ফিরে দেখা বছর: ঊনিশের দশ গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি প্রকাশনা

ফিরে দেখা বছর: ঊনিশের দশ গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি প্রকাশনা

মাহদি হাসান :

সময়ের অবধারিত নিয়ম মেনে গত হতে চলেছে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের আরো একটি বছর। কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার কিনারে উপনীত হয়েছে ২০১৯। প্রতিটি নতুন বছরেই পৃথিবীতে আগমন ঘটে নানা মুখ, নানা বিষয়ের। দুই হাজার ঊনিশেও পৃথিবীর উঠোনে অবতরণ ঘটেছে বহু নতুন বিষয়ের। বাংলাদেশের ইসলামি প্রকাশনার জগতে ২০১৯-কে বলা যায় একটি বিপ্লবী বছর। বিশেষ করে ঊনিশের শেষের দিকে আয়োজিত ইসলামি বইমেলায় পাঠকের ভিড় এ অঙ্গনে সূচনা করেছে নতুন বিপ্লবের। ইসলামি বইপত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা বহু পাঠক ধীরে ধীরে আগমন করছেন ইসলামি সাহিত্যের সুললিত অঙ্গনে। বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত বইমেলাগুলোতে পাঠকের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করছে যে মানুষ আর এখন ইসলামি বইপত্র থেকে দূরে থাকতে চায় না। দেশজুড়ে ইসলামি সাহিত্যের এই নীরব বিপ্লবের পেছনে অবদান রয়েছে দেশের শতাধিক ইসলামি প্রকাশনীর। যারা নিরলস পরিশ্রম করে পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী একের পর এক বই প্রকাশ করছেন।

বরাবরের মতো এ বছরও বাংলাদেশের শতাধিক ইসলামি প্রকাশনী থেকে সহস্রাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্য থেকে কোনো কোনোটি পাঠকের কাছে হয়েছে বিপুল সমাদৃত। তবে কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ বই পাঠকের দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গেছে। ঊনিশের সালতামামিতে এসে আমরা আপনাদের কাছে তুলে ধরব ঊনিশে প্রকাশিত থিম, উপস্থাপনা জনপ্রিয়তার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি ইসলামি প্রকাশনা তথা বইয়ের পরিচয়। যাতে ঠাঁই পাবে পাঠকের কাছে বিপুল সমাদৃত কিছু বই। তেমনি ঠাঁই পাবে প্রচারের আলোর বাইরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই। তালিকার ক্রমিক নম্বর শুধু ধারাবাহিকতা বুঝানোর জন্য। অবস্থান বুঝানোর জন্য নয়। তাছাড়া গুরুত্ব বিবেচনা এখানে করা হয়েছে সেরেফ আমাদের পর্যবেক্ষণ থেকে, এর বাইরে অ্যাকাডেমিক কোনো জরিপ চালানো হয়নি এ বিষয়ে। তাই আমাদের এ তালিকার বাইরেও এ বছর প্রকাশিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই থেকে যাবে, তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করছি।

এক.
ইসলামী জীবনব্যবস্থা
লেখক : মুফতি তারেকুজ্জামান

গুরুত্বপূর্ণ এই গ্রন্থটি এ বছর প্রকাশিত হয়েছে রুহামা পাবলিকেশন থেকে। বইটিতে সম্পূর্ণ ইসলামি জীবনব্যবস্থাকে সংক্ষিপ্তরূপে তুলে ধরা হয়েছে। সরল গদ্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইসলামের স্বকীয়তা এবং সৌন্দর্য। আছে কুরআন ও হাদীসের আলোকে বেশ কিছু বিষয়ের বিস্তারিত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। বিশাল কলেবরের এই বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই পাঠকের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

দুই.
চিন্তাপরাধ
লেখক : আসিফ আদনান

ঊনিশের প্রথম দিকে ইলম হাউজ পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয় আসিফ আদনান রচিত এই বইটি। লেখক যদিও বইয়ের শুরুতে সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে এটি ইসলামি কোনো বই না, তবে এটি লেখা হয়েছে মুসলিমদের জন্য। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া মিডিয়া প্রোপাগাণ্ডা, প্রথাগত প্রথাবিরুদ্ধতা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর আইডিয়াল কলোনিজম তথা আদর্শিক ঔপনিবেশকতার এই কালে মুসলিম উম্মাহর চিন্তার জট খোলার জন্য বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠকের মাঝে বিপুল সাড়া ফেলে।

তিন.
শতাব্দীর চিঠি
লেখক : মুসা আল হাফিজ

শতাব্দীর চিঠি বইটি ভিন্ন এক আঙ্গিকে রচিত ইতিহাসের পাঠ। পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু লগ্নে বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের ভাগ্যে ভয়াবহ দুর্দিন নেমে এসেছিল, মনুবাদী শক্তি গ্রাস করে নিয়েছিল মুসলিম শাসনের মসনদ। তারপর একজন আলেমের একান্ত প্রচেষ্টা ও চোখের জলের ওসিলায় মুসলমানদের হারানো মসনদ আবারও পুনরোদ্ধার হয়। বাঙালি মুসলমানদের বিস্মৃত এ অতীতকে অভিনব এক পদ্ধতিতে মুসা আল হাফিজ সুপাঠ্য করে নিয়ে এসেছেন এই গ্রন্থটিতে। বইটি একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯-এ প্রকাশিত হয় ফোয়ারা থেকে।

চার.
যেমন ছিলেন তিনি এবং নবীজীর সংসার
লেখক : শাইখ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ

আরবের প্রখ্যাত ইসলামি ব্যক্তিত্ব শাইখ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ রচিত অদ্বিতীয় গ্রন্থ ‘কাইফা আমালাহুম’-এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে দুইটি প্রকাশনী হতে। রুহামা পাবলিকেশন থেকে সম্পূর্ণ বইটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ‘যেমন ছিলেন তিনি’ শিরোনামে। এ পর্যন্ত বহু সিরাত গ্রন্থ রচিত হলেও এই বইটির বিশেষত্ব হচ্ছে, এতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের নানা খুঁটিনাটি বিষয় বিশ্লেষণ করে আলোচনা করা হয়েছে। বইটি প্রকাশের পর থেকে পাঠকের মাঝে বিপুল সাড়া ফেলেছে।

আর বইটির চুম্বকীয় একাংশের অনুবাদ বেরিয়েছে মাকতাবাতুল আসলাফ থেকে ‘নবীজির সংসার’ শিরোনামে। এতে বিস্তারিত আলোচ্য হয়েছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংসার জীবনের খুঁটিনাটি।

পাঁচ.
প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২
লেখক : আরিফ আজাদ

২০১৭-এর বইমেলায় আরিফ আজাদের প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ বইটি বইজগতে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছিল। যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকে এবং গল্পের আঙ্গিকে সংশয়বাদীদের মাঝে প্রচলিত প্রশ্নের উত্তর নিয়ে রচিত বইটি সর্বত্রই আলোচিত ও বহুল পঠিত হয়। ২০১৯-এর বইমেলায় ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২’ বইটির একটি সিক্যুয়েল লেখেন আরিফ আজাদ। প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদের মতো সিকুয়্যালও বেশ আলোড়ন তোলে। একপর্যায়ে বইমেলা থেকে বইটির ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপিত হয়। বইটি প্রকাশ করেছে সমকালীন প্রকাশন।

ছয়.
আমরা আবরাহার যুগে নই
লেখক : রাগিব সারজানি

মিসরের প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তক এবং ইতিহাসবিদ ডক্টর রাগিব সারজানি রচিত ক্ষুদ্র কলেবরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই ‘লাসনা ফি যামানি আবরাহা’র বঙ্গানুবাদ এটি। বইটি প্রকাশিত হয়েছে মাকতাবাতুল হাসান থেকে। বইটিতে জানানো হয়েছে মুসলিম উম্মাহর বর্তমান দুর্দশা এবং বিপর্যস্ত পরিস্থিতি থেকে উম্মাহর উত্তরণের উপায়। সরল ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থনায় হাত উত্তোলন করে রাখলেই চলবে না। অতীতে যেমন হকের শত্রুদের দমনে নেমে এসেছিল গায়েবী মদদ। কিন্তু মুহাম্মাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের সাথে সাথে সেই চিরাচরিত নিয়মে এসেছে পরিবর্তন। কী সেই পরিবর্তন? এসব কিছুই বইটিতে আলোচনা করেছেন সুলেখক ডক্টর রাগিব সারজানি। প্রকাশের পর থেকে বিপুল সমাদৃত হয়ে আসছে বইটি।

সাত.
শ্বেত সন্ত্রাসের এই সময়ে
লেখক : সাঈদ মুহাম্মদ আবরার

ঊনিশের শেষদিকে প্রকাশিত হয়েছে সাঈদ মুহাম্মদ আবরার রচিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তুর এই বইটি। প্রকাশ করেছে গ্রাফিটি নামক নতুন এক প্রকাশনী। খেলাফতের পতনের পর থেকে প্রায় শত বছর ধরে চলতে হোয়াইট এগ্রেসন তথা শ্বেত সন্ত্রাসের কবলে পড়ে মুসলিম জাতি সর্বত্র ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়। কোথাও আজ মুসলিমেরা শান্তিতে নেই। পশ্চিমা সন্ত্রাসীদের নির্যাতন-নিপীড়ন পৌছে গেছে সর্বোচ্চ চূড়ায়। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে কখনো ‘ওয়ান অন টেরর’ আবার কখনো ‘র্যাডিক্যাল ইসলামিক টেরোরিজম’ নাম দিয়ে কুফফার শক্তি ইসলামের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ক্রুসেডের ডাক দিয়েছে। সামরিক আক্রমণ তো অব্যহত আছেই। এর সাথে এখন যোগ হয়েছে সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। সাথে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বয়কটের ভয়ংকর হাতিয়ার। এভাবে চারদিক থেকে মুসলিমদের কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে। পশ্চিমাদের এই জায়ান্ট সিভিলাইজেশন তথা দানবীয় সভ্যতার হাত থেকে রেহাই পেতে মুসলিমদের সজাগ করার প্রয়াস চালানো হয়েছে বইটিতে। বইটিতে জানানো হয়েছে এ সময় আমাদের পতনের নয়। এ সময় আমাদের উত্থানের। অচিরেই চূড়ান্ত বিজয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এখন পর্যন্ত পাঠকের মাঝে বইটি ব্যাপক সমাদৃত হয়ে আছে।

আট.
তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব : ইসলামী উত্তরাধিকার
লেখক : মুসা আল হাফিজ

বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ কবি, দার্শনিক, ইসলামি চিন্তক ও ইতিহাসবেত্তা মুসা আল-হাফিজ রচিত এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে কিছুদিন পূর্বে। কম্পারেটিভ রিলিজিওন তথা তুলমামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে রচিত এই বইটি মূলত লেখকের তিনটি আলোচনার গ্রন্থিত রূপ। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এটি একটি অসামান্য সংযোজন।

নয়.
৩১৩ : বদরযুদ্ধের ঐতিহাসিক গল্পভাষ্য
লেখক : সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

ইসলামি সাহিত্য-অঙ্গনে ইতিমধ্যেই নক্ষত্রতুল্য অবস্থান করে নেয়া সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর রচিত এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে ঊনিশের একেবারে শেষে। প্রকাশিত হয়েছে অভিজাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নবপ্রকাশ থেকে। বইটিতে ইসলামি ইতিহাসের সর্বপ্রথম সশস্ত্র সংগ্রাম বদরযুদ্ধের বিজয়গাঁথাকে ফিকশন আকারে উপস্থাপন করেছেন লেখক। বদরযুদ্ধের কথা মুখে মুখে আমরা সকলে জানলেও এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানি খুব কম লোকজন। লেখক গল্পে গল্পে তুলে ধরেছেন সে-সব উপাখ্যান, যা আমাদের অনেকেরই অজানা। নিঃসন্দেহে বইটি পড়ে পাঠক রোমাঞ্চিত হবেন।

দশ.
কিংবদন্তির কথা বলছি
লেখক : আহমাদ সাব্বির

বাংলাদেশের সদ্যবিগত মনীষী কোনো আলেমের জীবনী ফিকশন আকারে উপস্থাপনের কাজ এই প্রথম। লেখক আহমাদ সাব্বির বাংলাদেশের ইসলামি সাহিত্যাঙ্গনের পথিকৃত আলেম মাওলনা মহিউদ্দীন খানের জীবনকে গল্পের আদলে তুলে এনেছেন কিংবদন্তির কথা বলছি বইটিতে। বইটি নভেম্বরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বইমেলায় নাশাত পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

এ ছাড়া আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯-এ। তালিকা সংক্ষিপ্ত হওয়ায় সেগুলোকে স্থান দেয়া সম্ভব হয়নি। ইসলামি সাহিত্য-অঙ্গনের অগ্রযাত্রায় দুই হাজার ঊনিশ একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

আগের সংবাদফিরে দেখা বছর : ঊনিশের দশ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
পরবর্তি সংবাদভারতের নাগরিক আইনের প্রতিবাদে এক হয়েছে দুই মজলিস, জমিয়ত ও খেলাফত আন্দোলন