মুজাহিদুল ইসলাম :
জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ ও উন্নতি সাধনে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য। বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো ভূগোলশাস্ত্রে রয়েছে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অসামান্য কীর্তি।
তথ্য-প্রযুক্তির আধুনিক এই যুগে গুগল ম্যাপ, জিপিএস সিস্টেম প্রভৃতি ব্যবহার করে যেমন আমরা ঠিকঠাক আমাদের গন্তব্য খুঁজে বের করতে পারি, তেমনি আগেকার দিনেও জাহাজ পরিচালনা, মরুভূমিতে পথ চলা ও যুদ্ধের পরিকল্পনা গ্রহণ ইত্যাদি কাজে মানচিত্র ব্যবহারের প্রয়োজন হতো। সে সময়ের নামজাদা ভূগোলবিদগণ সেসব মানচিত্র তৈরি করে দিতেন।
অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে-মহাদেশে যখন ইসলাম তার বিজয়যাত্রা নিয়ে রওনা হয়, তারা তখন প্রাচীন গ্রিক ভৌগোলিক বিজ্ঞানের অনুসরণ করে বহু বিপত্তিতে পড়েন। ফলে বিপত্তি কাটাতে তারা তাদের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরেন ভূগোলবিদ্যার যথার্থ ও নতুন নতুন দিগন্ত।
কয়েকজন আরব নৌবিজ্ঞানী ও তাদের অবদান নিয়ে আলোচনা করা যাক।
আল মাসউদি
দশম শতাব্দীর ইরাকের বিখ্যাত ভূগোলবিদ আল মাসউদি ১৯ বছর বয়স থেকে মৃত্যু পযন্ত পৃথিবী ভ্রমণ করেন। প্রাচীন গ্রিকের রোমান ইতিহাস ও বিজ্ঞানের ওপর তিনি নির্ভর করেন। তবে তিনি তাদের মতো কেবল চর্চাকেন্দ্রিক থাকেননি। বরং বাস্তবিক রূপ দেন। তার মতে পৃথিবী গোলাকার বলেই সমুদ্রে জাহাজ ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়।
আল মাসউদি পৃথিবীর সমুদ্র এবং মহাদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণের প্রয়াস চালান। এ ক্ষেত্রে তিনি গ্রিক-প্রথা অনুযায়ী জাপানকে পূর্ব সীমানা এবং পশ্চিমের সীমানা হিসেবে ধরে একটি দ্বীপপুঞ্জ নির্ধারণ করেন। সমুদ্রের ব্যাপারে আল মাসউদির ধারণা কিছুটা প্রাচীন ধারণার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। তার মতে, পুরো পৃথিবীকে চক্রাকারে ঘিরে আছে একটি মহাসমুদ্র, যা অন্যসব সাগরের সঙ্গে যুক্ত। আর আরব সাগর হলো পৃথিবীর বৃহত্তম সাগর। আরব ও চীনের মধ্যবর্তী পারস্য সাগরসহ মোট সাতটি সাগরের সীমানা ও দিক নির্ণয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন আল মাসউদি, যা তৎকালীন আরব ব্যবসায়ীদের ভীষণ কাজে দেয়।
মাকদেসি
দশম শতাব্দীর জেরুজালেমের ভূগোলবিদ মাকদেসি। তিনি বর্ণনামূলক ভূগোল ও মানচিত্রভিত্তিক ভূগোলে ছিলেন বেশ পারদর্শী। ভূগোল সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান লাভের জন্য তিনি ব্যাপক সফর করেছেন।
তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আহসানুত তাকাসিম ফি মা’রিফাতিল আকালিম’ এর সাথে মানচিত্র সংযোজন করেন। ভৌত ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহের চিত্রানুগ বর্ণনা দেওয়ার জন্য তিনি মানচিত্রে বিশেষ চিহ্ন দেওয়ার রীতি চালু করেন। তিনি ভ্রমণ ও অভিযানের মাধ্যমে সমুদ্র সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আরব সাগর, লোহিত সাগর ও অন্যান্য সাগর সম্পর্কে তার দেওয়া তথ্য নাবিকদের অত্যন্ত উপযোগী ছিল। শহর ও নগর জীবন সম্পর্কে তার গবেষণার কাছে আধুনিক ভূগোলবিদরাও হার মানতে বাধ্য হবেন। তিনি তার পূর্বের সমুদ্রবিষয়ক গ্রিকদের বিভিন্ন মতবাদের সমালোচনা করেন। যে সমালোচনা এখন এ শাস্ত্রে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা হয়।
আল বেরুনি
দশম শতাব্দীর ইরানের আল বেরুনি সর্বপ্রথম অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেন। তিনি তার গবেষণা দ্বারা ভূগোলশাস্ত্রকে বেশ সমৃদ্ধ করেছেন। তিনিই সর্বপ্রথম ভূগোলের অক্ষরেখার পরিমাপ নির্ণয় করেন। এ ছাড়া তিনি জোয়ার-ভাটার হ্রাস-বৃদ্ধি, চন্দ্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক নির্ণয়সহ আরো বিভিন্ন বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত তথ্য তুলে ধরেছিলেন। তার এই অবদানের কথা আজও আধুনিক ভূগোলবিদরা স্বীকার করেন।
আল বেরুনি সর্বপ্রথম বেরিং প্রণালী আবিষ্কার করেন। তিনি সূর্যের উচ্চতার মাধ্যমে খোয়াজাম এলাকার অক্ষাংশ নির্ণয় করেন। তিনি দক্ষিণ ও উত্তর দিক নির্ণয়ের ৭টি উপায় বের করেন। তিনি গাণিতিক কৌশল প্রয়োগ করে ঋতু শুরুর প্রকৃত সময় নির্ণয় করেন। তিনি অ্যাস্ট্রোলোব ও সমুদ্র-পাড়ের পাহাড়ের মাধ্যমে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেন। তিনি জটিল ভূ-গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেন ৬৩৩৯.৯ কিমি আর আধুনিক পরিধি হচ্ছে ৬৩৫৬.৭ কিমি। এই পদ্ধতি বর্তমানে আল বেরুনি ল’ নামে পরিচিত।
আল ইদ্রিস
দ্বাদশ শতাব্দীর স্পেনের মুসলিম ভূগোলবিদ আল ইদ্রিস। ব্যাপক ভ্রমণের ফলে সমসাময়িক পৃথিবী সম্পর্কে এত ব্যাপক জ্ঞানার্জন করেছিলেন যে, সিসিলের রাজা দ্বিতীয় রজার্স পৃথিবীর নিখুঁত মানচিত্র অঙ্কনের জন্য আল ইদ্রিসের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।
সুদীর্ঘ ১৫ বছরের অক্লান্ত অধ্যাবসায়ের দ্বারা তিনি ‘আল কিতাব আল রজারী’ নামের একটি নির্ভুল ভূ-চিত্র সংবলিত গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন। এই পুস্তকে তিনি বিভিন্ন স্থানের ৭০টি মানচিত্র এবং দুই হাজার ৫৫৮টি প্রসিদ্ধ ভৌগোলিক স্থানের বিবরণ তুলে ধরেছিলেন। তাতে মরুভূমি, বন, সমুদ্রপথ প্রভৃতিকে আলাদাভাবে বোঝানোর জন্য আলাদা বর্ণের ব্যবহার করেছিলেন।
হিজরি তৃতীয় শতাব্দীতে আরব বনিক সুলাইমান তাদেরই একজন, যারা তাদের দুঃসাহসী ভ্রমণের মাধ্যমে অজানা দুনিয়ার তথ্য তুলে ধরেছেন। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে সিলান দ্বিপের পাশ দিয়ে ভারত সাগর অতিক্রম করে চীন ভ্রমণ করেন। অনুরূপ তার জাহাজ ভূমধ্য সাগর, আরব উপসাগর ও লোহিত সাগর অতিক্রম করে। তিনি তার দীর্ঘ ভ্রমণ কাহিনী একটি বইতে লিখে গেছেন। এর সাথে আরেক পরিব্রাজক আবু যায়েদ হাসান সাইরাফী খ্রিস্টীয় নবম ও দশম শতাব্দীতে চীন ও ভারতের সাথে আরবের সম্পর্ক বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। চীন ও ভারতের টাইফুনের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুযোগ সম্পর্কে ধারণা দেন।
আরব নৌবিজ্ঞানের ভিত্তিতে কলম্বাসের নৌযাত্রা!
আরব নাবিক ও ভূগোলবিদদের সকল অভিজ্ঞতা তখন দৃশ্যমান। কাগজের পাতায় লিপিবদ্ধ। মানুষ সেগুলো থেকে খুঁজে পেতে থাকে আরো নতুন পথ। ঐতিহাসিক ড. হুসাইন তার বিখ্যাত বইতে বলেন, কলম্বাস আন্দালুসের ভূগোলবিদ আবু উবাইদ বকরীর তত্ত্ব দেখে তার এই ভ্রমণ শুরু করেন। যার সারমর্ম হলো, আরবরা মধ্যরেখা-যেখানে রাতদিন সমান হয়-হতে পূর্ব দিকে রওনা দিত। এ কারণে কলম্বাস ধারণা করেন, এর বিপরীত তথা পশ্চিম দিকে ভিন্ন কিছু আছে নিশ্চয়। এই ভেবেই তিনি মূলত অগ্রসর হন।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদির খালিদ আবু আল খায়ের নামক এক গবেষক কলম্বাসের আগে মুসলমানদের দ্বারা আমেরিকা আবিস্কারের দাবি গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা গেছে, স্পেনের মুসলমান শাসকরা ৮০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পযন্ত বিভিন্ন সময় আমেরিকায় লোক পাঠিয়েছে এবং সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে ব্যবসা করেছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কারের অভিযান চালান ১৪৯২ সালে। কলম্বাসের অভিযানে ছিল তিনটি জাহাজ, যার দুটিই ছিল “বেনজন” বা “ইবন জাইন” নামের এক স্প্যানিশ পরিবারের। ওই পরিবারের সদস্যদের পূর্বে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল।
প্রসিদ্ধ আরব নাবিক আহমাদ বিন মাজিদের ভ্রমণসংক্রান্ত বই-পুস্তক নৌবিদ্যায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ইউরোপীয়ানরা তার এ ভূমিকার কথা স্বীকার করে। এমনকি ভাস্কো দি গামার আরব সাগর আবিস্কারে আহমাদের বইয়ের বড় ভূমিকা আছে।
ফ্রান্সের প্রাচ্যবিদ ‘জিবরিল ফারান’ আহমাদ বিন মাজিদের কিছু কাজ বিংশ শতাব্দীর সূচনায় পুনঃপ্রকাশ করেন। এর ভূমিকাতে তিনি লেখেন, ‘ইবনে মাজিদ প্রথম শ্রেণীর লেখক। মধ্যযুগের নৌবিজ্ঞানের সর্বজন-বিদিত ব্যক্তি। তিনি বিভিন্ন সমুদ্রের বিস্তারিত বিবরণ দেন। ভাস্কো দি গামার আগেই ইবনে মাজিদ ও সুলাইমান মাহরীর সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নৌ-ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনী দিয়েছে।’
আরব্য ভূগোল যে শুধু নতুন দেশ আবিস্কার করেছে ও সমুদ্রের পর সমুদ্র জয় করেছে, তা নয়। বরং প্রাচীন গ্রিকদের বিভিন্ন তত্ত্বের ভুল সংশোধন করেছে। অধিকন্তু কলম্বাস এবং তার পরবর্তীদের বিভিন্ন অভিযানে জ্ঞানরসদ যুগিয়েছে। পরবর্তী ষষ্ঠ শতাব্দীতে ইসলামী বিশ্বে উসমানী নাবিক মুহিউদ্দিন পীর এমন মানচিত্র অঙ্কন করেন, যা বর্তমান কৃত্রিম উপগ্রহের দেয়া তথ্যের সাথে সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ। অথচ এটি কৃত্রিম উপগ্রহ-আবিস্কারের চারশ শতাব্দী আগেই তিনি অঙ্কন করেছেন।
আর রিয়াদাতুল জুগরাফিয়্যাতুল ইসলামিয়্যাহ : কাইফা আসসাসাল উলামাউল মুসলিমুন লিইকতিশাফি বিহারিল আলাম অবলম্বনে।
