‘বাংলাদেশ বিদ্বেষ’ : সীমান্তে বাড়ছে ভারতীয় আগ্রাসন

‘বাংলাদেশ বিদ্বেষ’ : সীমান্তে বাড়ছে ভারতীয় আগ্রাসন

রাগিব রব্বানি :

সীমান্তে থামছে না ভারতীয় আগ্রাসন। ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফ উগ্রভাবে বাংলাদেশের প্রতি তাদের বিদ্বেষের জানান দিচ্ছে। বাংলাদেশিদের নির্বিচার গুলি, নির্যাতন কিংবা গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে কদিন পরপরই। সীমান্তের কাছাকাছি কোনো বাংলাদেশিকে দেখলেই গুলি করছে তারা। পাকড়াও করতে পারলে চালাচ্ছে নির্মম নির্যাতন।

গত বছরের মাঝামাঝিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছিলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে গত ১০ বছরে মোট ২৯৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আর বছর শেষে গত ৩১ ডিসেম্বর বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৯ সালে ভারতের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী- বিএসএফ’র হাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৮ জন বাংলাদেশি। এরমধ্যে ৩৩ জন গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন এবং বাকি ৫ জনকে নির্যাতন করে মারা হয়েছে। এ ছাড়া বিএসএফ’র হাতে আহত হয়েছেন ৩৯ জন এবং আটক হয়েছেন আরও ৩৪ জন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দেশটির সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিএসএফ’র হাতে বাংলাদেশিদের প্রাণহানির সংখ্যা তিন গুণ বেড়েছে।

এ দিকে নতুন বছরের ২০ দিনও পার হয়নি, সীমান্তে এরই মধ্যে একাধিক বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে বিএসএফ। ধরে নিয়ে গেছে সীমান্তের কাছাকাছি নিজের জমিতে কৃষিকাজে ব্যস্ত এক বাংলাদেশিকে।

কৃষিকাজে ব্যস্ত কৃষকদের ধরপাকড়

গত ১৬ জানুয়ারি সন্ধ্যার দিকে মেহেরপুর সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের শোলমারী সীমান্তের আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ১২৯-এর নিকটবর্তী নিজ জমিতে কাজ করছিলেন মিলন হোসেন নামের স্থানীয় এক কৃষক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এমন সময় ভারতের ৮৪ বিএসএফের নন্দনপুর ক্যাম্পের সদস্যরা মিলনকে ধরে নিয়ে যায়।

এ ঘটনার পর ৬ বিজিবির পক্ষ থেকে মিলনকে ফেরত দেওয়ার জন্য বিএসএফের কাছে পত্র পাঠানো হয়। ১৭ জানুয়ারি দুপুরে বিএসএফের সঙ্গে বিজিবির পতাকা বৈঠক হয়। কিন্তু বৈঠকে মিলনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বিএসএফ। আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ১২৯/৫এস এর কাছে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বাংলাদেশিদের নির্মম কায়দায় নির্যাতন, হত্যা

এই ঘটনার ছয়-সাত দিন আগে লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্তে বাংলাদেশি এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে বিএসএফ। চোরাকারবারী সন্দেহে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে বুড়িমারী বামনদল সীমান্তের ৮৩৬ ও ৮৩৭ নম্বর মেইন পিলার এলাকায় মরদেহ ফেলে রেখে যায় তারা।

এ ছাড়া ২০১৯ সালে বাংলাদেশি নির্যাতনের নির্মম আরও বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়েছে বিএসএফ। গত বছরের ১০ মে সাতক্ষীরা সীমান্তে কবির হোসেন (৩২) নামে এক বাংলাদেশি শ্রমিককে অমানবিক নির্যাতন করে তারা। নির্যাতনের ফলে পরদিন ১১ মে ভোরবেলা লোকটি মারা যায়। পরিবারের অভিযোগ, বিএসএফ সদস্যরা তার পায়ুপথে পেট্রোল ঢেলে নির্যাতন করেছিল।

এর আগে ২৬ এপ্রিল নওগাঁর সাপাহার উপজেলার আদাতলা সীমান্তে ভারতের রাঙ্গামাটি ৬০ বিএসএফ ক্যাম্পের জোয়ানরা আজিমউদ্দীন নামে স্থানীয় এক বাংলাদেশি যুবককে গ্রেপ্তার করে নির্মম নির্যাতনের চালায়। গ্রেপ্তার ওই যুবকের হাতের সবকটি নখ প্লাস দিয়ে টেনে উপড়ে ফেলে তারা।

নির্বিচার গুলি করে হত্যা

সীমান্তে বিএসএফ সবচেয়ে বেশি হত্যা করে গুলি চালিয়ে। কাউকে সন্দেহ হলে উভয় দেশের আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেপ্তার বা জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ আছে, কিন্তু বিএসএফ এসব আইনের তোয়াক্কা না করে নির্বিচার গুলি চালায়।

চলতি বছরই গুলি করে হত্যার একাধিক ঘটনা ঘটিয়েছে বিএসএফ। এর মধ্যে গত ৯ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার পাড়িয়া সীমান্তে সাহাবুল ইসলাম নামে এক বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার পর লাশটিকে টেনে হেঁচড়ে নিজেদের ক্যাম্পে নিয়ে যায় বিএসএফ। পরে ঘটনার পাঁচদিন পর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিজিবির কাছে লাশ হস্তান্তর করে।

সীমান্তে ভারতের এই আগ্রাসন এবং নিপীড়ন বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা তাদের প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতনের বিষয়টি এই এক বছরে ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। সীমান্ত রক্ষী বাহিনীরা সীমান্ত পার করছেন এমন কাউকে দেখলেই গুলি করে ফেলছে। এই নীতি বদলাতে হবে।

তিনি বলেন, দুই দেশের সীমান্তে অভিন্ন পাড়া রয়েছে। যেখানকার মানুষেরা একে পাড়া হিসেবেই দেখে এবং ভারতের বাসিন্দারা বাংলাদেশে আসে আবার বাংলাদেশিরা ভারতে যায়। আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করা ছাড়াও জীবিকার সন্ধানেও মানুষ সীমান্ত পারাপার হয়ে থাকে।

‘দু দেশেরই আইন অনুযায়ী, এসব মানুষদের গ্রেফতার ও বিচার করার কথা। দু’দেশের সরকারি বাহিনীই যদি এটি মেনে চলেন তাহলে দেখা মাত্রই গুলি করার কথা না। কিন্তু সেটা হচ্ছে,’ বলেন তিনি।

এ ধরনের ঘটনাকে মারাত্মক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এই নির্বাহী পরিচালক।

আগের সংবাদদখলদারির বিরুদ্ধে খুতবা দেয়ায় মসজিদে আকসার খতিবকে বরখাস্ত করল ইজরাইল
পরবর্তি সংবাদআরব সাগর থেকে এক বাংলাদেশির লাশ উদ্ধার