জল্লাদের প্রতি ভালোবাসা: পশ্চিমা মিডিয়ায় ইজরাইলের পক্ষে সাফাই

জল্লাদের প্রতি ভালোবাসা: পশ্চিমা মিডিয়ায় ইজরাইলের পক্ষে সাফাই

মুজাহিদুল ইসলাম :

আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের নতুন রূপ পশ্চিমা গণমাধ্যম। গণমাধ্যমের সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা বোঝায়, গণমাধ্যমের ওপর ভর করে কোনো ভূখণ্ডের জনগণের উপর প্রভাব, বলপ্রয়োগ ও দমননীতি চালু রাখা। গণমাধ্যমের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এর বলয়-অঞ্চলে সরাসরি জনগণের ঘরে পৌঁছে যায়। পরিবর্তন ঘটায় চিন্তায়, নির্যাতিতকে জালেম এবং জালেমকে নিষ্পাপরূপে উপস্থাপন করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মনে জুলুমের পক্ষে তৈরি হয় একধরনের সিম্প্যাথি, জল্লাদের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা।

ফিলিস্তিন-ইজরাইল

বিশ্বগণমাধ্যমে ফিলিস্তিন-ইজরাইল ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সবসময়। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো অত্যন্ত কৌশলে ইজরাইলের পক্ষাবলম্বন করে। পশ্চিমা গণমাধ্যম যেন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার উপস্থিতিকে বৈধতা দানের জন্য। কারণ, এটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত একটি সত্য যে, আমেরিকার জনগণ স্বাধীনভাবে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তারা পারিবারিক বা সামাজিকভাবে যতটুকু নীতি নৈতিকতা গ্রহণ করেছে, তার প্রয়োগ হলে হয়তো বিশ্বে আমেরিকার সুনাম-সুখ্যাতি ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম তথা অর্থনীতি ও গণমাধ্যম তাদের সঙ্গ দেবে না।

আমেরিকার এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলো ইহুদিদের দখলে। ফলে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ইহুদিদের স্বার্থের বাইরে কিছু করতে পারেন না। আমেরিকার রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ মূলতঃ কর্পোরেট হাউজগুলোর হাতে। আর তারাই আমেরিকার অর্থনীতির প্রাণ।

বিশ্বনিয়ন্ত্রণকারী নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, ফক্স নিউজ, এবিসি ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নালসহ অসংখ্য পত্রিকার নিয়ন্ত্রক ইহুদি। বর্তমান ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা জুকার বার্গ ইহুদি। ফেসবুক ইহুদি-বিরোধী যে-কোনো কন্টেন্ট মুছে ফেলার দায়িত্ব নিয়েছে অঘোষিতভাবে। কিছুদিন আগে কাতারভিত্তিক আল জাজিরা টিভি চ্যানেল দ্য ইজরাইলি লবি নামে ডকুমেন্টারি প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু তারা আমেরিকার সর্বোচ্চ স্তরের হস্তক্ষেপে তা সম্প্রচারে ব্যর্থ হয়।

কিন্তু কেন নামিদামী সাংবাদিক ইজরাইলের সেবায় তাদের মেধা নিয়োগ করে? সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পত্রিকার প্রকাশক ও মালিকরা বিষয়বস্তু এবং কন্টেন্টের থিম নির্বাচনে সাংবাদিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। ইজরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে–এমন সুযোগ রেখে সকল ভাষ্য তৈরি করতে হয়।

জল্লাদের প্রতি গণমাধ্যমের ভালোবাসা

ওয়াশিংটনপোস্ট : গতবছর গাজার বাসিন্দারের গাজা ও ইজরাইলের কাঁটাতার অভিমুখে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় ইজরাইলের ছোড়া টিয়ার গ্যাস ও তাজা বুলেটের দৃশ্যকে ওয়াশিংটন পোস্ট ’একধরনের যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করে। বেসামরিক ব্যক্তিদের এই পদযাত্রা তাদের নিকট ‘হামাস নামে মাত্র বেসামরিক ব্যক্তি পাঠায়।’ অথচ পত্রিকার হিসেবেই অনেক মানুষকে হত্যা করে ইজরাইল। পত্রিকার ভাষ্যানুসারে ‘হামাসের চূড়ান্ত লক্ষ্য–ইজরাইলের তৎপরতাকে ‘রাজনৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতন হিসেবে চিহিৃত করা।’

নিউইয়র্ক টাইমস : নিউইয়র্ক টাইমসের টমাস গাজার নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হামাসের ব্যাপারে বলেন, ‘যখন তুমি ইজরাইলি বেড়ার নিকট হাজার হাজার ফিলিস্তিনি যুবককে ঠেলে দিচ্ছ, ধরে নেওয়া যায়, এটা ইজরাইলে প্রবেশের জন্য। আর তাদের কতক তো আবার হামাসের যোদ্ধা। অন্যদিকে হামাস জানে, অনেক মানুষকে হত্যা করা হবে, আর ইজরাইল সীমান্ত খুলবে না।’ রক্ষণশীল কলামিস্ট ব্রেট স্টেফেন্ট লেখেন, ‘নিশ্চিত আমরা গাজার দুঃখের কথা শুনবো। কিন্তু খেয়াল করলে দেখবেন, এর জন্য খোদ ভুক্তভোগীরা দায়ী।’

ব্রেট হামাসের প্রতি জনগণের ক্রদ্ধ না হওয়ার বিষয়ে বলেন, হামাস কাঁটাতারের দিকে ফিলিস্তিনিদের বার বার ঠেলে দিচ্ছে। এমনকি ইজরাইল একাধিকবার এটা করা থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করছে। আবার কেন মিছিলের শুরুতে নারী ও শিশুদের রাখতে হবে। এ ধরনের আচরণের মাধ্যমে বেসামরিক ব্যক্তিদের হুমকির মুখ ফেলে দেওয়া হয়। হামাস জনগণকে সীমাহীন ধূর্ততা ও কাপুরুষোচিতভাবে ধ্বংসের মুখ ঠেলে দিচ্ছে। এ জন্য হামাসের নিন্দা করতে হবে।’

টাইমসের অন্যান্য লেখকরাও অনুরূপ লেখেন। ডেভিড ব্রুক্স ফিলিস্তিনিদের আচরণকে ‘বৌদ্ধিক নাট্য’ বলে কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, এর লক্ষ্য ‘ধূর্ততা’। শাহাদাতের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে তাদের নিপীড়নের মাত্রা তুলে ধরা।’

এখানে ইজরাইলের তাজা বুলেট ও অধিকার কেড়ে নেওয়ার ঘটনার কোনো নিন্দা বা কোনো কিছুই নেই! অথচ বেসামরিক ব্যক্তিদের পদযাত্রায় তারা হামাসের ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছে। দেখতে পাচ্ছে বেসামরিক মানুষের বোকামি, মানব ঢাল।

মার্টিন লুথার কিং বনাম তৎকালীন উগ্র ও কর্পোরেট বুদ্ধিজীবী

এ সকল কলামিস্ট ও বুদ্ধিজীবী মূলত মার্টিন লুথার কিং-এর নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সমালোচনাকারীদের উত্তরসূরী। যখন মার্টিন লক্ষ লক্ষ জনতা নিয়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়ান তখন তাদেরকে তৎকালীন বুদ্ধিজীবীরা বেসামরিক মানুষদের ঢাল হিসেবে ব্যবহারের নিন্দা করেন।

টাইমসের লেখক ব্রুক্স কি মার্টিন লুথারের বেসামরিক মানুষদের ঐ আন্দোলনকে ধূর্ততাপূর্ণ ও বেসামরিক মানুষদের মানবঢাল বলে অভিহিত করবেন? নিশ্চয়ই উত্তর হবে, না। তবে এখানে কেন! যখন মার্টিন নোবেল পান, তৎকালীন রক্ষণশীল কলামিস্ট লিউনেল লুকস ইউএস নিউজ পত্রিকায় অভিযোগ করেন, অনেক আমেরিকান মনে করে, আশ্চর্যের বিষয়, নিগ্রোদের নাগরিক অধিকারের লড়াইয়ের ওপর ভর করে একজন মানুষ পুরস্কার জিতলো, অথচ তার কর্মকাণ্ডে অনেক সহিংসতার জন্ম দিয়েছে।’

লুথার কিং অস্ত্রের সামনে বেসামরিক মানুষের আন্দোলনকে ক্ষোভ উসকে দেওয়া নয়, বরং পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটানো বলে অভিহিত করেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দ্রুত সংকট সৃষ্টি করার কাজ করছি, যা শীঘ্রই আলোচনার পথ খুলে দেবে। আমি নিশ্চিতভাবে সহিংসতার বিরোধী। কিন্তু গঠনমূলক সংকট ও গঠনমূলক উত্তেজনা সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য জরুরি বিষয়।

পাশ্চাত্য মিডিয়া, যারা নিজেদের সভ্য মানুষের আলয় বলে দাবি করে, তারা কি তাদের নিউইয়র্ক বা হংকংয়ের এমন কোনো পরিস্থিতিকে ধূর্ততা বা মানবঢাল অভিহিত করে অত্যাচারীকে দায়মুক্তি দেবে?

আগের সংবাদআগ্নেয়গিরির ছাইয়ে ঢেকে যাচ্ছে ফিলিপাইনের ঘরবাড়ি
পরবর্তি সংবাদলাস্ট জেনারেশন: ইজরাইল যেভাবে খৃস্টানদের বিতাড়িত করছে