মুসান্না মেহবুব :
বাংলাদেশে শেয়ার বাজারের অস্থিরতা যেন কাটছেই না। গত কয়েক দিনে বিদেশি ও স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি মার্জিন ঋণে কেনা শেয়ার বাধ্যতামূলক বিক্রির (ফোর্সড সেলে) চাপে বড় ধরনের দরপতনে পড়েছে পুঁজিবাজার। কয়েকদিন আগে অব্যাহত দরপতনের ফলে মূল্যসূচক নেমে ৪ হাজার ৩৬ পয়েন্টে কমে এসেছিল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মূল্যসূচক সর্বশেষ ২০১৫ সালে এতো নিচে নেমেছিল। ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেয়ার বাজারে দেশীয় আইন অবাধ লঙ্ঘনের পাশাপাশি ইসলামি অর্থনীতির নিয়ম-কানুন অনুসরণ না করার কারণেই এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
গত সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ধারাবাহিকভাবে বড় আকারের দরপতন ঘটতে থাকলে বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ করেন। পাশাপাশি জাতীয় সংসদেও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা এই দরপতনের পেছনে বাজারে সুশাসনের অভাবকে দায়ী করে সরকারের সমালোচনা করেন।
জাতীয় পার্টির জ্যেষ্ঠ সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ বুধবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, শেয়ার বাজারের এই দুর্গতির প্রধানতম কারণ দুর্বল কোম্পানিগুলোকে লিস্টিং দেওয়া। সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন ভুয়া কোম্পানিগুলোকে লিস্টিং দিয়ে বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে দিয়েছে।
তবে ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্বল কোম্পানিগুলোকে লিস্টিং দেওয়াসহ দেশীয় আরও অনেক নিয়ম-কানুন লঙ্ঘনের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের অনেকগুলো দুর্বলতাও দায়ী এই অস্থিরতার পেছনে।
আইএফ অ্যাকাডেমি অ্যান্ড কনসালটেন্সি’র কো-অর্ডিনেটর মাওলানা আবু সাঈদ যুবায়ের ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ২০১৩ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শেয়ার মার্কেট আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটে বড়মাত্রার দরপতন হয়েছিল। দরপতনটা ছিল ভয়াবহ রকমের, এ নিয়ে অনেক আন্দোলন হয়েছে, বই লেখা হয়েছে, এমনকি মুভিও তৈরি হয়েছে এই ইস্যুকে কেন্দ্র। লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন। তাঁরা একটাই দাবি তুলেছিলেন, পুঁজিবাদ আর চাই না।
মাওলানা আবু সাঈদ বলেন, এর আগে ২০০৮ সালে এই পুঁজিবাদের কারণেই বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। সেসময়ও এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। বিশ্বখ্যাত ইসলামিক স্কলার আল্লামা তকি উসমানি এ নিয়ে একটা বইও লিখেছেন। সেখানে পুঁজিবাদের দুর্বলতা এবং ভাঁওতাবাজি তিনি সবিস্তারে আলোচনার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন। মানুষজন এই দুই ঘটনায় পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন ও সমালোচনা করেছিল।
মাওলানা আবু সাঈদ বলেন, এই দুই ঘটনার মাধ্যমে আমি যেটা বোঝাতে চাই, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় এমন অনেক ফাঁক ফোকড় রয়েছে, যেগুলো শেয়ার বাজারের দরপতনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। দরপতনের এটা একটা কারণ। এ ছাড়া আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে নানা ধরনের অনিয়ম করা হয়। এই অনিয়মের কারণেও বিনিয়োগকারীরা লোকসানে পড়েন।
ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ এ আলেম বলেন, সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটা সেটা ঘটে ইসলামি অর্থনীতি না মানার কারণে। এটাকে কেবল ইসলামিক ফাইন্যান্স না, আমরা ইথিকাল ফাইন্যান্স বলতে চাই। এর সবগুলো নিয়ম-কানুন যদি কেবল বাংলাদেশে না, অন্যান্য দেশেও মানা হয়, তাহলে দরপতনের এই সমস্যাটা আর থাকবে না বলেই আমরা মনে করি।
তিনি বলেন, ইসলামি অর্থনীতির বড় একটা বিষয় হলো, পুঁজিবাজার বা ক্যাপিটাল মার্কেটে শুধু ক্যাপিটাল গেইনের উদ্দেশ্যে কোনো কোম্পানির স্থাবর কোনো সম্পত্তি থাকলে ওইখানে সে কেনাবেচা করতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশে এমন অনেক কোম্পানি আছে, যাদের স্থাবর কোনো সম্পত্তি নেই, রিয়েল কোনোকিছুই নেই, কেবল কাগজে কলমে কোম্পানি, তারা নিজেদের ফেইজভ্যালু থেকে বেশি দামে শেয়ার বিক্রি করছে। ফলে মূলে যখন কোনো কিছুই নেই, এক হাত দুই হাত ঘুরতে ঘুরতে শেয়ারটার দাম অনেক বেড়ে অবশেষে যখন দেখা যায় কিছুই নেই, তখন বহু উপর থেকে একটানে নিচে চলে আসে।
মাওলানা আবু সাঈদ যুবায়ের আরও বলেন, ঢাকা এবং চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জে একটা শরিয়াহ ইনডেক্স আছে। কিন্তু এটা পুরোপুরি শরিয়াহ আইন মেনে চলে না। এটা মূলত লন্ডনের একটা কোম্পানির নিয়মকানুনে এটা তৈরি করা হয়েছে। শরিয়াহ-বিশেষজ্ঞদের এটা অনেক প্রশ্নবিদ্ধ। ইসলামি ফিকহের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য রেখে এটা তৈরি করা হয়নি। ফলে ফটকাবাজির অনেক সুযোগ থেকে গেছে।
তিনি বলেন, সর্বশেষ আমরা যেটা বলতে চাই, ইসলামি অর্থনীতির যে নিয়মকানুন, সেটা যদি পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করা হয়, পাশাপাশি দেশীয় যে বেসিক আইন-কানুন আছে, সেটা মেনটেইন করা হয়, তাহলে শেয়ারবাজারের এই দরপতন কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি।
