মুজাহিদুল ইসলাম:
বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির তীক্ষ্ণ এবং জনপ্রিয় মাধ্যম খোঁচা দিয়ে কথা বলা। সোজা প্রসঙ্গকে ঘুরিয়ে বাঁকা করে বলা। খোঁচা দিয়ে মনের ঝাল মেটানোর সংস্কৃতি আজকের নয়, অনেক পুরোনো। এই সংস্কৃতি নিন্দনীয় হলেও নির্মল হাস্য-রস এবং কৌতুক সকল জাতি-ধর্ম ও কৃষ্টি-কালচারেই সিদ্ধ। বিখ্যাত নাট্যকার অস্কার বিজয়ী উইল্ড বলেন, ‘আপনি যদি মানুষের কাছে সত্য বলতে চান, তাহলে হাসি দিয়ে বলুন। নইলে তারা আপনাকে শুনবে না।’
যে কথা সোজা বলা যায় না, সে কথা বিদ্রুপ করে খুব সহজেই বলা যায়। এতে পাশ কাটানোর সুযোগ থাকে। এজন্যই যুগে যুগে স্বৈরাচারের প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্র ও সরকারের সমালোচনায় মানুষ বিদ্রুপের আশ্রয় নিয়েছে। কৌতুক ও বিদ্রুপের মাধ্যমে তারা ফুটিয়ে তুলেছে তাদের ক্ষোভ, প্রতিবাদ, গড়ে তুলেছে প্রতিরোধ। একসময় বিদ্রুপ হয়ে উঠেছে স্বৈরাচার এবং সরকার মোকাবেলার প্রধান অস্ত্র।
ইসলাম-পূর্ববর্তী বিদ্রুপের মাধ্যম ও ইতিহাস
বিদ্রুপের ইতিহাস খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ বছর আগের। এই ক্ষেত্রে মিসর সবার থেকে অগ্রগামী। খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ বছর আগে জনগণের শক্তির সামনে রাজার পরাজয়ে চিত্র তুলে ধরতে মিসরের বুদ্ধিজীবীরা বিড়াল ও ইঁদুরের একটি চিত্র তুলে ধরতো। বিড়াল দ্বারা রাজা ও ইদুর দ্বারা জনগণকে নির্দেশ করা হতো। চিত্রে দুটি কুকুর একটি যুদ্ধযান চালাতে থাকে, যার চারপাশে ইদুরদের রাজা ঘুরে ঘুরে বিড়াল দ্বারা নিরাপত্তায় থাকা দূর্গে আঘাত হানতে থাকে।
ইসলাম-পরবর্তী বিদ্রুপের মাধ্যম ও ইতিহাস
ইসলামি ইতিহাসের প্রথম সম্বোধিত ব্যক্তিরা হল জাহেলী যুগ-পরবর্তী প্রজন্ম। ইতিহাসের স্বর্ণ মানব। তাদের একজনকে নিন্দা মানে গোটা গোত্রের নিন্দা করা, যা তাদের বংশানুক্রমে ইসলাম-পরবর্তী জীবনেও উপস্থিত ছিল। তাদের চিন্তার জগত ও রুচি অনুসারে বিদ্রুপকে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করলেও কোথাও কোথাও বৈধতা দিতে তিনি উদাহরণ এনেছেন। রাসূল সা. শত্রুদের উপহাসের জবাব কবিতার মাধ্যমে দিতে তার বাগ্মী সাহাবীদের নির্দেশ দিতেন, যা রাসূল শুনতেন এবং উপভোগ করতেন।
প্রথম শতাব্দী
তবে ইসলামি ইতিহাসে উপহাস ও বিদ্রুপের কথা মনে পড়লেই কল্পনায় ভেসে ওঠে ছোটখাটো, বেঁটে আকৃতির একজন মানুষ। মাথায় পাগড়ি আর গায়ে জোব্বা। সার্বক্ষণিক সঙ্গী একটা গাধা। তার নাম নাসিরুদ্দিন হোজ্জা; তাকে নিয়ে হাজারেরও বেশি গল্প চালু আছে। কোনো গল্পে তাকে মনে হয় খুব বুদ্ধিমান একজন মানুষ। আবার কোনো গল্পে তার আচরণ একেবারেই বোকার মতো মনে হয়। তবে তিনি পরিচিত তার সুক্ষ্ণ রসবোধের কারণে। তার নানা কথা আমাদের যেমন হাসায়, তেমনি ভাবায়ও বটে। দীর্ঘ সময় ধরে হোজ্জা দৃশ্যপটে রয়েছেন। তিনি হয়ে ওঠেন যুগে যুগে বিভিন্ন স্থানে নতুন হোজ্জা। যারাই অবিচার আর প্রতিবাদে অভিনব এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছে, তা্দেরকেই বলা হয়েছে হোজ্জা। তুরস্ক, ইরান, আর্মেনিয়া, মাল্টা, ইতালি, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, জার্মানিসহ এশিয়ায় বিভিন্ন জায়গায় হোজ্জা তার গল্পে বেশ পরিচিত।
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী
মিসরীরা প্রয়োজন অনুসারে বিদ্রুপের নিত্য নতুন ভার্সন বের করতে থাকে। প্রশাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে শাণিত হতে থাকে বিদ্রুপাত্নক প্রতিরোধ। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে মিসরে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের আক্রমণের পরে ইউরোপ থেকে আমদানী হতে থাকে বিদ্রুপ আর উপহাসের নতুন ভার্সন কার্টুন। মিসরীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী বিদ্রুপসাহিত্যে পাশ্চাত্যের মিশেলে তৈরী করে প্রশাসন-রাজনীতির দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুচালো প্রতিবাদ।
কার্টুনকেন্দ্রিক এই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে নায়ক জনগণ ও খলনায়ক সমালোচিত সরকার। অসংখ্য পত্রিকা, জার্নাল ও সাময়িকী শুধু এই কার্টুনকেন্দ্রিক এই প্রতিবাদের কারণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু জনগণ তাদের ক্ষোভ প্রশমনে এ পথে চলা অব্যাহত রাখে।
কাল্পনিক কমেডি ব্যক্তি
চ্যালেঞ্জের মুখে তখন প্রতিরোধের এই বিকল্প বিদ্রুপসাহিত্যে আসে নতুন ভাবনা। মিশরীয় শিল্পী আলেকজেন্দ্রার মিসরের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে একজন কাল্পনিক মিসরীয় আফেন্দী (মিসরী নেতা) ব্যক্তিত্ব আবিস্কার করেন। তারপর একের পর এক কাল্পনিক ব্যক্তি দৃশ্যপটে আসতে থাকে, যাদের নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন গল্প, যেখানে কল্পিত এই আফেন্দী বা নেতা জনগণের শক্তির সামনে পরাজিত হয়। এ প্রতিবাদ প্রক্রিয়া কতটা তীব্র ও সুচালো হলে খোদ দেশের প্রেসিডেন্ট তাকে নিয়ে বিদ্রুপ না করার অনুরোধ করেন!
আরব বসন্ত ও বিদ্রুপাত্নক প্রতিবাদ
সময়ের সাথে সাথে মিসর থেকে এই বিদ্রুপাত্নক এই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে ফিলিস্তিন, লিবিয়া, লেবানন ও সিরিয়ায়। বিশেষত আরব বসন্তের সময় এই বিদ্রুপাত্নক প্রতিবাদ আরব জনগণের দৈনিক রুটিনে পরিণত হয়। এমনকি ২০১১ সালে সিরিয়ায় বিদ্রোহের সূচনাতে আসাদ প্রশাসন এমনই এক শিল্পীকে রম্যকথনের শাস্তিস্বরুপ তার হাতের আঙ্গুল ভেঙ্গে দেয়।
কমিক্স
প্রযুক্তির বিস্তৃতিতে মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা এবং আরব ও বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসক-কর্তৃক বাকরুদ্ধ করার বিভিন্ন পলিসির মধ্যে জন্ম নেয় ভার্চুয়াল ও হার্ডকপির কমিক্স নামক রম্যসাহিত্য। যে সাহিত্য ছবি ও লেখার মাধ্যমে একটি চিন্তা প্রকাশ করে, সাধারণত যা জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদে বড় একটি মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পায়। আরব বসন্তে এ ধরণের কমিক্সের বেশ বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রশাসন প্রকাশকদের চাপ দেয়ার মাধ্যমে যতই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, সে চেষ্টাও কমিক্সসাহিত্যের নতুন খোরাক যোগাচ্ছে। সাধারণত বিশ্বশক্তি তাদের কৌশলগত কারণেই বিভিন্ন দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অনুরোধে তাদের মনপুত নয় এমন কন্টেন্ট মুছে ফেলে।
দেশে দেশে জরিমানা
বিষয়টির নাজুকতার কারণে মিসর, সৌদি আরব , আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ এ ধরণের কার্টুন, চিত্র ও কমিক্স প্রকাশের জন্য অর্থদণ্ড থেকে শুরু করে কারাদণ্ড পর্যন্ত ব্যবস্থা রেখেছে। তবে বাস্তব হলো, যে কোনও দমনকারী ব্যবস্থার অনিবার্য কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হয়। যেমন: মাথাব্যথা, মেজাজ বিগড়ে যাওয়া, শরীর ফুলে যাওয়া, বদহজম, ক্ষুধা হ্রাস, ঘুম হ্রাস, বাড়ির ক্ষতি, বন্ধুদের ক্ষতি, গ্যারান্টিযুক্ত সাংবিধানিক অধিকার হ্রাস, এমনকি মৃত্যু।
