবতেন, নিজের দেশের অর্থনীতিকে পশ্চিমাকরণ করতে গিয়ে আসলে আমরা আমাদের নয়, তাদের বাজার বড় করছি। তাদের সভ্যতা চর্চা করছি। এটা একটা বোকামি।
আলি শরিয়তী মুক্তির দাবি এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে পশ্চিমাদেরকে আইডল মানার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, পশ্চিমারা নিজেদের মাটিতে মানবাধিকারের কথা বলে, অথচ দেশের বাইরে হত্যাযজ্ঞ চালায়। ফ্রান্স নিজের দেশের রাজধানীকে করে তুলেছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র, অথচ তারা অন্যদেশে চালায় নারকীয় তাণ্ডব। সুতরাং আইডল হিসেবে পশ্চিমাদের চিন্তাপুরুষ মার্কস, সার্ত্রে, হেগেল এবং নিটেশদের নেয়ার দরকার নেই। আমাদের ইতিহাসেই তো আদর্শ ও আইডলের অভাব নেই। আমরা আদর্শ হিসেবে নিতে পারি আবু যর গিফারি, সালমান ফারসি, আলি ইবনে আবু তালিব, হুসাইন, ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের। পশ্চিমাদের অনুকরণ এবং অতীতের অন্ধ অনুসরণে বাইরে তৃতীয় কোনো পথ খুঁজতে হবে। আর সেই তৃতীয় পথটি হলো ইসলাম। এখানে ফিরে আসলেই কোনো বৈপরীত্য পাওয়া যাবে না। সবচে বেশি মানবতার কথা বলে ইসলাম। সর্বব্যাপী সুরক্ষার কথা বলে ইসলাম।
পুরো বিশ্বের জন্য ইসলামকেই একমাত্র ত্রাণকর্তা হিসেবে মানতেন তিনি। খেলাফত এবং ইমামত দুটো একই বিষয় হিসেবে গণ্য করতেন। পারিভাষিক কোনো তর্কে যেতেন না তিনি। বলতেন, ইসলামে ধর্ম এবং রাজনীতির মধ্যে পার্থক্য নেই। ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যা মানুষকে পরিশীলিত করে গড়ে তুলে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ উপহার দেয়। মানুষ সামাজিক জীব। সুতরাং সুন্দর সমাজ বিনির্মানে মুসলিমদের বিপ্লব কিভাবে পরিচালিত করা যায়, তা ভাবতে হবে।
ইরানে বিপ্লবের চিন্তাপুরুষ আলি শরিয়তী। যে চিন্তার প্রদীপ তিনি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, তার সামনে দাঁড়িয়ে তাই মনে হয়। ইরানের অন্যান্য চিন্তাবিদের মতোই চিন্তা করেছেন আলি শরিয়তী। কিন্তু তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী, যা অন্যদের থেকে তাকে আলাদা মর্যাদা দিবে? পার্থক্যটা হলো অন্যদের মতো কেবল গ্রন্থেই তার চিন্তা আটকা পড়েনি। বরং তার হাজার হাজার ছাত্রের মাধ্যমে তার চিন্তা দিকবিদিক ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি যে নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন, প্র্যাকটিক্যালি ইসলামকে তুলে আনতে চাইতেন জীবনে, সে স্বপ্ন তার চোখ থেকে তারা হাজার হাজার ছাত্রের চোখেও বাসা বুনেছে। এখানেই অন্যদের সঙ্গে তার পার্থক্য।
আল জাজিরা অবলম্বনে
