রাগিব রব্বানি :
মনে করা হয় ভারতের গেরুয়া গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের উত্থান ঘটেছে ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়ে; এর কারণ, খোদ বিজেপিই আপাদমস্তক একটি গেরুয়া সংগঠন। কিন্তু আদতে গেরুয়াদের উত্থান ঘটেছিল সেই ৪৭ সালেই, ভারত-পাকিস্তান ভাগ হবার মধ্য দিয়ে। দেশভাগের পর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরু ও তাঁর দল যদিও দেশটিকে সেকুলার রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রের কর্মপ্রক্রিয়া ও তৎপরতা আদতে হিন্দুত্ববাদেরই প্রতিনিধিত্ব করছিল। সেখানকার সংখ্যালঘু বা মুসলিম জনগোষ্ঠী নানাভাবে সময়ে সময়ে নিগ্রহ ও নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছিলেন।
সময়ের পালাক্রমে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও গেরুয়া সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ভারতের রাষ্ট্রীয় মদদ ও আস্কারাতেই ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। উগ্র সন্ত্রাসবাদী এই সংগঠনের কর্মীদের হাতে দাঙ্গার নামে হাজার হাজার মুসলিম নির্মমভাবে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। এদের হাতেই শহিদ হয়েছে শত শত বছরের ঐতিহ্য মণ্ডিত অযোধ্যার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ। আজকের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি আদতে এই আরএসএসেরই রাজনৈতিক শাখা।
তবে এটা ঠিক, ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়ে গেরুয়া বাহিনী নতুন উদ্যম ও শক্তি লাভ করেছে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন পেয়েছে নতুন মাত্রা। এতদিন তারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণ পেত আড়ালে-আবডালে, এখন পাচ্ছে কোনো রাখঢাক ছাড়াই, বরং স্বয়ং রাষ্ট্রই নিরত হয়েছে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা নিয়ে।
জন্ম লগ্ন থেকেই ভারত তার প্রতিবেশী ক্ষুদ্র ও অপেক্ষকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর সাথে কখনোই সদাচরণ করেনি, বরং সবসময় দাদাগিরি করে এসেছে। দুর্বল প্রতিবেশীরা একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও সবল ও বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের আনুগত্য প্রদর্শনে বাধ্য থেকেছে। ভারত তার দাদাগিরি ফলাতে গিয়ে নূন্যতম সৌজন্যতাবোধ রক্ষারও গরজ দেখায়নি। এমনকি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নগ্ন হস্তক্ষেপও করে এসেছে বারবার।
এতোকাল এই দাদাগিরি ফলানোর পেছনে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা প্রধানতম উদ্দেশ্য থাকলেও ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়ে গেরুয়া বাহিনীর রাষ্ট্রীয় উত্থানের পর এই দাদাগিরির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে উপমহাদেশে হিন্দুত্ববাদের একক আধিপত্য বিস্তার। ফলে নিকট প্রতিবেশী দেশগুলো সম্প্রতি ভারতের দাদাগিরি থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করেছে। ছোট ও দুর্বল দেশ হিসেবে তাদের অনেকে এই ‘ধৃষ্টতা’র ব্যাকআপ পেতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে নিয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মালদ্বীপ তার অভ্যন্তরীণ কারণে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য হবার সময় প্রকাশ্যেই ভারতের প্রতি অপমানকর পদক্ষেপ গ্রহণের কথা উল্লেখ করা যায়। চীন সেসময় কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেবার মতো করে বলেছিল, তারা ভারতের যেকোনো ধরনের প্রত্যক্ষ ব্যবস্থার বিরোধিতা করবে। অথচ এই মালদ্বীপই বছর কয়েক আগে ভারতের একান্ত আজ্ঞাবহ ছিল।
এদিকে নেপালে বিজেপি সরকার নিজেদের আধিপত্য অটুট রাখতে গিয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছে। ৮০ ভাগ লোক হিন্দু হবার ফলে রাজতন্ত্রের আমলে নেপাল ছিল ঘোষিত হিন্দু রাষ্ট্র। কিন্তু ২০১৫ সালে পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে যখন দেশটি সেকুলার রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হয়, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী চেহারা তখন প্রবল রাগান্বিত হয়ে ওঠে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত নেপালি জনগোষ্ঠী মদেশিদের তারা কাজে লাগায় এবং এদের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে দেশটিতে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে তুমুল এক সংকটের সৃষ্টি করে। ফলে নেপালি জনগণের মধ্যে ভারতের গেরুয়া আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তৈরি হয় বৈরি মনোভাব। যার কারণে ভারতপন্থীদের বদলে চীনপন্থী কমিউনিস্ট জোটকেই তারা ক্ষমতায় রেখেছে। অথচ প্রথমেই বলেছি দেশটির ৮০ ভাগ মানুষই হিন্দু মতাবলম্বী।
এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেক সহযোগিতার পরও বাংলাদেশের জনগণের কাছে ভারত একটি ‘শত্রু দেশ’ হিসেবেই পরিচিত। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নানা সময়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ন্যায্য পাওনাগুলো অনাদায়, সীমান্তে হত্যা ইত্যাদি নানাবিধ কারণে বাংলাদেশের জনগণ ব্যাপকভাবে ভারত-বিরোধী অনেক আগ থেকেই। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর গেরুয়া-বাহিনীর রাষ্ট্রীয় উত্থান এই বিরোধিতাকে আরও প্রগাঢ় ও ব্যাপক করে তুলেছে। এর অন্যতম কারণ, ক্ষমতাসীন বিজেপি একেরপর এক সেদেশের মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন, বৈষম্যমূলক আচরণ ও আইন প্রণয়ন করা। বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবতই ধর্মঘনিষ্ঠ এবং নিজেদের ধর্মীয় সম্পর্কের প্রশ্নে সচেতন। ফলে ভারতীয় মুসলমানদের ওপর গেরুয়া শক্তির ক্রমান্বয় আঘাত ও নানামাত্রিক আক্রমণ ভারতের প্রতি তাদের মনোভাবকে আরও তিক্ত করে তুলছে প্রতিনিয়ত।
