মুসান্না মেহবুব :
আলিয়া মাদরাসার দাখিল নবম-দশম শ্রেণির ইসলামের ইতিহাস বইয়ে বেশ কয়েকজন সাহাবিকে নিয়ে বিদ্বেষ ও বেয়াদবিমূলক কথাবার্তা সন্নিবেশিত থাকার অভিযোগ আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। সচেতন মহল বলছেন, এই পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে বেশ কয়েকজন সম্মানিত সাহাবি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মনে অমূলক বিরূপ ধারণা ও বিদ্বেষ তৈরির চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
বইটি ঘেঁটে দেখা যায়, কাতিবে ওহি হজরত মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হজরত আমর ইবনুল আস রাদিআল্লাহু আনহু সম্পর্কে বেশ কয়েক জায়গায় বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। তাঁদের চরিত্রহনন করা হয়েছে খুবই নির্মম শব্দে। এক জায়গায় উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা সম্পর্কেও বিষোদগার করা হয়েছে।
বইটির ১৪১ নম্বর পৃষ্ঠায় হজরত মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে বলা হয়, ‘হজরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর হত্যার প্রতিশোধ ও বিচারের অজুহাতে গৃহযুদ্ধের সূচনা করেন (হজরত মুআবিয়া)। অবশেষে আমিরে মুআবিয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে খিলাফতের পরিবর্তে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।’
বইয়ের ১৫২ নং পৃষ্ঠায় ‘মুআবিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সমরপ্রস্তুতি’ উপশিরোনামের অধীনে বলা হয়, ‘মুয়াবিয়া ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতালোভী ও উচ্চাভিলাসী।তিনি হযরত উসমান(রা) এর হত্যাকে অব্যর্থ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্বীয় অভীষ্ট সিদ্ধি সাধনে তৎপর ছিলেন।’
সিফফিন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়, ‘মুয়াবিয়ার ঔদ্ধত্য ও জঙ্গি মনোভাবের পরিবর্তন না হওয়ায় যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।’
বইটির ১৪৯, ১৫১, ১৫২, ১৫৩ ও ১৫৪ নং পৃষ্ঠায় হজরত মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ‘স্বার্থান্বেষী, ‘সম্পদলোভী’, ‘ক্ষমতালোভী’ ‘উচ্চাভিলাষী’ ‘স্বার্থপর’ ‘ঔদ্ধত’ ‘জঙ্গি মনোভাবাপন্ন’ ‘চক্রান্তকারী’ ‘পরিস্থিতি ঘোলাটেকারী’ ‘অপরাজনীতিবিদ’ ‘ভোজবাজ’ ও ‘নিকৃষ্টতম শঠ’ বলা হয়েছে। ঠিক এই বিশেষণগুলোই তাঁর সম্পর্কে এ বইয়ে প্রয়োগ করা হয়েছে। এ ছাড়া যেখানে অন্য সাহাবির নামের পর ‘রাদি.’ দুআ এসেছে, সেখানে সতর্কতার সঙ্গে মুআবিয়া রাদি.-এর নামের পর ‘রাদি.’ ব্যবহার করা হয়নি।
এর পাশাপাশি আলোচিত পৃষ্ঠাগুলোর নানা স্থানে হযরত আমর ইবনুল আস রাদি.-কে ‘ছলচাতুরিকারী’ ‘চক্রান্তকারী’ ‘ধূর্ত’ ‘হঠকারী’ ‘বিশ্বাসঘাতক’ ও ‘কপট’ বলা হয়েছে। যখনই তাঁর নাম এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষণ হিসেবে ‘ধূর্ত’ শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে, নির্মমভাবে। তাঁর নামের সঙ্গেও ‘রাদি.’ দুআ বর্জন করা হয়েছে।
বইটির ১৪৯ নং পৃষ্ঠায় জঙ্গে জামালের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, হযরত আয়েশা রাদি. হযরত আলি রাদি. এর প্রতি পূর্বশত্রুতা ও পূর্ববিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব থেকে এই যুদ্ধ বাঁধিয়েছেন।
উল্লেখ্য, সাহাবায়ে কেরাম হচ্ছেন সত্যের মাপকাঠি। কোনোভাবেই তাঁদের সমালোচনা করা যাবে না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ঐক্যমত এটার ওপরেই। তাঁদের সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে গেলে আদবের দিকে লক্ষ্য রাখাও বাঞ্চনীয়। অথচ এই বইয়ে কয়েকজন সম্মানিত সাহাবি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এসবের দিকে ভ্রুক্ষেপও করা হয় নাই। সচেতন মহল বলছেন, নাইন-টেনের কিশোর তরুণ ছাত্রদেরকে ইসলামি ইতিহাসের নামে যা পড়ানো হচ্ছে, তাঁদের ভেতরে সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই একটা বিরূপ ধারণার তৈরি হবে, যা আদৌ বাস্তব নয়।
সচেতন মহল বলছেন, আহলে সৃুন্নাহ ওয়াল জামাআহর অনুসারী হিসেবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিষয়টি সম্পর্কে প্রতিবাদ-প্রতিকার করা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টির অসঙ্গতি তুলে ধরে অনতিবিলম্বে পাঠ্যপুস্তক সংশোধন করা আমাদের সবার ঈমানি দায়িত্ব।
