হিন্দুত্ববাদী আদালত: গেরুয়া সন্ত্রাস যেভাবে দায়মুক্তি পায়  

হিন্দুত্ববাদী আদালত: গেরুয়া সন্ত্রাস যেভাবে দায়মুক্তি পায়  

মুনশী নাঈম:

‘গেরুয়া সন্ত্রাস’ হলো উগ্র হিন্দু সংগঠনের সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, পৈচাশিকতা। গুজরাট দাঙ্গার সময় শব্দটির উদ্ভব। গুজরাটে হাজার হাজার মুসলিম হত্যার মধ্য দিয়ে যে গেরুয়া সন্ত্রাসের আগমন, পরবর্তীতে এমন অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের ক্রীড়নক এবং খলনায়ক তারা। একটি হত্যাকাণ্ডেরও উল্লেখ্যযোগ্য কোনো বিচার হয়নি ভারতের হিন্দুত্ববাদী আদালতে। নিম্নে কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলো।

গুজরাট হত্যাকাণ্ড

২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের গোধরা শহরের নিকটে বহু হিন্দু তীর্থযাত্রী ও অন্যান্য যাত্রীসহ sabarmati express নামে একটি ট্রেন বিস্ফোরণ হামলার শিকার হয়। এতে ৫৯ জন নিহত হয়। কোনো প্রমাণ ছাড়াই, মুসলিমরা এ হামলা ঘটিয়েছে মিথ্যা খবরটি ছড়িয়ে পড়লে গুজরাটজুড়ে শুরু হয়ে যায় মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা। নৃশংসতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায় উগ্র হিন্দুরা। তারা অনেক মুসলিমকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে, গর্ভবতী নারীর পেট চিরে সন্তান ও মা দুজনকেই কুপিয়ে খুন করে, মেয়েদের ধর্ষণ করে অবাধে। মিথ্যা খবরে সৃষ্ট পরিকল্পিত এই দাঙ্গায় নিহত হয় দুই হাজারের বেশি মানুষ, আহত হয় কয়েক হাজার। আহত-নিহতদের অধিকাংশই মুসলিম। বিশেষ করে নারোদা পাটিয়া মহল্লায় ৯৭ জন মুসলিমকে যেভাবে মারা হয়েছিল, সেটা পৃথিবীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডলোর একটি।

নারোদা হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ছিল বিজেপি নেত্রী এবং সাবেক মন্ত্রী মায়া কোদনানি। এ মামলায় দণ্ডিত হয়ে জেল খাটছিলেন যারা, তাদেরকে একে একে মুক্তি দিচ্ছে আদালত। এক-দেড় বছর আগে বিজেপি নেত্রী মায়াকে মুক্তি দিয়েছে আদালত। ২০১৯ এর জানুয়ারিতে মুক্তি দিয়েছে আরও চার খুনীকে।

গুজরাটে দাঙ্গাপীড়িতদের হয়ে বহু বছর ধরে লড়ছেন আহমেদাবাদের অ্যাক্টিভিস্ট নির্ঝরিণী সিনহা। তিনি বলেন, নারোদা পাটিয়া মামলায় নিম্ন আদালতে কিন্তু খুব ভাল বিচার হয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্ট বা উচ্চতর আদালতে পৌঁছনোর পরই দেখা যাচ্ছে হয় সেগুলোতে হয় প্রসিকিউশন ঠিকমতো হচ্ছে না, কিংবা আগের সাক্ষ্য গ্রাহ্য হচ্ছে না এবং দণ্ডিতরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন। কোন কিছু যে ঠিকঠাক হচ্ছে না, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। ভিক্টিমদের সঙ্গে ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্স সিস্টেমের এটা যেন চরম এটা একটা প্রহসন।

‘গুজরাট ফাইলস’ বইয়ের লেখিকা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক রানা আয়ুবও মনে করছেন মায়া কোদনানির মুক্তির পর থেকেই যেন এই বিচারের ধারাটা পুরো উল্টে গেছে। আদালতের যেন মনে হচ্ছে—কেউ গুজরাট দাঙ্গায় যেন কেউ নিহত হয়নি।

সমঝোতা একপ্রেস হামলা

২০০৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা ৫০ মিনিটে ১৬টি বগি নিয়ে দিল্লি থেকে পাকিস্তান সীমান্তবর্তী স্টেশন আত্তারির দিকে রওয়ানা হয় সমঝোতা এক্সপ্রেস। এই ট্রেনের অধিকাংশ যাত্রীই ছিলেন পাকিস্তানি। এদের প্রায় সবাই ভারতে অবস্থানরত আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা সাক্ষাত করে দেশে ফিরছিলেন। ট্রেনটি যখন ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের পানিপথে এসে পৌঁছায়, তখন বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরিত হয়। ফলে ট্রেনের দুইটি বগি আগুন ধরে যায়। এই ভয়াবহ বোমা হামলায় মোট ৬৮ জন প্রাণ হারান। যাদের মধ্যে ৪৩ জন পাকিস্তানি এবং ১০ জন ভারতীয়। বাকি ১৫ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ওই সময়কার বিরোধী দল বিজেপি ও কয়েকটি ভারতীয় মিডিয়া হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে দায়ী করেছিল। কিন্তু ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এনআইএ) তদন্তে দেখা যায়, হামলাটি চালিয়েছিল চার ব্যক্তি: স্বামী অসিমানন্দ, কমল চৌহান, রাজিন্দর চৌধুরী ও লোকেশ শর্মা। তারা সবাই হিন্দু উগ্রবাদী গ্রুপ অভিনভ ভারতের সদস্য। এনআইএ চারজনকেই দোষী সাব্যস্ত করে।

কিন্তু ২০১৯ সালে ২০ মার্চ সমঝোতা এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজন অভিযুক্তকেই মুক্তি দিয়ে দেয় এনআইএ-র বিশেষ আদালত। আদালত পাকিস্তানি সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণের আবেদনও নাকচ করে দেয়। এনআইএ-র কৌঁশুলি আর কে হাণ্ডা বলেছেন, এনআইএ-র বিশেষ আদালত সিদ্ধান্তে এসেছে যে তদন্তকারী সংস্থা কোনও রকম ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বেনিফিট অফ ডাউট দেওয়ার কথা বলেছে।

এই দুঃখজনক রায়ের পর দোষীদের শাস্তি দিতে এনআইএ উচ্চতর আদালতে যাওয়ার বা নতুন করে তদন্তের কোনো ঘোষণা দেয়নি। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংও স্পষ্ট করে জানান যে সরকার আপিল করবে না। তিনি বলেন, তার ব্যক্তিগত অভিমত হলো এই যে পাকিস্তানই সবসময় এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী।

হায়দ্রাবাদের মক্কা মসজিদে হামলা

২০০৭ সালের ১৮ মে। হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদে জুমার নামাজের সময় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ৯জন মুসল্লি শহিদ এবং ৫৮ জন আহত হন।

হায়দরাবাদ পুলিশ প্রথমে দায়ী করেছিল হরকাত উল জিহাদ নামে এক সংস্থাকে। শতাধিক মুসলিমকে এ জন্য গ্রেপ্তারও করা হয়। ২০০৮ সালে তারা ছাড়া পায়। দুই বছর পর হায়দরাবাদ পুলিশের হাত থেকে এই হামলার তদন্ত তুলে দেয়া হয় সিবিআইয়ের হাতে। সিবিআই হিন্দু উগ্রপন্থী সংগঠনদের ওই বিস্ফোরণের জন্য দায়ী করে। চার্জশিটে বলা হয়, একের পর এক ইসলামি মৌলবাদী আক্রমণে ক্ষুব্ধ হয়ে হিন্দু উগ্রপন্থী সংগঠন অভিনব ভারত এই কাজ করে।

এরপর ২০১১ সালে সিবিআইয়ের হাত থেকে তদন্ত চলে যায় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইয়ের কাছে। কিন্তু এনআইএ যে ১১ জনকে অভিযুক্ত করেছিল, তাদের সবাইকে আদালত খালাস দিয়েছে। এনআইএ তদন্তে দেখেছিল যে ওই ১১ জন অভিনব ভারতের সদস্য। সমঝোতা এক্সপ্রেসে হামলার জন্য অভিযুক্ত স্বামী অসিমানন্দও এই ঘটনার সাথে জড়িত বলে তদন্তে ওঠে আসে। কিন্তু এখানেও প্রমাণের অপর্যাপ্ততার কথা বলে আদালত সবাইকে বেকসুর খালাস দেয়। এক্ষেত্রেও এনআইএ আপিল করার কথা জানায়নি।

আজমির শরিফ দরগাহ বিস্ফোরণ

২০০৭ সালের ১১ অক্টোবর, ইফতারির সময় আজমির দরগাহ শরিফের আঙিনায় একটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তিনজন নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়। এ মামলায় জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইয়ের তদন্তে ভবেশ পাটল, আরএসএস নেতা দেবেন্দ্র গুপ্তা, সুনীল যোশী, অসীমানন্দ, চন্দ্রশেখর, মুকেশ, ভরত মোহন, লোকেশ শর্মা, মেহুল কুমার এবং হর্ষদের নাম উঠে আসে।

কিন্তু ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ এনআইয়ের বিশেষ আদালত ভবেশ প্যাটেল, দেবেন্দ্র গুপ্তা ও সুনীল যোশিকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং অভিযুক্ত ৫ জনকে রেহাই দেয়। আদালত আরএসএস নেতা ইন্দ্রেশ কুমারকে ক্লিনচিট দেয় এবং বহুলালোচিত স্বামী অসীমানন্দকে বেকসুর খালাস করে দেয়। দোষী সাব্যস্ত হওয়া সুনীল যোশির অবশ্য আগেই রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়।

ওই মামলা থেকে অসীমানন্দর পাশাপাশি চন্দ্রশেখর, মুকেশ, ভরত মোহন, লোকেশ শর্মা, মেহুল কুমার এবং হর্ষদ সোলাঙ্কিকে রেহাই দেয়া হয়। অন্যদিকে, সুরেশ নায়ার, সন্দীপ ডাঙ্গে এবং রামচন্দ্রকে পলাতক ঘোষণা করা হয়।

শেষকথা

উপরোক্ত হত্যাকাণ্ড এবং বিচারগুলো লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ভারতের আদালত আসলে গেরুয়া সন্ত্রাসকেই রক্ষা করে। নামকা ওয়াস্তে বিচার বসায়, তদন্ত অর্পণ করে জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইয়ের কাছে। তারপর এনআই কখনোই পর্যাপ্ত প্রমাণ দিতে পারে না হত্যাকাণ্ডের। আদালত মুক্তি দিয়ে দেয় দিনদুপুরে মানুষ হত্যাকারীদের। তারচেয়েও অদ্ভুত হলো—এনআই কখনোই কোনো ঘটনায় আপিল জানায়নি। অদ্ভুত নীরবতা প্রদর্শন করেছে।

মূলত ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। যার ফলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।

এর জ্বলন্ত প্রমাণ সম্প্রতি বাবরি মসজিদ মামলার রায়। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ গুড়িয়ে দেয় বিজেপি এবং শিবসেনার করসেবকরা। তারপরে সৃষ্ট দাঙ্গায় নিহত হয় দুই হাজার মুসলিম। তদন্ত করে অপরাধীদের বিচার না করে ভারতের হিন্দুত্ববাদী আদালত বাবরি মসজিদের জায়গায় উলটো রামমন্দির নির্মাণের রায় দিয়েছে। যদিও আদালতে প্রমাণ হয়নি—মসজিদের নীচে রাম মন্দির ছিল।

আপিল না করে, তদন্ত না করে, পরিপূর্ণ সাক্ষী না নিয়ে—ভারত আসলে প্রমাণ করছে তারা মুসলিমদের হত্যাকারী গেরুয়া সন্ত্রাসের বিচার করতে আগ্রহী নয়। হিন্দুত্ববাদী আদালতও গেরুয়া সন্ত্রাসকে দিয়ে দেয় ক্লিনচিট। এভাবেই ভারত পরিণত হচ্ছে গেরুয়া সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্যে।

আগের সংবাদপ্রসঙ্গ সিএএ : বিক্ষোভকারী ভেবে ৬ বছর আগে মৃত ব্যক্তিকে পুলিশের নোটিশ
পরবর্তি সংবাদবাংলাদেশে গেরুয়া বাতাস: রাজনীতিতে ‘হিন্দুত্ববাদী অনুপ্রবেশে’র চেষ্টা