রাকিবুল হাসান :
যেকোনো সিস্টেম সুনির্দিষ্ট একটি চিন্তা এবং দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বর্তমানে দ্বীনবিমুখ মুসলমানদের দ্বীনমুখী করার সবচেয়ে সফলতম মাধ্যম তাবলীগও এর বাইরে নয়। তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস রহ. জীবনের শুরুতেই তাবলীগের নতুন এই সিস্টেম এবং পদ্ধতি উদ্ভাবন করেননি। বরং জীবনের অভিজ্ঞতার একটি পর্যায়ে গিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু চিন্তার আলোকে তিনি এই পদ্ধতি খুঁজে বের করেছেন। পদ্ধতি খোঁজার এই সময়, মানুষের সঙ্গে তাবলীগের চিন্তা বিনিময়, তারপর তাবলীগের শুরু—পুরো প্রক্রিয়াটা কাছে থেকে দেখেছেন হজরত আবুল হাসান আলী নাদাবি রহ.।
তাবলীগে জামাত পাঠানোর কাজ তখনো শুরু হয়নি, এমন একদিন মাওলানা ইলিয়াস রহ. আবুল হাসান আলী নাদাবিকে বললেন, ‘মাওলানা! আপনার দ্বারা আমি কিছু কাজ নেব।’ এরপর তাবলীগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেলেন ক্ষণজন্মা এই চিন্তাপুরুষ। লেখায়, বলায়, চলায়, বয়ানে সারাজীবন তরজুমানি করে গেছেন তাবলীগের। তার সেই তরজুমানির সময়টা বিবৃত হয়েছে তার ‘মাওলানা মুহাম্মদ ইলয়াস রহ. ও তার দ্বীনী দাওয়াত’ বইয়ে।
এই বইয়ে আবুল হাসান আলী নাদাবি তাবলীগ জামাতের চিন্তাগত ভিত্তির দিকটি পাতায় পাতায় তুলে ধরেছেন। সংক্ষিপ্তভাবে সেগুলোকে আমরা কয়েকটি পয়েন্টে চিহ্নিত করতে পারি।
মুসলমানদের শেকড় মজবুত করা
ধর্মীয় আবহাওয়ায় বড় হলেও ইলিয়াস রহ. চোখ মেলে তাকিয়েছিলেন বাইরের পৃথিবীতে। তিনি স্পষ্টত দেখতে পেয়েছিলেন, মুসলমানদের ঈমান-আমল ক্রমশ অবনতির দিকে নামছে, দ্বীনের ‘আযমত’ ও মর্যাদাবোধ সম্পর্কে গাফলত ঝেঁকে বসেছে তাদের মধ্যে। অথচ ঈমান এবং দ্বীনের প্রতি আযমত-ই হলো ইসলামের মৌলিক ভিত। ঈমান দুর্বল হলে, দ্বীনের মর্যাদাবোধ সম্পর্কে গাফেল থাকলে দ্বীনের উচ্চস্তরীয় বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা বৃথা। শেকড় শক্তিশালী না হলে গাছ তার ডালপালায় শক্তি সঞ্চার করবে কীভাবে? তাই তিনি ভেবেছিলেন, এমন কিছু দরকার, যার মাধ্যমে মানুষের ঈমান তাজা হবে, তাদের হৃদয়ে দ্বীনের মর্যাদাবোধ ফিরে আসবে। এগুলো অর্জন হলে বাকি বিষয়গুলোর প্রতি তারা এমনিতেই আগ্রহী হয়ে উঠবে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব সংকট দূর করা
ইলিয়াস রহ. অনুভব করেছিলেন, এভাবে মানুষের দ্বীনী মর্যাদাবোধ হারাতে থাকলে নতুন নতুন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা তো দূরের কথা, পুরোনো এবং প্রতিষ্ঠিত দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যাবে। কারণ দ্বীনী মর্যাদাবোধ হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি, সেগুলো সংরক্ষণের গুরুত্ববোধ এবং সেখানে কর্মরতদের দ্বীনী খেদমত ও অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতির মানসিকতা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছিল। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান দুনিয়ামুখিতা এবং ঈমান ও সওয়াবের প্রতি অনাগ্রহিতার কারণে দ্বীনী ইলম চর্চাও নিষ্ফল হয়ে যাচ্ছে। এই ইলম তালেবে ইলমদের বিপক্ষে প্রমাণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই মাদরাসার কার্যকারিতা ও দ্বীনী ইলমের প্রভাব দুনিয়া থেকে উঠে যাচ্ছে।
মুসলমানদের কল্যাণের জন্য মাদরাসাকে তিনি অপরিহার্য মনে করতেন। কিন্তু মামুষের উদাসীনতার কারণে বিপুল মাদরাসা তখন মেওয়াতেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অথচ এই মাদরাসাগুলো আকাবিরগণ দ্বীনী দাওয়াত ও মেহনতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দ্বীন জিন্দা রাখার জন্য দেশব্যাপী মাদারাসার জাল ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। মাদরাসাগুলোকে তার আপন মহিমায় অটুট রাখার জন্য এখন আবার তেমন দ্বীনী দাওয়াত ও মোজাহাদা দরকার। মানুষের দ্বীনী মর্যাদাবোধ জাগ্রত করা দরকার।
অনুভূতি ও আত্মচাহিদার দাওয়াত
উপরোক্ত দুই দল ব্যাতীত আরেকদল মুসলিম আছে। যাদের দ্বীনের কোনো অনুভূতিই নেই। মর্যাদাবোধ থাকা তো দূরের কথা, তাদের অন্তরে দ্বীনের চাহিদা এবং পিপাসা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, দ্বীনের ব্যাপারে লাভ-ক্ষতির কোনো পরওয়া নেই তাদের। এখন দরকার এই মানুষগুলোকে দাওয়াত ও মেহনতের মাধ্যমে চাহিদা ও পিপাসা জাগিয়ে তোলা। দ্বীনের প্রয়োজনীয়তা তাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল করে দেয়া।
আম্বিয়ায়ে কেরামের আবির্ভাবকালে মানুষ এমন বিমুখ ও উদাসীন থাকতো। আম্বিয়ায়ে কেরাম তাদের মাঝে তলব ও জযবা, অনুভূতি ও স্পর্শ সৃষ্টি করতেন। এখনো সেই মানুষদের শীতল অনুভূতিতে উষ্ণতা এবং মৃত হৃদয়ে পিপাসা জাগিয়ে তুলতে হবে। আম্বিয়ায়ে কেরামের পদ্ধতি এটাই।
মক্তব : এক্সপেরিমেন্টাল মেথড
মেওয়াতে মানুষের ধর্মীয় অজ্ঞতা ও জাহিলিয়াত, দ্বীনের প্রতি অনাস্থা ও উদাসীনতা দূর করতে প্রথমত মক্তব প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছিলেন মাওলানা ইলিয়াস রহ.। কোথাও কেউ আমন্ত্রণ জানালে তিনি শর্ত জুড়ে দিতেন, ওখানে মক্তব প্রতিষ্ঠা করলে আমি দাওয়াত গ্রহণ করব। কিন্তু এক পর্যায়ে তিনি লক্ষ করলেন, মক্তবে যে ছাত্ররা আসছে তারা বাইরের দ্বীনহীন পরিবেশ এবং ধর্মীয় অনুভূতিহীন মানুষদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মানুষ মক্তবে তাদের ছেলেকে ধর্মীয় শিক্ষা দিতেও আগ্রহী নয়। তৃতীয়ত, মক্তবে পড়ছে কেবল বাচ্চারা। বয়স্ক লোকজন অধার্মিকতার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। তাই শুধু মক্তবে কাজ হবে না। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দ্বীনী মর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে, বাইরের পরিবেশে দ্বীনের আবহাওয়া তৈরী করতে হবে। তাহলে মাদরাসা-মক্তবে যারা পড়বে, তারাও সংরক্ষিত থাকবে। দ্বীন-ধর্মের দেখা পেলে মানুষ নিজেই উদ্বুদ্ধ হবে ধর্মীয় কাজে।
গণমানুষের দুয়ারে তাবলীগের বার্তা
এইসব চিন্তা মাথায় রেখে, নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে ইলিয়াস রহ. উপলব্ধি করলেন মানুষের কাছে গিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দ্বীনের দাওয়াত দেয়া ছাড়া উপায় নেই। ঈমানের ক্রমবর্ধমান অবনতি ঠেকাতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব সংকট কাটাতে, সর্বোপরি মানুষের মাঝে দ্বীনের বুঝ ও সমজ, মান্যতা ও সমীহ তৈরী করতে সরাসরি মানুষকে নিয়েই কাজ করতে হবে। সুতরাং তিনি শুরু করলেন তাবলীগের মেহনত। মানুষ অবাক হলো, বিস্মিত হলো, তার ডাকে সাড়া দিলো অল্প কজন মানুষ। এ দাওয়াত ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিয়ে মুবাল্লিগ পর্যন্ত নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি!
আবুল হাসান আলী নাদাবির বইটির আলোচনা থেকে স্পষ্ট—তাবলীগের পেছনে ইলিয়াস রহ.-এর মূল চিন্তা ছিল মানুষের ভেতর দ্বীনী জযবা এবং চাহিদা ব্যাপকতর করা। যেন দ্বীনের অন্যান্য শাখায় যারা কাজ করছেন, তাদের মেহনতগুলো বিফলে না যায়। তাবলীগ কখনোই দ্বীন প্রচারের কিংবা মানুষকে দ্বীনমুখী করার একমাত্র প্রচেষ্টা হিসেবে শুরু করেননি মাওলানা ইলিয়াস রহ.। ব্যাপক এবং দূরদর্শী যে চিন্তা নিয়ে তিনি তাবলিগের কাজ শুরু করেছিলেন, তা ছিল একটি বিপ্লব। একটি ইতিহাস।
