কওমী মাদরাসার অর্থনীতি

কওমী মাদরাসার অর্থনীতি

আশরাফ উদ্দীন খান :

‘কওমী অর্থনীতি’ এখানে একটি বিশেষ পরিভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর দ্বারা আমাদের বুঝানো উদ্দেশ্য ‘কওমী মাদরাসা পরিচালনা ও এর ছাত্র-শিক্ষকের সাথে সম্পর্কিত অর্থনীতির সাথে জড়িত বিভিন্ন বিষয় ও হালাত’ অর্থাৎ এর মাধ্যমে বুঝানো হচ্ছে দেশের কওমী মাদরাসা পরিচালনার অর্থের জোগান, সম্ভাব্য ব্যয় সংগ্রহের পথ ও পদ্ধতি, শিক্ষকদের সন্মানী ও সেই সাথে কওমী মাদরাসার ছাত্রদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে চিন্তা, পর্যালোচনা, পরিকল্পনার সাথে সম্পর্কিত নানা বিষয়। পরিভাষা হিসাবে শব্দটি বহুল পরিচিত না হলেও, পরিভাষাটির ধারণা আমাদের অধিকাংশ জনের কাছেই পরিচিত।

পরিভাষাটি সৃষ্টির প্রেক্ষাপট

পরিভাষাটি সৃষ্টির পিছনে প্রত্যক্ষ প্রেক্ষাপট তৈরি হতে যে সকল কারণ ভূমিকা রাখে তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে চলতি বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের কুরবানির ঈদের কুরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চামড়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট তৈরি করে চামড়ার বাজারে সংকট সৃষ্টি করার ঘটনা। চামড়ার মালিকেরা যে কারণে সামান্যতম নামমাত্র মুল্যে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন, অথবা অনেকেই চামড়া বিক্রি না করে সেই চামড়া জমিতে পুঁতে ফেলেন।

এর ফলে দেশের একটি উল্লেখযোগ্য শিল্পখাত ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সাথে সাথে দেশের অধিকাংশ কওমী মাদরাসা বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কারণ এই চামড়ার মাধ্যমে কওমী মাদরাসার আর্থিক জরুরতের একটি বড় অংশ পূরণ হয়ে থাকে। কিন্তু এবার কুরবানির ঈদের পর মাদরাসার সেই জরুরত পূরণ না করেই তাদের ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখতে হয়।

চামড়ার বিষয়টি ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝে গভীর ‘সদমা’র সৃষ্টি করে এবং এই কারণে অনেকেই অনেক ভাবে নড়ে-চড়ে বসেন, এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী হতে পারে সেই জন্যে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। সেখান থেকেই আমাদের মধ্যে এই চিন্তা, এবং সেই চিন্তা থেকেই এই আলোচনা।

এখানে দুটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরী বলে মনে হয় যে, আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিভিন্নভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা যে হয় না–সেটা বলা যায় না। তবে আলোচনা যেটা হয়ে থাকে যদি তার দিকে খেয়াল করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে সেই আলোচনার অধিকাংশই ব্যক্তিগত অনুভূতি, আশা-আশংকা বা আবেগ-তাড়িত হয়ে থাকে। চামড়ার বিষয়টি সামনে আনা যাক। চামড়া সমস্যার পরে অনেকের আলোচনা ছিল এমন যে ১৪ শো’ বছরে কেউ এই কওমী মাদরাসা বন্ধ করতে পারেনি, ইনশা আল্লাহ চামড়ার সমস্যার মাধ্যমেও এই কওমী মাদরাসা বন্ধ করা যাবে না। অথবা এই মাদরাসার হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালার হাতে, কাজেই মাদরাসা নিয়ে যতই ষড়যন্ত্র করা হোক না কেন সেই ষড়যন্ত্র সফল হবে না… । এখানে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, প্রকারান্তরে যেন সমস্যার সমাধানে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকার ভিত্তিতে আমাদের যা করণীয় ছিল যেন সেই করণীয় থেকে আমরা আমাদেরকে দূরে সরিয়ে নিলাম। অথচ সমস্যার সমাধানের জন্যে আমাদের উপরও যে করণীয় কিছু আছে সেটাও বিবেচনা করা জরুরী ছিল।

প্রেক্ষাপটটি এভাবে উল্লেখ করার কারণ এই দিকে ইঙ্গিত করা যে, জাতি হিসাবে বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন সমস্যাকে কেন্দ্র করে এটা অনেক বার প্রমাণিত হয়েছে যে, যে কোন সমস্যার জন্মস্থান ও জন্মকালের বাইরে সেই সমস্যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এখনো আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়নি। যার নেতিবাচক প্রকাশ এমন হতে পারে যে, এটা আমাদের অনেকটা জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে যে, যে কোন সমস্যা যখানে ঘটে বা যে সময়ে ঘটে সেই স্থান ও সময়ের মধ্যেই আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে। আবারো চামড়ার প্রসঙ্গ আনা যাক। সমস্যার সৃষ্টি হল সেটা নিয়ে আমরা সোচ্চার হলাম, কিছুদিন পরে আবার নিরব হয়ে গেলাম, কিন্তু সমস্যার সমাধান কিছু হল না। সামনের বছরে যদি–আল্লাহ না করুন–আবার এই সমস্যার সৃষ্টি হয়–সৃষ্টি না হওয়ার কোন কারণ আমাদের সামনে যদিও নেই–আবার আমরা সোচ্চার হবো, কিছুদিন পর হয়ত আবার নীরব হয়ে যাবো, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্যে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা সন্দেহ রয়েই যায়।
এই প্রেক্ষাপট থেকেই আমাদের মনে হয়েছে ‘কওমী অর্থনীতি’ হিসাবে আমাদের সামনে আমাদের নিজেদের অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা বিদ্যমান থাকা জরুরী। হয়ত এই জন্যে সনাতন কিছু ধারণা বা পদ্ধতির পরিবর্তন করার চিন্তা আসতে পারে, নতুন কোন ধারণার সৃষ্টি হতে পারে, যার মাধ্যমে আমাদের অর্থাৎ কওমী মাদ্রাসার অর্থনৈতিক দিকটা আরো বেশী হিকমতপুর্ণ হতে পারে।

কওমী মাদরাসার চলমান অর্থনীতি বা অর্থনৈতিক অবকাঠামো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে গেলে আমাদের সামনে কুরআন-হাদীসের অনেক নুসুস, নুসুসের ব্যাপারে আমাদের ব্যাখ্যা ও আমলকে কেন্দ্র করে এবং সেই সাথে শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত বেশ কিছু মৌলিক ধারণা ও বোধের স্পষ্ট জবাব দিতে হয়। এরপর হয়ত এই বিষয়ে কোন একটি অবস্থান গ্রহণ করা যেতে পারে। এখানে সেই সকল বিষয়ের কিছু বিষয় উল্লেখ করে অতি সংক্ষেপে তার জবাব দেওয়ার বা আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আরো গভীর ও বিস্তারিতভাবে চিন্তা-গবেষণার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি

বিষয়টি সাধারণ শিক্ষার সাথে যে পরিমাণ সম্পর্কিত, ইসলামী শিক্ষার সাথে সেইভাবে সম্পর্কিত নয়। তাহলে এরপরেও কেন এই বিষয়ের অবতারণা করার দরকার মনে করা হল? ইসলামী বা দ্বীনী শিক্ষা ও মুসলিম উম্মাহর শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য আমাদের সামনে স্পষ্ট হওয়া দরকার। পবিত্র কুরআনের হেফজ করাকে দ্বীনী শিক্ষা হিসাবে বিবেচনা করা, হাদীসের শিক্ষা, আকাইদ শিক্ষা বা এই-জাতীয় আরো অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোর শিক্ষাকে দ্বীনী শিক্ষা হিসাবে বিবেচনা করা খুবই স্পষ্ট বিষ –এতে কোন সন্দেহ নেই। কাজেই এই ধরণের শিক্ষার পিছনে দ্বীনের উদ্দেশ্য ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। এটা গেল দ্বীনী শিক্ষার বিষয়।

দ্বিতীয়ত যে বিষয় সেটা হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর শিক্ষাব্যবস্থা। কওমী মাদরাসা বা আলিয়া মাদরাসাকে কি আমরা দ্বীনী শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করবো না মুসলিম উম্মাহর শিক্ষাব্যবস্থা হিসাবে বিবেচনা করবো? যদি দ্বীনী শিক্ষাব্যবস্থা হিসাবে বিবেচনা করি তাহলে এখানে যা শিক্ষা দেওয়া হয় সেই বিষয়কে শুধুমাত্র দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হয়, কাজেই এখানে কি বিষয়ের শিক্ষা প্রদান করা হবে, এবং কেন ও কিভাবে সেই শিক্ষা প্রদান করা হবে তা দ্বীনী দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নির্ধারিত হবে। আর যদি এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরা মুসলিম উম্মার শিক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে বিবেচনা করি তাহলে মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক ভাবে বিভিন্ন জরুরত ও প্রয়োজনের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হতে হবে এখানে কি বিষয়ের শিক্ষা প্রদান করা হবে, এবং সেই সকল বিষয়ের শিক্ষা কেন ও কিভাবে প্রদান করা হবে।

একটি সাধারণ পরিসংখ্যানে দাবী করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর একজন মাদরাসার শিক্ষার্থী। চারজনের একজন দ্বীনী শিক্ষা গ্রহণ করছেন, কিন্তু আর বাকি তিনজন যেই শিক্ষার ধারার সাথে জড়িত তারা কি সেখানে ধর্মীয় প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করার পরিবেশ পাচ্ছে–সেটা আমাদের বিবেচনা করার বিষয়। বা অন্যভাবে বলতে গেলে দেশের মাদরাসাসমূহের বাইরে–চাই সেটা কওমী মাদরাসা হোক অথবা আলিয়া–যারা শিক্ষা গ্রহণ করছেন তারা কি মুসলমান হিসাবে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করার সুযোগ ও পরিবেশ পাচ্ছেন? মোটেও পাচ্ছেন না। কাজেই কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার বাইরের শিক্ষাকে পরিপুর্ণ করার সম্পূরক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা করার মত কোন প্রতিষ্ঠান দেখা যায় না। কাজেই এটা বলা যায় না যে, যেহেতু আমাদের জাগতিক শিক্ষার দিকটি সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে তাই ধর্মীয় শিক্ষার দিকটা আমরা মাদরাসা শিক্ষার মাধ্যমেই পূরণ করতে পারি। অর্থাৎ সাধারণ শিক্ষা ও মাদরাসাশিক্ষাকে একে অপরের সম্মুরক শিক্ষা হিসাবে বিবেচনা করার মত পরিবেশ ও সুযোগ আপাতত নেই। এটা গেল এক দিকের কথা।

এবার আসা যাক শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে। প্রথমে সাধারণ শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটু আলোচনা করে দেখি যে শিক্ষাকে সেখানে কি দৃষ্টিতে দেখা হয়ে থাকে, বা সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে সময়ের ব্যবধানে কোন ধরণের পরিবর্তন এসেছে কি না।

মানব সমাজের ইতিহাসের শুরুতে যখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা শুরু হয়, তখন শিক্ষাকে মূলত মানব আত্বার উন্নতির একটি মাধ্যম হিসাবে দেখা হত আরো সহজ ভাষায় শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল শুধুই শিক্ষা অর্থাৎ শিক্ষাকে শিক্ষার উদ্দেশ্যেই প্রদান করা হত। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের শুধুমাত্র মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ হাসিল হত, শিক্ষার মাধ্যমে পার্থিব কোন প্রাপ্তির উদ্দেশ্য মানুষের ছিল না।

সময়ের ব্যবধানে শিক্ষার প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের সৃষ্টি হয়ে যায়, শিক্ষাকে শুধুমাত্র মানুষের আত্বিক-নৈতিক ও মানসিক উন্নতির মাধ্যম হিসাবে বিবেচনা করার সাথে সাথে শিক্ষাকে মানুষের পার্থিব উন্নতি-অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যম হিসাবে দেখার প্রবণতা ও বাস্তবতা শুরু হয়। শিক্ষার সাথে মানুষের জাগতিক উন্নতি ও অগ্রগতির সম্পর্ক নির্ধারিত হয়ে যায়। তাই দেখা যায় যে, যে জাতি যত বেশী শিক্ষিত অর্থনৈতিকভাবে বর্তমানে তারা তত বেশী শক্তিশালী।

এই অবস্থার পিছনে মানব জাতির অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বিবর্তন মূল কারণ। মানব জাতির প্রথম অর্থনৈতিক জীবন ছিল কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, এরপরে তাদের অর্থনীতি হয় শিল্প-নির্ভর অর্থনীতি, শিল্প বিপ্লবের পরে মানব জাতির অর্থনীতি হয় ব্যবসা-নির্ভর অর্থনীতি, আর এখন মানব জাতির অর্থনীতি হচ্ছে তথ্য-উপাত্ত ও জ্ঞান নির্ভর অর্থনীতি। জ্ঞান উৎপাদন, প্রয়োগ, জ্ঞানের বিশ্লেষণ, জ্ঞান বিতরণের সাথে এখনকার অর্থনীতি গভীরভাবে সম্পর্ক রাখে।

এখান থেকেই শিক্ষার ব্যাপারে দৃষ্টিগভঙ্গির ব্যাপারে দুটি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে এবং এই বিতর্ক হয় যে, শিক্ষাখাত কেই সেবার খাত না শিক্ষার খাত একটি বিনিয়োগের খাত? অনেকেই বলেছেন যে, শিক্ষার সূচনা হয়েছিল সেবার খাত হিসাবে তবে সেটা সময়ের ব্যবধানে বিনিয়োগের খাতে পরিণত হয়েছে, তবে বাস্তবে নিরপেক্ষভাবে যারা জ্ঞান ও শিক্ষাকে দেখে থাকেন তাদের অনেকেই শিক্ষাকে সেবা ও বিনিয়োগ উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনা করে থাকেন। এটা গেল সাধারণ শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির কথা। ইসলামী শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে যখন আলোচনা করা হয় তখন বিষয়টাকে এই সরল ভাবে ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ করা যায় না। এই আলোচনার জন্যে আমাদেরকে সামনের ‘ধারনা’র উপর কিছুটা নির্ভর করতে হবে। আর সেই ধারণাটি হচ্ছে ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাপ্রাপ্ত জ্ঞানের প্রকার কি তা নির্ধারণ করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাপ্রাপ্ত জ্ঞানের প্রকার

আমরা যা শিখি তা কয়েক ধরণের। এক. সামাজিক জ্ঞান, দুই. ধর্মীয় জ্ঞান, তিন. সময়ের জ্ঞান, চার. আর্থিক জরুরত পূরণ করার জ্ঞান ও প্রযুক্তি বা সমাজের প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করার জ্ঞান।

ধর্মের প্রতি সঠিকভাবে চলার জন্যে ধর্মীয় জ্ঞান ও শারিয়াতের ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজ। সেই ফরজ পরিমাণ অর্জন করার পরে অনেকেই দ্বীনের অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করার জন্য এবং গভীরতা অর্জন করার জন্যে অনেকেই সময় ও মেহনত নিয়োজিত করে থাকেন। এর পুরাভাগ নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে।

সামাজিক জ্ঞান হচ্ছে এমন কিছু জ্ঞানের প্রকার যা সমাজে সকলের সাথে মিলে মিশে চলার জন্যে আমাদেরকে শিক্ষা অর্জন করতে হয়, এর প্রধানতম প্রকার হচ্ছে সমাজের ভাষা, সমাজের সাধারণ সংস্কৃতি, আচার-অভ্যাস ইত্যাদি। এই প্রকার জ্ঞানের কিছু অংশ মানুষ পরিবার ও সমাজে থেকে অর্জন করে আবার কিছু অংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও অর্জন করে থাকে।

সময়ের জ্ঞান হচ্ছে এমন কিছু বিষয়ের জ্ঞান যা সেই সময়ের দাবী ও চাহিদা অনুযায়ী চলার জন্যে একজন মানুষকে শিক্ষা অর্জন করতে হয়। যেমন বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আধুনিক বিষয়ের ব্যবহারিক জ্ঞান একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। এটাও মানুষ বিভিন্ন মাধ্যম ও প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জন করে থাকে।

আর সবশেষে মানুষকে তার অর্থনৈতিক জরুরত ও প্রয়োজন পূরণ করার জন্যেও কিছু জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এটা সময় ও সমাজের ব্যবধানে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এটা বাস্তবতা যে, মানুষের জীবন যাপনের জন্যে বিভিন্ন জরুরতের মধ্যে একটি বিশেষ জরুরত হচ্ছে অর্থনৈতিক জরুরত। বিভিন্ন পেশা ও কর্মের মাধ্যমে মানুষ তাঁর অর্থনৈতিক জরুরত পূরণের ব্যবস্থা করে থাকে। কারো পন্থা হয়ে থাকে কৃষিকাজ, কারো ব্যবসা, কারো চাকুরি বা সেবা প্রদান ইত্যাদি।

এখানে একটি বিষয় খেয়াল করার যায় যে, জ্ঞানের কোন কোন শাখা রয়েছে যার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা যায় না। অর্থাৎ কিছু জ্ঞান আছে জানার জন্যে বা নিজের কোন প্রয়োজন পূরণ করার জন্যে, তবে তা আর্থিক প্রয়োজন পূরণ করার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে না। তবে এতটুকু পূরণ করতে পারে যে, যদি কোন ব্যক্তি সেই জ্ঞানের শিক্ষাদানের সাথে নিজেকে জড়িত করতে পারেন। ব্যবসায়িক লেনদেন ও ইতিহাসের বিষয় দুটি যদি আমাদের সামনে রাখি তাহলে এই দাবীটি স্পষ্টভাবে বুঝা যেতে পারে।

শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব কার : সরকারের, সমাজের, অভিভাবকের?

এটা একটি বাস্তবতা যে, শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্যে অনেক কিছু বিষয়ের প্রয়োজন পরে। যদি সেই সকল বিষয়কে সাধারণ ভাবে নির্ধারণ করতে যায় তাহলে দেখা যায় যে, এর প্রধানতম বিষয় হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন, ভবন পরিচালনা, ভবন মেরামত। শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন, ভাতা, সন্মানী। ছাত্রদের আবাসন, খাদ্য, স্বাস্থ্য সেবা। শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও উপকরণ ইত্যাদি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সকল বিষয়ের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব কার? এটা কখনো দেশের সরকারের হতে পারে, অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকেই এই সকল বিষয়ের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে শিক্ষাকে দেশের জনগণের জন্যে উন্মুক্ত ও সহজলভ্য করে দেওয়া হয়, আবার কখনো এটা সমাজের শিক্ষাঅনুরাগী মানুষের মাধ্যমে হয়ে থাকে, আবার কখনো এটা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এখান থেকেই প্রায় প্রতিটি দেশেই সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থা ও বেসরকারি বা বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থা নামে আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠে, এবং তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।

শিক্ষা ব্যবস্থার দার্শনিক ভিত্তির পাশাপাশি আরো কিছু ভিত্তি রয়েছে যেমন ধর্মীয় ভিত্তি, সামাজিক ভিত্তি, শিক্ষার্থীদের মানসিক, প্রশাসনিক ভিত্তি ইত্যাদি। প্রশাসনিক ভিত্তি হচ্ছে এই যে, যখন যাদের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়ে থাকে তখন তাদের আদর্শ, মূল্যবোধের ছায়া পরিপুর্ণভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি প্রতিফলিত হয়ে থাকে। একটি দেশের সরকার যে আদর্শ ও মূল্যবোধ পালন করেন, এবং ধর্মের সাথে তার সম্পর্ক যতটুকু এবং ধর্মকে তিনি যতটুকু পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে থাকেন ঠিক ততটুকুর প্রতিফলন তাঁর নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে দেখা যাবে।

দ্বীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মুসলিম উম্মাহর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে দ্বীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরুর দিকে রাষ্ট্রের ‘বাইতুল মাল’ থেকেই এই ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেখাশোনা ও অর্থ নির্বাহ করা হত। সরকারের পাশাপাশি অনেক সামর্থবান মুসলমান দ্বীনী শিক্ষার প্রচার-প্রসারে স্বতস্ফুর্তভাবে এগিয়ে আসতেন ও অংশগ্রহণ করতেন। পাক-ভারত উপমহাদেশে দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থায়নের ইতিহাস পর্যালোচনা দেখা যায় যে, এই অঞ্চলে এমন অনেক জমির খোজ পাওয়া যায় যেকে ফিকাহ শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘লা-খিরাজ’ বলা হত। অনেক সামর্থবান মুসলমান নিজেদের জমি এইভাবে মসজিদ বা মাদরাসার জন্যে বরাদ্দ করে দিতেন এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার থেকে খিরাজ উসুল করা হতো না। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ইংরেজ উপনিবেশ শাসনামলে এই ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। যার ফলে দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ানের উপর বিরাট একটা ধাক্কা আসে। তবে দ্বীনী প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার জন্যে মুসলিম উম্মাহর চিন্তাশীল আলেম-উলামা তখন থেকে বিকল্প পথ-পন্থা অবলম্বন শুরু করেন এবং তখন থেকে শুরু হয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের থেকে অর্থ সহযগিতা সংগ্রহ করার সিলসিলা।

এখানে যে বিষয়টি লক্ষ্যণীয় সেটা এই যে, প্রথম দিকে মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে যেমন অংশগ্রহণ করতেন এখনকার সময়ে সেই ভাবে স্বতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করা তেমন আমাদের চোখে পড়ে না। নিকট-অতীতেও মানুষ যেই আগ্রহ ও উদ্দীপনা নিয়ে দ্বীনের এই সকল প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় যেভানে এগিয়ে আসতেন বর্তমানে সেই আগ্রহ ও উদ্দীপনার মধ্যে দুর্বলতা লক্ষ করা যায়।
ইসলামী শিক্ষার জন্যে প্রথম দিকে বাইতুল মাল বা সরকারের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ পৃষ্ঠপোষকতা ছিল এখন তার কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই। সরকারের স্থানটি অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মপ্রাণ মুসলিম সমাজ নিজের উপর ফরজ করে নিয়েছিলেন। যার ফলে সাধারণ দান, ওয়াকফ, করবানির চামড়ার মত উৎস থেকে এই জরুরত পূরণ হয়ে আসছিল। এখন যেহেতু এই সকল বিষয়ে বাঁধা আসছে তাই এর বিকল্প কি হতে পারে সেই বিষয় নিয়ে আমাদেরকে চিন্তাভাবনা করতে হবে।

চিন্তার প্রাথমিক পর্যায়ে এটা ভেবে দেখা যায় যে, এতদিনে যেভাবে অবৈতনিকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষা পরিচালিত হয়ে আসছিল, মাদরাসার জরুরত পূরণ করার উদ্দেশ্যে সেই অবস্থার সংস্কার করে সেখানে বেতন ব্যবস্থা চালু করা যায়। আবার যেহেতু অনেক ধর্মপ্রাণ কিছু মানুষ একদিকে যেমন এই শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করার কিছু লোক পাওয়া যাবে এবং সেই সাথে এমন শিক্ষার্থীও পাওয়া যাবে যাদের আর্থিক অবস্থা তেমন সহজ হবে না, তাই তাদের জন্যে বিশেষ কোন বৃত্তির ব্যবস্থা অবশ্যই রাখতে হবে।

শিক্ষার্থীদের আর্থিক জরুরত পূরণ হওয়ার মাধ্যম বা কর্মসংস্থান নির্ধারণ

এই আলোচনার প্রথম দিকে এই বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, কওমী মাদ্রাসাসমূহকে আমরা দুই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে পারিঃ একঃ দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দুইঃ মুসলিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই দুইভাবে বিবেচনা করার কারণে মাদ্রাসার অবকাঠামো ও ভিত্তিমূল হিসাবে যে রুপরেখা নির্ধারিত হয়ে যায় সেটা সেখানে আলোচনা করা হয়েছিল। কওমী মাদ্রাসাসমূহকে আমরা মুসলিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা করে বলছি, যেহেতু বর্তমান সময়ের অর্থনীতি জ্ঞান-নির্ভর অর্থনীতি, তাই মাদরাসাসমূহে দ্বীনী শিক্ষাদানের পাশাপাশি ছাত্রদেরকে এমন বিষয়ের শিক্ষাদান করতে হবে যার মাধ্যমে তারা মাদ্রাসার শিক্ষা থেকেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার মত যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। এই জন্যে সময়ের প্রেক্ষাপটে এমন কিছু বিষয় ছাত্রদেরকে অবশ্যই শিক্ষা প্রদান করতে হবে যারা মাধ্যমে তারা তাদের কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। এখানে এসে আমাদের সামনে কিছু বাঁধা বা প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়, যার সঠিক উত্তর বা ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরী।

উপসংহার

মুসলমান হিসাবে ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর উপর ভরসা একটি মৌলিক সিফাত যা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরী। তদ্রুপভাবে দ্বীনের দায়ীগণ যেহেতু নবী-রাসুলদের ওয়ারিস এবং নবী-রাসুলদের ব্যাপারে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে বলা হয়েছে তারা তাদের দাওয়াতের সময় তাদের কওমের সামনে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না, আমার পারিশ্রমিক একমাত্র আল্লাহর নিকট।’ এই ধরণের নুসুস, আমাদের আকাবিরের বিভিন্ন কর্মপন্থা ও ধারণার স্পষ্ট ব্যাখা-বিশ্লেষণ করাও কওমী-অর্থনীতির আওতায় পড়ে।

এখানে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল এই দিকে ইঙ্গিত করা যে, সময়, সমাজ ও অবস্থার পরিবর্তনের কারণে মানুষের কর্ম পদ্ধতির মধ্যে নানা ধরণের পরিবর্তনের দরকার পরে থাকে, যার ফলে সময়ের প্রয়োজনে সে সকল বিষয়ে নতুনভাবে ভাবতে হয়, কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করতে হয়। কওমী মাদরাসার অর্থায়ন, মাদ্রাসার আর্থিক জরুরত সংগ্রহের পথ-পদ্ধতি, ছাত্রদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে আরো বাস্তবসম্মত পদ্ধতিতে আমাদের ভাবতে হবে, পথ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। যার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে দ্বীনী শিক্ষা এবং এই শিক্ষার সাথে জড়িত শিক্ষার্থীদের স্বার্থের দিকে খেয়াল করেই।

আগের সংবাদআ. লীগ নেতার বিরুদ্ধে কবরস্থান দখলের অভিযোগ
পরবর্তি সংবাদনিখোঁজ হলেন মাদরাসাশিক্ষক আরেক আতিকুল্লাহ