রাকিবুল হাসান :
কারো সঙ্গে সম্পর্ক রাখা খারাপ কিছু না। কিন্তু সম্পর্কটা যখন হয় তোষামোদ এবং লেজুড়বৃত্তির, সেই সম্পর্কে নিষিদ্ধের তকমা লেগে যায়। পশ্চিমাদের সঙ্গে কাদিয়ানীদের সম্পর্কটা নিষিদ্ধ সম্পর্কের কাতারেই পড়ে। কাদিয়ানীদের ভিত্তিটা যেহেতু নিতান্তই ভঙ্গুর এবং মিথ্যা-জরাক্রান্ত, তাই তারা পশ্চিমের তাবেদারি এবং তোষামোদ করে নিজেদের একটা মেরুদণ্ড দাঁড় করাতে চেয়েছে মাত্র। অন্যদিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত কিছু মুসলিমকে পেয়ে পশ্চিমের কর্তারা তাদের অভিবাদন জানিয়েছে। বিশ্বাসের সমর্থনের চেয়ে স্বার্থের রসায়নটা এখানে গাঢ় বরং প্রগাঢ় ছিল।
ইজরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক
মির্জা গোলাম আহমদের সময়কালে কাদিয়ানীরা ইহুদিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেনি। ইজরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ১৯২০-এর দিকে কাদিয়ানী মতবাদের বার্তা নিয়ে সর্বপ্রথম ফিলিস্তিনে যান জালালুদ্দিন শামস। তারপর ১৯২৪ সালে ফিলিস্তিনে কাদিয়ানীদের ছোট একটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ফিলিস্তিন সফর করেন কাদিয়ানীদের দ্বিতীয় খলিফা মির্জা বশিরুদ্দিন মাহমুদ।
কাদিয়ানীরা বিশ্বাস করে—ইজরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এবং ফিলিস্তিনে ইহুদিদের বসবাস বাইবেল এবং পবিত্র কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারেই হয়েছে। ‘আহমাদিয়্যাতের আমন্ত্রণ’ গ্রন্থে মির্জা বশিরুদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ‘ইজরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এবং ফিলিস্তিনে ইহুদিদের বসবাস বাইবেল এবং পবিত্র কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারেই হয়েছে।’ আহমাদিয়া মুসলিম কমিউনিটি কর্তৃক প্রকাশিত The Commentary of the Holy Quran-এ সূরা বনি ইসরাইলের ১০৫ নং আয়াতের অনুবাদ করা হয়েছে—’এবং তারপর আমরা ইজরাইলের লোকদের বলেছিলাম, তোমরা তোমাদের দেশে বসবাস করো। পরবর্তী প্রতিশ্রুত সময় উপস্থিত হলে তোমাদেরকে একসঙ্গে নিয়ে আসব।’ মির্জা তাহির আহমদের উর্দু অনুবাদে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘ইহুদিদের পৃথিবীর সমস্ত অঞ্চল থেকে পবিত্র ভূমিতে ফিরিয়ে আনা হবে। বালফোর ঘোষণাপত্রের আওতায় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের বসতি স্থাপন এবং ইজরাইলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কুরআনের এই ভবিষ্যদ্বাণী উল্লেখযোগ্যভাবে পূরণ হয়েছে।’ (পৃ:৪৮০)
বর্তমানে ইজরাইলে হাইফার কাবাবির পাড়ায় বসবাস করে কাদিয়ানীরা। কাবাবিরের কাদিয়ানী-প্রধান শেখ মুহাম্মদ শরীফ ওদেহ রাষ্ট্রপতি শিমোন পেরেসকে রমজানে ইফতার এবং ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ইফতারে ইহুদি এই রাষ্ট্রপতি অংশ নিয়ে কাদিয়ানীদের প্রশংসাও করেছিলেন। এ ছাড়াও ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আহমাদিয়া মুসলিম কমিউনিটি ইউএসএ-র ফিলাডেফিয়া শাখার সদস্যরা অবহেলিত সেন্ট লুই ইহুদি কবরস্থান পরিদর্শন করেছেন এবং পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নিয়েছেন।
ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক
এই উপমহাদেশে ব্রিটিশদের শাসন এবং শোষণকে জোর সমর্থন দিয়েছে মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী। লেখায় এবং বলায় জয়েজ করতে চেয়েছে ব্রিটিশদের রাজত্ব, হারাম ঘোষণা করেছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদ।
গোলাম আহমদ কাদিয়ানী লিখেছে, ‘আজ থেকে আল্লাহর আদেশে তলোয়ার দিয়ে মানবিক জিহাদের আদেশ বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে যে-কেউ অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে তলোয়ার তুলে নিজেকে গাজী বলে আখ্যায়িত করবে, সে নবীর বিরোধিতা করবে। যিনি ১৩০০ বছর আগে জানিয়ে দিয়েছিলেন, প্রতিশ্রুতিযুক্ত মাসিহের সময়ে তলোয়ার দিয়ে জিহাদ বাতিল করা হবে। সুতরাং আমার আগমনের পরে এখন কোনো জিহাদ নেই। আমাদের দিক থেকে আমরা শান্তির পতাকা তুলেছি।’ (খুতবায়ে ইলহামিয়া, রুহানি খাজেন, খণ্ড ১৬)
ব্রিটিশ লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে লেখা এক চিঠিতে মির্জা সাহেব লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি যে, আমার অনুসারী বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে জিহাদের মতবাদের বিশ্বাসীরা হ্রাস পাবে। কারণ, আমাকে মাসিহ ও মাহদী হিসাবে গ্রহণ করা মানে জিহাদ মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করা।’ (তাবলিগ-এ-রিসালাত, খণ্ড ৭)
ব্রিটিশদের প্রতি নিজের আনুগত্যের বর্ণনা দিয়ে গোলাম আহমদ কাদিয়ানি লিখেছে, ‘আমার প্রথম দিন থেকে এই ষাট বছর বয়স পর্যন্ত আমি আমার কলম এবং জিহ্বা দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি বিশ্বস্ত আনুগত্যের প্রতি মুসলমানদের হৃদয়কে আগ্রহী করে তোলা এবং সদিচ্ছার অনুভূতি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাজটিতে নিযুক্ত থেকেছি। সরকারের প্রতি সহানুভূতি জাগ্রত এবং আমি তাদের মন থেকে জিহাদের ধারণাগুলো নিষ্ক্রিয় করতে চেষ্টা করেছি। কারণ এই ধারণাগুলো তাদেরকে এই সরকারের সাথে খোলামেলা ও আন্তরিক যোগাযোগ স্থাপন থেকে বাধা দেয়। শুধু এতটুকু নয়, বরং আমি এসব বিষয়ে আরবি, ফারসি এবং উর্দুতে অনেক বই লিখে বিভিন্ন দেশে প্রচার করেছি।’ (কিতাব-উল-বারিয়া, রুহানি খাজেন, খণ্ড ১৩)
মির্জা গোলাম আহমদ এবং তার ঘনিষ্ঠরা তাদের অনুগামীদের উপর ব্রিটিশ সরকারের স্বার্থে প্রার্থনা, গুপ্তচরবৃত্তি, হত্যা এবং জীবন দান বাধ্যতামূলক করেছিল। মির্জা গোলাম ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তার অনুকরণীয় সেবার জন্য গর্ব প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি এবং এই কথা প্রকাশ করতে লজ্জা পাননি। বরং এর পরিবর্তে তিনি তাদের কাছ থেকে সুরক্ষা এবং ক্ষতিপূরণ প্রত্যাশা করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমার বইগুলো আরব বিশ্বে অবিরত সরবরাহ করা হয়েছিল যতক্ষণ না আমি অনুভব করছি যে, বইগুলো প্রভাব ফেলছে। আপাতদৃষ্টিতে সত্যের সন্ধানে আমি এই প্রকাশনাগুলোতে প্রচুর সময় ব্যয় করেছি। কখনও এই দায়িত্বটিকে অবহেলা করিনি। তাই আমি বলি, ব্রিটিশ সরকারের কাছে এই পরিষেবাগুলোর বিষয়ে আমি অনন্য এবং আমি এই ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে দুর্গ এবং তাবিজের মতো। আমিই সে, যে তাদের মন্দ থেকে রক্ষা করি। আল্লাহ আমাকে প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকবেন আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না। সুতরাং, এই সরকারের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমার মতো সমান ও অনুরূপ আর কেউ নেই এবং যদি এটি লোককে জানার পক্ষে সক্ষম হয় তবে এটি আমার পরিষেবার মূল্য অনুধাবন করবে।’ (নূর-উল-হক, রুহানি খাজেন, ৮ ম খণ্ড)
তিনি আরও লিখেছেন, ‘ব্রিটিশ সরকার আমাকে এবং আমার অনুসারীদের সুরক্ষা এবং আশ্রয় দিয়েছেন। আমরা এখানে, ব্রিটিশ সরকারের অধীনে যে শান্তি উপভোগ করি তা মক্কা আল মুকাররমায় বা মদীনা মুনাওয়ারাতে পাওয়া যায় না।’ (তিরিয়াক-উল-কুলুব, রুহানি খাজেন, খণ্ড ১৫)
উচ্চ পদস্থ কাদিয়ানী কর্মকর্তারা এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘প্রকৃতপক্ষে, ব্রিটিশ সরকার আমাদের আশ্রয়স্থল। আমরা এই সরকারের সুরক্ষায় এগিয়ে চলেছি। যদি এই সুরক্ষা-ছায়া সরিয়ে ফেলা হয়, তবে আমরা চতুর্দিক থেকে বিষাক্ত তীরের ফলায় খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাবো।’ (আল-ফাদল, ১৯ অক্টোবর, ১৯১৫; মির্জা মাহমুদ আহমদ)
শেষকথা
কাদিয়ানীরা যেখানেই বাস করে, সেখানেই সংবেদনশীল অবস্থান তৈরির চেষ্টা করে। ইজরাইল, ভারত এবং পাকিস্তান; বিশেষ করে কাদিয়ানীরা আফ্রিকা ও কিছু পশ্চিমা দেশে বেশ সক্রিয়। শুধু আফ্রিকাতেই তাদের ৫ হাজার দাঈ এবং প্রশিক্ষক রয়েছে। নিজেদের বিশ্বাসের প্রতি আহ্বান জানাতে কাদিয়ানীরা শিক্ষামূলক উপায় বিশেষভাবে ব্যবহার করে। কারণ তারা শিক্ষায় এগিয়ে। বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ডাক্তার সবকিছু রয়েছে তাদের। ব্রিটেনে ইসলামিক টিভি নামে তাদের একটি টিভি চ্যানেলও আছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপিটাউনে ইসলামিক ফিকহ কাউন্সিল এক বিবৃতিতে বলেছিলো, ‘কাদিয়ানীদের ইজরাইলের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক আছে। ইজরাইল তাদের জন্য কেন্দ্র এবং স্কুল খুলে দিয়েছে। তাদের মুখপত্র হিসাবে ম্যাগাজিন এবং বই প্রকাশ করে বিশ্বব্যাপী বিতরণের জন্য সহায়তা করেছে।’
