মুসলিম সভ্যতায় নৌবাণিজ্য: সমর ও অর্থনীতিতে সমুদ্র জয়ের ভূমিকা

মুসলিম সভ্যতায় নৌবাণিজ্য: সমর ও অর্থনীতিতে সমুদ্র জয়ের ভূমিকা

মুজাহিদুল ইসলাম:

ইসলাম বিশ্বজনীন। এ আসমানী ধর্ম জীবন-জগতের কোন কিছুকে সবিস্তার বর্ণনায় ত্রুটি করেনি। মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ অর্থনৈতিক লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য। ইসলাম-নির্দেশিত পথে ব্যবসাকে ইবাদাত গণ্য করা হয়। মুসলিম-জীবনের অবিচ্ছিন্ন লক্ষ্য মানুষকে এক সৃষ্টিকর্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। এই মৌলিক লক্ষ্য ও ব্যবসায়িক ইবাদাতের মহান অনুভূতি ধারণ করেই নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রিয় সহচরগণ শুরু করেন আদিকাল হতে চলে আসা বাণিজ্যের জন্য নতুন নৌযাত্রা।

আরও পড়ুন : ইসলামি সভ্যতায় ভূগোলবিদ্যা : সমুদ্র জয়ে মুসলমানদের অবদান

আরব উপদ্বীপের মানুষরা ভৌগোলিক কারণে নৌবাণিজ্যের সাথে তাদের পরিচিতি আগে থেকেই ছিল। ভারত সাগরের উপকূল ও দূরপ্রাচ্যে তথা চীন, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় অনানুষ্ঠানিকভাবে তথা শাসকদের সেনা অভিযানের আগেই ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ইসলাম পৌঁছে যায়। ওমর (রা.)-এর শাসনামলে আলা ইবনে হাদরামি প্রথম নৌবাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেন। তিনি কেন্দ্রের অনুমতি ছাড়াই একটি নৌবাহিনী গঠন করেন এবং পারস্যের সমুদ্র-তীরবর্তী অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে এই অভিযান ব্যর্থ হয়। কেন্দ্রের অনুমতি না নিয়ে অভিযান চালানোয় ওমর (রা.) তাকে বরখাস্ত করেন।। এবং ওই অঞ্চলে সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে নিযুক্ত করেন।

তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)-এর আমলে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম বণিকদের সামুদ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে তাদের নিরাপত্তার জন্য মুসলিম নৌবাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বিশেষত এই সময় মিসর ও সিরিয়ার উপকূলবর্তী এলাকার বহু মুসলিম সমুদ্র বাণিজ্যে সক্রিয় হয়। তাদের নিরাপত্তায় মুয়াবিয়া (রা.) মুসলিম নৌবাহিনী গঠনের জোরালো আবেদন জানান। উসমান (রা.) তাতে সাড়া দেন।

মুসলিম নৌবাহিনী গঠনের পর মুসলিম বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ভূমধ্য সাগর, পারস্য সাগর ও ভারত মহাসাগরে তাদের তৎপরতা বাড়ায়। ৮৬ হিজরিতে খলিফা ওয়ালিদ (রা.)-এর আমলে মুসলিম বাহিনী ভারতের সিন্ধু বিজয় করে। এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারত মহাসাগরে মুসলিম বণিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কেননা সিন্ধুর শাসক রাজা দাহির মুসলিমদের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা দিতে অস্বীকার করেন। এমনকি তিনি মুসলিমদের জাহাজ লুণ্ঠনকারীদের শাস্তি দিতেও অস্বীকার করেন।

হিজরি প্রথম শতাব্দীতে বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর সামুদ্রিক বন্দর স্থাপিত হয়। ১২৩ হিজরিতে আব্বাসি খেলাফতের যুগে ভারত মহাসাগর ও আরব উপসাগরে বিভিন্ন অভিযান প্রেরণ করা হয়। এসব অভিযানের পুরোটাই সামরিক ছিল না, বরং বাণিজ্যিকও ছিল। ১৪৮ হিজরিতে আব্বাসি খলিফা আবু জাফর মানসুর বাগদাদকে খেলাফতের রাজধানী ঘোষণা করেন। ১৪৮ সালে বাগদাদ খেলাফাতের রাজধানী হলে সেখানে দজলা ও ফোরাতকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয় বিভিন্ন নৌবন্দর। বাল্টিক সাগরমুখী নৌবন্দর হতে বিভিন্ন জাহাজ বাগদাদে আসতো। সম্প্রতিক সময়ে বাল্টিক সাগর ও রাশিয়ার বিভিন্ন লেকে তৃতীয় শতাব্দীর মুদ্রার আবিস্কার এর নির্দেশ করে। মুসলিমবিশ্বের ইউরোপ ও আফ্রিকার বাণিজ্যিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পায় এ সময়। (মুজামুল বুলদান)

আব্বাসি যুগে ইসলামী সাম্রাজ্যে, বিশেষত ইরাকে শিল্প ও কৃষির বিপ্লব ঘটে। আর তাতে উৎপন্ন পণ্যসামগ্রী ও অন্যান্য দ্রব্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দজলা ও ফোরাত নদী দিয়ে রপ্তানি করা হয়। এ পথে বাণিজ্যিক পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীরা মনোযোগী হয়ে ওঠে। এসময়ে নৌবাহিনী ও সামুদ্রিক কাফেলার মাধ্যমে গড়ে ওঠে বাহরাইন, ওমান, বসরা, সাইরাফসহ অনেক বন্দর। ভারত সাগরের উপকূল মালাবার, সিলান ও সুমাত্রায় গড়ে ওঠে মুসলিম বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এসব বাণিজ্যকেন্দ্র অর্থেনৈতিক ভূমিকার পাশাপাশি সামরিক ক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীকে সহযোগিতা করেছে। দূরপ্রাচ্যের বাণিজ্যিককেন্দ্র ভারত, সিন্ধু, চীনসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক কেন্দ্র থেকে মুসলিম দেশগুলোর প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর আমদানি জোরদার হয়।

চীনে আরব ও ইসলামিক ব্যবসায়ীদের শক্ত উপস্থিতির বিষয়ে জনৈক চৈনিক ঐতিহাসিক বলেন, খ্রিস্ট অষ্টম শতাব্দী হতে ষষ্ঠদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্র্ণ আরব ও মুসলিমদের নিকট ছিল। আরব উপসাগর তারপর ভারত মহাসগর হয়ে চীনের ক্যান্টনসহ দক্ষিণের নৌবন্দরে তারা নোঙ্গর করত। তারা সেখান থেকে ভারতের বিখ্যাত তরবারি, লবঙ্গ, মরিচ, সেগুন, চামড়া, ঘোড়ার জিন, হাতির দাঁত, টিন, কাগজ, চন্দনসহ নানা প্রকারের বস্ত্রাদি, চীনের মেশক, মৃৎপাত্র, কাফুর, উদ, বর্শা, তীর, ধনুক ও অন্যান্য সামগ্রী আমদানি করত। তেমনিভাবে রপ্তানি করা হতো নানাপ্রকারের খেজুর, আঙুর, আনার, কলাসহ বিভিন্ন ফল-ফলাদি। তেমনি রেশম কাপড়, পাগড়ি, পশমবিশিষ্ট কাপড়সহ নানা প্রকারের দ্রব্যাদি রপ্তানি করা হতো।

ইসলামের সুষম ও আদর্শ অর্থনৈতিক কাঠামোতে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা অমুসলিমদের ওপর বেশ ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।। ইসলামী সংস্কৃতিকে বরণ করে নিতে তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়। পরবর্তী যেকোন অভিযানে স্থানীয় মানুষদের সুদৃষ্টি অর্জনে যা বড় ধরনের সহায়ক হয়।

অন্যদিকে আফ্রিকার মোগাদিশুর উপকূল নিয়ে ইবনু বতুতা বলেন, এখানে প্রচুর উট ছিল। তারা দৈনিক দুই শত উট জবাই করত। বতুতার ভাষায়, এখানের বাসিন্দারা ছিল খুবই সুঠাম দেহের অধিকারী। তারা চমৎকার কাপড় বুনন করত। তারা এটা মিসর হয়ে বর্তমানের তানজিনিয়ার বন্দরে বিক্রি করত। তানজিনিয়ার বন্দর হতে ভারতের বন্দরে পণ্য চলাচল করত। মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর নানা দেশে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে গড়ে ওঠে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এ সম্পর্ক শুধু অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ইসলামের প্রচার-প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। অনিবার্যভাবে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ হওয়াতে তৎকালীন শাসক, ধনী ও সুশীল শ্রেণী মুসলিমদের সাথে বিরূপ মানসিকতার পরিবর্তে শক্তির সাথে আপোষের পথ বেছে নেয়। এমনকি রাজকীয় ছত্রছায়ায় তারা সমু্দ্রে সংশ্লিষ্টদেশের নিয়ন্ত্রণাধীন জলভাগে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে থাকে। অনেক রাজা-বাদশাহ মুসলিম ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক উপদেষ্টো হিসেবে নিয়োগ দেন। যা সামরিক পলিসির জন্য খুবই অনুকূল।

তেমনি আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলেও আরব থেকে আগত মুসলিমদের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপকতা লাভ করে। সেখানেও অনেক মুসলিম স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ইসলামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার হয়। তাদের অনন্য আচার-ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। সমুদ্রভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় অনেক সময় নানা রকম প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। তাই ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েই সমুদ্রে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করা হতো। মুসলিমদের সমুদ্রে বাণিজ্যিক যাত্রার মাধ্যমে ইসলামী সভ্যতা ব্যাপকতা লাভ করে। ইসলামের প্রভাব-প্রতিপত্তির জয়গান ছড়িয়ে পড়ে। তেমনি ইসলামী সাম্রাজ্যের সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য পরাশক্তির লেনদেন শুরু হয়। অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে স্বাবলম্বী মুসলিমরা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। ইসলামের সুদৃঢ় নৈতিক দর্শন মানুষকে আকর্ষণ করে। প্রাচ্যের মুসলিমরা ব্যাপকভাবে সামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী সাম্রাজ্যের অর্থনীতি সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। আর এরই মাধ্যমে ইসলামের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও চূড়ান্তভাবে সামরিক রূপরেখা ও শক্তি পৃথিবী স্বীকার করে নেয়।

আগের সংবাদআওয়ামী লীগে কট্টর ইসলামপন্থীরা সক্রিয়, ভারতীয় পত্রিকার দাবি
পরবর্তি সংবাদডাকসু ভিপির উপর আক্রমণের প্রতিবাদে সিলেটে ছাত্র মজলিসের বিক্ষোভ মিছিল