মুজাহিদুল ইসলাম :
ওআইসি
১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট আল-আকসা মসজিদে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ সেপ্টেম্বর মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রনেতারা মরক্কোকোতে মুসলিম দেশগুলো নিয়ে সহযোগিতামূলক একটি সংগঠন তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। যা বর্তমানে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) নামে পরিচিতি। প্রতি তিন বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় শীর্ষ সম্মেলন।
তারই ধারাবাহিকতায় ‘মক্কা সামিট: টুগেদার ফর দ্য ফিউচার’ শিরোনামে সৌদি আরবের মক্কায় বর্তমান সভাপতি বাদশাহ সালমানের নেতৃত্বে ওআইসির ১৪তম ইসলামিক সম্মেলনের আয়োজিত হয়। মক্কা ঘোষণায় বলা হয়, অমুসলিম দেশগুলোতে আগ্রাসন, বলপ্রয়োগ, অন্যায় ও নিপীড়নের শিকার মুসলমানদের পাশে থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তাদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করার অঙ্গীকার করা হয়।
ফিলিস্তিনীদের অধিকার হরণ করে এমন যেকোন শান্তিপ্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি জেরুজালেমকে ইসরাইলের কথিত রাজধানী ঘোষণা ও যুক্তরাষ্টের তা সমর্থনের নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়। দখলীকৃত সিরিয়ার গোলান মালভূমি হতে ইসরাইলকে সরে যাওয়ার দাবী জানানোর পাশাপাশি সিরিয়ার অখণ্ডতা ও সংকট নিরসনে জেনেভার ১ এর আলোকে নেয়ার প্রতি জোর দেয়। লিবিয়ার সকল পক্ষকে যু্দ্ধ ও জনগণের ভোগান্তি না বাড়িয়ে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদানের আহবান ও ইয়ামেনের আবদে মানসুর হাদির সরকারের প্রতি সমর্থন প্রদানও দেয়া হয়।
বিশ্লেষকগণ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইরান-সৌদি আরবের মধ্যে আঞ্চলিক রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রভাব যেন এ সংগঠনের ঐক্য ও সংহতিকে সংকটে না ফেলে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে কোনো এক পক্ষকে সমর্থন না করে সদস্য দেশগুলোর উচিত হবে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা, সিরিয়া ও ইয়ামেনের মানবিক সংকট মোকাবেলায় মুসলিম দেশগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানায়।
আরবলীগ
আরব লীগ আরব দেশগুলোর সবচেয়ে বড় সংস্থা। মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংস্থাও এটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ২২ মার্চ ১৯৪৫ সালে নিজেদের নিরাপত্তা ও আর্থিক উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকারে প্রতিষ্ঠিত হয় আরব লীগ।
৩১ মার্চ ২০১৯ তারিখে তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসে সর্বশেষ ত্রিশতম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২২টি দেশের সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলনে আরব লীগের মাত্র ১১ জন শীর্ষ নেতা অংশগ্রহণ করেন।
গোলান মালভূমির ওপর ইসরাইলের স্বার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার নিন্দা ও প্রত্যাখানের পাশাপাশি বরাবরের মতো ফিলিস্তিনীদের ন্যায্য অধিকারের প্রতি তাদের সমর্থন ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবকিছু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ইস্যুর ন্যায্য সমাধান আশু প্রয়োজন বলে দাবি করা হয়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ও অখণ্ডতা রক্ষায় ইরাককে সমর্থন, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পারস্পারিক সহযোগিতা করার ওপর জোর দেয়া, আরবদেশগুলোর সাথে ইরানের সম্পর্ক ইরানের সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের ওপর নির্ভর করছে বলে জানানো হয়।
আরব লীগের প্রতি মুসলিম বিশ্বের, বিশেষত আরব মুসলিমদের ব্যাপক প্রত্যাশা থাকলেও শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। কিছু নিন্দা প্রস্তাব ও অঙ্গীকারসর্বস্ব ঘোষণায় শেষ হয় প্রতিটি শীর্ষ সম্মেলন। ঘোষণা ও অঙ্গীকার থাকে; কিন্তু তা বাস্তবায়নের রূপরেখা কেমন হবে তার উল্লেখ থাকে না। যেমন—এবারের শীর্ষ সম্মেলনের অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল গোলান মালভূমির ওপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণা। আরব লীগের শীর্ষ সম্মেলনে এই ঘোষণার নিন্দা করা হয়েছে। কিন্তু গোলান মালভূমির ওপর সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব কিভাবে রক্ষা করা হবে, সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই।
কুয়ালালামপুর সামিট ২০১৯
‘দ্য কুয়ালালামপুর সামিট ২০১৯’ শীর্ষক সম্মেলনটি ১৮-২০ ডিসেম্বর কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। পশ্চিমা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষ, বিরোধী প্রচারণা ও মুসলিম বিশ্বের উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও সুশাসন, সংস্কৃতি ও পরিচয়, সুবিচার ও স্বাধীনতা, শান্তি, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়।
সম্মেলনে তুরস্ক, কাতার, ইরান ও মালয়েশিয়ার শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হওয়ার পাশাপাশি ৫০টি দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের চার শতাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত হয় এ সম্মেলনে। সম্মেলন থেকে যৌথ কোন ঘোষণা না এলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় মুসলমান দেশগুলোর মধ্যে স্বর্ণ ও পণ্য অদলবদল প্রথা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ। তুর্কি প্রেসিডেন্ট বিশ্ব পাঁচ হতে বড় দাবি করে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার ও সেখানে মুসলিমদের স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবি জানান। সম্মেলনে চীন, মায়ানমার ও ভারতের মুসলিমদের নির্যাতন-ইস্যু গুরুত্বের সাথে স্থান পায়।
বিশ্বের ১৭৫ কোটি মুসলিমের ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য এই সম্মেলন সঠিক ফোরাম নয় বলে দাবি করেছে সৌদি আরব অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। বরং তা বানচালে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফোরামের উদ্যোক্তাদের অন্যতম পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শেষ সময় অংশগ্রহণ করতে না পেরে দুঃখ প্রকাশ করেন। এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠান। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এ সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছেন। এ সম্মেলন মুসলিম উম্মাহের মধ্যে বেশ আশা জাগিয়েছে। তবে যেহেতু আঞ্চলিক বিভিন্ন শক্তির স্বার্থদ্বন্দ্ব আছে, তাই কার্যকর ভূমিকার দৃশ্যমান ফলাফলে জন্য মুসলিম উম্মাহকে অপেক্ষাই করতে হবে।
ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক
৫ ও ৬ এপ্রিল মরক্কোর মারাকাসে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) ৪৪তম বোর্ড অব গভর্নরসের বার্ষিক সভা “দ্রুত পরিবর্তিত বিশ্বে রূপান্তর: টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যের পথে” স্লোগানের অধীনে হয়। মুসলিম দেশগুলোর জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট বাদশাহ ফয়সালের বিশেষ অণুপ্রেরণায় আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে ব্যাংকটির সদস্য সংখ্যা ৫৭।
এই বছরের বৈঠকে ৫৭ সদস্য রাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রীগণ অংশ নেয়ার পাশাপাশি জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন। টেকসই বিকাশের লক্ষ্যগুলি বাস্তবায়নের উপায়, বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা, যুবকদের জন্য নতুন সুযোগ ও কাজের ক্ষেত্র তৈরি উপায় এবং নারীর ক্ষমতায়নের প্রচেষ্টা সমর্থন করার প্রক্রিয়াগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
