আশরাফ উদ্দীন খান :
ফিকাহ ও উসুলে ফিকাহ’র সাথে জড়িত একটি অতি গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হচ্ছে ‘মাকাসিদুশ শারিয়াহ’ বা ‘মাকাসিদ-শারিয়াহ’। বিষয়টির গুরুত্ব একজন ফকিহ ও মুজতাহিদের জন্যে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি শরিয়াতের বিধান পালনকারী একজন সাধারণ মুসলমানের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ; যদিও গুরুত্বের দিক ও গভীরতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিষয়টির চর্চা আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে–জ্ঞান উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে–ঠিক কোন পর্যায়ে ও স্তরে বর্তমানে পৌঁছেছে এবং দুনিয়ার অন্য স্থানে এটা নিয়ে কতটুকু বিস্তারিত কাজ হয়েছে–সেই ধরনের একটি তুলনামূলক আলোচনাই এখানে আমাদের মূল উদ্দেশ্য। তবে আলোচনার অবকাঠামোগত দিক ঠিক রাখার জন্যে অতি সংক্ষেপে আমরা ‘মাকাসিদ-শারিয়াহ’-এর সাধারণ অর্থ ও রূপরেখা পেশ করছি।
মাকাসিদ-শারিয়াহ
একটি ইসলামি পরিভাষা, যার সাধারণ অর্থ হচ্ছে ‘ইসলামি শরিয়তের উদ্দেশ্য’ বা ইসলামি শরিয়তের আহকাম ও বিধি-বিধানের উদ্দেশ্য। সাধারণ অর্থে আমরা পরিভাষাটির সমার্থক শব্দ হিসাবে ‘শরিয়তের রহস্য’, ‘ইসলামি শরিয়তের আহকামের দর্শন’ বা ‘ফালসাফাহ’ শব্দসমূহও ব্যবহার করতে পারি। উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি যে, শরিয়তের পক্ষ থেকে আমাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ের আদেশ ও নিষেধমূলক বিধান দান করা হয়েছে, যেমন নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ। আবার নামাজের সাথে অজু, তায়াম্মুম, তাহারাত-পাক-পবিত্রতা, সফরের হালাতে নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে বিশেষ ‘তাখফিফ’ বা সহজতা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে হুদুদ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও শরিয়তের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। রয়েছে পারিবারিক বিভিন্ন হুকুম-আহকাম–এই সকল হুকুম-আহকামের মূল উদ্দেশ্য, রহস্য বা দর্শনকেই সাধারণ অর্থে ‘মাকাসিদ-শারিয়াহ’ হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে।
এই মাকাসিদ বা উদ্দেশ্যসমূহ শরিয়তের উৎস কুরআন-হাদিসের নুসুস বা ভাষ্যে কখনো স্পষ্টভাবে আবার কখনো অস্পষ্টভাবে বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার কখনো মুজতাহিদ আলেম তাঁর ইজতেহাদের মাধ্যমে উদঘাটন করে থাকেন। এবং এই মাকাসিদ নির্ধারণ করার কিছু নির্ধারিত ‘মাসালিক’ বা পথ-পদ্ধতিও রয়েছে, যা এই শাস্ত্রের মাধ্যমে আলোচনা করা হয়ে থাকে। এই শাস্ত্রের আলোচনার বিষয়বস্তুর দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় যে, মাকাসিদ-শারিয়াহকে দুইভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে–১. উসুল (মূলনীতিগত) মাকাসিদ। ২. ফুরু (খণ্ডিত) মাকাসিদ।
উসুল বা মূলনীতিগত মাকাসিদ হচ্ছে এমন মাকাসিদ যার মাধ্যমে শরিয়তের আহকামের নীতিমালা নির্ধারিত হয়ে থাকে, এবং এই ধরনের মাকাসিদ মূলত মুজতাহিদ বা ফফিহদের আলোচনার বিষয়। তাঁরা তাঁদের ইজতিহাদ ও গবেষণায় এর আলোচনা ও ব্যবহার করে থাকেন। পক্ষান্তরে ফুরু বা খণ্ডিত মাকাসিদের বিষয়টি মুজতাহিদ, ফকিহ, সাধারণ মুসলমান–সকলের সাথেই সম্পৃক্ত। এর আলোচনা একজন ফকিহের জন্যে যেমন উপকারী ঠিক তেমনি একজন সাধারণ মুসলমানের জন্যেও উপকারী ও সহজবোধ্য। মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ.-এর কিতাব ‘যুক্তির নিরিখে ইসলামি বিধান’ (অনূদিত) ও শায়েখ আবুল হাসান আলী নাদভি রহ.-এর কিতাব ‘আল-আরকান আল-আরবায়া’ দুটি সাধারণ উদাহরণ হতে পারে।
মাকাসিদ-শারিয়ার চর্চা
এতটুকু স্পষ্ট যে, মাকাসিদ শারিয়াহ’র চর্চাকেন্দ্র আমাদের দীনি মাদরাসা, মারকাজ, ইফতা বিভাগ ও গবেষণা কেন্দ্রসমূহ। দীনি মাদরাসার বর্তমান মানহাজ, তালেবে ইলম ও সদ্য-ফারিগ আলেমদের সাধারণ আলোচনা, লিখনি, বিশ্লেষণসমূহ পর্যালোচনা করে একটি প্রবণতা আমরা খেয়াল করতে পারি যে, বর্তমান আমাদের শিক্ষা মানহাজ ও ইলমি আলোচনাতে বিষয়বস্তুর গভীরতা ও বিস্তারিত রূপরেখা দেখা যায়। তেমনিভাবে অনেক আলোচক, খতিব-বক্তার আলোচনাতে যেমন, ঠিক তেমনি অনেক লেখক ও গবেষকের লেখা ও গবেষণাতে মাকাসিদ শরিয়াহ পরিভাষা সাম্প্রতিক কালে খেয়াল করা যায়।
আমাদের দেশে মাকাসিদ শারিয়াহ-এর চর্চা কিভাবে শুরু হলো–সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু করার আগে এই দিকে ইঙ্গিত করা জরুরি যে, মাকাসিদ শারিয়াহ একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসাবে অস্তিত্ব লাভ করার পরে কিছু সময়ের জন্যে আবার আড়ালে চলে যায়। তার অনেক যুগ পরে আবার এই বিষয়টি আলোচনায় ফিরে আসে। এবং সেই আলোচনার পর থেকে আজ পর্যন্ত অব্যাহত আছে এবং দিন দিন এর গভীরতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই প্রথমে আমরা মাকাসিদ শারিয়াহ একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসাবে অস্তিত্ব লাভ করা ও এর পুনর্জাগরণ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করে উপসংহারে বাংলাদেশে কিভাবে এর চর্চা শুরু হলো সেই দিকে ইঙ্গিত করব।
মাকাসিদ শারিয়াহ’র সূচনা
মাকাসিদ শারিয়াহ-এর সূচনা বলতে এটা স্বরণে রাখা দরকার যে, এখানে মাকাসিদ বিষয়টি একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়েছে, কারণ এটা স্পষ্ট যে, মাকাসিদের ধারণা তত্ত্ব থেকে প্রয়োগে আসেনি, বরং প্রয়োগ থেকে তাত্ত্বিক রূপ লাভ করেছে। কারণ মাকাসিদের ধারণার প্রমাণ সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়িদের থেকে শুরু করে পূর্ববর্তী ইমাম ও মুজতাহিদদের ফিকাহ ও ইজতিহাদে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান পাওয়া যায়, তবে স্বতন্ত্রভাবে বা আলাদা একটি শাস্ত্র হিসাবে এর উল্লেখ তখনো হয়নি।
এই আলোচনার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাকাসিদের আলোচনা দুইভাবে হয়ে থাকে। উসুলি দৃষ্টিকোণ থেকে, আর ফুরুর দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রথমে মাকাসিদের কিতাব হিসাবে যে সকল কিতাব লেখা হয় তা ছিল ফুরু মাকাসিদের উপর। সামনে আমরা সেই সম্পর্কে কিছু আলোচনা করছি।
খণ্ডিত মাকাসিদের দুটি কিতাবের উদাহরণ
‘মাকাসিদ’ শিরোনামে প্রথম যে কিতাব আমাদের হাতে আসে তা ছিল হাকিম তিরমিজি নামে প্রসিদ্ধ, একজন সুফি, মুহাদ্দিস ও ফকিহের লেখা কিতাব ‘আস-সালাত ওয়া মাকাসিদুহা’। কিতাবটি ৩২০ হিজরি সালের আগেই লেখা হয়, কারণ হাকিম তিরমিজি রহ.-এর ইন্তেকাল হয় ৩২০ হিজরিতে। এই কিতাবে লেখক নামাজের মাসআলা, হিকমত ও বিভিন্ন রহস্য নিয়ে আলোচনা করেছেন।
দ্বিতীয় আরেকটি কিতাব হচ্ছে আবুল হাসান মুহাম্মাদ বিন আবু জর ইউসুফ আল-আমেরী (৩৮১ হিজরিতে ইন্তেকাল), যিনি নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর লেখা কিতাব ‘আল-ই’লাম বি-মানাকিবিল ইসলাম’। এখানে লেখক ইসলামের আরকান (মূল ভিত্তি) যথা আকিদা, ইবাদত, শরিয়ত (লেনদেন ও বিচার), সিয়াসত (রাজনীতি), আখলাক, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ইহুদি, খ্রিষ্টান, অগ্নিপূজক, মুর্তিপূজক ও সাবেয়ি–এই পাঁচটি ধর্মের সাথে তুলনা করেন। তিনি ‘জরুরিয়াত-খামসাহ’ (পাঁচ জরুরি বিষয়) অর্থাৎ দীন, নাফস, নাসল, আকল ও মাল (ধর্ম, প্রাণ, বংশ, বুদ্ধি ও সম্পদের হেফাজত করা) সম্পর্কে ধারণা দান করেন।
এরপরের দিকে মুহাম্মাদ বিন আলি বিন ইসমাইল আবু বকর শাশী রহ. (ইন্তেকাল : ৩৬৫হিজরি)-এর লেখা কিতাব ‘মাহাসিনুশ শারিয়াহ’, ইমাম গাজালি রহ. (৪৫০হিজরিতে ইন্তেকাল)-এর ‘এহিয়া উলুমুদ্দিন’ কিতাব দুটি এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এই সিলসিলার কিতাবের মধ্যে আমাদের সময়ের অতি নিকটবর্তী কিতাবের মধ্যে আছে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ. (১১১৪-১১৭৬হিজরি)-এর বিখ্যাত কিতাব ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’। এই কিতাবের মুল বিষয় হচ্ছে শরিয়তের আসরার বা রহস্যাবলি। তিনি তাঁর কিতাবকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন–১. প্রথম ভাগ শরিয়তের মৌলিক নীতিমালা। ২. দ্বিতীয় ভাগ বিভিন্ন হুকুম-আহকামের হিকমত।
প্রথমের ভাগের বিষয়বস্তু হচ্ছে–তাফলিফ ও প্রতিদানের কারণসমূহ, দুনিয়ার জীবনে ও মৃত্যুর পরের প্রতিদান প্রদানের পদ্ধতি, দুনিয়ার জীবনের সাধারণ জরুরত, সৌভাগ্য, নেকআমল ও বদআমল, সিয়াসাত-শারইয়াহ (ইসলামি রাজনীতি), হাদিস ও শরিয়ত।
দ্বিতীয় ভাগের বিষয়বস্তু হচ্ছে হাদিস থেকে শরিয়তের আসরার বা আমলের রহস্য উদঘাটন করা। এই ভাগে তিনি ফিকাহ কিতাবের আদলে ইসলামি বিধানের প্রায় সকল বিষয়ের হিকমত ও রহস্য উল্লেখ করেছেন। ঈমান, ইলম থেকে শুরু করে, তাহারাত, নামাজ, জাকাত, রোজা, হজ, ইহসান, মুয়ামালাত, ফিকহুল মানযিন [পারিবারিক ব্যবস্থা], সিয়াসাত [রাজনীতি], মায়িশাত [জীবন-জীবিকা]-সহ আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
দ্বিতীয় আরেকটি কিতাব হচ্ছে শায়েখ আবুল হাসান আলী নাদভী রহ.-লেখা ‘আল-আরকান আল-আরবায়া’। কুরআন-সুন্নাহের আলোকে নামাজ, জাকাত, রোজা ও হজ–এই চারটি আরকানের উপর বিভিন্ন ধর্মের সাথে তুলনা করা হয়েছে এই কিতাবে।
এই পর্যন্ত গেল খণ্ডিত বা ফুরু-মাকাসিদ নিয়ে আলোচনা। মাকাসিদের দ্বিতীয় বা আরেক স্তর ছিল উসুল-মাকাসিদ। এই সম্পর্কে দেখা যায় যে, ইমামুল হারামাইন, তাঁর শাগরেদ ইমাম গাজালি, ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম রহ. মাকাসিদ শারিয়ার উসুল সম্পর্কে মৌলিক ধারণা পেশ করেন। তবে এই ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেন যিনি তিনি হচ্ছেন ইমাম শাতেবি রহ.। তাঁর কিতাব ‘আল-মুওয়াফাকাত’।
ইমাম আবু ইসহাক শাতেবি রহ. ও তাঁর কিতাব
ইমাম আবু ইসহাক শাতেবি রহ.-এর ইন্তেকাল ৭৯০ হিজরিতে। তাঁর বিখ্যাত কিতাবের নাম ‘মুওয়াফাকাত’, তবে কিতাবের আসল নাম হচ্ছে ‘উনওয়ানুত তা’রিফ বি-আসরারিত-তাকলিফ’। কিতাবটির তৃতীয় ভাগকে তিনি শুধুমাত্র মাকাসিদের আলোচনার জন্যে নির্ধারণ করেছেন। ইমাম শাতেবি রহ.-এর হাতেই মাকাসিদ বিষয়ের পূর্বের সকল ধারণা-মাসয়ালা একত্রিত হয়, বিন্যস্ত হয়। পূর্বের ধারণা একত্রিত করার সাথে সাথে তিনি অনেক মৌলিক ধারণাও পেশ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, ইমাম শাতেবি রহ.-এর পরে দেহলভি রহ.-এর কিতাবটি পুনরায় এই বিষয়ে লেখা হয় বলে আমাদের প্রবল ধারণা। কারণ এই দুই কিতাবের মাঝখানে আর কোনো কিতাব আমাদের হাতে আসেনি।
মাকাসিদ-শারিয়া চর্চার পুনর্জাগরণ
অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, আধুনিক যুগে মাকাসিদ-শারিয়ার পুনর্জাগরণের মূলে রয়েছেন ইমাম শাতেবি রহ.। কিতাবটি হিজরি অষ্টম হিজরিতে লেখা হলেও, তাকে কেন্দ্র করে আর তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। এরপর দীর্ঘ যুগ ও শতাব্দী অতিবাহিত হওয়ার পরে অবশেষে হিজরি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কিতাবটি ছাপার আকারে প্রকাশ পায়। ১৩০২ হিজরিতে (১৮৮৪ সালে) তিউনিসিয়াতে প্রথম ‘মুওয়াফাকাত’ কিতাবটি প্রকাশ করা হয়। সেই সময় থেকে আবার মাকাসিদ নিয়ে চর্চা ও গবেষণা শুরু হলো।
শায়েখ মুহাম্মাদ আবদুহু রহ. তিউনিসিয়ায় সেই সময়ে সফরে গেলে এই কিতাবের প্রশংসা করেন, এবং এর প্রচার-প্রসারে উদ্বুদ্ধ করেন। সেই সময়ে মিশরে শায়েখ মুহাম্মাদ আবদুুহু রহ.-এর ছাত্র আবদুল্লাহ দাররাজ রহ. ‘মুওয়াফাকাত’ কিতাবটির তাহকিক করে প্রকাশ করেন।
সেখান থেকে মরক্কোতে এই কিতাবের প্রভাব পড়ে। মরক্কোর আলেম শায়েখ মাউল আইনাইন মুহাম্মাদ ফাজিল বিন মামাইন রহ. ‘মুওয়াফাকাত’ কিতাবকে গদ্য আকারে লেখেন, এরপর আবার সেই গদ্য-কিতাবের ব্যাখ্যা গ্রন্থ লেখেন। তাঁর গদ্য-কিতাব ও ব্যাখ্যাগ্রন্থের নাম ছিল যথাক্রমে–‘মুয়াফিকুল মুওয়াফাকাত’, আল-মারাফিক আলা আল-মুওয়াফিক’।
তিউনিসিয়ায় ‘মুওয়াফাকাত’ কিতাবের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। সেখানকার জাইতুনাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেমদের হাতে এই কিতাবের ব্যাপক চর্চা শুরু হয়। তিউনিসিয়ার একজন বিখ্যাত আলেম শায়েখ ইবনে আশুর রহ.।
শায়েখ ইবনে আশুর রহ.
ইবনে আশুরের জন্ম ১২৯৬ হিজরি মোতাবেক ১৮৭৯ সালে, তিউনিসিয়াতে। তিনি ছিলেন জাইতুনাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শায়খুল জামিয়া। জাইতুনাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শাতেবি রহ.-এর মুওয়াফাকাত কিতাবের পাঠদান চালু করেন। কয়েক বছরের পাঠদানকালে তিনি মাকাসিদ বিষয়ে অনেক মৌলিক চিন্তা-ভাবনা পেশ করেন, যা দিয়ে পরবর্তীতে তিনি একটি কিতাব রচনা করেন ‘মাকাসিদুশ শারিয়াহ আল-ইসলামিয়াহ’ শিরোনামে। ইবনে আশুর রহ.-এর পরে আসেন আ’ল্লাল আল-ফাজি রহ.।
আ’ল্লাল আল-ফাজি রহ.
ইবনে আশুর রহ.-এর কিতাবের নাম ‘মাকাসিদুশ শারিয়াহ আল-ইসলামিয়াহ ওয়া মাকারিমুহা’। তিনি রিবাত ও ফাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পাশাপাশি কারভিন/কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও শরিয়াহ অনুষদে বেশ কিছু ইসলামি বিষয়ে পাঠ দান করেন। পাঠদানে তিনি শরিয়তের মাকাসিদের উপর গুরুত্ব দান করেন। পরবর্তীতে তাঁর সেই আলোচনাকেই বই আকারে প্রকাশ করেন। মাকাসিদ সম্পর্কে তিনি তাঁর বইটি ১৯৬৫ সালে প্রকাশ করেন।
শায়েখ ইবনে আশুর, আল্লাল ফাজি রহ.-এর পরে মাকাসিদ-শরিয়াহ বিষয়টি আরও বেশি তাহকিক, গবেষণা ও ইজতিহাদ-পুষ্ট হতে থাকে।
মাকাসিদ নিয়ে আধুনিক গবেষণার ধারা
বর্তমানে মাকাসিদ-শারিয়াহ নিয়ে বেশ ব্যাপক আলোচনা, গবেষণা ও চর্চা শুরু হয়েছে। তুরাসি (সনাতন) বিভিন্ন কিতাব থেকে আকাবিরের মধ্য থেকে অনেকের ‘মাকাসিদ-তত্ত্ব উদঘাটন করা হচ্ছে, মাকাসিদের রূপ ও কাঠামো নতুনভাবে পেশ করা হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে মাকাসিদ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করছেন গবেষণা, আলোচনা, পাঠদান ইত্যাদির মাধ্যমে। বর্তমানে মাকাসিদ নিয়ে কাজের কিছু ধরণ হচ্ছে নিম্নরূপ–
*স্বতন্ত্র রচনাবলী
*মুতাকাদ্দিম মুহাক্কিক আলেমদের রচনা থেকে মাকাসিদ-তত্ত্ব উদঘাটন
*মাকাসিদের প্রায়োগিক দিক
*মাকাসিদ ভিত্তিক কাওয়ায়িদ ও ইজতিহাদ
*ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাকাসিদ-শারিয়ার পঠন ও পাঠন
*মাকাসিদ বিষয়ক শিক্ষা-সম্মেলন
অনেক আলেম, গবেষক মাকাসিদ নিয়ে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন–জামালুদ্দিন আতিয়াহ রহ. (তাঁর কিতাবের নাম ‘নাহওয়া তাফয়িল মাকাসিদুশ শারিয়াহ’), আবদুল্লাহ ইবনে বাইয়াহ (তাঁর কিতাব ‘মাশাহিদ মিনাল মাকাসিদ’ এবং ‘আলাকাতু মাকাসিদুশ শারিয়াহ বি-উসুলিল ফিকহ’) এবং ড. আহমদ রাইসুনি। মাকাসিদ সম্পর্কে তিনি বেশ কিছু গবেষণা ও বই রচনা করেছেন, তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে–‘নাযারিয়্যাতুল মাকাসিদ ইনদাল ইমাম আশ-শাতেবি’, মিন আ’লামিল ফিকরিল মাকাসিদি’, ‘মাদখল ইলা মাকাসিদিশ শারিয়াহ’, ‘আল-ফিকরুল মাকাসিদ : কাওয়ায়িদুহু ওয়া ফাওয়ায়িদিহু’, ‘আল-ইজতিহাদ : আন-নাস ওয়াল মাসলাহাহ ওয়াল ওয়াকি’ এবং ‘মাকাসিদুল মাকাসিদ : আল-গায়াত আল-ইলমিয়্যাহ ওয়াল আমালিয়্যাহ লি-মাকাসিদিশ শারিয়াহ’।
ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাকাসিদ-শারিয়াহ’র পঠন-পাঠন
আগেই বলা হয়েছে যে, ইমাম শাতেবি রহ-এর ‘মুওয়াফাকাত’ কিতাবের মাধ্যমে আবার নতুন করে মাকাসিদ বিষয়ের চর্চা শুরু হয়। জাইতুনাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে শায়েখ ইবনে আশুর রহ. প্রথম ‘মুওয়াফাকাত’ কিতাবের দরস শুরু করেন। সেখান থেকে আবার নতুন করে ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উলুমে ইসলামির বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সাথে মাকাসিদ-শারিয়াহ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা শুরু হয়। পাক-ভারত উপমহাদেশের মাদরাসাগুলোতে ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ কিতাবের চর্চা শুরু হয়, শরিয়তের মাকাসিদ বা আসরার হিসাবে।
অতীতে যেখানে শরিয়াহ অনুষদের বিভাগের নাম লেখা হতো ‘উসুলে ফিকাহ’, এখন সেখানে লেখা হচ্ছে ‘উসুলে ফিকাহ ও মাকাসিদ-শারিয়াহ’। যার মাধ্যমে বুঝা যায় যে, মাকাসিদের চর্চা স্বতন্ত্রভাবে বেশ গুরুত্বের সাথে শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নের বদৌলতে এই বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা চালু হয়েছে। মাকাসিদ বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণাপত্র লেখা হচ্ছে। এর বাইরে শত শত গবেষণাপত্র ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বা ব্যক্তিগত গবেষণা হিসাবে প্রকাশিত হচ্ছে।
মাকাসিদ বিষয়ক শিক্ষা-সম্মেলন
গবেষণা, অধ্যয়ন, লেখালেখির পাশাপাশি মাকাসিদ শিরোনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া আন্তর্জাতিক সম্মেলন, যার শিরোনাম ছিল–‘ইসলামি ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ ও একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন : মাকাসিদ-শারিয়াহ ও আধুনিক যুগে তা প্রয়োগের পথ-পদ্ধতি’।
সম্মেলনের মৌলিক আলোচ্য বিষয় ছিল নিম্নরূপ :
*মাকাসিদ বিশ্বকোষ প্রকল্প
*মাকাসিদ অধ্যয়নে তাত্ত্বিক ও অ্যাকাডেমিক বিষয়সমূহ
*মাকাসিদ-শারিয়ার আলোকে সংস্কার, ঐক্য ও সভ্যতা
*মাকাসিদ-শারিয়াহ ও আর্থিক ব্যাংকিং লেনদেন
*মাকাসিদ-শারিয়াহ ও পারিবারিক সমস্যা
*মাকাসিদ-শারিয়াহ ও ইসলামি রাজনীতি
*মাকাসিদ-শারিয়াহ ও ইসলামি ফৌজদারি আইন
*মাকাসিদ-শারিয়াহ ও তথ্য-প্রযুক্তি
*মাকাসিদ-শারিয়াহ ও ভাষা
*মাকাসিদ-শারিয়াহ ও পরিবেশ সংরক্ষণ
*মাকাসিদ-শারিয়াহ ও সুন্নাহ
*মাকাসিদ-শারিয়াহ ও কিছু প্রয়োগিক বিষয়
*কুরআনুল কারিম ও মাকাসিদ-শারিয়াহ
*মাকাসিদ-শারিয়াহ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশে মাকাসিদ-শারিয়াহ’র চর্চা
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। আমার যতটুকু মনে পড়ে দাওরাতুল হাদিস সমাপ্ত করার পরে, আমাদের কওমি অঙ্গনে বিশেষ পরিচিত ব্যক্তি, আরবী ভাষাবিদ (মরহুম) হজরত শহীদুল্লাহ ফজলুল বারী (আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন) সাহেব হুজুরের আরবি সাহিত্যের দরসে প্রথম ‘মাকাসিদ শরিয়াহ’ সম্পর্কে ধারণা লাভ করি। শব্দটি শুধু আমার জন্যে নতুন ছিল না, বরং সেখানে আরও যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের সকলের জন্যেই ছিল নতুন একটি পরিভাষা। এরপরে আমি চিন্তা করে দেখেছি যে, দাওরাতুল হাদিস পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ের নিসাবের কোনো একটি কিতাবেও কি পরিভাষাটি আমাদের সামনে আসেনি? আমার মনে হয়েছে যে, শব্দটি আমাদের সামনে আসেনি, এবং এই বিষয়টি নিয়ে সংক্ষেপে বা বিস্তারিতভাবে আমাদের জানার সুযোগ তখনো হয়নি। এই দরসেই মাকাসিদ-শারিয়াহ সম্পর্কে মৌলিক কিতাব হিসাবে ইমাম আবু ইসহাক শাতেবি রহ.-এর ‘আল-মুওয়াফাকাত’ কিতাবের নাম জানতে পারি।
আল-মুয়াফাকাত কিতাবের পরে সামনে আসে ইবনে আশুর রহ.-এর কিতাব ‘মাকাসিদুশ শারিয়াহ আল-ইসলামিয়াহ’। আমাদের সেই সময়ের তুলনায় বর্তমানে মাদরাসা ও ইলমি অঙ্গনে মাকাসিদ-শারিয়াহ একটি বহুল আলোচিত ও চর্চিত বিষয়।
এই চর্চার পেছনে যে সকল কারণ বড় ভূমিকা রাখে তার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, আমাদের তালেবুল ইলম সমাজের সচেতনতা, নতুন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন এবং সেই জ্ঞান অন্যদের মাঝে ও সমাজে প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত হওয়ার সহজাত মানসিকতা। দ্বিতীয়ত, অনেক তুরাসি কিতাবের তাহকিক হচ্ছে এবং সেই সকল কিতাব আমাদের পঠন-পাঠনের আওতায় আসছে, ফলে সেই সমস্ত কিতাবের বিষয়বস্তুর সাথে আমরা পরিচিত হতে পারছি।
এর সাথে আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস ও গবেষণার সাথে আমাদের দেশের মাদরাসার ছাত্রদের সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়া। বর্তমানে আমাদের দেশের বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থী আরব দেশসহ আরও বিভিন্ন দেশের ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছেন। অনেকে সেখানে গবেষণা করছেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কী বিষয়ে গবেষণা হচ্ছে তা এখন আমরা দেশে বসেও জানতে পারছি। এককথায় বর্তমানে ইলম ও তত্ত্ব-তথ্যের সহজতার কারণে অনেক নতুন বিষয়ে আমরা অবগত হতে পারছি যার ফলে সেই বিষয়ে আমরা নিজেদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছি।
তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে, ইতিপুর্বে ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ কিতাবটির প্রসঙ্গ আমাদের এই আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিতাবটি আমাদের এই অঞ্চলের কিতাব এবং দারুল উলুম দেওবন্দ ও নাদওয়াতুল উলামার মতো মাদরাসাতে এর চর্চা অনেক আগ থেকে চালু আছে। এই সকল মাদরাসার সাথে আমাদের ইলমি সম্পর্ক অনেক আগ থেকে চলে আসছে এবং আমাদের দেশের মাদরাসাসমূহে হাদিস, ফিকাহ, আরবি ভাষা-সাহিত্য চর্চার ব্যাপারে সেই সম্পর্কের প্রভাব অনুভব করা যায়। কিন্তু মাকাসিদ-শারিয়াহ চর্চা সেখানে থাকলেও আমাদের মাদরাসাসমূহে বলতে গেলে সেই আলোকে মাকাসিদের চর্চা শুরুই হয়নি। এর কারণ হিসাবে মনে হয় উল্লেখিত মাদরাসাসমূহে ব্যাপকভাবে বা প্রাতিষ্ঠানিক দরস-কেন্দ্রিক চর্চার পরিবর্তে বরং ব্যক্তিগত কোনো শায়েখের তত্ত্বাবধানে এর চর্চা চালু আছে এবং ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ কিতাবটি আমাদের মাঝে মাকাসিদ-শারিয়াহ শিরোনামে তেমন প্রসিদ্ধ নয়, যেমন কিতাবটি শরিয়তের আহকামের আসরার বা হিকমতের কিতাব হিসাবে প্রসিদ্ধ। এবং কিতাবটি ‘অনেক সূক্ষ্ম ও উচ্চাঙ্গের কিতাব’ মনে করে সাধারণ চর্চার বাইরেই রাখা হয়েছে। কিন্তু যে নামেই হোক অন্ততপক্ষে কিতাবটির বহুল চর্চা শুরু হওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয় হিসাবে কামনা করা যেতে পারে।
তবে খুশির বিষয় যে, বর্তমানে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহেেএবং ইলমি আলোচনাতেও মাকাসিদ-শারিয়াহ-এর চর্চা শুরু হয়েছে। অনেকেই কথার যুক্তি বা দলিল হিসাবে মাকাসিদের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন, যেটা অবশ্যই ইতিবাচক একটি দিক। এই আলোচনা, গবেষণা অব্যাহত থাকবে এবং এর মাধ্যমে নতুন কোনো ধারণা, বিদ্যমান কোনো সমস্যার সমাধান, কর্মপদ্ধতি, কোনো কিছুর সংস্কার প্রক্রিয়াতে রূপরেখা নির্ধারণে সঠিকভাবে প্রয়োগ করার মতো সক্ষমতা আমরা অর্জন করতে পারব শিগগিরই, সেই কামনা করি।
