রাগিব রব্বানি :
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার তিন বছর পর আজ (বুধবার) এ হামলার সঙ্গে জড়িত সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত। সন্ত্রাস-বিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল দুপুরে এ রায় ঘোষণা করে।
২০১৬ সালের ১লা জুলাই রাতে অভিজাত এ রেস্তোরাঁটিতে আকস্মিক হামলা চালায় অস্ত্রধারী কিছু যুবক। তার পরপরই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় শান্ত-সমাহিত এই এলাকাটি। যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল পরদিন সকাল অবধি। এই ঘটনায় ১৮ জন বিদেশি নাগরিকসহ সেদিন ২২ জন নিহত হযন।
নিহতদের মধ্যে নয় জন ইতালির, সাত জন জাপানের, তিন জন বাংলাদেশি, যাদের একজনের দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল এবং এক জন ভারতীয় নাগরিক। এছাড়া দুইজন পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হয়েছিলেন হামলাকারীদের গুলিতে।
আরও পড়ুন : হলি আর্টিজানের তিন বছর : ফিরে দেখা গুলশান হামলা
কারা হামলা করেছে?
হামলার দায় ঘটনার দিন রাতেই স্বীকার করেছে আইএস। হামলার সঙ্গে যারা জড়িত বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রত্যেকেই সমাজের উচ্চবিত্ত এবং শিক্ষিত ফ্যামিলির সন্তান। অধিকাংশই বিভিন্ন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী।
হামলার সাথে মোট ২১ জনের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। এর মধ্য থেকে ঘটনার দিন ও পরে বিভিন্ন অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ১৩ জন মারা গেছেন। আর বাকি ৮ জনকে চার্জশিটভুক্ত করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এদের মধ্যে মিজানুর রহমান নামে একজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে আর বাকি সাতজনকে আজ দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড।
শিক্ষিত-ধনী তরুণেরা কেন ধ্বংসযজ্ঞে নেমেছিলেন?
হলি আর্টিজানের ভয়াবহ ঘটনার সাথে অভিযুক্ত এ ২১ জনের প্রত্যেকেই ধনী ও শিক্ষিত ফ্যামিলির সন্তান। দৃশ্যত সুখী এবং নিরাপদ জীবনই ছিল তাদের। তারপরও তাঁরা কেন এমন ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত হলেন? জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম দুজন আলেম চিন্তাবিদের সঙ্গে।
চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, এখানে নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল, তারা কেন এমন ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন। তবে আমার যেটা মনে হয়, আইএস বেশ কৌশলী। মানুষ যত বিত্তশালীই হোক না কেন, ধর্মের জায়গাটায় তারা খুব দুর্বল, অধিকাংশ মানুষই এমন। আইএস এই দুর্বলতাটাতাই কাজে লাগিয়েছে। ধর্মের লেভেল লাগিয়ে উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত শ্রেণির তরুণদেরকে তারা দলে ভিড়িয়েছে। এবং এমন ধ্বংসযজ্ঞের প্রতি প্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে।
তিনি বলেন, তবে হলি আর্টিজানের ঘটনা থেকে একটা বিষয় পরিস্কার হয়েছে। এ দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহল সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হামলা বা বোমাবাজির দায় মাদরাসা-শিক্ষিত বা ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর চাপাত একসময়। বলত, অভাবের কারণে নিম্নবিত্ত এই শ্রেণিটি জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত হয়। হলি আর্টিজানের হামলার পর প্রমাণিত হয়েছে, তাদের এ দাবি একপাক্ষিক এবং ভুল ছিল। সমাজের উচ্চবিত্ত এবং আধুনিক শিক্ষিতরাও এমন হামলায় জড়াতে পারে, এবং বিভিন্ন সংবাদের ভিত্তিতে বলা যায় বোমাবাজি এবং উগ্রপন্থা বাংলাদেশে যারাই ছড়িয়েছে তাদের সঙ্গে এ দেশের ধর্মীয় ঘরানা বা মাদরাসা-সংশ্লিষ্টদের কোনো সম্পৃক্তি নেই।
তবে ব্যাপারটাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। শিক্ষিত ও ধনী পরিবারের সন্তানেরা হলি আর্টিজানে কেন এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে গেল, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্ব আজ চূড়ান্তভাবে নিপীড়নের শিকার। বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের ওপর প্রতিনিয়ত জুলুম চলছে। আংশিক হলেও গণমাধ্যমের খবরে উঠে আসছে এসব তথ্য। গণমাধ্যমের খবর বা বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণত শিক্ষিত ও উচ্চবিত্তরা বেশি সচেতন থাকেন। সেই জায়গা থেকে উচ্চবিত্ত মুসলিমদের মধ্যে, যারা মুসলিম হিসেবে সচেতন, তাদের ভেতর নানা দেশে নির্যাতিত মুসলিমদের ব্যাপারে একটা দরদ কাজ করে। সেই সঙ্গে নির্যাতন যারা করছে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বা পরাশক্তি, সবার ব্যাপারেই একটা ক্ষোভ কাজ করে। আমার মনে হয়, এই ক্ষোভ থেকেই মূলত এসব ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ধাবিত হচ্ছেন তারা। কেবল বাংলাদেশ না, বহির্বিশ্বে সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে যারাই সশস্ত্রপন্থার দিকে ঝুঁকছেন, তারা ঠিক এ কারণেই ঝুঁকছেন এবং তাঁদের অধিকাংশই সাধারণ শিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। সশস্ত্রপন্থার দিকে ঝোঁকার আরও নানাবিধ কারণ থাকতে পারে, আছে, তবে আমার কাছে এই ক্ষোভটা অন্যতম একটা কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, আজ হলি আর্টিজেন হামলার রায় হয়েছে, রায়ে সাতজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, আইনকে হাতে তুলে নেওয়ার কারণে এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির কারণে এটা তাদের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু যে কারণে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে এই সশস্ত্রপন্থার দিকে ধাবিত হয়েছে, দেশে দেশে মুসলিম নির্যাতন, সেটা বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ না করলে এমন ক্ষোভের বিস্ফোরণ তাদের মতো আরও অনেকের মধ্যে ঘটতে পারে, ঘটছেও। তাই কেবল হামলাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা পর্যন্তই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ না রেখে দেশে দেশে মুসলিম নির্যাতন কীভাবে বন্ধ করা যায়, মুসলিমদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষা করা যায়, সে ব্যাপারেও নতুন করে ভাবতে হবে।
