রাগিব রব্বানি:
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজয় বরণ করেছিল, অর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশের বিজয়। ব্যাপক আয়োজন ও উদযাপনের মধ্য দিয়ে কয়েক দিন আগে বিগত হয়েছে চলতি বছরের বিজয় দিবস।
বেশ কয়েক বছর ধরে ধর্মীয় পরিমণ্ডলেও বিজয় দিবস পালিত হয়ে আসছে আলাদা গুরুত্ব ও মোটামুটি ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ধর্মীয় অঙ্গনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন এ দিনটিতে যার যার মতো করে নানা কিসিমের আয়োজন করেছিল। এরমধ্য থেকে র্যালি, সঙ্গীতানুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক আলোচনাসভা উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের সেকুলার শ্রেণি একসময় ব্যাপকভাবে অভিযোগ করত, ধর্মীয় পরিমণ্ডল দেশের জাতীয় দিবসগুলো পালন করে না। এই সূত্র ধরে তারা ধর্মীয় অঙ্গনের দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন ওঠাত। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই অভিযোগ ও প্রশ্ন অনেকাংশেই খেই হারিয়েছে। ধর্মীয় পরিমণ্ডলে এখন বিজয়, স্বাধীনতা ও ভাষা দিবসকে গুরুত্বের সঙ্গে বেশ ঘটা করেই পালন করা হয়। আয়োজন করা হয় নানামুখী অনুষ্ঠানের। আলোচিত হয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও।
কিন্তু কেবল মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশি মুসলিম হিসেবে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস নয়। বৃহত্তর মুসলিম জাতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের আগেও আরও অনেক মুক্তিযুদ্ধ, সংগ্রাম এবং যুদ্ধ জয় এবং পরাজয়ের ইতিহাস আছে। উপমহাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখা হয়, তাহলে পলাশীতে পরাজয়, বালাকোটের লড়াই, সিপাহি বিদ্রোহ, এবং ব্রিটিশ বিতাড়নের লড়াইয়ে মুসলমানদের আরও অনেক বীরত্বগাথা কিংবা পরাজয়ের গল্প আছে আমাদের ইতিহাসে। তারও আগে আছে আরও অনেক ইতিহাস, যা মুক্তিযুদ্ধের মতোই সমান গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের চর্চা দরকারি।
কিন্তু সেসব ইতিহাস কিংবা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো আয়োজন বা চর্চার উপলক্ষ তৈরি করার মানসিকতা পরিলক্ষিত হয় না ধর্মীয় অঙ্গনে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কেবল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বা জাতীয় দিবসগুলো ঘটা করে পালন করা কি সেকুলারদের অভিযোগ ও প্রশ্নের অপনোদনের জন্য কেবল চাপে পড়েই করা হয়?
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ব্যাপারটাকে আমি ঠিক এভাবে দেখতে চাই না। বরং আমি মনে করি আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের বাপ-দাদা বা পূর্বপুরুষদের কষ্টার্জিত মুক্তিযুদ্ধের বিজয় এবং দেশের স্বাধীনতা বিষয়ে জানাশোনা এবং চর্চা করা জরুরি ছিল। একই সঙ্গে দেশের জন্য আমাদের বাপ-দাদাদের মধ্যে যারা জীবন দিয়েছেন, জালেমের বিরুদ্ধে লড়ে মৃত্যুকে বরণ করেছেন, তারা তো শহিদ, তাদের জন্য জাতীয় দিবসগুলোতে দোআর ব্যবস্থাও রাখা যায়। ধর্মীয় অঙ্গনে একসময় এটা ছিল না, এখন সচেতনতা তৈরি হয়েছে, বিভিন্নভাবে এসব দিবসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে স্মরণ করা হচ্ছে, শহিদদের জন্য দোআর আয়োজন করা হচ্ছে। কেউ কেউ বুকে লাল-সবুজের পতাকা জড়িয়ে র্যালিও করছেন, এটা দেশপ্রেমের পরিচায়ক হিসেবে করা যেতেই পারে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটা নাজায়েজ না। বরং দেশপ্রেমের প্রকাশ একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের করা জরুরি।
ড. খালিদ বলেন, এই সচেতনতাটা একসময় ছিল না, এখন নানাভাবে মানুষ সচেতন হচ্ছে, সেই ধারাবাহিকতায় ধর্মীয় অঙ্গনেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকতার সচেতনতাটা তৈরি হয়েছে। আমি একে ‘চাপে পড়ে আনুষ্ঠানিকতা করা হচ্ছে’ বলব না। বরং নতুন সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ বলব। ধর্মীয় উপলক্ষ বা আলাদা ইবাদত হিসেবে না করলে নিজ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম-কেন্দ্রিক দিবসগুলো পালনে শরয়ি আপত্তিও নেই। নিজ দেশের প্রতি মমতা ও ভালোবাসা থেকে এসব আয়োজন করা সময়ের প্রেক্ষিতে জরুরিও।
তিনি বলেন, তবে হ্যাঁ, কেবল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পর্যন্তই আমাদের সীমাবদ্ধ থাকলেই হবে না। এর আগের আরও বিস্তৃত ইতিহাস আমাদের আছে। ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়নে মুসলিমদের ভূমিকাই ছিল মূখ্য। দুই শো বছরের ব্রিটিশ শাসনামলে আমাদের আকাবেরগণ নানাভাবে ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রাম করেছেন। বালাকোট, সিপাহি বিদ্রোহ, রেশমি রুমাল আন্দোলন—এইসব আমাদের আকাবেরদেরই প্রচেষ্টা। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসের পাশাপাশি এইসব আন্দোলন-সংগ্রামের দিবসগুলোতেও চর্চার নিমিত্তে আমাদের কাজ করা দরকার। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যেভাবে আমাদের সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, আমি আশা করব সময়ের ধারাবাহিকতায় সেসব ইতিহাস নিয়েও একসময় ব্যাপক পরিসরে আলোচনা ও সচেতনতা তৈরি হবে।
তবে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন আলেম ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেছেন, বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধকে সামনে রেখে বিভিন্ন আয়োজন করা যায়, এটা অবশ্যই প্রয়োজন এবং ইতিবাচক। কিন্তু ধর্মীয় অঙ্গন হিসেবে আমাদের এই আয়োজন-অনুষ্ঠান সেক্যুলারদের আদলে যাতে না হয়ে যায়, এদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
তাঁরা বলছেন, বিজয় দিবস পালনের নামে আমাদের অঙ্গনে এমন কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে, যা আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে ঠিক যায় না। দৃশ্যত যে কারও মনে হতে পারে এবং হচ্ছেও, এইসব কর্মসূচি নিছক সমালোচনা বন্ধ করার জন্য এক ধরনের চাপে পড়ে করা হচ্ছে। তাই দিবস পালনের ক্ষেত্রে আমাদের স্বতন্ত্র একটা চরিত্র দাঁড় করানো উচিত, যেটার সঙ্গে সেকুলারদের বয়ান ও তরিকার কোনো মিল থাকবে না। পাশাপাশি বিজয় দিবস বা অন্য কোনো জাতীয় দিবসে সেকুলারদের যে তরিকা ও বয়ান, সেগুলোর ভ্রান্তির দিকগুলোও আলোচিত হওয়া জরুরি।
