মুনশি নাঈম:
১৪ মে, সোমবার, ২০১৮; আমি যে দিনটির কথা বলছি, ইজরাইলের ইতিহাসে তা ‘জাতীয় গর্বে’র এক দিন। এদিন ইজরাইলের তেলআবিব থেকে মার্কিন দূতাবাসটি কুদসে (জেরুসালেম) স্থানান্তর করা হয়। দূতাবাস স্থানান্তরের দিনটিকে ‘ইজরাইলের জন্য বিশেষ দিন’ আখ্যায়িত করে টুইট করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
পবিত্র ভূমি কুদসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস খোলাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভে নামে ফিলিস্তিনিরা। ১৯৪৮ সালে যেখান থেকে তারা উৎখাত হয়েছিল, সেখানে যাবার স্লোগান তুলে গাজার সঙ্গে ইজরাইলের সীমান্তে কড়া সুরক্ষিত বেড়া অতিক্রমের চেষ্টা করে তারা। এ সময় নৃশংসভাবে গুলি চালায় ইজরাইলি সেনাবাহিনী। টিয়ার সেল গ্যাস, গুলি, বোমায় নিহত হয় ৫৮ ফিলিস্তিনি, আহত হয় প্রায় তিন হাজার। ইজরাইলের জন্য দিনটি উৎসবের হলেও গাজায় বয়ে যায় এ দিন রক্তগঙ্গা।
অবরুদ্ধ গাজার একদিন
১৪ মে’র সেই রক্তাক্ত দৃশ্যগুলোর সমন্বয়ে একটি ডকুমেন্টারি প্রকাশ করেছিল বিবিসি। ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিলেন পরিচালক অলি ল্যামবার্ট। ‘গাজায় একদিন’ শিরোনামের ডকুমেন্টারিতে অলি কোনো ইতিহাস টানেননি। কেবল ওইদিনের নির্যাতনের দৃশ্যগুলো ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এমন ভয়ংকর দৃশ্য, শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায় ভয়ে।
ল্যামবার্ট বিভিন্ন সংগৃহীত ফুটেজে দেখিয়েছেন, চারদিকে যেন মৃত্যুর হাহাকার পড়ে গেছে। কারো হাতে গুলি, কারো বুকে। টিয়ার সেলে খোলা যাচ্ছে না চোখ। মানুষ দৌড়াচ্ছে, দৌড়াচ্ছে, দৌড়াচ্ছে। ধোঁয়া আর আগুনে সাক্ষাৎ কেয়ামত যেন। বেশিরভাগের পায়ে গুলি করা হয়েছে। গুলির আঘাতে পায়ের হাড় গুড়ো হয়ে গেছে একদম।
বিক্ষোভে এসেছিলেন উইসাল শেখ খলিল। সীমান্ত বেড়ার কাছে তিনি তার বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এমন সময় লক্ষ্যভেদী অত্যাধুনিক ইজরাইলি স্নাইপারের বুলেট তাঁর মাথায় আঘাত করে। তিনি ঢলতে ঢলতে পড়ে যান মাটিতে। স্নাইপারের বুলেট বিদ্ধ হয়ে আরও এক জায়গায় ঢলে পড়তে দেখা যায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে। ডকুমেন্টারিতে বশির নামের একটি ছেলের কোমর পর্যন্ত দেখানো হয়েছিলো। সে বলেছিল, তার পা কেটে দিয়েছে ইজরাইলি সেনারা।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বিবিসি এবং এএফপি জানিয়েছে, নিহত ৫৮ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। এ সময় ইজরাইলি বাহিনীর গুলিতে আহত হয় আরও প্রায় তিন হাজার ফিলিস্তিনি।
সংগ্রামী জাতির কথকথা
এই কুদস শহর মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি–সবার কাছেই পবিত্র ভূমি বলে বিবেচিত। শত শত বছর ধরে কুদসের নিয়ন্ত্রণ নিতে স্থানীয় বাসিন্দা, আঞ্চলিক শক্তি ও আক্রমণকারীরা লড়াই করেছে। এর মধ্যে ছিল মিসরীয়, ব্যাবিলনীয়, রোমান, মুসলিম, ক্রুসেডার, অটোমান, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো। সর্বশেষ এই পবিত্র ভূমি দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে দখলদার ইজরাইল।
১৯১৭ সালে ‘বেলফোর ঘোষণার’ পর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ইজরাইল। ওই বছরই আরব-ইজরাইল যুদ্ধে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডসহ বেশ কিছু আরবভূমি দখল করে নেয় ইজরাইল। এরপর ১৯৬৭ সালে আরব-ইজরাইল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের প্রায় পুরোটাই ও মিসরে সিনাইয়ের কিছু ভূমিও দখল করে ইজরাইল। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে সীমানা বরাদ্দ রেখেছিল, বর্তমানে তার অর্ধেকও ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে নেই। পশ্চিম তীর ও পূর্ব কুদসে ফিলিস্তিনিদের হটিয়ে তাদের জমির ওপর প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ইহুদিবসতি গড়ে তুলেছে দখলদার ইজরাইল।
আর তাদের এই দখলদারিত্বকে সমর্থন দিতেই ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইজরাইলি দূতাবাস তেলআবিব থেকে কুদসে স্থানান্তর করবেন। গত ৬ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে কুদসকে ইজরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন ট্রাম্প। এই ঘোষণার পর ফিলিস্তিনিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পের ঘোষণার সমালোচনা শুরু হয়। কুদসকে ইজরাইলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে ২১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটি হয়। তাতে ট্রাম্পের ঘোষণা প্রত্যাখ্যাত হয়। ভোটাভুটিতে ১২৮ সদস্য ট্রাম্পের ঘোষণা প্রত্যাহারের পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট দেয় মাত্র নয়টি দেশ। ৩৫টি দেশ ভোটদান থেকে বিরত থাকে। তারপরও নিজের নীতিতে অনড় থেকে কুদসে দূতাবাস স্থানান্তর করলেন ট্রাম্প।
ফিলিস্তিনিরা মনে করে, এই দূতাবাস খোলার অর্থ পুরো কুদসের নিয়ন্ত্রণ নিতে ইজরাইলকে ওয়াশিংটনের স্বীকৃতি দেয়া। তাই প্রতিবাদে নেমে এসেছিল ফিলিস্তিনিরা। কিন্তু তাদের ইজরাইলি সেনারা চালায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। সিএনএনের খবরে বলা হয়েছিল, ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ হামলার পর সেখানে এতবেশি হতাহত হওয়ার ঘটনা আর ঘটেনি।
এদিন পৃথিবী শুধু তাকিয়ে দেখলো—গাজায় যখন রক্তগঙ্গা বইছে, তখন কুদসে মার্কিন দূতাবাস উদ্বোধন হচ্ছে। আনন্দে গান গাইছে হোয়াইট হাউজের দুই গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা–ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্প। কী অদ্ভুত সেলুকাস এই পৃথিবী!
