রাকিবুল হাসান:
পৃথিবীর উন্মুক্ত কারাগার গাজা উপত্যকা। যেখানে রাতদিনের কোনো ফারাক নেই; সর্বদাই ভয়ে তটস্থ থাকে মানুষ—এই বুঝি ইজরাইল থেকে উড়ে এলো ক্ষেপণাস্ত্র, গুঁড়িয়ে দিলো ঘরবাড়ি। জোরে একটু শব্দ হলেই বাচ্চারা গিয়ে লুকোয় চেয়ার কিংবা খাটের তলায়। কারাগার থেকে বেরোতে বন্দীরা যেমন হাঁসফাঁস করে, ঠিক তেমনি গাজার অধীবাসীরাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপেক্ষা করে এই ভয় থেকে মুক্তির। এই লেখায় তাদের সেই ভয়, অপেক্ষা ও মুক্তির তোড়জোড়ের চিত্র ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছি।
সংকটে গাজার শিশুরা
গত নভেম্বরে গাজায় ভয়ংকর টানা বিমান হামলা চালায় ইজরাইল। এই হামলায় গাজার ৩৪ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের রয়েছে নয়জন। পরিবারের নয়জন নিহত হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে বারো বছর বয়সী নুর আল সাওয়ার্কাহ এবং তার বোন রিমা ও দিয়া। ঘটনার দু সপ্তাহ পর আল জাজিরার কাছে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাওয়ার্কাহ বলছিলো, ‘শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে জানি না কী হলো আমার। আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। চারদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। তবুও আমি দৌড়েছি।’ রিমা যখন আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলছিলো, তার চোখে-মুখে তখনো পোড়া পোড়া দাগ। স্মৃতিচারণে এতটুকুই বলতে পারলো সে, ‘বিকট শব্দ কানের আসার পর আমার আর কিছু মনে নেই। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম আমি হাসপাতালে।’
এই হামলায় নিহত হয় সাওয়ার্কার বাবা রাসমি আবু মালহৌস, মা মরিয়ম। ভাই মোহননাদ, সেলিম, ফিরাস। চাচা মোহাম্মদ, চাচী ইসরা, চাচাতো ভাই ওয়াসিম, মোয়াজ। আপন সবাইকে হারিয়ে এতিম হয়ে গেছে সাওয়ার্কা। বাড়ি নেই, ঘর নেই, আশা নেই। কোনোরকমে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় হয়েছে তাদের।
গাজাভিত্তিক কর্মী ও লেখক রানা শুবায়ের চলতি সালের পয়লা জানুয়ারি এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘অবরুদ্ধ গাজার অধিবাসীদের শহরের বাইরে অন্য কোথাও ভ্রমণের সুযোগ নেই। বাচ্চাদের কুদসের ছবি দেখাতে চাইলে তারা দেখতে চায় না। বরং নিজেরা ওখানে গিয়ে ছবি তুলতে চায়। তারা জিজ্ঞেস করে, “মা, আমরা কুদসে কেন যেতে পারব না?” বড়দের শঙ্কিত কথাবার্তা বাচ্চারা শুনে ফেলে। তারাও চিন্তায় পড়ে যায়। ছেলেকে পড়ায় মনোযোগ দিতে বললে, ও বলে, চাকরি না পেলে পড়ালেখা করে কী করব? আমি জানি গাজায় চাকরি নেই, বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ছেলেদের পড়ার সুযোগ নেই। তবু তাদের মিথ্যা অভয়বাণী শুনাই, “স্নাতক শেষ হতে অনেক সময় এখনো। ততদিনে পরিবেশ বদলে যাবে ইনশাআল্লাহ। তুমি মন দিয়ে লেখাপড়া করো।”’
গাজার শিশুরা ভয়ার্ত এক সময় কাটাচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য দৌড়াচ্ছে প্রাণপণ। মা হারাচ্ছে, বাবা হারাচ্ছে, মাটি কামড়ে তবুও তারা বাঁচতে চাইছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া গতি নেই তাদের।
গাজায় বিপাকে ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা
ইউরো-ভূমধ্যসাগরীয় মানবাধিকার সংস্থা মনিটরের মতে, ২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সিরিয়ায় আশ্রয় নেয়া ১ লাখ ৬০ হাজার ফিলিস্তিনি শরণার্থী প্রতিবেশী কিংবা ইউরোপের দেশগুলোতে পালিয়ে যায়। এর প্রায় অর্ধেক ইউরোপে এবং বাকিরা লেবানন, তুরস্ক এবং জর্ডানে আশ্রয় নেয়। গাজায় এসে আশ্রয় নেয় প্রায় ৭ হাজার ফিলিস্তিনি শরণার্থী। তারা ভেবেছিল, নিজেদের দেশে ফিরে গেলে অবস্থার উন্নতি হবে। এ সময় গাজা এবং মিশরের মধ্যবর্তী রাফাহ ক্রসিং উন্মুক্ত ছিল এবং শরণার্থীরা ভিসা ছাড়াই মানবিক ভিত্তিতে প্রবেশ করতে পারত।
গাজায় এসে বিপাকে পড়েছে এসব শরণার্থীরা। চাকরি নেই, বাজার নেই, কাজ নেই। তার ওপর যখন-তখন হামলা তো আছেই। এক মূহুর্তের বিশ্বাস নেই, ভয় তাড়িয়ে বেড়ায় সারাক্ষণ। উপার্জনের অভাবে অনেকে একবেলা খেতেও পায় না। কেউ টাকা ধার করে সেই ধার পরিশোধ করতে না পারার কারণে জেলও খাটছে।
সিরিয়া থেকে ২০১২ সালে গাজায় এসেছিল আমিনা আহমেদের পরিবার। তখন তাদের কাছে ছিল কেবল ২০০ ডলার। ভয়, সঙ্কট, চাকরির হাহাকারে এখন তারা গাজা থেকে হিজরত করার স্বপ্ন দেখছে। তেমনি আরেক ভাগ্যাহত জামাল আহমাদ। নাকাবার ঘটনার সময় গাজায় পালিয়ে আসেন তিনি। এখানে এসেই তাকে পেয়ে বসে দারিদ্র্য। বিভিন্নভাবে তিনি চেষ্টা করছেন অন্যকোনো দেশে চলে যেতে। ৩২ বছর বয়সী আবু হামেদ পরিবারের খাবার কেনার জন্য টাকা ধার করে চলতে হয়। বকেয়া পরিশোধ না করতে পারায় তাকে চারবার জেল খাটতে হয়েছে। ৬৩ বছর বয়েসী ওদেহ বলেন, ‘ভেবেছিলাম নিজের দেশে ফিরে এলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখছি আমাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না; চাকরি দেবে তো দূরের কথা। ৩০০-এর বেশি পরিবার গাজায় এসেছিল। আবার সবাই গাজা থেকে পালাতে চাইছে। অনেকে পালিয়েও গেছে।’
ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের কাছে গাজা এখন কারাগার। কারাগার থেকে তারা এখন বেরোতে চাইছে। যেখানে খাবার নেই, চাকরি নেই, জীবনের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে কে থাকতে চাইবে?
গাজায় ইজরাইলের সাম্প্রতিক হামলা এবং হামাসের অবস্থান
গত নভেম্বরের শুরুতে ইজরাইলে গাজার ইসলামিক জিহাদের রকেট ছোড়ার প্রতিশোধ নিতে গাজায় আক্রমণ শুরু করে ইজরাইলের সেনারা। এতে ইসলামিক জিহাদের শীর্ষ কমান্ডার বাহা আবু আতা-সহ নিহত হয় আরও ৩৪ জন নাগরিক। সবচে লক্ষণীয় হলো—ইজরাইল এবারের হামলায় তার চিরশত্রু হামাসের দিকে আঙুল তোলেনি। বরং বিবৃতিতে, আক্রমণে বারবার ইসলামিক জিহাদকেই লক্ষ্য বানিয়েছে। গাজার সংকটময় এই পরিস্থিতিতে হামাস কার্যত চুপ ছিল। ইসলামিক জিহাদের শীর্ষ কমান্ডার নিহত হবার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, হামাস এবার কথা বলবে। কিন্তু হামাস যৌথ অপারেশন কমান্ডের পরামর্শে বসা ছাড়া আর কিছুই করেনি। এতে অবশ্য অনেকে হামাসের ওপর ক্ষিপ্তও হয়েছে।
জোর প্রতিবাদ কিংবা প্রতিআক্রমণ না করে হামাস কেন সংযত অবস্থানে ছিল, এর কারণটা জানতে হলে একটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে।
২০০৭ সালে ফাতাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে গাজার শাসনভার হাতে নেয় হামাস। ইজরাইল হামাসকে তখন শাসন থেকে বিতাড়িত করতে গাজা অবরোধ করে। ইজরাইলের লক্ষ্য ছিল বাহ্যিক চাপ কিংবা আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সৃষ্টি করে হামাসের পতন ঘটানো। কিন্তু হামাসের শক্তিশালী পদক্ষেপের কারণে তা সম্ভব হয়নি। বরং তারা এখনো ক্ষমতায়। পরে ২০১০ সালে ইজরাইল হামাসের সঙ্গে লড়াইয়ের কৌশল পরিবর্তন করে এবং গাজা এবং পশ্চিম তীরের মধ্যে বেড়া দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পশ্চিম তীরে হামাসের পা রাখাও নিষিদ্ধ করে দেয়। এ সময় আইএসের উত্থান হয়। হামাস পুরো ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা চায়, আইএস চায় ফিলিস্তিন হবে ইসলামি খেলাফতের প্রদেশ। আইএস তখন হামাসকে এক ভিডিও বার্তায় হুমকি দিয়ে বলে, হামাস ইজরাইলের প্রতি দুর্বল। এমন হলে হামাসকে ধ্বংস করে দেবে তারা। আইএসের হুমকির পর ইজরাইলের ধারণা হয়, গাজায় যেন আইএস না আসতে পারে, তাই হামাসের সাথে একটা স্থিতিশীল সম্পর্ক দরকার। তখন তাদের মধ্যে স্থিতিশীল থাকার একটা চুক্তি হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে পশ্চিম তীরে তিন ইজরাইলি সেনাকে হত্যা করলে ইজরাইল তার দায় চাপায় হামাসের ওপর। তখন চুক্তি ভেঙে গাজায় হামলা চালায় ইজরাইল। তবে এরপর আবার হামাসের সঙ্গে পূর্বের বোঝাপড়া ঝালাই করে। তার মধ্যে গাজার অবরোধ সহজ করা, গাজার ফিশিং জোন সম্প্রসারণ করা এবং কাতার থেকে গাজায় অর্থ প্রবেশের অনুমতি ছিল। এরপর হামাসের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব রাজি হামেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে এক আলাপে বলেছিলেন, হামাস ইজরাইলের সাথে রক্তাক্ত যুদ্ধে জড়িত হতে আগ্রহী নয়। বরং এর পরিবর্তে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করবে।
সেপ্টেম্বরের শেষদিকে ইজরাইলে রকেট হামলা করে স্থিতিশীলতা ভেঙে দিয়েছে ইসলামিক জিহাদ। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইজরাইল হামলা চালিয়েছে। তাই হামাস ইজরাইলের বিরুদ্ধে আক্রমণের ঘোষণা দেয়নি। এর মানে এই নয়, ইসলামিক জিহাদের শীর্ষ কমান্ডারের হত্যায় তারা খুশি হয়েছে। পলিটিক্যাল একটা কারণও হতে পারে—মাহমুদ আব্বাস যে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন, তা মাথায় রেখেছে হামাস। এবারের নির্বাচন পুরো দেশব্যাপী হবে, শুধু গাজায় নয়। এর অর্থ হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে হামাস জিততে না পারলেও পশ্চিম তীরে পা রাখার সুযোগ পাবে হামাস। এই নির্বাচনের মাধ্যমে গাজার ক্ষমতায় থাকতে চায় হামাস। তাই পরিস্থিতি আর উত্তপ্ত করতে চায়নি।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজার পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে যদি এভাবে খারাপ হতেই থাকে, তাহলে হামাস বেশিদিন চুপ থাকবে না। কিন্তু ইজরাইল গাজায় আগ্রাসন কমিয়ে দিলে হামাসও উচ্যবাচ্চ্য করবে না। তারা গাজায় শান্ত একটা পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করবে।
শেষকথা
রানা শুবায়ের লিখেছিলেন, মাঝেমধ্যে গাজায় এত সুন্দর রাত নামে, সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখা যায়, মনেই হয় না রাত বিদীর্ণ করে কীভাবে নেমে আসতে পারে মৃত্যুযজ্ঞ। কিন্তু কল্পনার সঙ্গে বাস্তবতা মেলে না। দীর্ঘ সত্তর বছর ধরে এই ভূমিতে যুদ্ধাপরাধ করে আসছে ইজরাইল। দুঃখ হলো পরাশক্তি দেশগুলো যুদ্ধাপরাধীদেরকেই সমর্থন দিয়ে আসছে। গাজা উপত্যকাকে বানিয়ে রেখেছে দমবন্ধ কারাগার। কোথাও কোনো ছিদ্র দিয়ে সামান্য আলোও আসে না। আমরা অপেক্ষা করি আলোর, অপেক্ষা করি মুক্তির।
