আমওয়াস : সাহাবা যুগের মহামারী

মুজাহিদুল ইসলাম

বিশ্বে এখন সংক্রমক ব্যধির শংকায় আতংকিত সবাই। শহরের পর শহর জুড়ে ভুতুড়ে পরিবেশ বিদ্যমান । রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ ও সবকিছুতেই সুনসান নীরবতা। ধনী-গরীব ও নিপীড়ক-নিপীড়িত কেউই রক্ষা পাচ্ছে না। কুশল বিনিময়ে হাত না-মিলিয়ে পা স্পর্শ করাকেই মহা সাহসিকতা ও উদারতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মৃত্যুর পরবর্তী স্থানটিতেও দেখা যাচ্ছে এক ধরণের বিমাতাসুলভ আচরণ। যাকে ভাইরাস যুগের গোরস্থানের ইতিকথা বলা যায়।

একজন বিশ্বাসী মুসলিম তার আত্মপরিচয়ের সূত্রে খুঁজতে থাকে যে, নবী-সাহাবা-সালাফের যুগে কি এমন কোন বিপর্যয় সংঘটিত হয়েছিল? সেই অনুসন্ধানেই তার সামনে আবিষ্কৃত হয় উমর রা. এর যুগের এক মহামারী, বড় বড় সাহাবীদের মৃত্যুর শিক্ষাপ্রদ ঘটনা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে উমর রা. এর নিরন্তর এক প্রচেষ্টার কথা।  সেই মহামারীর কিছু চিত্রায়ণই এই লেখায় পাওয়া যাবে।

উৎপত্তি স্থল, নামকরণ, সময় কাল ও বিস্তৃতিঃ

উমর রা. সবেমাত্র সহকর্মী ‘আমীনুল উম্মাহ’ উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ ও ফকীহ ‍মুয়াজ ইবনু জাবালসহ রাসুলের প্রিয় মানুষগুলোর হাতে বায়তুল মুকাদ্দাসের ভার তুলে দিয়ে মদিনায় ফিরে এসেছেন। সাহাবারা বায়তুল মুকাদ্দাসের পাশে স্থানীয় নাগরিকদের সাথে বসবাস করছেন। তাদের চরিত্রমাধুর্যে দলে দলে অমুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ করছেন।

১৯ হিজরী। দ্বিতীয় বারের মতো শামে যাবার জন্যে আমিরুল মুমিনীন উমর রা. মুহাজির ও আনসারদের নিয়ে মদিনা থেকে বের হলেন। তাদের কাফেলা তখন হিজাজ ও শামের সীমান্তে। জনৈক সেনাকমান্ডার এসে শামে মহামারী উপদ্রবের আশংকার কথা জানালেন। উমর রা. পরামর্শে বসলেন। সিদ্ধান্ত অনুসারে ফিরে এলেন আবার মদিনায়।

বায়তুল মুকাদ্দাসের পার্শবর্তী ছোট শহর ‘আমওয়াস’ এ প্রকাশ পায় প্রথম এই রোগ। তারপর ছড়িয়ে পড়ে পুরো শামজুড়ে। কয়েক মাস এই মহামারীর প্রকোপ জারি থাকে। এমনকি ইরাকের বসরাহ শহরেও এর বিস্তৃতি দেখা যায়।

রোগসৃষ্টির অনুকূল অবস্থা ও প্রেক্ষাপট 

শামে মুসলিম ও রোমান বাহিনীর মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের পর অসংখ্য রোমান সৈন্য নিহত হয়। মুসলিম সৈন্যদের লাশ দাফন করার সময় ও সুযোগ হলেও রোমানদের লাশ দাফন করা হয়নি। মানুষের অনুপস্থিতিতে হাজার হাজার লাশ পড়ে থাকে। আবহাওয়া দূষিত হতে থাকে। এর পরেই মূলত এই ঘটনা ঘটে। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের এমন মতামতই তুলে ধরেছেন হাল আমলের ইতিহাসবিদ আলী সাল্লাবী ও সারজানী। ইবনু হাজার আসকালানী রহ. বলেন, ‘এটা ছিল শরীরে একধরনের ফোসকা ও একটু বড় টিউমারের মতো।’

মৃত্যুর পরিসংখ্যান 

আক্রান্ত হওয়ার পর কোন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচ দিন জীবিত থাকতো। উবায়দাহ উবনুল জাররাহ রাজিঃ এর নেতৃত্বে তখন শামে ত্রিশ থেকে পয়ত্রিশ হাজার মুসলিম অবস্থান করছিল। ইতিহাসবিদদের মতভেদ অনুসারে অন্তত পচিশ হাজার মানুষ এই মহামারীতে মারা যায়। বিশেষ একটি অঞ্চলের আশি শতাংশ মানুষ কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়াটা যে কত বড় নাজুক পরিসি্‌হতি ছিল, তা কল্পনা করাও অনেক দুষ্কর । বদর থেকে নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের আগ পর্যন্ত সকল যুদ্ধেও এত মুসলিম শাহাদাত বরণ করেনি।

উমর ও আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ এর মধ্যে হৃদয়স্পর্শকারী পত্রবিনিময়

পারস্যের সাথে তখন তুমুল যুদ্ধ চলছে। বায়তুল মুকাদ্দাসে  সৈন্যদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ। তখনো তিনি রোগাক্রান্ত হননি। বিশেষ বিবেচনায় তাকে ডেকে পাঠানোর জন্য পত্র পাঠালেন উমর রা.।

”আপনার প্রতি সালাম

আপনার নিকট আমার একটি প্রয়োজন আছে। আপনার সাথে সরাসরি কথা বলা দরকার। তাই আমি বলছি, যখন আপনি আমার চিঠি পড়বেন, হাত থেকে না রেখেই রওনা দিবেন। চিঠি যদি আপনার নিকট রাতে পৌঁছায়, তাহলে ভোরেই আপনি আমার নিকট উপস্থিত হবেন। আর চিঠি যদি সকালে পৌঁছায়, সন্ধ্যায়ই আমার সাথে দেখা করবেন।”

আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহকে মহামারী কবলিত স্থান থেকে বের করে আনার জন্য উমর রা. এর এই কৌশল — এটা বুঝতে পেরে তিনি উত্তর লিখে পাঠালেন,

“হে আমিরুল মুমিনীন!

আপনার প্রয়োজন আমি বুঝতে পেরেছি। এখানের মুসলিম সৈনিকদের আমার প্রয়োজন আছে। আমি তাদের ছেড়ে যেতে চাইনা। আল্লাহ আমার বিষয়ে ও তাদের বিষয়ে ফায়সালা করুন। হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি আপনার ইচ্ছা ত্যাগ করুন। আমাকে আমার সৈন্যদের মধ্যে থাকতে দিন।”

ফিরতি জবাব পেয়ে উমর রা. এর মতো লৌহপ্রাণ মানুষের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। আবু উবায়দাহ মারা গেছেন ; উপস্থিত ব্যক্তিদের এমন আশংকার জবাবে উমর কাঁদো স্বরে বললেন, ‘না’ কিন্তু … “ অর্থাৎ মৃত্যুর মুখে।

এক বর্ণনা অনুসারে পত্রবিনিময় করছিলেন তারিক নামক এক ব্যক্তি। তিনি পুনরায় উমর রা. এর পক্ষ থেকে সামান্য হলেও জায়গা পরিবর্তনের নির্দেশনা নিয়ে আসলেন।

আবু উবায়দাহ যখন তাকে জায়গা খুঁজে বের করতে বললেন, তখন তিনি নিজের বাড়িতে গিয়ে নিজের স্ত্রীকে আক্রান্ত দেখতে পেলেন।

তারিক ফিরে এসে আবু উবায়দাহকে বিষয়টি বললে তিনি তাকে সমবেদনা জানান। এরই মধ্যে তারিক আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ এর পায়ে ও কাঁধে রোগের লক্ষণ দেখতে পেলেন।

আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ এর মৃত্যু

আবু উবায়দাহ অবস্থা অনুধাবন করতে পেরে সকলের সামনে নীতিনির্ধারণী ভাষণ দিলেন। এবং মুয়াজ ইবনু জাবালকে পরবর্তী দায়িত্বশীল নিযুক্ত করলেন। আবু উবায়দাহ আলোচনার এক পর্যায়ে যখন বলছিলেন- হে লোকসকল, এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে রহমত। তোমাদের নবীর দোয়ার প্রতিফল। আবু উবায়দাহ যখন সকলের থেকে প্রতিশ্রুতি নিতে যাচ্ছিলেন, হেঁচকি তুলতে তুলতে তিনি সেখানেই ইন্তেকাল করেন। তখন তিনি ৫৮ বছর বয়স পার করছিলেন।

প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকট দাফনের কথা বললেও এটা নিয়ম হয়ে যাওয়ার আশংকায় যেখানে মৃত্যু বরণ করবেন, সেখানেই দাফন করতে বলেন।

মুয়াজ ইবনু জাবালের ভাষণ

‘ ভাইয়েরা! তোমরা সত্যিকার তওবাহ করো। যে বান্দা তাওবাহ করে, সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। তোমাদের ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করো।…..”

মুয়াজ বিন জাবাল, আমর ইবনুল আস ও দাহহাক বিন কায়েস যখন তাকে কবরে রাখেন, তখন মুয়াজ বললেন,

”হে আবু উবায়দাহ! আমি অবশ্যই তোমার প্রশংসা করবো। তবে এমন কিছু বলবো না, যাতে আমাকে আল্লাহর নিকট জবাব দিতে হয়। কসম খোদার, আমার জানা মতে, তুমি ছিলে অনেক জিকিরকারী, জমিনে নম্রভাবে চলাচলকারী, জাহিল ব্যক্তিরা তোমার সাথে কথা বললে, তুমি বলতে, ঠিক আছে। খরচ করলে বেশীও করতে না, আবার কৃপণতাও করতে না। কসম খোদার, তুমি ছিলে অসহায় ও ইয়াতিমদের প্রতি খুবই দয়াশীল। এবং বিশ্বাসঘাতক ও অহংকারীদের নিকট ভয়ের মূর্তপ্রতীক।”

মুয়াজ ইবনু জাবালের মৃত্যু

মুয়াজ ইবনু জাবাল হলেন সেই ব্যক্তি, রাসূল সা. যাকে ইয়েমেনের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। আবার তার বিষয়ে বলেছিলেন, মুয়াজ খুবই ভালো ছেলে।

পরদিন সকালে যখন মুয়াজ রা. আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহকে দাফন করলেন, তখন তিনি লোকদের বিভিন্ন সমালোচনা শুনছিলেন- এই মহামারী ফেরআউনের সম্প্রদায়ের নিকট বিপদরুপে এসেছিল, এটাও তাই। মুয়াজ রা. লোকদের এই কথার উপযুক্ত খন্ডনের সময়ই মাত্র ৩৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

যখন উমর রা. এই সংবাদ শুনলেন, কান্নায় তার দাঁড়ি ভিজে গিয়েছিল। তিনি ইয়াজীদ বিন সুফিয়ানকে পরবর্তী দায়িত্বশীল নির্ধারণ করলেন।

পুনর্বাসন কার্যক্রম

এভাবে আরো দুইজন গভর্নর মহামারীতে শহীদ হন। শহীদদের মধ্যে রাসূল সা. এর চাচাতো ভাই ফুজাইল বিন আব্বাস, আবু জান্দাল বিন সুহাইল, আবু জাহলের ভাই হারিস বিন হিশাম, আবু মালিক আশআরী, মুয়াজ ইবনু জাবালের স্ত্রী ও দুইসন্তানসহ অনেক প্রথমসারির সাহাবী মহামারীতে শাহাদাত বরণ করেন।

ব্যাপক মৃত্যুর কারণে শামের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। একসময় আল্লাহ তায়ালা যখন এই ভূমিকে সবার জন্য সহনীয় করে দিলেন, তখন শামের সবকিছু পুনরায় বিন্যস্ত করা হয়। এই মহামারী যতটুকু না বিপর্যয়ের নির্দেশ করে, তার থেকে অনেক বেশী রাসূলের রেখে যাওয়া দ্বীনের প্রতি সাহাবাদের অবিচলতার সাক্ষ্য দেয়।

আগের সংবাদজারিফ মহামারী : মৃত্যুদায়গ্রস্থ বসরা শহর
পরবর্তি সংবাদদিল্লি পেয়েছিস! বলেই দুই মুসলিমকে মারধর